‘প্রবাহ’ -
গবেষণাধর্মী একটি পূর্ণাঙ্গ লিটল ম্যাগাজিন
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ২০২০
- এর পুণ্য প্রভাতে বরাক উপত্যকার প্রত্যন্ত শহর লালাবাজারে বসবাসরত সাহিত্যের এক
নিমগ্ন পূজারি - মান্যবর আশিসরঞ্জন নাথের হাত থেকে সসম্মানে গ্রহণ করেছিলাম
গবেষণাধর্মী লিটল ম্যাগাজিন ‘প্রবাহ’-এর সর্বশেষ সংখ্যাটি। এ সংখ্যার সুচিন্তিত
বিষয় - ‘চা বাগিচার যাপন কথা’। বিগত ৩২টি বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন
ভাবে এভাবেই একের পর এক প্রাসঙ্গিক বিষয় ভিত্তিক প্রকাশের মাধ্যমে ‘প্রবাহ’ বরাক
উপত্যকার সাথে সাথে উত্তর পূর্ব তথা দেশের বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের জগতে এক
সুনিশ্চিত উচ্চতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে নিঃসন্দেহে।
শ্রী আশিসরঞ্জন নাথ মহাশয়ের পরিপক্ক সম্পাদনায় বলতে গেলে নিখুঁত ভাবে সেজে উঠেছে অন্যান্য বারের মতো এবারের এই সংখ্যাটিও। ধারে ও ভারে এক কথায় অপ্রতিরোধ্য সংখ্যাটি হাতে নিলেই ইচ্ছে করে পালটে যাই একের পর এক পাতা। প্রচ্ছদ থেকে প্রায় শেষের পাতাটি অবধি সজ্জিত হয়ে আছে পাতায় পাতায় - যে পাতার নির্যাসে শুরু হয় আমাদের নিত্যদিনের রোজনামচা, অর্থাৎ চায়ের পাতা। নামে লিটল হলেও এ যেন চা ও চা বাগিচার সাতকাহনের এক পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন। মোট ১৬৩টি পৃষ্ঠা জুড়ে চা বাগিচার সুখ দুঃখ ও ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে হারিয়ে যেতে হয় দেশ থেকে দেশান্তর, কাল থেকে কালান্তর। প্রায় ১৬৫ বছর আগে প্রথমবারের মতো ‘বরাক উপত্যকায়’ শুরু হয়েছিল চা-এর চাষ। তখন থেকে আজ অবধি চা তথা চা বাগিচার নিরন্তর যাপন কথায় ঋদ্ধ ‘প্রবাহ’-এর এই সংখ্যাটি পড়তে পড়তে যেন মনে হয় এই মাত্র শেষ হলো - শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি বিজড়িত একাধিক চা বাগানের কোনও একটির আপাত সম্পূর্ণ পরিক্রমা।
গণেশ নন্দীর প্রাসঙ্গিক রঙিন প্রচ্ছদে প্রথম দর্শনেই জাত চেনা যায় ‘প্রবাহ’-এর। সম্পাদকীয়তে অতিকথনের ছায়া মাড়াননি বুদ্ধিদীপ্ত সম্পাদক। স্বল্প কথায় খেই ধরিয়ে দিয়েছেন অফুরন্ত বিষয় সম্ভারের। মোট একুশটি বিষয় ভিত্তিক নিবন্ধ, একটি বিষয় বহির্ভূত নিবন্ধ, কবিতাগুচ্ছ ও ‘পাঠকের চিঠি’তে গ্রথিত হয়েছে সংখ্যাটি। বিষয় ভিত্তিক নিবন্ধের শ্রীগণেশ হয়েছে নিবন্ধকার দেবব্রত দত্তের একটি মূল্যবান নিবন্ধের মাধ্যমে। “বরাক উপত্যকার চা বাগান - গোড়াপত্তন পর্ব” শীর্ষক নিবন্ধটি ১৯৬৫ ইংরেজিতে শিলচর গুরুচরণ কলেজের মুখপত্র পূর্বশ্রীতে প্রকাশিত নিবন্ধের পুনর্মুদ্রণ। নিবন্ধটিকে চা-এর আদি কথা বললেও অত্যুক্তি হয় না। একাধিক সরকারি চিঠিপত্রের পুনর্মুদ্রণের মাধ্যমে ইতিহাস যেন কথা বলেছে এই রচনায়। চা শ্রমিকের জীবন যাত্রার বিভিন্ন দিকের সংক্ষিপ্ত অথচ বৈচিত্রময় পরিচয় বর্ণিত হয়েছে রাখি পুরকায়স্থের নিবন্ধ - ‘বরাক উপত্যকার চা জনগোষ্ঠী - আগমন ও বিবর্তনের রূপরেখা’ নিবন্ধে। মেঘমালা দে মহন্তের নিবন্ধ ‘আসামে চা শ্রমিক আমদানি - এক দীর্ঘ দহনকথা’ চা শ্রমিকদের উপর বহু তথ্যপূর্ণ এক করুণ গাথা। বিশিষ্ট নিবন্ধকার ও সমাজ কর্মী অরূপ বৈশ্যের দীর্ঘ নিবন্ধ ‘বরাক উপত্যকার চা শ্রমিকদের আন্দোলন ও চা-শিল্প’ সব দিক সামলে নিয়ে লিখা চা শিল্পের এক পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন। ‘চা শ্রমিকদের মাতৃভাষা ও তার ক্ষয়িষ্ণুতা’ শিরোনামে যশস্বী লেখিকা কাজল দেমতা লিপিবদ্ধ করেছেন চা বাগানের ভাষার এক বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা। চা জনজাতির বিবাহের রীতিনীতি নিয়েও রয়েছে তাঁর আরেকটি নিবন্ধ। ঠিক তেমনি চা বাগিচার শিক্ষা ব্যবস্থা ও তার ত্রুটি নিয়ে নিবন্ধ লিখেছেন অধ্যাপক রমাপ্রসাদ বিশ্বাস। সাংস্কৃতিক দিকসমূহের উপর বিভিন্ন নিবন্ধে আলোকপাত করেছেন ডঃ সন্তোষ আকুড়া, অশোক বার্মা, গল্পকার ঝুমুর পাণ্ডে ও শংকর দেব। ডঃ আকুড়ার নিবন্ধে উল্লিখিত একটি প্রচলিত গানের কথায় আমরা গভীর ভাবে অনুভব করতে পারি চা মজদুরদের জীবনের দুঃখজনক ইতিহাসের ইঙ্গিত -
সাহাব বলে কাম কাম
বাবু বলে ধরি আন,
সর্দার বলে লিব পিঠের চাম,
হে বিদেশি শ্যাম -
ফাঁকি দিয়ে আনিলি আসাম।
চা বাগান অঞ্চলে চর্চিত খেলাধূলার উপর বিস্তৃত আরেকটি নিবন্ধ লিখেছেন অশোক বার্মা। বরাক উপত্যকার লাবক চা বাগানের হাসপাতালে রোনাল্ড রস কর্তৃক ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক আবিষ্কার ও বর্তমান সন্দর্ভে তার বিস্মৃতির কথা ব্যক্ত করেছেন আহমদ হাসান বড়ভুঁইয়া তাঁর ‘লাবক চা বাগানের হাসপাতাল আজ ইতিহাস’ নিবন্ধে। বিশ্বরাজ ভট্টাচার্যের সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় উঠে এসেছে কাজল দেমতা সম্পাদিত আঞ্চলিক ভাষার পত্রিকা ‘হামদের বাত’ এর কথা। বরাকে চা পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে লিখেছেন সম্পাদক আশিসরঞ্জন নাথ। বর্তমানে চা শিল্পের বেঁচে থাকার লড়াই নিয়ে আলোকপাত করেছেন ডঃ জওহরলাল সেন তাঁর ‘এ অঞ্চলে চা শিল্পের সাম্প্রতিক সংকট’ নিবন্ধে। ডঃ শ্যামানন্দ ভট্টাচার্য ‘চরগোলা এক্সোডাস ১৯২১’ শীর্ষক নিবন্ধে মনোগ্রাহী আলোচনা করেছেন বিবেকানন্দ মোহন্ত রচিত তথা ২০১৪ সালে শিলচর থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘চরগোলা এক্সোডাস ১৯২১’-এর। চা শিল্পে শ্রমিকদের অমানবিক দুর্দশার এক নিদারুণ মর্মগাথা এই পুস্তক এবং এই গ্রন্থ পরিক্রমারই এক বিনীত নির্যাস এই নিবন্ধ।
চা শ্রমিকদের মুখের ভাষায় উপত্যকার কবি লেখকদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সাহিত্যচর্চা করেছেন অভিজিৎ চক্রবর্তী। তাঁরই চারটি কবিতার পুনর্মুদ্রণে সমৃদ্ধ হয়েছে ‘প্রবাহ’। এ ছাড়াও মূল্যবান নিবন্ধ লিখেছেন পার্থঙ্কর চৌধুরী, ডঃ অলক সেন ও আখতার হামিদ খান।
পরিশেষে দু’টি কথা অপ্রাসঙ্গিক হবে না বলেই মনে হয়। প্রথমত, প্রতিটি প্রবন্ধই যেহেতু শুধুমাত্র বরাকের চা বাগিচার উপর লিখিত সেই হিসেবে বিষয়টি ‘বরাকের চা বাগিচার যাপনকথা’ হিসেবেই উল্লিখিত হতে পারত। দ্বিতীয়ত, সব শেষের নিবন্ধটি অর্থাৎ তুতিউর রহমান পাটিকর লিখিত ‘অস্তিত্ব সংকটে শীতল পাটি শিল্প’ যদিও নিঃসন্দেহে একটি মূল্যবান রচনা কিন্তু বিষয় বহির্ভূত হওয়ায় সরল পঠনে কোথাও যেন একটা হোঁচট খেতে হয়। পাঠককে যেন একেবারে শেষের বেলা জোর করে চা বাগিচা থেকে বাইরে বের করে দেওয়া হয়েছে। যদিও বিষয় ভিত্তিক সংখ্যায় বিষয় বহির্ভূত রচনার অন্তর্ভুক্তি নিষিদ্ধ বলে কোনও ধরা বাঁধা নিয়ম নেই কিন্তু শুধুমাত্র একটি নিবন্ধের উপস্থিতি এই ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও বিসদৃশ হিসেবে ধরা দিয়েছে।
আরেকটি আক্ষেপ থেকেই গেল - আপাত দৃষ্টিতে চা বগিচার যাপন কথায় প্রাসঙ্গিক সব দিক সন্নিবিষ্ট হলেও দুটি পাতা একটি কুঁড়ি থেকে চায়ের কাপ অবধি পৌঁছানোর অর্থাৎ চা পাতা তৈরির যে প্রক্রিয়া সেই বিষয়ে একটু আলোকপাত হলে বোধ করি চায়ের ষোলকলা পূর্ণ হতো।
আসাম রাজ্য তথা বরাক উপত্যকার অধিবাসী হিসেবে আমরা সবাইই চা বাগিচার পরিবেশের সাথে কম বেশি পরিচিত। সেই পরিচিতিটাকেই যেন আরোও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল ‘প্রবাহ’। এত বিশাল আয়োজনের নিখুঁত সম্পাদনা - এ যে কতটুকু একাগ্রতা ও অধ্যবসায়ের নিরেট ফল তা শুধু সংশ্লিষ্ট মানুষদের পক্ষেই অনুধাবন করা সম্ভব। যেমন ছাপা তেমনি অক্ষর বিন্যাস, তেমনি নির্ভুল বানানে সম্পাদিত এক প্রামাণ্য দলিল ‘প্রবাহ’-এর এই সংখ্যাটি। অন্যান্য সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রটিকে ছেড়ে দিলেও শুধুমাত্র ‘প্রবাহ’-এর রূপকার হিসেবেই আশিসরঞ্জন নাথ নিঃসন্দেহে জায়গা করে নিয়েছেন এ অঞ্চলের সাহিত্য ক্ষেত্রে। ভবিষ্যৎ নিশ্চিত ভাবেই মূল্যায়ন করবে এই কথাটির। অনুসন্ধিৎসু পাঠককুল নিশ্চিতভাবেই সাগ্রহে পথ চেয়ে থাকতে পারে ‘প্রবাহ’-এর পরবর্তী সংখ্যার জন্য। রইল আগাম শুভেচ্ছা।
