Skip to main content

উনকোটিতে ইচ্ছেপূরণ


কথায় বলে - আমার উনকোটি বৃত্তান্ত চাই। অর্থাৎ এক কোটি কথার মধ্যে বড় জোর একটি কথা কম হতে পারে, তার বেশি নয়। এই ‘এক কম’ শব্দযুগলকেই সাধারণতঃ ‘উন’ বলা হয়। যেমন - উনতিরিশ মানে এক কম তিরিশ, উনচল্লিশ মানে এক কম চল্লিশ। সেরকমই আরকি। তো সেই উনকোটি নিয়েই লিখব আজ। তবে পুরোটাই লিখব। একটুও কম নয়।

সে বেশ ক’বছর আগের কথা। ছোট পরিবার, সুখী পরিবার-এর সূত্র ধরে সকন্যা - সস্ত্রীক উনকোটির উৎকণ্ঠিত ভ্রমণ বৃত্তান্ত। তবে এই ভ্রমণের সলতে পাকানোর কাজটি শুরু হয়েছিল তারও অন্তত বছর দশেক আগে। সেই সলতে পর্বের কথাটি ভূমিকায় সেরে নিই প্রথমেই। তখন আমি ত্রিপুরা রাজ্যের উত্তর ভাগে, আসাম সংলগ্ন শহর ধর্মনগরে থাকতাম। বদলির চাকুরি। নির্ঝঞ্ঝাট আমি এই বদলির ব্যাপারটা বেশ উপভোগই করতাম মন থেকে। কত কত অদেখা জায়গা, মানুষজন, অনাস্বাদিত খাদ্য - এসবের একটা আলাদা আকর্ষণ ছিল আমার কাছে। তবে ওখানে ঘর ভাড়া নিয়ে আমি থাকতাম আমার মা বাবার আওতায়। ততদিনে বাবাও রিটায়ার করে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। তাই তাঁদেরও একটু ঘোরাঘুরি হবে আর রান্নাবান্নার মতো কাজে আমার মতো অকালকুস্মাণ্ডেরও একটা হিল্লে হবে - সেই ভেবে মায়ের চিন্তামুক্তিও হবে, এই ভেবে এমনই হলো সিদ্ধান্ত। সেখানে বেশিদিন থাকবো না জানতাম। অফিস আর তিনজনের সংসার নিয়ে ভালোই কাটছিল দিনগুলো। চাকরি সূত্রে নিত্য ঘোরাঘুরি। তখন ত্রিপুরায় উগ্রপন্থারও বাড়বাড়ন্ত। এরই মধ্যে দুর্দান্ত সব স্থানে আমার ডিউটি পড়তো। কিছু নমুনা দিচ্ছি। যাঁরা জানেন তাঁরা শিউরে উঠবেন নিশ্চিত। শর্মনটিলা, শিকারিপাড়া, ছৈলেংটা, কাঞ্চনপুর, ফুলদেংসাই সহ অন্যান্য অনেক জায়গা যেমন আমবাসা, পেঁচারতল, কুমারঘাট, কৈলাশহর আদি। জম্পুই এর আনারস আর কমলালেবুর স্বাদ উপভোগ করেছি রসনাসিক্ত করে। এদিকে আবার ধর্মনগর থেকে আধঘন্টার দূরত্বে পানিসাগর নামের জায়গাটিতে থাকতো আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেবাশিস। ত্রিপুরা সরকারের অধীনে ইঞ্জিনিয়ার - যদিও তখনো পাকা হয়নি চাকরি। মাঝে মধ্যেই সন্ধে হলেই আমার পক্ষীরাজ - বাজাজ সুপারটি নিয়ে সেখানে গিয়ে বসে যেতাম আড্ডাবাজিতে। এদিকে তখন আমার জন্য সুপাত্রীরও চলছে সন্ধান। লাগামের সন্ধানে মা বাবা সহ ঘরের সব অভিভাবকবৃন্দ তখন বলতে গেলে মাঠে নেমে পড়েছেন আদাজল খেয়ে। সেই আদাজলের সূত্রে ধর্মনগর শহর সহ দেশের নানান জায়গায় পাত্রী দেখা উপলক্ষে আমার দাদা বৌদিরাও এসে জড়ো হতেন সেখানে। তবে থাকা হতো না তেমন। শেষ পর্যন্ত শিকে ছিড়লো লামডিং-এর। দিনকয়েক পর লামডিং থেকে শাখা সিঁদুর পরে নবাগতা এসে পৌঁছালেন ধর্মনগর। এরপর আবারো একদিন সবাই মিলে এলেন সেখানে থাকতে। এবার কয়েকদিন একসাথে থাকার পরিকল্পনা। 

