বর্তমান বাংলা সাহিত্যের ভুবন বিন্যাস অনেকটাই ধোঁয়াশাবৃত থাকলেও আসামের বরাক উপত্যকা নিঃসন্দেহে এই ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে রেখেছে।
প্রাতঃস্মরণীয় কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্যে ভাগ্যবান আমি কবে থেকে যে নিজেরই অজান্তে লিখতে শুরু করেছি কবিতা তা আমি নিজেও জানি না। এবং এটাও সত্যি যে এগুলো আদপেই কবিতা কিনা সেটাও আমার অজানা। পাঠক পাঠিকারা পাঠ প্রতিক্রিয়া থেকেও স্পষ্ট ভাবে কিছু বোঝার উপায় নেই। এর কারণ হচ্ছে যাঁরা আমার পরিচিত, আমাকে ভালবাসেন, স্নেহ করেন তাঁরা তো সৌজন্যের খাতিরে মন্দ হলেও তার উল্লেখ করবেন না আর অপরিচিত পাঠক পাঠিকার পাঠ প্রতিক্রিয়া সচরাচর উপলব্ধ হয় না। তাই এ ধন্দটা আমার রয়েই গেল।যাই হোক ভালো বা মন্দ কিছু একটা যে লিখে ফেলি তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আর এ করে করেই বিভিন্ন জায়গার বিভিন্ন মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়ে গেছে একগাদা কবিতা ও গল্প। সম্প্রতি ত্রিপুরার দু'টি ছোট পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাগুলোর কথা আগেই লিখেছিলাম। এমনি করেই পরিসরটা যখন ক্রমবর্ধমান তখন হৃদয়ের গভীরে তিল তিল করে গড়ে উঠছিল এক অদম্য বাসনা। কারণ এত সবের পরেও এ যাবৎ অধরা রয়ে গেছিল আমার জন্মমাটির আবেগঘন পরশ। হ্যাঁ, বরাক উপত্যকার সাহিত্য জগতে আমার ছিল না কোনও উপস্থিতি। (ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করা যায় আমার ছাত্র জীবনের বিদ্যালয় রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠের স্মরণিকাতে পুনর্মুদ্রিত কিছু গল্প কবিতা - সাহিত্যের পরিমণ্ডলে এই সব পুনর্মুদ্রণ যেখানে বিশেষ কোন স্থান অধিগ্রহণ করাটা নিতান্তই দুঃসাধ্য)।
যাই হোক অন্তরের সুপ্ত ইচ্ছেটাকে যখন লালন করছিলাম একান্তই গোপনে তখনই হঠাৎ করে একদিন একেবারে খোদ আমার জন্মজেলার সদর থেকেই ভেসে এল আহ্বান। আহ্বায়িকার পরিচয় ততদিনে একটু একটু করে পেয়ে যাচ্ছিলাম তাঁর বিশাল কর্মকান্ডের মাধ্যমে।
বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ শহরের বুকে আপন কৃতকার্যে মহিমান্বিত বৃদ্ধাবাস - বেলাভূমি। বেলাভূমির পরিচালনা সমিতির উদ্যোগে নিয়মিত প্রকাশ হয় ছোট পত্রিকা 'সেবা'। 'সেবা'র সঙ্গে আমার একতরফা পূর্ব পরিচয়। গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত ৭ম উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলনে দু'দিন ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি' সেবা'। হাইলাকান্দির বর্ষীয়ান কবিবর শ্রদ্ধেয় বিজিত ভট্টাচার্য মহাশয়ের 'সাহিত্য' পত্রিকার উন্মেষ ঘটে যে উপত্যকায় তারই আকর্ষণীয় ফসল 'সেবা', 'মানবী' আদি পত্রিকা আমাকে আকর্ষণ করছিল প্রতিনিয়ত। কিন্তু মুখচোরা আমি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে পরিচিত হতে পারিনি। একই মঞ্চে গল্প পাঠের আসরে স্বরচিত গল্প পাঠের পর শ্রদ্ধেয় গল্পকার আদিমা মজুমদার এসে যখন বলেছিলেন - আপনার গল্প শুনে আমি চোখের জল আটকাতে পারিনি - তখন সমগ্র অন্তরাত্মা জুড়ে অনুভব করেছি বালক বেলার খেলাভূমির অমোঘ অনুভূতি।
সেই সম্মেলন গৃহে 'সেবা' স্টলে উপস্থিত ছিলেন 'সেবা'র সম্পাদিকা শ্রীমতী অপর্ণা দেব মহাশয়া - তখন যাঁকে আমি চিনতাম না। পরবর্তীতে জেনেছি 'বেলাভূমি' ও 'সেবা' - উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর অসামান্য আত্মনিবেদন ও কর্মকুশলতার কথা। অনেকটাই সৌজন্যে আমার আরেক সেবাপরায়ণ বাল্যবন্ধু শ্রী প্রশান্ত কর।
যাইহোক সেই নমস্য সম্পাদিকা অপর্ণা দেব এর অনুরোধে সাড়া দিয়ে 'সেবা'র জন্য লিখে পাঠালাম একটি দীর্ঘ কবিতা। 'সেবা' উন্মোচিত হওয়ার পর পূর্ণ হলো আমার দীর্ঘ দিনের লালিত আকাঙ্খা। 'সেবা'র হাত ধরে প্রথম বারের মতো বরাক উপত্যকার সাহিত্য জগতে আমাকে এক তিল জায়গা করে দেওয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই শ্রীমতী দেবকে।
কামনা করি সাহিত্য ভাবনায় উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হোক 'সেবা' এবং সমাজের অভিভাবক স্বরূপ বয়স্য ব্যক্তিদের সেবায় সাফল্যমণ্ডিত হয়ে উঠুক 'বেলাভূমি'।
সমগ্র প্রক্রিয়াটির শেষ পর্বে 'সেবা'কে আমার ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার কাজে সাহায্য করায় ধন্যবাদ প্রাপ্য আমার কিশোর বেলার আরেক সহপাঠী বন্ধু ডঃ সঞ্জীব করেরও।
(অদূর ভবিষ্যতে 'সেবা'র একটি সাহিত্যালোচনা লেখার ইচ্ছা রইল)।
Comments
Post a Comment