Skip to main content

প্রথম চুমু(ক)

প্রথম চুমু(ক)

 

‘মাস্ক পরো - মাস্ক পরো’ - প্রায় চেঁচিয়েই ওঠে বাতি। বাতি অর্থাৎ বাতিঘর। এ নামেরও এক সুমধুর পটভূমি আছে। সে নাহয় পরে হবে। আপাতত সরেজমিনে বাতিকে সামাল দেওয়াটাই মুখ্য। ঘর থেকে বেরোতে গিয়েই এমন ঝাঁঝালো নির্দেশের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না সুমন। না, এ নামের পেছনে কোনও ইতিহাস নেই। পুরুষের নামে এসব থাকেও না। বৈচিত্রহীন, একঘেয়ে, সরলরৈখিক জীবনের আরেক নাম বোধকরি পুরুষ। যদিও বিপরীত লিঙ্গের মানুষরা এটা মানবে না কিছুতেই - বাতিই যেখানে মানে না সেখানে - - - । 

আরে, আমরা তো গাড়িতেই যাচ্ছি। তাহলে মাস্কের কী দরকার ?’ - পরিস্থিতি সহজ করার লক্ষ্যে সচেষ্ট হয় সুমন - পুরুষ মানুষেরা যা সারা জীবন ধরে করেই থাকে আরকি। 

নিমরাজি বাতি বুঝে উঠতে পারে না কী বলবে। জিভ যেন আটকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। একসাথে অনেকগুলো লোক দরজা দিয়ে বেরোতে চাইলে যেমন সবাই আটকা পড়ে যায় ঠিক তেমনি। ভয়, ভীতি, আনন্দের মিশেল অনুভূতির ঝড় বইছে ভেতরে। তাই বলার মতো যেন জুতসই কথাই খুঁজে পাচ্ছে না বাতি। অথচ ওই পুজোআচ্চার সময় আর ঘুমের সময়টুকুর বাইরে কথাই ছিল তার সর্বক্ষণের সঙ্গী। ছিল মানে তো এই সেদিন অবধি যখন নিয়মিত স্কুলে যেতে হতো। সারাদিন ছাত্রছাত্রীদের সাথে আর ঘরে এলে সুমন আর শুচির সঙ্গে। স্কুলে তো এখন পড়াশোনা যতটুকু হয় তার বাইরে সরকার বাহাদুরের হুকুমে বিষয় বহির্ভূত ব্যাপারেও ততটুকুই কাজ। ঘরে আসতে আসতে তাই নিত্য সন্ধ্যা। একই সময়ে প্রায় সুমনও এসে পড়ে ঘরে। ওরা এলেই মায়ামাসির ছুটি। বিকেলের ঘুমের মধ্যেই শুচির অভিভাবক বদল হয়ে যায়। এর পর রাতে শুতে যাওয়া অবধি কথা আর কাজ চলতেই থাকে সমানে। 

এর পর কোথা দিয়ে যে কী হয়ে গেল। বদলে গেল পৃথিবী। ঘরবন্দি হলো মানুষ আর বাইরে বেরিয়ে এলো বাকি সব পশুপাখি। এমন দৃশ্য কল্পনারও অগোচর ছিল মানুষের। 

নিচে নেমে এসে গাড়িতে উঠতে উঠতে কোনওক্রমে বললো - আচ্ছা, ঠিক আছে। এনেছো তো সাথে ? নাকি ঘরে ফেলে এসেছো ? শুচি মাস্ক এনেছিস তো মা ?’ 

মাথা নেড়ে সায় দেয় দুজনেই। শুচি পেছনের সিটে গিয়ে বসে। এবার মোবাইল হাতে নিয়ে আধঘন্টার জন্য হারিয়ে যাবে কল্পলোকে। বাতি সামনের সিটে গিয়ে বসে দীর্ঘ দশ মাসের বিরতির পর। এও যেন এক পুনর্জন্ম। এভাবে যে একদিন আবার বাইরে বেরোনো যাবে পৃথিবীটাকে আবার চেনা অচেনা লাগবে - একদিন তা অলীক স্বপ্নের মতো মনে হয়েছিল। এমনকি সারা পৃথিবীতে মানুষ নামের কোনও প্রাণী যে থাকবে এতেও একটা সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল বাতির মনে। আজ তাই অবাক চোখে তাকিয়েই থাকে বাইরের দিকে। অজান্তেই গুনগুনিয়ে ওঠে - পৃথিবী বদলে গেছে, যা দেখি নতুন লাগে - - -। 

