Skip to main content

তপন মহন্ত-র কাব্যগ্রন্থ ‘সময় অস্থিময়’

তপন মহন্ত-র কাব্যগ্রন্থসময় অস্থিময়

 

কবিতা যে কবির কতখানি গরজের ধন, আশা নিরাশার জ্বলন্ত প্রতিবেদন - তা এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতার মাধ্যমে সপাট চমৎকারিত্বে তুলে ধরেছেন কবি তপন মহন্ত প্রতিবাদী মননের সোজাসাপটা বহিঃপ্রকাশের মাধ্যমে তথা শ্লেষ, ব্যঙ্গ ও উপহাসের সুচতুর শব্দ বিন্যাসে এক একটি কবিতা যেন হয়ে উঠেছে নিষ্ঠুর সময়ের তির্যক প্রতিবেদন

কবি তপন মহন্তের জন্ম নিম্ন অসমের বঙাইগাঁও- কর্মসূত্রে তেজপুর মানসিক হাসপাতালের প্রশাসনিক পদে কর্মরত এ অবস্থায় জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাত চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করে ঋদ্ধ হয়েছে তাঁর কবি মানসিকতা মরাভরালির চরে, জিয়াভরালির কুলুকুলু বহমানতায় কঠোর বাস্তবের নানা প্রহসন তাই স্বভাবতই জ্যান্ত হয়ে ধরা দিয়েছে তাঁর কবিতায় আলোচ্য গ্রন্থটি কবির দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ এ যাবৎ তাঁর মোট ৪টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে   

প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় চমৎকার একটি প্রচ্ছদের এঁকেছেন একাধারে চিত্রশিল্পী এবং সাহিত্যিক উদয়ন বিশ্বাস যুগ পুরোনো একটি জীর্ণ সময় মাপক ঘড়ির উপর মানানসই নামলিপি প্রথমেই পাঠক মনে জাগিয়ে তোলে অনুসন্ধিৎসার বাতাবরণ ষাট পৃষ্ঠার এই কাব্যগ্রন্থে সন্নিবিষ্ট রয়েছে মোট ৫১টি কবিতা উৎসর্গ করা হয়েছে তাঁদের -‘মাতৃভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে যাঁরা সন্দিহান শেষ প্রচ্ছদে প্রকাশক নাইনথ কলামের তরফে রয়েছে বইটির একটি সংক্ষিপ্ত অথচ জমজমাট ভাষ্য কবির তরফে কোনও ভূমিকা কিংবা প্রাককথন নেই

প্রথম কবিতাঘোড়ার প্রায় প্রতিটি ছত্রে যেন ঝরে পড়েছে প্রচণ্ড শ্লেষ অসাধারণ কিছু পংক্তি

খোঁড়া ঘোড়া কালেভদ্রে লাফালাফি করে
হ্রেষাধ্বনির বদলে অনুচ্চারে
টিক টিক, ঠিক যেন মিনিমিনে মাতৃভাষা - - -

প্রতিটি কবিতার মধ্যেই কবি উজাড় করে দিয়েছেন হিংসা, সন্ত্রাস, সমাজের অগণিত অব্যবস্থার বিরুদ্ধে তাঁর যাবতীয় ক্ষোভ। পেরিয়ে আসা ঘোর হিংসাবেলার প্রত্যাঘাতে শ্লেষ, ব্যঞ্জনা, শব্দকল্পের অনন্য সংমিশ্রণে অসামান্য হয়ে উঠেছে কিছু কবিতার কিছু পংক্তি -

আজকাল ডোরবেল বাজলেই
বুকখানা কেঁপে ঊঠে
দরজায় তরুণের চেনামুখ
মধুর হাসির সাথে পেতে দেয় থাবা
আর আমি শ্রমণের মতো পথে নামি
ফৌজি অভিযানের বিরুদ্ধেই ওঠাই তর্জনী
অথচ সন্ত্রাস
সংবাদপাঠিকার ভ্রুর মতো আধখানা চাঁদ।
(কবিতা - চাঁদমারি)

কিংবা -

বিদেশি প্রযুক্তির প্রজনন কেন্দ্রে
ছড়াও স্থানীয় বীজ
পূবাকাশ ভরে থাক স্থানীয় শকুনে
স্যাটেলাইট চোখ মেলে খুঁজুক গলিত লাশ - - -
(কবিতা - সংরক্ষণ)
- - - অনন্ত বিস্ময়ে দেখি
কীভাবে যে যায় চাকা ঘুরে
পরম স্বদেশি আজ চরম বিদেশি
সোনার অসমে।
(কবিতা - ভাবমূর্তি)

অন্য দিকে শত বেদনা, শত গঞ্জনার মধ্যেও তাঁর কবি মন ঘুরে বেড়ায় জন্মমাটি, জন্মভূমির আনাচে কানাচে। জিয়াভরালি থেকে লুইতে, বরাকে তাঁর অবাধ কথন -

মনে পড়ে সেই আশির দশকে
চারদিকে যখন মিছিলের ছয়লাপ
কৃষ্ণচূড়া ফুলের মতো রক্তিম সময় পূর্ব কোণে
- - - - তখনও কি হেসেছিল কৃষ্ণচূড়া ?
নাকি ছিল আমার মতোই তার
চোখ জুড়ে টলোমলো লুইত - বরাক ?
(কবিতা - কৃষ্ণচূড়ার হাসি)

কিছু ছন্দোবদ্ধ কবিতা, কিছু অণু কবিতা, কিছু অকপট প্রেমের অভিব্যক্তি - সব মিলিয়ে প্রতিটি কবিতাই সুখপাঠ্য। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক কিছু স্থানীয় শব্দের সমাহার। সব মিলিয়ে একটি পরিপাটি পরিবেশনা - ‘সময় অস্থিময়’। অশ্লীলতার সংজ্ঞা যেহেতু বিতর্কিত এবং সময়ের সাথে পরিবর্তনীয় তাই বলা যায় জনসমক্ষে বলতে না পারা কিছু শব্দের বহুল ব্যবহার কিছু কবিতায় প্রাসঙ্গিক মনে হলেও কিছু কবিতায় হয়তো ইচ্ছে করলে এড়িয়ে যাওয়া যেত। তবু শেষ কথা সেই কবি মন। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে নিজেকেই কাঁটাছেড়া করে কবিতার খেলায় ভাবিয়ে তুলতে পেরেছেন পাঠককে আর নস্টালজিয়ার আবহে ভারমুক্ত করেছেন নিজেকে। এখানেই এই কাব্যগ্রন্থের সার্থকতা।

‘সময় অস্থিময়’।
কবি - তপন মহন্ত।
মূল্য - ৫০ টাকা।

- - - - -  বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...