সব বড় কাজেরই একটা সাইড এফেক্ট থাকে। অর্থাৎ শুধু রথ দেখতে এত কাঠখড় পুড়িয়ে এতদূর আসার তো মানে হয় না। তাই কলা বেঁচারও বন্দোবস্ত করতে হলো আমাকে। এবং সেই পরিকল্পনা ও কলা বেচা সূত্রে আমাদের সপরিবারে ঘুরতে যাওয়া কোথাও। অনেক খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল ধর্মনগর থেকে প্রায় বিশ কিলোমিটার দূর এক অতীব সুন্দর জায়গা আছে যার নাম উনকোটি। শৈবতীর্থ হিসেবে উনকোটি সবার কাছে এক তীর্থস্থানের মর্যাদা পেয়ে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। আছে উনকোটির এক সমৃদ্ধ ইতিহাস তথা ধর্মীয় পশ্চাৎপটও। তার যতটুকু সম্ভব তথ্য জোগাড় করে এক সকালে বেরিয়ে পড়লাম সবাই মিলে একটি জীপগাড়ি ভাড়া নিয়ে। ত্রিপুরার সব জায়গাতেই জীপ গাড়ির খুব চল ছিল। উঁচুনিচু পাহাড় পথে জীপগাড়ির চলাচল খুব সাবলীল। বেলা দশটা নাগাদ চান-টান সেরে সবাই মিলে জীপে উঠে বসলাম। সামনের সিটে বাবা, দাদা ও দাদার ছেলে পল। পেছনে মা, বৌদি ও আমরা নববিবাহিত যুগল। ধর্মনগর থেকে কৈলাশহর যাওয়ার পথে পড়ে উনকোটি। এই ধর্মনগর - কৈলাশহর রাস্তাটি ছিল অত্যন্ত সরু এবং অসংখ্য বাঁক থাকা। ভাগ্যিস কারো ‘উল্টি’র ধাত ছিল না। এঁকেবেঁকে পাহাড়ের কোল ঘেষে এগিয়ে চললো আমাদের জীপ। তখন রাস্তার পাশের পাহাড় কেটে কেটে রাস্তা চওড়া করার কাজ চলছে। কাঁচা মাটি পড়ে গিয়ে তাই রাস্তা অনেকটাই বিপদসঙ্কুল। তবে দক্ষ ড্রাইভারের মুন্সিয়ানায় এক ঘন্টাতেই আমরা পৌঁছে গেলাম যেখান থেকে উনকোটি যাওয়ার রাস্তা শুরু হয়েছে সেখানটায়। আন্তর্জাতিক সীমানা সংলগ্ন শহর কৈলাশহর তখনও দশ কিলোমিটার দূরে। সামনে তাকিয়ে দেখলাম একটি দিক নির্দেশক সাইনবোর্ড। তাতে লিখা আছে - ‘পুণ্যতীর্থ উনকোটি ডানদিকে’। প্রায় আধ কিলোমিটার রাস্তা যেতেই থেমে গেল জীপ এবং ড্রাইভার জানিয়ে দিল যে আমরা এসে গেছি। 