‘প্রবাহ’, সম্পাদক - আশিসরঞ্জন নাথ, মূল্য - ১৫০ টাকা। যোগাযোগ - ৮৮১১০১০৫৪০
শ্রী আশিসরঞ্জন নাথ মহাশয়ের পরিপক্ক সম্পাদনায় বলতে গেলে নিখুঁত ভাবে সেজে উঠেছে অন্যান্য বারের মতো এবারের এই সংখ্যাটিও। ধারে ও ভারে এক কথায় অপ্রতিরোধ্য সংখ্যাটি হাতে নিলেই ইচ্ছে করে পালটে যাই একের পর এক পাতা। প্রচ্ছদ থেকে প্রায় শেষের পাতাটি অবধি সজ্জিত হয়ে আছে পাতায় পাতায় - যে পাতার নির্যাসে শুরু হয় আমাদের নিত্যদিনের রোজনামচা, অর্থাৎ চায়ের পাতা। নামে লিটল হলেও এ যেন চা ও চা বাগিচার সাতকাহনের এক পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন। মোট ১৬৩টি পৃষ্ঠা জুড়ে চা বাগিচার সুখ দুঃখ ও ইতিহাস পাঠের মাধ্যমে হারিয়ে যেতে হয় দেশ থেকে দেশান্তর, কাল থেকে কালান্তর। প্রায় ১৬৫ বছর আগে প্রথমবারের মতো ‘বরাক উপত্যকায়’ শুরু হয়েছিল চা-এর চাষ। তখন থেকে আজ অবধি চা তথা চা বাগিচার নিরন্তর যাপন কথায় ঋদ্ধ ‘প্রবাহ’-এর এই সংখ্যাটি পড়তে পড়তে যেন মনে হয় এই মাত্র শেষ হলো - শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি বিজড়িত একাধিক চা বাগানের কোনও একটির আপাত সম্পূর্ণ পরিক্রমা।
গণেশ নন্দীর প্রাসঙ্গিক রঙিন প্রচ্ছদে প্রথম দর্শনেই জাত চেনা যায় ‘প্রবাহ’-এর। সম্পাদকীয়তে অতিকথনের ছায়া মাড়াননি বুদ্ধিদীপ্ত সম্পাদক। স্বল্প কথায় খেই ধরিয়ে দিয়েছেন অফুরন্ত বিষয় সম্ভারের। মোট একুশটি বিষয় ভিত্তিক নিবন্ধ, একটি বিষয় বহির্ভূত নিবন্ধ, কবিতাগুচ্ছ ও ‘পাঠকের চিঠি’তে গ্রথিত হয়েছে সংখ্যাটি। বিষয় ভিত্তিক নিবন্ধের শ্রীগণেশ হয়েছে নিবন্ধকার দেবব্রত দত্তের একটি মূল্যবান নিবন্ধের মাধ্যমে। “বরাক উপত্যকার চা বাগান - গোড়াপত্তন পর্ব” শীর্ষক নিবন্ধটি ১৯৬৫ ইংরেজিতে শিলচর গুরুচরণ কলেজের মুখপত্র পূর্বশ্রীতে প্রকাশিত নিবন্ধের পুনর্মুদ্রণ। নিবন্ধটিকে চা-এর আদি কথা বললেও অত্যুক্তি হয় না। একাধিক সরকারি চিঠিপত্রের পুনর্মুদ্রণের মাধ্যমে ইতিহাস যেন কথা বলেছে এই রচনায়। চা শ্রমিকের জীবন যাত্রার বিভিন্ন দিকের সংক্ষিপ্ত অথচ বৈচিত্রময় পরিচয় বর্ণিত হয়েছে রাখি পুরকায়স্থের নিবন্ধ - ‘বরাক