Skip to main content

শ্রমসাধ্য সাহিত্য চর্চায় অপ্রতিরোধ্য ছোট পত্রিকা - সংলাপ


শ্রমসাধ্য সাহিত্য চর্চায় অপ্রতিরোধ্য ছোট পত্রিকা - সংলাপ


গুয়াহাটির মজলিশ বইঘরের পরিবেশনায় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে সাহিত্য পত্রিকা সংলাপ বা মজলিশ সংলাপ বছরে চারটি সংখ্যা অর্থাৎ ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা বাংলা সাহিত্যের এই তৃতীয় ভুবনে প্রতি তিন মাসে একটি সংখ্যা - তাও আবার সংলাপ-এর মতো হৃষ্টপুষ্ট একটি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করা যে কতখানি শ্রমসাধ্য তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না গত পনেরোটি বছর ধরে নিমগ্ন সাহিত্য চর্চা ও সাধনায় ব্রতী এই পত্রিকা গোষ্ঠী। বহু ঘাত প্রতিঘাতের ইতিহাস পেরিয়ে আজও অম্লান এই পত্রিকার নিরন্তর পথ চলা।

সম্প্রতি হাতে এল এই পত্রিকার সাম্প্রতিকতম সংখ্যাটি - পঞ্চদশ বর্ষ, তৃতীয় সংখ্যা। প্রথম পাতায় ছিমছাম সম্পাদকীয়তে হয়তো নিজেরই অজান্তে বর্তমান ত্রস্ত দিনযাপনের এক ভবিষ্যদ্বাণী করে গেলেন বহু যুদ্ধের ঘোড়া তথা পোড় খাওয়া সাহিত্যিক তুষার কান্তি সাহা। এবারের সংখ্যায় আছে একটি ‘বিশেষ রচনা’, ‘আপন কথা’ শিরোনামে একটি স্মৃতি রোমন্থন, একটি নভেলেট বা উপন্যাসিকা, ছয়টি গল্প, একটি দীর্ঘ কবিতা, দু’টি গুচ্ছ কবিতা, একটি নাটক, দু’টি অনুবাদ গল্প, একটি অণুগল্প, একটি রম্য রচনা এবং সতেরোটি কবিতা। অর্থাৎ বৈচিত্রে ভরপুর এক অনবদ্য সাহিত্য সম্ভার।

বিশেষ রচনায় একটি মননশীল প্রবন্ধ লিখেছেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক উদয়ন বিশ্বাস। প্রবন্ধের শিরোনাম - ‘রবীন্দ্রনাথ-রামকিংকরের জীবন রসে সিঞ্চিত এক শিল্পী - বেণু মিশ্র’। চিত্রশিল্পী বেণু মিশ্রের জীবন ও শিল্পচর্চার এক অসাধারণ বর্ণনা সাবলীল ছন্দে গ্রথিত করেছেন লেখক। পাঠক নিশ্চিত ভাবেই বেণু মিশ্রকে নতুন করে আবিষ্কার করবেন এই প্রবন্ধের মাধ্যমে। ‘আপন কথা’য় সাহিত্যিক শঙ্খশুভ্র দেববর্মন একটি চমৎকার স্মৃতি কথা লিখেছেন ‘চকমকি পাথরের টুকরোগুলি’ শিরোনামে। নিমগ্ন পাঠে যেন এক ঘোর লাগা আবেশে নতুন করে উদ্ভাসিত হলেন কিংবদন্তী কবিদ্বয় - শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। অসাধারণ লিখন শৈলিতে অনবদ্য একটি উপন্যাসিকা বা নভেলেট লিখেছেন সাহিত্যিক সুকুমার রুজ। আদ্যোপান্ত টানটান বর্ণনায় সুখপাঠ্য হয়েছে উপন্যাসিকাটি। প্রাঞ্জল গতিময়তার আবহে সিদ্ধান্তের অসামান্য প্রকাশ ঘটেছে শেষ পর্বে। কিন্তু পাঠক মনে নিশ্চিত ভাবেই থেকে যাবে আরোও খানিকটা পথ চলার দাবি।

