ইতি
হলো দারুণ এক সফরের। চার দিনের উত্তর ত্রিপুরা ও বরাক সফর। এই মুহূর্তে ফেরত
যাত্রায় বসে আছি রেলের কামরায়। সঙ্গে অনন্ত সুখ-স্মৃতির ভাণ্ডার। মনে হচ্ছে
পেছনে ফেলে আসছি এক 'সব পেয়েছির দেশ'। পূর্ব পরিচিত ও সদ্য পরিচিত
সুজনদের সান্নিধ্যে আজ কানায় কানায় পরিপূর্ণ আমার হৃদয় ।
**
বন্ধুবর দেবাশিস
পানিসাগরে নিজের ঘর বানিয়েছে বছর তিনেক হলো। আমি যেতে পারিনি বলে ওর গৃহসুখ
অসম্পূর্ণ রয়ে গেছিল। দেড় দিনের উপস্থিতিতে ওর ফোলা গাল সঠিক জায়গায় ফিরে
এসেছে। হৃদয়ের কোন অলিন্দে সযতনে সাজাই এমন অকৃত্রিম বন্ধুত্ব ? বন্ধু
পত্নী বাবলির- প্রতি পলের অক্লান্ত অতিথি সৎকার ছিল অনবদ্য। দুর্ধর্ষ গরমকেও হার
মানিয়েছে বাবলি।
**
এই দেড় দিনেই আরেক অন্তরঙ্গ বন্ধু অসীম ও বন্ধু পত্নী মনিকার
অতিথি হয়ে সাক্ষী হয়ে রইলাম বন্ধুকৃত্যের এক অপূর্ব উদাহরণের। মননে কৃষ্ণ
সুদামা।
**
জন্মভূমি বরাকের সমৃদ্ধ সাহিত্য জগতে নিজের অস্তিত্বের অভাব অনুভূত
হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরে। কড়ায় গণ্ডায় তা পরিপূর্ণ করে দিলেন অগ্রজ প্রতিম কবিবর
সুশান্ত ভট্টাচার্য। নিজের ঘরে সাহিত্য বাসরের আয়োজন করে আমাকে ভাসিয়ে দিলেন
বরাকের প্রবহমান সাহিত্য স্রোতে। ধন্যবাদ কিংবা কৃতজ্ঞতা জানানোর মতো শব্দ আমার
পুঁজিতে নেই আর সেই ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে বকুনি খাওয়ার ইচ্ছেও মোটেই নেই। কতটুকু
সমৃদ্ধ হলাম সেদিনের সাহিত্য সভায় তা বর্ণনা করার সাধ্যও আমার নেই। শতদল আচার্য, মমতা
চক্রবর্তী, লীনা
নাথ সহ সেদিনের সব গুণীজনের সাহচর্য আজীবন অটুট থাকবে স্মৃতির পাতায়।
**
শেষ দিনে বরাকের তথা উত্তর পূবের বাংলা সাহিত্য জগতের আরেক দিকপাল
মনোমোহন মিশ্রের সঙ্গে সাক্ষাতে পূর্ণ হলো আরেক দীর্ঘদিনের সযতনে রাখা সুপ্ত
মনষ্কাম। উপহার স্বরূপ পেলাম তিন তিনটি বই। আমি আপ্লুত।
**
পুরো সফর জুড়ে বন্ধু বেষ্টিত আমি কী করে ভুলি 'পরাণ
সখা বন্ধু আমার'
- পীযূষ ও তার সহধর্মিণী মুন, টিটু
ও তার সহধর্মিণী মউ, গার্গী ও তার 'সহধর্মী' শিশির-দাকে
? কী
করে ভুলি ৮৫ বর্ষীয়া মাসি (টিটুর মা)-এর বালিকা বয়সে শেখা দীর্ঘ কবিতার আবৃত্তি ?
**
ভোলা যায় না এ কথা যখন ধর্মনগর থেকে রেলে শিলচর আসার পথে করিমগঞ্জ
স্টেশনে সটান হাজির বাল্যবন্ধু সঞ্জীব। বর্তমানে কলেজ শিক্ষক। শোনাল এক অদ্ভুত গা ছম ছম করা তথ্য।
বললো - "আজ থেকে ১০০ বছর আগে সিলেট যাওয়ার পথে এই স্টেশনে পদার্পণ করেছিলেন
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজ একশো বছর পর তুই এলি। কামনা করি তোর কবি প্রতিভার
বিকাশ ঘটুক উত্তরোত্তর"। বিমূঢ় আমার 'ধরণী
দ্বিধা হও'-এর
বাইরে বলার মতো কিছু ছিল না।
**
দু'দিনের বরাক সফরকে সুস্বাদু করে
তোলায় যাদের সস্নেহ অবদান ছিল অকৃত্রিম সেই বোনটি আমার মিঠু ও তার করিৎকর্মা
পতিদেবতা রাজু এবং চল্লিশ বছর পর আমাকে 'ভুজিয়া' মাছের
'কড়ুয়া' খাইয়ে
কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করে রাখলেন বৌদি অপর্ণা ও দাদা বিশ্বজিৎ।
**
বিদায় বেলায় ভাষা শহিদ স্টেশনে বাবার হাত ধরে রাতের খাবার হাতে
প্রবেশ অপর্ণা বৌদির মেয়ে কন্যাসম নেহা ও অন্য দিক থেকে শেষ মুহূর্তে হন্তদন্ত
হয়ে অকুস্থলে হাজির আমার ব্যস্ততম সুহৃদ পীযূষ।
সবার
অকুণ্ঠ স্নেহ ভালোবাসায় ঋদ্ধ আমি -
'একটি কথাই চাই বলিবারে
আবার আসিব ফিরে এই বরাকেরই
তীরে'।
Comments
Post a Comment