গাড়ি থেকে নেমে কয়েক পা এগোতেই হঠাৎ করে এক বিশাল উপত্যকা আমাদের সামনে এসে ধরা দিল। অভিভূত হয়ে দেখছিলাম এক ভয়ঙ্কর সুন্দরকে। আমরা যেখানটায় দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকেই বাঁধানো সিঁড়ি নেমে গেছে নিচে আঁকাবাঁকা পথে। আমরাও তরতরিয়ে নামতে শুরু করলাম। নিচে নেমে আসতেই চারদিকে অসংখ্য পাহাড় আর তার গায়ে সেঁটে থাকা অগুনতি পাথরের মূর্তি। মূর্তি নয় এগুলো। পাহাড় গায়ের পাথরকে কেটে কেটে একের পর এক অপরূপ ভাস্কর্য। বিশাল সব দেব দেবীদের মুখ। শুনলাম তারই সবচেয়ে বড় শিবের মুখ থাকা ভাস্কর্য নাকি এক বিখ্যাত কারুকার্য। এশিয়ার মধ্যে সবচাইতে বড় এ ধরণের কাজ। 

দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি। সামনে তাকিয়ে দেখি একটি পাহাড়ের বুক চিরে অসংখ্য সিঁড়ি উঠে গেছে উপরে। খবর নিয়ে জানলাম ওই পাহাড়ের উপরে নাকি আছে বিষ্ণু মন্দির। এত কাছে এসে সফর অসমাপ্ত রেখে যাওয়ার কোনও মানেই হয় না। অতএব শুরু হলো চড়াই। সেই ভর যৌবনেই হাঁফিয়ে উঠেছিলাম স্পষ্ট মনে আছে। বিষ্ণু মন্দিরে পৌঁছে দীর্ঘ বিশ্রাম শেষে আবার উৎরাই বেয়ে নেমে আসা। এসে আরোও এক চমক। দুই পাহাড়ের মধ্যিখান থেকে তরতরিয়ে নেমে আসছে স্বচ্ছ ধারার ঝরনা। আমরা তো অবাক। আগে কেন দেখিনি একে ? ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে হাতের ক্যামেরার কাজ। সবার চোখ এড়িয়ে নবদম্পতির একটু ঘনিষ্ঠ ছবিও তোলা হলো বৌদির সৌজন্যে। ঝরনার দিকে এগোতেই কেউ একজন এসে বললেন এই ঝরনা খুব পুণ্যতোয়া। যাঁরাই এখানে এসে মনে মনে ভগবানের কাছে কিছু প্রার্থনা করেন তাদের বাসনা অবশ্যই পূর্ণ হয়। আর অশোকাষ্টমীর দিন এই জলধারা হয়ে ওঠে বিশেষ গুণসম্পন্ন। তাই প্রতি বছর এই বিশেষ দিনে এখানে আগমন হয় অগণিত পুণ্যার্থীর। বসে তিন দিন ব্যাপী বিশেষ মেলা। এছাড়াও শিবরাত্রি এবং মকর সংক্রান্তিতেও বসে মেলা। বিজ্ঞানের ছাত্র আমি এসবে বড় একটা  বিশ্বাসী ছিলাম না যদিও আপাদমস্তক এক ঈশ্বরবিশ্বাসী মানুষ ছিলাম। তাই এক গণ্ডুষ জল ছিটিয়ে দিলাম সর্বাঙ্গে আর মনে মনে ভাবলাম সঙ্গিনী তো জুটলো। এবার সন্তান হলে আরোও একবার আসবো এই পুণ্যস্থানে। আর আসবো কোনও এক অশোকাষ্টমীর পুণ্য লগনে। অলক্ষ্যে স্ত্রীরত্নটিও যে একই পণ করেছেন মনে মনে তার খোলাসা হতে এরপর লেগে গেছে বহু বছর। 

ইতিমধ্যে উনকোটির উপর দিয়ে বয়ে গেছে বহু ঝড় তুফান। উগ্রপন্থী এসে জড়ো হয়েছে চারপাশে। ক্রমে দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হলো পুরো এলাকা। 

