কেউ কেউ এমনও বেঁচেবর্তে থাকেন, যাঁকে নিয়ে কলম ধরতেই হয়। আগেই লিখেছিলাম সেই রবীন্দ্রনাথ, সেই নকল বুঁদিগড় আর সেই একা কুম্ভের কাহিনি। এক সময় কালের করাল ধারায় স্তব্ধ হয়ে যায় একা কুম্ভেরও যাবতীয় প্রতিরোধ, যাবতীয় লড়াই।
জীবনের অমোঘ সত্যের আরেক নাম মৃত্যু। সেই মৃত্যু এসে ছিনিয়ে নিয়ে গেল আমাদের একান্ত আপন ভুবনের এক নিরলস সাহিত্যপূজারি, নকল বুঁদিগড়েরই মতো আমাদের প্রতিবেশী এক রাজ্য নাগাভূমি বা নাগাল্যাণ্ড-এর সেই একা কুম্ভ, নাগাভূমির বাংলা চর্চার একমেবাদ্বিতীয়ম কবি, সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার শ্রী দেবাশিস দত্তকে।
ধর্মমূলক ছবির বদলে যাঁর বৈঠকখানার মূল বহির্গমন দরজার উপরে স্রোতের বিপরীতে সসম্মানে বিরাজিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র - সাহিত্যে তাঁর আত্মোৎসর্গ সহজেই অনুমেয়। সাহিত্য চর্চার স্থান এই বৈঠকখানার বাকি দেয়াল অবধারিতভাবেই রবীন্দ্রময়। বলতে গেলে রবীন্দ্র ছায়ায় আচ্ছাদিত এই নিবেদিত প্রাণ সাহিত্যিক কী অসীম একাগ্রতায় যে সাহিত্যের এই অখ্যাত, নির্জন ভুবনে বসে রচনা করেছেন অফুরন্ত সব প্রাণবন্ত সাহিত্য, গভীরে প্রবেশ না করলে তা বুঝার উপায় নেই। ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত নাগাল্যাণ্ড নামের এই রাজ্যে – বাংলা ও বাঙালি যেখানে সংখ্যালঘুত্বের খাতিরে চির ব্রাত্য, সেখানে গত পঞ্চাশটি বছর ধরে চলে আসছিল তাঁর এই নিরবচ্ছিন্ন, আত্মনিমগ্ন সাহিত্য আরাধনা। মূলত গবেষণাধর্মী প্রবন্ধই তাঁর সাহিত্য সম্ভারের প্রধান উপাদান যদিও একজন প্রকৃত সাহিত্যিক কখনো সাহিত্যের শুধুমাত্র একটি ধারায় মিজেকে আবদ্ধ করে রাখতে পারেন না। স্বভাবতই শ্রী দত্তের লেখনী থেকে সৃষ্টি হয়েছে অনবদ্য কিছু ছোটগল্প এবং কবিতাও।
সাহিত্যিক দেবাশিস দত্তের জন্ম তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশের) শ্রীহট্ট জেলার মোলভীবাজারের অন্তর্গত ভানুগাছ (কমলগঞ্জ) রেলওয়ে স্টেশনের অদূরবর্তী পাত্রখোলা চা বাগানে - ১৯৪৩ সনের ১লা এপ্রিল। বাবা প্রয়াত রামকুমার দত্ত, মা প্রয়াতা সুপ্রভা দত্ত। বিদ্যালয় শিক্ষা বাংলাদেশের আদমপুর এম ই স্কুল, করিমগঞ্জের নিলামবাজার স্বামী বিরজানন্দ হাইস্কুল ও উধারবন্দের দুর্গানগর হায়ার সেকেণ্ডারি স্কুলে। এরপর শিলচর গুরুচরণ কলেজ থেকে বাংলায় সাম্মানিক সহ স্নাতক এবং গৌহাটি বিস্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রীলাভ। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৬৯ সালে ডিমাপুর কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে। তখন থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩১ বছরের কর্মময় জীবনে শ্রী দেবাশিস দত্ত রচনা করে গেছেন অসংখ্য মূল্যবান সাহিত্য। ২০০০ সালে কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে নিমগ্ন ছিলেন শুধুমাত্র সাহিত্যেরই অঙ্গনে, লিখে গেছেন একের পর এক অনবদ্য রচনা।
সুসাহিত্যিক দেবাশিস দত্ত তাঁর লেখনীর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন চেয়েছেন তাঁর কর্মভূমি, তাঁর বাসভূমিকে সর্বজনপরিচিত করে তুলতে ঠিক তেমনি অন্য দিকে বাংলা সাহিত্যকেও চেয়েছেন ব্রাত্য এই অঞ্চলে যতটুকু সম্ভব ছড়িয়ে দিতে। চেয়েছেন বাংলা সাহিত্যের এই ছন্নছাড়া ভুবনে বসবাসরত বাঙালিদের মধ্যে ছিটিয়ে দিতে বাংলার সুরভিত বৈভবের অনাস্বাদিত রসমাধুরী। আর সেই চাওয়ার সুবাদে ২০০৩ সালে জন্ম নিল সাহিত্যিক দেবাশিস দত্তের মানস পত্রিকা – ‘পূর্বাদ্রি’। সাথে কিছু সহযোগী যোদ্ধা – ইতোমধ্যেই যাঁরা আংশিক হলেও সিঞ্চিত হয়েছেন বাংলা সাহিত্য