ওদিকে বহুদিন পর আবার পাশে বাতিকে বসিয়ে বাইরে বেরোনোর আনন্দে মশগুল হয়ে আছে সুমন। একবার পেছন দিকে তাকিয়ে দেখে নেয় শুচিকে। এবার গাড়ি স্টার্ট করার আগে নিশ্চিন্ত হয়ে তাকায় বাতির মুখের দিকে। আনমনা বাতির ডানহাতের উপর হাতটা রাখে। এ সুমনের চিরদিনের অভ্যেস। গাড়ি চালাতে চালাতে প্রায়ই এটা করে থাকে। বাতিও উপভোগ করে ব্যাপারটা। মুখ ফুটে বলে না কিছুই তবে মুচকি হাসির ছোঁয়াটুকু এড়িয়ে যায় না সুমনের চোখ। আজ যেন সুমনের হাতের ছোঁয়ায় এক পরম নির্ভরতার আশ্বাস খুঁজে পায় বাতি। চলতে শুরু করে গাড়ি। 

আজকের এই অভিযানের উদ্দেশ্য শুচিকে সংগীত শিক্ষিকার ঘরে পৌঁছে দেওয়া। দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন ক্লাসের পরম্পরা পেরিয়ে এসে আজই প্রথম খুলেছে সরাসরি গান শেখানোর পালা। খুলেছে অনেক কিছুই। আপাতত মানুষকে কিছুটা রেহাই দিয়েছে করোনা ভাইরাস নামের মহা শক্তিধর জীব। মেঘনাদ যেমন মেঘের আড়াল থেকে ছুঁড়তেন একের পর এক মারাত্মক অস্ত্র ঠিক তেমনি অদৃশ্য এই ভাইরাস কখন কাকে ঘায়েল করেছে সেসব কথা ভাবতে গেলেও শিউরে উঠতে হয় বৈকি। 

এখন জীবন অনেকটাই সহজ হয়ে আসছে। সহজ মানে মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটছে দর্শনীয় ভাবে। এতদিনের না পাওয়ার পালা যেন সুদে আসলে পুষিয়ে নিতে চাইছে সবাই। বিনোদনের চূড়ান্তটুকু পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে মানুষ। কিন্তু কেউ কেউ রয়ে গেছেন অনেকটাই ভীত - আগেরই মতো। বিশ্বাস নেই কোথায় ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে ওই মারণ ভাইরাস। আর এই অনেক-এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাতি আর শুচির ওই সংগীত শিক্ষিকা। অন্য সবখানে অফলাইন ক্লাস শুরু হয়ে গেছে বেশ কদিন হলো কিন্তু ভীতির এই পর্যায় কাটিয়ে উঠতে অনেকটাই সময় লেগেছে তাঁর। যাই হোক, আজ শুচির এই প্রথম অফলাইন ক্লাসের সূত্র ধরে বাতিরও পুনর্জন্ম। মনের সব দ্বিধা দ্বন্দ কাটিয়ে মুক্ত আকাশের নিচে আবার এসে দাঁড়ালো বাতি - সুমনের পরম নির্ভরতায়, যেমন এসে দাঁড়িয়েছিল আজ থেকে অন্তত তিরিশটি বছর আগে। 

বিয়ের ঠিক আগে আগেই সুমন বদলি হয়ে যায় ভিন রাজ্যে। অগত্যা নববিবাহিত বউকে নিয়ে বিয়ের পর সেখানেই পাড়ি দিতে হয়। ভিন রাজ্যের ওই দুবছরের সময়কাল দুজনেরই তাই জীবনের এক সোনালি অধ্যায়। পৃথিবীটা তখনও বদলে গেছিল দুজনের। যা দেখি নতুন লাগের মতো অবস্থা তখনও। সারাদিনের অফিসের পর সন্ধে হলে বেরিয়ে যেত দুটিতে। সুমনের মাটি রঙের স্কুটারের পেছনে বসে জগতটাকে নতুন করে দেখতো বাতি। এই অদ্ভূত নামটিও সুমনেরই দেওয়া। এক রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে দেখছিল যখন একে অন্যকে তখন কথাটা শুরু করেছিল বাতিই। বলেছিল - জানো, আমার জীবনটাকে আলোয় আলোয় ভরিয়ে দিয়েছ তুমি। এতটা সুখ আমার কল্পনায় ছিল না কোনওদিন। বরাবরই আমি খুব চিন্তায় থাকতাম আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমার সব ভাবনা, সব দুশ্চিন্তা দূর হয়ে গেছে আজ। তুমি আমার লাইট হাউস - বাতিঘর।“ - বলে মুখটা গুঁজে দেয় সুমনের উদোম বুকে। 

