Skip to main content

অকাল অবসর

 এটাকে ঠিক যাযাবরের জীবন বলাটা হয়তো ঠিক হবে না কারণ জীবিকার তাগিদে সাগ্রহেই ঘুরে বেড়িয়েছি এতকাল। দীর্ঘ আটাশটি বছর, দিক থেকে দিকান্তর। এক জায়গায় সব থেকে বেশি এগারো বছর আর এ যাত্রায় সব থেকে কম ঊনিশ মাস।

আজ এই মুহূর্তে ঊনিশ মাসের অবস্থান শেষে প্রত্যাবর্তন পথে বসে আছি রেলের কামরায়। স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন। বড়ই আনন্দের ক্ষণ। দীর্ঘ দেড় বছর ধরে পরিবার বিবর্জিত হয়ে নিজের মননে যতটা না হয়েছি সংবিগ্ন তার চাইতে বেশি বিধ্বস্ত হয়েছে পরিবারের নির্ভরশীল মানুষগুলোর জীবনযাপন। এই চিন্তায় সদাই থাকতাম উদ্বিগ্ন।
এবার দেড় বছরের ডিমাপুর বাসের অন্ত হওয়ায় এই উদ্বিগ্নতার পালা হবে সাঙ্গ। আপাতত মজে আছি এই নিরুদ্বিগ্নতায়।

সব চিন্তারই এক বিপরীত চিন্তা থাকাটা বোধ হয় জাগতিক কোন অলিখিত নিয়ম। সুতরাং আমিই বা বাদ যাই কী করে ? যখন যেখানে গেছি সেখানেই যেন মিশে গেছি সেই স্থানটির পরিবেশে - একান্ত আপন হয়ে। ছেড়ে আসতে হৃদয়ে বেজেছে খুব। পরবর্তী সময়ে যখনই গেছি সেখানে - মনে হয়েছে যেন নিজের জায়গাটিতেই এসেছি ফিরে। মাটি ও মানুষের সাথে এই একাত্মতার পালা চলে আসছে জন্মাবধি।
ডিমাপুর এর ব্যাপারটা একটু অন্য রকম। এখানে আমার পরিবারহীন বাস। কিন্তু এই জায়গাতেই আরেক ধন্দ পরিবারের সংজ্ঞা নিয়ে। যে সজ্জন মানুষটির সাথে ভাগ করে নিয়েছিলাম ঘর সেই অপরিচিত সুজন যে এতদিনে হয়ে উঠেছেন পরম স্বজন সে আর বলার। তাঁকে আমার অন্তরের গভীর কৃতজ্ঞতা।
এই ঊনিশ মাসের ডিমাপুর বাস আমাকে দিয়েছে অনেক। সম্পর্কে নিকট না হলেও হৃদয়ের কাছের এক পরমাত্মীয়ের কাছ থেকে পেয়েছি যাবতীয় সামাজিক পরিচিতি ও সহযোগিতা। তাঁর প্রতি আমি শ্রদ্ধায় নতজানু।
কর্মক্ষেত্রে অভাবনীয় শ্রদ্ধা ও সহায়তা পেয়েছি যা আমার কল্পনাতে ছিল না। সম্পূর্ণ কার্যকাল এক নিশ্চিত নিরাপত্তার বলয়ে কাটিয়েছি আমি। ধন্যবাদ সব ঊর্ধ্বতন, অধস্তন ও সমবর্গীয় সহকর্মীদের।
সবচাইতে বড় যে আমার প্রাপ্তি তা হলো কর্মকালের বাইরে একান্ত আপন কিছু নিরালা ক্ষণ। যে সময়কে আমি কানায় কানায় ব্যবহার করেছি আমার সৃজনশীলতায়। আমি নিশ্চিত আমার এই সৃষ্টি জগতের কোনও কাজে লাগবার নয় কিন্তু আমার নিজস্ব মননকে যে আমি ঋদ্ধ করতে পেরেছি প্রাচুর্যে - সে তো শুধু আমিই জানি।
আরেক হৃদয়হীন বস্তু যে নিজের অজান্তেই আমাকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে অগুনতি সৃষ্টিশীলতার সুযোগ তা তো সে নিজেই জানে না। এ হলো জনশতাব্দী এক্সপ্রেস রেলগাড়িটি। প্রতি সপ্তাহে দীর্ঘ সাড়ে চার ঘন্টার নিরুপদ্রব যাত্রায় আমার হযবরল লেখালেখির সম্ভার হয়েছে সমৃদ্ধ। কী বলে ধন্যবাদ জানাই একে ?
তাই তো শেষ বেলায় একটু হরিষে বিষাদ। একদিকে প্রাপ্তি সুখের প্রচ্ছন্ন হাতছানি আর অন্য দিকে বিচ্ছেদের আচ্ছন্ন সুরখানি।
(
আমার এক অভিন্ন হৃদয় সহপাঠী বন্ধু কী করে যেন টের পেয়ে গেল যে আমার ডিমাপুর ছেড়ে আসতে কষ্ট হচ্ছে। এ না হলে বন্ধু ?
শেষ যাত্রায় ডিমাপুর স্টেশনে এসে নিজস্বীতে বন্দি করলাম নিজেকে। আর পরক্ষণেই নিজের ছবি দেখে নিজেই চমকে উঠেছি। মেলাতে পারছি না কিছুই - কোথা থেকে এত কষ্ট ফুটে উঠেছে চেহারায়, কোথা থেকেই বা লিখতে লিখতে এত জল এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে দু'চোখের পাতা। এটাই কি আনন্দাশ্রু ?)

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...