রসে। সেই ২০০৩ থেকে শ্রী দেবাশিস দত্তের সম্পাদনায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছিল ডিমাপুর তথা নাগাল্যাণ্ডের গর্বের ছোট পত্রিকা ‘পূর্বাদ্রি’। ছোটপত্রিকার ভুবনে সমগ্র উত্তর পূর্বাঞ্চল জুড়ে ‘পূর্মাদ্রি’ আজ বহুল সমাদৃত। এই পূর্বাদ্রিরই পাতায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছে শ্রী দত্তের দীর্ঘ প্রবন্ধ – ‘রবীন্দ্রনাটকে মৃত্যু’ যা ইতিমধ্যেই ২০২০ এর গুয়াহাটি বইমেলায় উন্মোচিত হয়েছিল পুস্তক আকারে। অপূর্ব রচনা শৈলিতে আবদ্ধ গ্রন্থটি যে রবীন্দ্র চর্চার এক মূল্যবান সম্পদ হিসেবে একদিন পরিগণিত হবে এতে কোনও দ্বিমত থাকার কথা নয়। প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘকন্যা’। প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল একটি সংগ্রহযোগ্য প্রবন্ধ সংকলনও – ‘নাগাল্যাণ্ড ও সেকালের বাংলা চর্চা’। ‘পূর্বাদ্রি’ ১৪২৮ শারদীয় উৎসব সংখ্যাও ছিল যন্ত্রস্থ। হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই তা প্রকাশিত হবে। কিন্তু ‘পূর্বাদ্রি’র জনক আর তা দেখে যেতে পারলেন না।
তখন ২০০৬ সাল। ‘পূর্বাদ্রি’ তখনও বিদ্ব মহলে বহুল পরিচিত হয়ে উঠেনি। স্বভাবতই সাহিত্যিক দেবাশিস দত্তও রয়ে গেছিলেন বলতে গেলে পরিচিতির আড়ালেই। সে বছর গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় লিটল ম্যাগাজিন সম্মেলন। সেদিন তাঁকে আমন্ত্রণ জনানো হয় মঞ্চে। আর সেই মঞ্চাভিষেকের পর থেকেই তিনি হয়ে উঠেছেন উত্তর পূবের বাংলা সাহিত্য মঞ্চের অপরিহার্য উপস্থিতি। সেদিনের পর থেকে শ্রী দেবাশিস দত্ত আপন পরিচয়ে নিজের স্থান করে নিয়েছিলেন উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাহিত্য জগতের অন্যতম নক্ষত্র হিসেবে।
তিনি যদিও মননশীল প্রবন্ধেই বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যেখানেই হাত লাগিয়েছেন সেখানেই ফলেছে নিরেট সোনা। লেখালেখির বাইরেও জড়িয়েছিলেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে। ডিমাপুরে বাংলা সাহিত্যের প্রচার ও প্রসারের অংশ হিসেবে একাধিক নাটকের রূপায়ণে ছিল তাঁর ওতপ্রোত সংযোগ। বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন সময়ে। এগুলোর মধ্যে আছে আই পি টি এ, নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন, ডিমাপুর সংস্কৃতি পরিষদ, নান্দনিক সংস্কৃতি সংস্থা, ডিমাপুর বাঙালি সমাজ ইত্যাদি।
জীবন জোড়া সাহিত্য বিষয়ক কর্মকাণ্ডের ফলস্বরূপ বিভিন্ন স্থানে সংবর্ধিত হয়েছেন তিনি, পেয়েছেন পুরস্কারও কিন্তু এই বিষয়ে বেশি কিছু বলতে নারাজ ছিলেন। হয়তো হৃদয়ের কোণে চাপা পড়ে ছিল কোন অভিমান, কোনও ক্ষোভ। তাই তাঁর নিজের কথায় – “ সংবর্ধনা, পুরস্কার ইত্যাদি প্রাপ্তি ঘটেছে তবে এ বিষয়ে বিশদ উল্লেখ অরুচিকর। সৃষ্টির জগতে যতক্ষণ বিচরণ করা যায় তাই তো জীবনের সঞ্চয়। সৃষ্টির অভিমুখ তার প্রকাশের সাবলীলতায় – পুরস্কারে, প্রচারে নয়। এ বিষয়ে বেশি বলা অপ্রয়োজনীয়”।
৭৮ বছর বয়সে দুরারোগ্য ব্যাধিতে চলে গেলেন পরপারে। সাহিত্যের এই প্রাঙ্গনে সৃষ্টি হলো এক অপূরণীয় শূন্যতা। আজ তাঁরই জীবনগুরু রবীন্দ্রনাথের গানের কয়েকটি লাইন দিয়ে স্মরণ করি তাঁরে -
“পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে
আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে
চুকিয়ে দেব বেচা কেনা
মিটিয়ে দেব লেনাদেনা,
বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে - - -”।
- - - - - - - - - - - - - - -
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

Comments
Post a Comment