দু’বছর পর বদলি হয়ে চলে এলাম আপার আসামে। ধর্মনগর, উনকোটি থেকে বহুদূর। মাত্র ছ’মাস হয়েছে আমার মানসকন্যার হয়েছে আবির্ভাব। গিন্নির কোল জুড়ে খেলা করে বেড়ায় আমার সুখের ভাঁড়ার। বেড়ে উঠতে থাকে মেয়ে, সাথে আমরাও। সংসার ধর্মের বিন্যস্ত পালনে চলে যায় বেশ ক’বছর। একদিন সহধর্মিণী জড়োসড়ো হয়ে জানালেন তাঁর মনের সুপ্ত বাসনাটি। রুবিকে নিয়ে একবার উনকোটি যাবো। আমি তো শুনেই হতভম্ব। এতদিন ধরে মনের গভীরে পুষে রেখেছি যে বাঞ্ছা সেখানে কী করে প্রবেশ করলো আমার জীবনসঙ্গিনী ? চমক আর পুলকে সব কথা খোলসা হলো দুই তরফেই। হাসিতে লুটিয়ে পড়ার মতো অবস্থা। ইতিমধ্যে আমার আবার হয়েছে বদলি। কন্যা রুবি এতদিনে চার ক্লাসের ছাত্রী। ওদিকে বন্ধু দেবাশিসের সঙ্গে সম্পর্ক, যোগাযোগ রয়েছে অটুট। ওর চাকরি স্থায়ী হয়েছে এতদিনে। বিয়ে থা করে দুই সন্তানের পিতা। কিন্তু আজ অবধি ওর বধূটির মুখদর্শন আর হয়ে উঠেনি। মোবাইল ফোন এসে গেছে আওতায়। ছবি দেখেছি, কথাও বলেছি বহুবার। বন্ধুর সাথে বন্ধুপত্নীটিও হয়ে উঠেছেন কাছের মানুষ। ততদিনে আরোও একটি কাজও সেরে রেখেছি। উনকোটি সম্বন্ধে বহু তথ্য এবং ‘মিথ’ জেনেছি এতদিনে মোবাইল ফোন এবং গুগল-এর মাধ্যমে। 

পৌরাণিক মতে উনকোটি নামকরণের কাহিনিতে কথিত আছে যে কালু কামার নামে একজন স্থাপত্যকার ছিলেন, সেই সাথে দেবী পার্বতীর ভক্ত ছিলেন। একবার দেবী-মহাদেবের সাথে কৈলাসে যাচ্ছিলেন তখন কালু কামার বায়না ধরলেন তাকে যেন তাদের সঙ্গে নেন। তখন মহাদেব উনার উপর শর্ত আরোপ করে বলেন উনি যেতে পারেন তবে তার জন্য তাকে এক রাত্রির মধ্যে এককোটি দেবদেবীর মূর্তি তৈরী করে দিতে হবে। কিন্তু সমস্ত রাত্রি অমানুষিক পরিশ্রম করেও কালু কামার এককোটি থেকে মাত্র একটি কম মানে উনকোটিটি মূর্তি তৈরি করে দিতে সক্ষম হন।

উনকোটির মুর্তিগুলি নিয়েও একাধিক কাহিনি প্রচলিত আছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আরেকটি কাহিনি আছে, যার কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেন মহাদেব। দেবাদিদেব শিব একবার দেবতাদের নিয়ে ত্রিপুরার উপর দিয়ে বারাণসী যাচ্ছিলেন। মহাদেবকে নিয়ে দেবতাদের সংখ্যা ছিল এক কোটি। সন্ধ্যে নামার পর রাত্রিবাসের ব্যবস্থা হয় এই রঘুনন্দন পাহাড়ে। পথপরিশ্রমে ক্লান্ত দেবতারা গভীর নিদ্রায় অচেতন হলেন। পরেরদিন সূর্যোদয় হওয়ার আগে সবার বারাণসীর উদ্দেশে যাত্রা করার কথা, কিন্তু মহাদেব ছাড়া অন্য কোনো দেবতাদের নিদ্রাভঙ্গ হল না। মহাদেব বিরক্ত হয়ে একাই বারাণসীর উদ্দেশে রওনা দিলেন। গভীর নিদ্রায় সমাধিস্থ দেবতাদের কালনিদ্রা আর ভাঙলো না এবং তারা অনন্তকালের জন্য পাথর হয়ে রইলেন। যেহেতু সমাধিস্থ এই দেবতাদের সংখ্যা ছিল এক কম কোটি তাই উনকোটি। সেই থেকেই এই রঘুনন্দন পাহাড় হয়ে গেল শৈবতীর্থ উনকোটি।

পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা মূর্তিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জটাধারী শিব এবং ৩০ ফুট উঁচু কালভৈরবের মূর্তি। এছাড়া গণেশ, দুর্গা, বিষ্ণু, রাম, রাবণ, হনুমান এবং শিবের বাহন নন্দীর মূর্তি। উনকোটির একটি প্রধান দ্রষ্টব্য হল গণেশকুন্ড। কুন্ড সংলগ্ন পাথরের দেওয়ালে দক্ষ হাতে খোদাই করা আছে তিনটি গণেশ মূর্তি। এদের ডান পাশে রয়েছে চতুর্ভুজ বিষ্ণু মূর্তি। ঐতিহাসিকদের মতে, উনকোটির অভিনব ভাস্কর্য তৈরী হয়েছিল অষ্টম বা নবম শতাব্দীতে।

এতসব পুঙ্খানুপুঙ্খ জেনে আর তর সইছিল না দ্বিতীয় বারের মতো দর্শনের। তাই আর দেরি না করে প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম। টারগেট পরবর্তী অশোকাষ্টমী। আলাপ অনুযায়ী প্রস্তুত হয়ে রইল বন্ধুবর দেবাশিস। আবারো রথ দেখা আর কলা বেচার যৌথপ্রয়াস। অশোকাষ্টমীর স্নান আর বন্ধুপত্নী ও তাঁর সন্তানদের প্রথম বারের মতো দর্শন। 

আয়োজন অনুযায়ী এক অশোকাষ্টমীর দু’দিন আগেই এসে পৌঁছে গেলাম পানিসাগর। পথে সেই ছেড়ে যাওয়া জায়গাগুলো - করিমগঞ্জ, চুরাইবাড়ি, বাগপাশা। স্মৃতি এসে নাড়া নিয়ে যায় সঘনে। আতিথেয়তায় বন্ধু আর বন্ধুপত্নীর যেন এক অলিখিত (কিংবা লিখিতও হতে পারে) প্রতিযোগিতা। প্রথম দিনেই খাওয়া দাওয়ার বিশাল আয়োজনে উদরপুর্তির ব্যবস্থা। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই মেয়ের পেটের ব্যথা শুরু হলো। সারা দিনে ব্যাপারটা উদরাময়ের পর্যায়ে। ঔষধেও কাজ হচ্ছে না। চিন্তা ও উৎকণ্ঠায় সবাই বিমর্ষ। তীরে এসে তরীর এ কী হাল হলো ? কেউ কেউ বলছেন তীর্থ ভ্রমণে এমন বিপত্তি নাকি প্রায়শই ঘটে থাকে। এটাও শুনেছি আমি আগেই। কিন্তু বিশ্বাস করি না এসব। তাই মানসিক দিক থেকে অনেকটাই বিপর্যস্ত থাকলেও পরদিন শৈবতীর্থে যাওয়ার ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। দেবাশিস পরদিন গাড়ি ঠিক করে রেখেছিল কিন্তু অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গাড়ি বাতিল করে দেবার কথা পাড়তেই আমি বাধা দিলাম। আমার বিশ্বাসে খামতি থাকলেও ভরসায় তা নেই। 