ছোটগল্প লিখেছেন একাধিক প্রতিষ্ঠিত গল্পকার। বিশেষোল্লেখের দাবি রাখে কুমার অজিত দত্ত ও বিমলেন্দু দত্তের গল্প। এছাড়াও ভালো গল্প লিখেছেন মানিক দাস, নিশুতি মজুমদার, ঝুমুর পাণ্ডে ও বিজন কুমার সরকার।

সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন এ রাজ্যের এক প্রতিষ্ঠিত গল্পকার মানব রতন মুখোপাধ্যায়। এখানে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর এক ব্যতিক্রমী রচনা। ‘বাগান বাগান গন্ধ’ শিরোনামে তিনি লিখেছেন একটি দীর্ঘ কবিতা। এবং বলাই বাহুল্য তাঁর কবিতার হাতটিও যে একেবারেই পাকা সেটা তিনি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। চা বাগিচার যাপন বেলার প্রেক্ষাপটে একটি চমৎকার প্রেমের কবিতা লিখেছেন মানব রতন। মৃত্যু তাঁকে অকালে ছিনিয়ে না নিলে নিশ্চিত ভাবেই সমৃদ্ধ হতো এ অঞ্চলের সাহিত্য।

পুস্পল চট্টোপাধ্যায়ের নাটক ‘কমরেড’-এ জীবন্ত হয়ে উঠেছে বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাস ও বিবর্তন। টানটান নাটকীয়তায় চূড়ান্ত সুখপাঠ্য হয়েছে নাটকটি।

বিশ্ব সাহিত্যের অন্তর্গত ইসমত চুগগতাহ-এর একটি গল্পের বাংলা অনুবাদ করেছেন চৌখস সাহিত্যিক বদরুদ্দোজা হারুণ। এছাড়া মৃণাল কলিতার একটি অসাধারণ অসমিয় গল্প ‘থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস’-এর অনুবাদ করেছেন বাসুদেব দাস। দু’টি অনুবাদ গল্পই সরল, সুখপাঠ্য। হোঁচট খেতে হয়নি কোথাও।

একটি অণুগল্প লিখেছেন সত্যজিৎ চৌধুরীমোট ১৬০ পৃষ্ঠার এই সংখ্যায় সূচীপত্রের হিসেবে  ১৬৯ তম পৃষ্ঠায় দু’টি অনুবাদ গল্প লিখেছেন এ অঞ্চলের পরিচিত সাহিত্যিক তপন মহন্ত। যথারীতি তা খুঁজে পাওয়া যায়নি। সম্পাদনার এই ত্রুটি পাঠক মনে নিঃসন্দেহে সৃষ্টি করবে হতাশা।

রম্য রচনা লিখেছেন হরিপ্রসন্ন পাল। গুচ্ছ কবিতা লিখেছেন অজিত বাইরী ও তনিমা হাজরা।

তিন পর্বে বিন্যস্ত ‘কবিতার বারান্দা’য় চমৎকার কবিতা লিখেছেন গোপাল মল্লিক, সম্পাদক তুষার কান্তি সাহা, চিরঞ্জীব হালদার, অভীক কুমার দে, তৃণা সাহা, বাসুদেব মণ্ডল। এছাড়াও কবিতা লিখেছেন তৃষ্ণা বসাক, জ্যোতিষ দেব, প্রাণজি বসাক, রমানাথ ভট্টাচার্য, শৈলেন সাহা, মণিশঙ্কর রায়, সুশান্ত ভট্টাচার্য, সুতপা চক্রবর্তী, সুপ্রভাত সরকার, মতি গজ্জালি ও দেবাশিস বকসী।

সব মিলিয়ে এক সাড়ম্বর সাহিত্য আয়োজন। মানিক চন্দ্র কান্দারের প্রচ্ছদ সম্পাদকীয় ভাবধারাকেই যেন করে তুলেছে বিমূর্ত। বাঁধাই, ছাপার স্বচ্ছতা ও শব্দ বিন্যাস যথাযথ। বানান ও ছাপার ভুল থেকে গেছে বেশ কয়েকটি পৃষ্ঠা জুড়ে। আগামীতে এই ব্যাপারে আরোও সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সুখ দুঃখের সহাবস্থানেই চলমানতা। জীবনের এই সারসত্যটিকেই যেন স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান করিয়েছে সংলাপ। মসৃন ও দীর্ঘ হোক ‘সংলাপ’-এর যাত্রাপথ।


Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...