বাতির মুখটাকে পরম যত্নে দুহাতে তুলে ধরে আবছা আলোর মায়াবী পরশে বলে সুমন - কী করে বুঝাই বলো - তুমি আমার কে ? চলার পথে পথ দেখাতে তোমাকে আমার খুব খুব করে চাই। আমি তো তোমার বাতিঘর, তুমি কিন্তু আমার অন্ধকারের আলোর উৎস - বাতি।বলে পরম ভালো লাগায় বাতির ঠোঁটের উপর এঁকে দেয় প্রগাঢ় প্রেমের চুম্বন। বাতি সেই থেকে বাতি। 

একটি বছর যেন উড়ে বেড়িয়েছে দুজনে। যখন যেমন খুশি। সন্ধে হতেই সোজা নতুন খোলা চপের দোকানে। কত রকমের চপের পসরা। ভেজ, এগ, মাটন, চিকেন, ফুলকপি, চিংড়ি ইত্যাদি ইত্যাদি। বাতিদের দুজনেরই বরাবরের ভালো লাগা আইটেম হলো ফুলকপি আর চিংড়ির চপ। তারিয়ে তারিয়ে খেত দুজনেএরপর খানিকক্ষণ এদিকে সেদিকে ঘোরাঘুরি করে রাত নটার আগেই ঘরে। 

ফাস্ট ফুড এর দোকানে এমনি নিত্য দিনের খরিদ্দার ছিল ওরা দুজন। কিন্তু এ সুখ আর স্থায়ী হলো না বেশি দিন। কারণ বছর ঘুরতেই এর উপর এসে জুড়ে বসলো আরোও বড় সুখের খবর। ততদিনে দুজনের কাছেই পৌঁছে গেছে শুচির আগমনি বার্তা। খুশিতে উদ্বেল সুমন আর বাতিকে এরপর একদিন ডেকে পাঠালেন ডাক্তারবাবু। যথাসময়ে চেম্বারে গিয়ে উপস্থিত হয়ে ভেতরে খবর পাঠাল সুমন। 

বোধ করি সুখ একা আসে না। সুখের দোসর দুঃখও সাথে আসে পাশাপাশি। ডাক্তার স্পষ্ট বলে দিলেন - এমনিতে সব ঠিকই আছে তবে কিছু সমস্যা রয়েছে। যার ফলে বাতিকে অন্তত মাস তিনেক বেড রেস্টে থাকতে হবে। আর বাইরের খাওয়া দাওয়া একেবারেই নিষেধ। 

সেই থেকে বদলে গেল জীবন। বাতির বেশির ভাগ ঘরোয়া কাজকর্মই সুমন নিয়ে এল নিজের উপর। বাইরে ঘোরাঘুরি বন্ধ হলো তৎক্ষণাৎ। চপের দোকান স্মৃতি হওয়ার পথে চলে গেল। 

সেই থেকে চিরতরেই হারিয়ে গেল সেই ক্রেজ, সেই ভালো লাগা। আজ উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী শুচি। জীবনধারা পালটে গেছে সুমন আর বাতির। তবে বাতি আর বাতিঘর নামাকরণের সার্থকতা আজও অম্লান। ভালোবাসার বাঁধন ক্ষুণ্ণ হয়নি একরতিও। 

# # # 

গলির মুখে নামিয়ে দেওয়া হলো শুচিকে। এবার ঘণ্টা দেড়েকের কালযাপন। যে যার মতো করে। বাতি এবার গিয়ে বসবে মন্দিরে। তন্ময় হয়ে নাম জপ করবে একটি ঘন্টা। অসম্ভব রকমের আধ্যাত্মিক নিবেদন। কালের ধারায় এক স্বতঃস্ফূর্ত মানবিক বিবর্তন। অথচ সুমনের পক্ষে এমনটা সম্ভব হয়ে উঠেনি আজো। পুরুষ ও স্ত্রীর মধ্যে এটাই বোধ করি অবধারিত ফারাক। দুজনের পারস্পরিক ভাব ভালোবাসাটুকু কিন্তু একই রয়ে গেছে আজো। কিন্তু প্রাত্যহিক দিন যাপনের শৈলীটুকু পালটে গেছে আমূল। সুমন এখনো আগেরই মতো উদ্দাম হয়ে থাকতে ভালোবাসে। বন্ধু বান্ধবীর সঙ্গে আড্ডা, নেশা জাতীয় খাবারের প্রতি দুর্বলতা সবই থেকে গেছে অবিকৃত। ধার্মিক চিন্তাধারা এখনো দানা বাঁধতে পারেনি ভেতরে। ভগবানে অবিশ্বাসের সেই সাহসটুকু যদিও আয়ত্ত্ব করে উঠতে পারেনি এখনো তথাপি আধ্যাত্মিক সমর্পণের সেই ভাবটুকু জেগে ওঠেনি অন্তরে। 