পরদিন সকাল হতে হতে মেয়ে অনেকটাই কাটিয়ে উঠলো উপসর্গ। কিন্তু নেতিয়ে গেছে একেবারে। কী করে ওখানে গিয়ে পাড়ি দেবে বিষ্ণু মন্দিরের এতটা পথ ? যাই হোক। যথা সময়ে গাড়ি এলো এবং অনেকটা চিন্তা এবং তার  চাইতে বেশি ভরসা নিয়ে শুরু হলো যাত্রা। দীর্ঘদিনের পুষে রাখা ইচ্ছেপূরণের যাত্রা। সঙ্গে সব ধরণের ঔষধপত্র এবং  আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র নিয়ে সেই ধর্মনগর হয়েই চলছে গাড়ি। আবার পৌঁছে গেলাম উনকোটির সেই সিঁড়ির কাছে। সবাই নেমে এলাম গাড়ি থেকে। মেয়ে হাঁটতেই পারছে না। চিন্তিত হয়ে পড়ছি আমি। কোনওক্রমে ওকে ধরে ধরে নিচে ঝরনার পাশে নিয়ে এসে চোখেমুখে ছিটিয়ে দিলাম পুণ্যজলের ছিটা। জলের ছিটায় একটু যেন সতেজ হলো মেয়ে। ওদিকে অশোকাষ্টমীর মেলা ঘিরে পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য। এতদিনে সরকারি তৎপরতায় দূর হয়েছে উগ্রপন্থী সমস্যাও। তাই পাহাড় ও সমতল থেকে নেমে এসেছে মানুষের ঢল। 

যাই হোক এবার উপরে বিষ্ণুমন্দিরে কী করে উঠবো ভাবছি। হঠাৎ করে দেবাশিস - চল, বলে এক ঝটকায় কোলে উঠিয়ে নিল আমার দশ বছরের ‘শিশু’কন্যাটিকে। নিয়েই সোজা উঠতে থাকলো উপরে। বাবা হয়ে আমি হতভম্ব। পিছু পিছু ছুটছি। অনেকটা পথ উঠার পর হাত বাড়িয়ে নিলাম আমার কাছে। কোথা থেকে যে এত শক্তি এলো আমিই ভেবে পাচ্ছিলাম না। তরতর করে উঠতে উঠতে এক সময় ফুরালো পথ। আবার এলাম ইচ্ছেপূরণের স্থলে। তত সময়ে মেয়ের মাও উঠে এসেছেন উপরে। বেশ কিছু সময় সেই স্বর্গীয় প্রাকৃতিক পরিবেশে কাটিয়ে অবশেষে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসার পালা। এবার যেন মেয়েও ফিরে পেয়েছে হারানো শক্তি - অনেকটা। আমার মনে হচ্ছিল যেন ভগবান এতক্ষণে চিনে নিয়েছেন তাঁর বরকন্যাটিকে। নিজেই হাত ধরে ধরে নেমে এলো নিচে। এরপর এদিক ওদিক ছোটাছুটিতেও মেতে উঠলো এক সময়। আমি তো হতবাক। সবার মুখে ফুটে উঠেছে এক অনাবিল প্রশান্তির হাসি। প্রায় পুরো দিনটাই কাটিয়ে এবার শুরু হলো ফেরৎ যাত্রা। সন্ধে নাগাদ পানিসাগরে ফিরে এসে সামান্য খাওয়া দাওয়া সেরে এক ঘুম দিয়ে উঠেই মেয়ে যেন জেগে উঠলো পুনর্জন্ম পেয়ে। আগের মতোই উচ্ছল, প্রাণবন্ত। সেই মহিলাটি আবার বললেন - তীর্থযাত্রায় এরকমই হয়। কী ভেবে যেন মাথায় চলে গেল হাত। কার উদ্দেশে কী জানালাম তা জানে শুধু এই মন। 

এরপর আরোও একটি দিন সেখানে থেকে পানিসাগরের বিখ্যাত পঞ্চদেবতার মন্দির দেখে ইচ্ছেপূরণের যাত্রাশেষে ফিরে এলাম নিজের কর্মস্থলে। সাথে সারা জীবনের জন্য ঝুলি ভরে নিয়ে এলাম উনকোটি যাত্রার স্মৃতি। ভবিষ্যতে সুযোগ হলে আবারো যে ছুটেই যাবো সেখানে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। 


ছবি ও তথ্য সূত্র - আন্তর্জাল।

- - - - - - - - - - - - - -

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...