উপত্যকার চা জনগোষ্ঠী - আগমন ও বিবর্তনের রূপরেখা’ নিবন্ধে। মেঘমালা দে মহন্তের নিবন্ধ ‘আসামে চা শ্রমিক আমদানি - এক দীর্ঘ দহনকথা’ চা শ্রমিকদের উপর বহু তথ্যপূর্ণ এক করুণ গাথা। বিশিষ্ট নিবন্ধকার ও সমাজ কর্মী অরূপ বৈশ্যের দীর্ঘ নিবন্ধ ‘বরাক উপত্যকার চা শ্রমিকদের আন্দোলন ও চা-শিল্প’ সব দিক সামলে নিয়ে লিখা চা শিল্পের এক পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন। ‘চা শ্রমিকদের মাতৃভাষা ও তার ক্ষয়িষ্ণুতা’ শিরোনামে যশস্বী লেখিকা কাজল দেমতা লিপিবদ্ধ করেছেন চা বাগানের ভাষার এক বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা। চা জনজাতির বিবাহের রীতিনীতি নিয়েও রয়েছে তাঁর আরেকটি নিবন্ধ। ঠিক তেমনি চা বাগিচার শিক্ষা ব্যবস্থা ও তার ত্রুটি নিয়ে নিবন্ধ লিখেছেন অধ্যাপক রমাপ্রসাদ বিশ্বাস। সাংস্কৃতিক দিকসমূহের উপর বিভিন্ন নিবন্ধে আলোকপাত করেছেন ডঃ সন্তোষ আকুড়া, অশোক বার্মা, গল্পকার ঝুমুর পাণ্ডে ও শংকর দেব। ডঃ আকুড়ার নিবন্ধে উল্লিখিত একটি প্রচলিত গানের কথায় আমরা গভীর ভাবে অনুভব করতে পারি চা মজদুরদের জীবনের দুঃখজনক ইতিহাসের ইঙ্গিত -
সাহাব বলে কাম কাম
বাবু বলে ধরি আন,
সর্দার বলে লিব পিঠের চাম,
হে বিদেশি শ্যাম -
ফাঁকি দিয়ে আনিলি আসাম।
চা বাগান অঞ্চলে চর্চিত খেলাধূলার উপর বিস্তৃত আরেকটি নিবন্ধ লিখেছেন অশোক বার্মা। বরাক উপত্যকার লাবক চা বাগানের হাসপাতালে রোনাল্ড রস কর্তৃক ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক আবিষ্কার ও বর্তমান সন্দর্ভে তার বিস্মৃতির কথা ব্যক্ত করেছেন আহমদ হাসান বড়ভুঁইয়া তাঁর ‘লাবক চা বাগানের হাসপাতাল আজ ইতিহাস’ নিবন্ধে। বিশ্বরাজ ভট্টাচার্যের সংক্ষিপ্ত বর্ণনায় উঠে এসেছে কাজল দেমতা সম্পাদিত আঞ্চলিক ভাষার পত্রিকা ‘হামদের বাত’ এর কথা। বরাকে চা পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে লিখেছেন সম্পাদক আশিসরঞ্জন নাথ। বর্তমানে চা শিল্পের বেঁচে থাকার লড়াই নিয়ে আলোকপাত করেছেন ডঃ জওহরলাল সেন তাঁর ‘এ অঞ্চলে চা শিল্পের সাম্প্রতিক সংকট’ নিবন্ধে। ডঃ শ্যামানন্দ ভট্টাচার্য ‘চরগোলা এক্সোডাস ১৯২১’ শীর্ষক নিবন্ধে মনোগ্রাহী আলোচনা করেছেন বিবেকানন্দ মোহন্ত রচিত তথা ২০১৪ সালে শিলচর থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ ‘চরগোলা এক্সোডাস ১৯২১’-এর। চা শিল্পে শ্রমিকদের অমানবিক দুর্দশার এক নিদারুণ মর্মগাথা এই পুস্তক এবং এই গ্রন্থ পরিক্রমারই এক বিনীত নির্যাস এই নিবন্ধ।