গাড়িটা নিয়ে মন্দির পেরিয়ে এগিয়ে যায় খানিকটা। বাতি এতক্ষণে বসে পড়েছে মন্দিরের ধ্যানঘরে। থাকুক। যার যেভাবে পরিতৃপ্তি। সুমন এখন একটি ঘন্টা ডিসটার্ব করবে না বাতিকে। এখন একটি ঘন্টা সুমনের একেবারেই একান্ত নিজের। অফিসের বাইরে অফিসের চিন্তা কোনওদিনই পছন্দের নয় সুমনের। তাই তার বাইরে এবার ভাবতে বসবে সুমন। পান দোকানের মালিকের সঙ্গে এতদিনে পরিচিতি বেড়ে গেছে অনেকটাই। সুমনকে দেখেই তাই পছন্দমতো পান সাজতে উদ্যোগী হয় মালিক। নিরাশ করে না সুমনও। ভাবে দিনে কত আর রোজগার এদের ? না জানি কত বড় এর সংসার। অতিমারীর দিনের শেষে কার ঘরে যে কী দুর্যোগ এসে হামলে পড়েছে কে তার হিসাব রাখে ? এত এত মাইনে পেয়েও জিনিসের দামের পারদ চড়তে থাকা বাজারে যেখানে খেই হারিয়ে ফেলে খোদ সুমনও সেখানে এইসব ছোট ব্যাবসায়ীরা না জানি কী করে সামাল দিচ্ছে দিন। 

পানটি মুখে পুরে পার্কিং-এ রাখা গাড়ির ড্রাইভিং সিটের দরজাটি আধা খুলে সিটটাকে পেছনে ঠেলে দিয়ে বসে সুমন। কী করা যায় ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ে বিশ্বের কথা। সহপাঠী বিশ্ব এখন এখানে কাছাকাছিই থাকে। যোগাযোগ আছে নিয়মিত। কদিন আগেও কথা হয়েছে। একটা ফোন করে দেখাই যাক। কিছুটা সময় জম্পেশ আড্ডায় কাটিয়ে দেওয়া যাবে। বিশ্বকে ফোন লাগায় সুমন। কিন্তু ফোন ধরে বিশ্ব জানায় ও কোলকাতা আছে। গত পরশুদিনই গেছে ওখানে। ফিরবে সামনের সপ্তায়। বেশি আর কথা বাড়ালো না সুমন। তবুও নেই নেই করে গোটা পনেরো মিনিট পেরিয়েই গেলো। এবার মোবাইল ডাটা অন করে সুমন। বহু সময় হয়ে গেছে নেট দুনিয়ার বাইরে ছিল।

নেট অন করতেই বৃষ্টির মতো মেসেজ এসে আছড়ে পড়তে থাকলো অঝোর ধারায়। টুংটাং, টিউটিউ - নানা রকম শব্দের ঝঙ্কার শেষ হতে একটি একটি করে মেসেজ পড়তে শুরু করে সুমন। দরকারির চাইতে অদরকারি মেসেজই বেশি। তৎক্ষণাৎ ডিলিট করে সব। চোখ এড়ায় না কিছু বিশেষ বার্তাও। সামাজিক দুনিয়ায় সংস্কৃতি জগতে নাম করার সুবাদে ইতিমধ্যে বেশ নাম করে ফেলেছে সুমন। তারই সূত্র ধরে কিছু বিশেষ বার্তা, কিছু বন্ধুত্বের হাতছানি এখন সুমনের নিত্য পাওনা। যথাসম্ভব হিসেব কষে এগোয়। দেমাকি হওয়া ভালো নয়। মাটিতেই থাকতে চায় তাই। মোবাইলে মগ্ন থাকতে থাকতেই কখন যে পেরিয়ে গেছে নির্ধারিত সময় তা বুঝেই উঠতে পারেনি সুমন। হঠাৎ করে বাতির মুখটা ভেসে উঠলো মোবাইলের পর্দা জুড়ে। ফোন করছে বাতি। সম্বিত ফিরে পেয়ে ফোনটা ধরে - হ্যালো। 

