‘শেষের রূপকথা’ - ভালোবাসার শেষ কথা'
আবির্ভাবেই চমকে দিলেন পারমিতা। হ্যাঁ, শুধুই পারমিতা - এরও একটা হেঁয়ালিভরা ব্যাখ্যা আছে শেষ প্রচ্ছদে। “রবীন্দ্রভাবনায় বেড়ে ওঠা পারমিতা স্বাধীনচেতা বলেই নিজেকে শুধুমাত্র ‘পারমিতা’ বলতে বেশি ভালোবাসেন কোনোরকম পদবী ছাড়া। কারণ সৃষ্টিশীল কাজে তিনি শুধুমাত্রই পারমিতা।” এ ভাষ্য প্রকাশক ভিকি পাবলিশার্সের। গোটা কাব্যগ্রন্থের পরতে পরতে এমনি সব হেঁয়ালির সঘন ব্যবহার পাঠককে করে তুলেছে পিপাসার্ত, কাব্যসুষমার রসাস্বাদনে ব্যাকুল।
বুকে মুড়ে নিতে হয়,
তাই অবাধ আকাশ হতে হয়”
আমি গনগনে আগুনের শেকল বেঁধেছি
শ্যামলা পায়।
বল দেখি - - -
তোর কালো আকাশের গায়।“
অলক্ষ্যে থাকা ‘অনি’
চরিত্রকে উদ্দেশ্য করে এমনি কত হৃদয় নিংড়ানো কথার কথামালায় সেজে উঠেছে
একের পর এক নাম-না-জানা কবিতা। এখানেও হেঁয়ালি। শিরোনাম বিহীন কবিতায়ও অবলীলায় সৃষ্টি হয়েছে কবি ও পাঠকের এক অটুট সম্পর্ক। কখনো মনে হয়নি যে কবিতার একটা শিরোনাম দরকার ছিল। একের পর এক কবিতার অনাবিল পঠনে কোথাও ঘটেনি ছন্দপতন
কিংবা পঠনসুখের তারতম্য।
পারমিতা একাধারে শিক্ষিকা, সঙ্গীত
শিল্পী, বাচিক শিল্পী এবং একজন সফল সঞ্চালিকা। ‘শেষের রূপকথা’ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। গুয়াহাটি থেকে
প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। চুরাশি পৃষ্ঠার
এই কাব্য সংকলনে স্থান পেয়েছে মোট ৭৫টি কবিতা। মানানসই প্রচ্ছদ এঁকেছেন নয়নজ্যোতি শর্মা। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে - “রূপকথার এক চণ্ডালকে যে প্রতিনিয়ত
ভালোবাসার শব পোড়ায় অথচ তার ভস্ম গায়ে মাখে না - - - -।“ অর্থাৎ উৎসর্গেই হেঁয়ালির সূত্র
ধরিয়ে দিয়েছেন সাহসী এই কবি। কাব্যগ্রন্থটির
ভূমিকা লিখেছেন প্রতিষ্ঠিত কবি সঞ্জয় চক্রবর্তী। তাঁর কথায় - “বাংলা কবিতায় যে বিভিন্ন বাঁক, কাব্য আন্দোলন, প্রকাশের ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গি, সেসব থেকে দূরে এক সহজ, সাধারণ অনুভবের প্রকাশের তাগিদাই
পারমিতার কবিতা। তিনি নির্জনে, নীরবে,
নিজের মতো করে লিখেছেন এই কবিতাগুচ্ছ।”
আত্মকথনে নির্ভীক কবি
বলেছেন
- “- - - কোন এক একলা রাতে কেউ যদি ‘শেষের রূপকথা’কে নিবিড় ভাবে নিজের কোন রূপকথায় রূপান্তরিত করতে পারেন সেটাই পরম প্রাপ্তি।”
অধিকাংশ কবিতায়ই পাঠক
যে খুঁজে পাবেন তাঁর নিজের রূপকথা এতে কোনও সন্দেহ থাকার কথা নয়। শব্দের জাল বুনে হৃদয়ের গভীরতম স্থান থেকে উঠে
আসা অনুচ্চারিত ভালোবাসাকে অনাবিল ভাষ্যে কবি যেন ছড়িয়ে দিয়েছেন পাঠক হৃদয় জুড়ে।
যেন নদীর উপর চর - - -
খেয়ার নেশা ঘুচিয়ে যদি খুঁজে মরি ঘাট - - -
কিংবা -
এখন বোধহীন নীল বসন্ত অসাড় - - -
তবু আরো আরো ভালোবাসতে চাই - - -
ভালোবাসার অপার অনুভূতি
এভাবেই স্বচ্ছন্দ ধারায় প্রকাশিত হয়েছে কবিতার অবয়বে। বস্তুতঃ নিরেট একটি গভীর ভালোবাসার উপাখ্যান এঁকে দিতে সক্ষম হয়েছেন কবি
তাঁর প্রথম প্রয়াসেই। হাতে গোণা কিছু
বানান ভুল আর একটি কবিতা দু’বার ছাপার ভুল ছাড়া ‘শেষের
রূপকথা’ এককথায় অনবদ্য এবং পাঠক-সমাদৃত
একটি কাব্য সংকলন। কবি সঞ্জয় চক্রবর্তীর
কথার খেই ধরে অনায়াসেই বলা যায় নিজের মনগহন কোণে নিজেকেই বলার অনেক কিছু থাকে, থাকে
বেদনা, থাকে আনন্দ, থাকে সুন্দর। সেই কথাসকলই দুই মলাটের ভেতরে এই কাব্যগ্রন্থে।
তোমার দীর্ঘশ্বাসে কখনো খোঁজ নিয়ে দেখো - - -
অনাগত ভবিষ্যতে ভালোবাসার
খেয়া বেয়ে কবি পারমিতা যে রয়ে যাবেন ভীষণ ভাবে সেই প্রতিশ্রূতিটুকু অন্তত নিশ্চিতভাবেই
পরিলক্ষিত হয়েছে তাঁর এই প্রথম কাব্যগ্রন্থে। তাই পারমিতার কলম থেকে এমনি আরোও একাধিক সৃষ্টির আশা করা যেতেই পারে।
- - - - - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

Comments
Post a Comment