চা শ্রমিকদের মুখের ভাষায় উপত্যকার কবি লেখকদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি সাহিত্যচর্চা করেছেন অভিজিৎ চক্রবর্তী। তাঁরই চারটি কবিতার পুনর্মুদ্রণে সমৃদ্ধ হয়েছে ‘প্রবাহ’। এ ছাড়াও মূল্যবান নিবন্ধ লিখেছেন পার্থঙ্কর চৌধুরী, ডঃ অলক সেন ও আখতার হামিদ খান।
পরিশেষে দু’টি কথা অপ্রাসঙ্গিক হবে না বলেই মনে হয়। প্রথমত, প্রতিটি প্রবন্ধই যেহেতু শুধুমাত্র বরাকের চা বাগিচার উপর লিখিত সেই হিসেবে বিষয়টি ‘বরাকের চা বাগিচার যাপনকথা’ হিসেবেই উল্লিখিত হতে পারত। দ্বিতীয়ত, সব শেষের নিবন্ধটি অর্থাৎ তুতিউর রহমান পাটিকর লিখিত ‘অস্তিত্ব সংকটে শীতল পাটি শিল্প’ যদিও নিঃসন্দেহে একটি মূল্যবান রচনা কিন্তু বিষয় বহির্ভূত হওয়ায় সরল পঠনে কোথাও যেন একটা হোঁচট খেতে হয়। পাঠককে যেন একেবারে শেষের বেলা জোর করে চা বাগিচা থেকে বাইরে বের করে দেওয়া হয়েছে। যদিও বিষয় ভিত্তিক সংখ্যায় বিষয় বহির্ভূত রচনার অন্তর্ভুক্তি নিষিদ্ধ বলে কোনও ধরা বাঁধা নিয়ম নেই কিন্তু শুধুমাত্র একটি নিবন্ধের উপস্থিতি এই ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও বিসদৃশ হিসেবে ধরা দিয়েছে।
আরেকটি আক্ষেপ থেকেই গেল - আপাত দৃষ্টিতে চা বগিচার যাপন কথায় প্রাসঙ্গিক সব দিক সন্নিবিষ্ট হলেও দুটি পাতা একটি কুঁড়ি থেকে চায়ের কাপ অবধি পৌঁছানোর অর্থাৎ চা পাতা তৈরির যে প্রক্রিয়া সেই বিষয়ে একটু আলোকপাত হলে বোধ করি চায়ের ষোলকলা পূর্ণ হতো।
আসাম রাজ্য তথা বরাক উপত্যকার অধিবাসী হিসেবে আমরা সবাইই চা বাগিচার পরিবেশের সাথে কম বেশি পরিচিত। সেই পরিচিতিটাকেই যেন আরোও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল ‘প্রবাহ’। এত বিশাল আয়োজনের নিখুঁত সম্পাদনা - এ যে কতটুকু একাগ্রতা ও অধ্যবসায়ের নিরেট ফল তা শুধু সংশ্লিষ্ট মানুষদের পক্ষেই অনুধাবন করা সম্ভব। যেমন ছাপা তেমনি অক্ষর বিন্যাস, তেমনি নির্ভুল বানানে সম্পাদিত এক প্রামাণ্য দলিল ‘প্রবাহ’-এর এই সংখ্যাটি। অন্যান্য সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রটিকে ছেড়ে দিলেও শুধুমাত্র ‘প্রবাহ’-এর রূপকার হিসেবেই আশিসরঞ্জন নাথ নিঃসন্দেহে জায়গা করে নিয়েছেন এ অঞ্চলের সাহিত্য ক্ষেত্রে। ভবিষ্যৎ নিশ্চিত ভাবেই মূল্যায়ন করবে এই কথাটির। অনুসন্ধিৎসু পাঠককুল নিশ্চিতভাবেই সাগ্রহে পথ চেয়ে থাকতে পারে ‘প্রবাহ’-এর পরবর্তী সংখ্যার জন্য। রইল আগাম শুভেচ্ছা।
‘প্রবাহ’, সম্পাদক - আশিসরঞ্জন নাথ, মূল্য - ১৫০ টাকা। যোগাযোগ - ৮৮১১০১০৫৪০
Comments
Post a Comment