- হ্যালো কোথায় আছ তুমি ? আমি বেরিয়ে গেছি মন্দির থেকে। 

হাত ঘুরিয়ে ঘড়ি দেখে সুমন। এক ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। বলে - আমি কাছেই আছি। তুমি মন্দিরের কাছেই থাকো আমি আসছি এখুনি। ডাটা অফ করে মোবাইলটাকে পকেটে পুরে গাড়ি ঘুরিয়ে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই মন্দিরের কাছে পৌঁছে যায়। দাঁড়িয়ে আছে বাতি। গাড়ি পার্কিং করে নেমে আসে সুমন। হাল্কা শীতের আমেজে কিংবা হয়তো জপতপের পুণ্যফলে বাতির মুখটা যেন খুব মায়াবী উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। তার উপর কমলা ও লালের সমাহারে চমৎকার একটা চূড়িদার পরেছে আজ। সত্যি সত্যি দারুণ লাগছে - ভাবে সুমন। তাকিয়ে থাকবে যে কেউ। সুমন দেখে এদিক ওদিক কেউ তাকাচ্ছে কি না। এসব হয়ে যায় স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই। কেউ বলে দিতে হয় না। না, তেমন সময় কারোও কাছে আছে বলে মনে হলো না। সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। যাক বাবা, বাঁচা গেল। আরে, এসব কী ভাবছে সুমন ? এবার হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে বলে - শুচি ফিরে আসতে তো আরোও মিনিট বিশেক দেরি আছে। ততক্ষণ কী করা যায় বলো তো ? 

এ প্রশ্নের জবাব নেই শুচির কাছে। বাইরে বেরিয়ে কী করে সময় কাটাতে হয় তা ভুলে গেছে কবেই। ঠোঁট ওল্টায় তাই - জানিনা। গাড়িতেই বসি গিয়ে 

সুমনের ইচ্ছা নেই। এতক্ষণ তো গাড়িতেই বসে রয়েছিল। তার চেয়ে এক কাপ চা যদি খাওয়া যেত তাহলে মন্দ হতো না। কিন্তু বাতি কি বাইরে চা খেতে রাজি হবে। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে সুমনের মুখ থেকে। বাস্তব মানুষকে কী শিক্ষাই না দেয়। সন্ধে হতেই চপের দোকানে যাওয়ার সেই তাড়নার দিনগুলো ভেসে আসে চোখের সামনে। একবার জিজ্ঞেস করেই দেখা যাক বাতিকে।

প্রথমে চমকে উঠলেও সুমনের নির্লিপ্ত ভঙ্গি আর পথচলতি মানুষের অবাধ গতিবিধি লক্ষ করে ভেতরে ভেতরে খানিকটা ভরসা পায় যেন বাতি। ওর নিমরাজি ভাবখানা দেখে এগিয়ে আসে সুমন। রসিকতার ছলে বলে - একদিন খেয়েই দেখি চলো। যা হয় হবে দু'জনেরই।

পাশেই একখানা ঠেলাগাড়ির উপর অস্থায়ী ছাউনি সেজে চা বিক্রি করছিলেন এক মহিলা। এরকম দোকানে আগে আকছার চা চপ খেয়েছে দু' জনে। বিলাসী রেস্তোরাঁর চাইতে এসব ঘুমটি ঘরেই যাতায়াত ছিল বেশি। সেদিকে ইঙ্গিত করে সুমন। দু'কদম এগিয়েও যায় চায়ের দোকানের দিকে। বাতি আর বেশি সময় পায় না চিন্তা করার। চোখ কান খোলা রেখে পায়ে পা মেলায় সুমনের সঙ্গে। সন্থর্পণে জরিপ করতে থাকে সরেজমিন।

ভদ্রমহিলা যিনি মূলতঃ সামলাচ্ছিলেন দোকান তাঁর চেহারা দেখা গেল না। কারণ মুখে মাস্ক্ পরে রয়েছিলেন। এদিক দিয়ে অনেকটাই নিশ্চিন্ত হলো বাতি। অন্য যাঁরা চা খাচ্ছিলেন তাঁদের সবাইকেই কাগজের ডিসপোজেবল্ কাপে করে চা দিচ্ছেন ভদ্রমহিলা। কাপটাতে চা ঢালার আগে কাপের নিচের দিকে ধরে ট্রের উপরে সাজিয়ে রাখছেন এবং কেটলি থেকে কাপে গরম চা চালান করে ট্রেখানা এগিয়ে দিচ্ছেন খরিদ্দারের দিকে। অর্থাৎ কোনও কিছুতেই হাতের ছোঁয়া লাগতে দিচ্ছেন না দোকানের মালিক। এটা দেখে ভয় অনেকটাই কাটিয়ে উঠলো বাতি। এবার সুমনের কথায় সায় দিয়ে রাজি হয়ে গেল চা খেতে।

পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ভাবে ভদ্রমহিলা দু'কাপ চা এগিয়ে দিলেন ওদের দিকে। চায়ের কাপটি ঠোঁটে ছোঁয়াতে গিয়ে এবার আবার এক বিভ্রান্তির শিকার হয়ে পড়লো বাতি। হঠাৎ করে কোথা থেকে যে দমকা হাওয়ার মতো ভীতি এসে আষ্টেপৃষ্ঠে যেন জড়িয়ে ধরলো তাকে।

এভাবে পাবলিক প্লেসে দাঁড়িয়ে চা খাওয়ার পরিণতি কী হতে পারে সেই ভাবনার জালে আটকা পড়ে গেল অকস্মাৎ। দেশ থেকে তো নিঃশেষ হয়ে যায়নি মারণ ব্যাধি। আজ ওর কিছু হলে কী হবে শুচির ? আর এই যে নির্বিকার সুমন, সে কী পারবে একা হাতে শুচিকে গড়ে তুলতে ? আর এ ছোঁয়াচে রোগের খপ্পরে একা বাতিই যে পড়বে তারই বা কী গ্যারান্টি আছে ? তার সংস্পর্শে এসে ওরাও তো হতে পারে আক্রান্ত।

হাতে চায়ের কাপ নিয়ে গভীর ভাবনায় নিমগ্ন বাতির চোখে মুখে এক বিসদৃশ অনুভূতির স্পষ্ট ছায়া ফুটে ওঠে। সুমন কাছে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে দেখতে থাকে বাতিকে। বাতির ভাবনা বিধুর মনের অতলে ডুব মেরে ওঠে সুমনও। গত দশটি মাসের ত্রস্ত দিনগুলোর যাপন বেলা যেন স্ন্যাপশট হয়ে ঘুরতে থাকে অন্তরে। কখনো স্মৃতির তরী ভাটির টানে পিছিয়ে যায় বহু দূর। বাতির চোখে মুখে এক অজানা ভীতির স্পষ্ট ছবি যেন হুবহু সেই প্রথম মিলন রাতেরই নকল কপি। সেদিনও তেমনি বাতির চোখে মুখে খেলা করছিল এমনি এক অজানা আশঙ্কা। আর এই পরিস্থিতিতেই যেন তার চেহারায় ফুটে ওঠে এক অপরূপ সুষমা। সেই সোহাগ রাতের সেই সুষমাই যেন ফিরে এসেছে আজ আবার। সে রাতে এমন এক বিহ্বল ক্ষণের সমাপ্তি হয়েছিল সুমনের একটি চুমুর মাধ্যমে। আজও স্পষ্ট মনে আছে সুমনের যখন বাতির ঠোঁটের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে তার মুখ তখন অনাবিল এক মোহে আচ্ছন্ন হয়ে চোখদু'টো বুজে ফেলেছিল দু' জনেই। আজও যেন ফিরে এসেছে সেই ক্ষণ। বাতির সেই ফিরে আসা মুখচ্ছবিতে নিমগ্ন সুমনের তীব্র ইচ্ছে করছে আরোও একবার নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে আবারও একটি চুমু উপহার দেয় বাতিকে। ওদিকে কোন এক অদম্য আকর্ষণে সুমনের চোখে চোখ রেখে বাতিও চায়ের কাপে চুমুক দিতে উদ্যত হয় অজান্তেই।

জাগ্রত, অপলক দুই জোড়া চোখে তখন তমসাচ্ছন্ন চরাচর। থমকে আছে পৃথিবী। প্রথম চুমু(ক)-এর প্রতীক্ষায় মারী শেষের নতুন পৃথিবীর প্রথম মানব-মানবী।

- - - - - - - - - - - -

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...