শরতের আগমনের সাথে সাথেই সবার হৃদয়ে
প্রতীক্ষার ‘ঢ্যাম কুড়কুড়’। কীসের প্রতীক্ষা ? বাঙালির চিরায়ত বার্ষিক উৎসবের। কিন্তু
এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন একটি নাম যা নিখাদ এক ভগবানেরই নাম। যে যতই ঢেকে
রাখার চেষ্টা করুন না কেন এই গূঢ় সত্যটিকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। দুর্গা
এবং পূজা শব্দদ্বয় একশো ভাগ হিন্দু ধর্মের সত্যোচ্চারণ। এড়িয়ে যাওয়ার জো নেই -
যদিও বিভিন্ন ভাবে সেই অপচেষ্টাটি করে থাকেন অনেকেই। ফি বছর পুজো এলেই ঢাক ঢোল পিটিয়ে প্রচার হয় - ‘আমার দুর্গা, তোমার
দুর্গার থোড় বড়ি খাড়া। মহান সাজার এই মোক্ষম সুযোগটুকু কেউই ছাড়তে রাজি নন। হঠাৎ
করে মনে পড়ে যায় রাস্তার পাশের আবর্জনা কুড়োনো সেই নারীদের কথা যারা তখন এক এক জন
দুর্গা মা। এরা হলেন ‘আমার দুর্গা’ আর দেবী ভগবতী হলেন ‘তোমার দুর্গা’। এখন বোঝ যে
কত অবুঝ, অশিক্ষিতের দল তোমরা। আমরা ধর্ম মানি না। মানলে অসুবিধে আছে। সমাজে একটা
বিশেষ স্থান অধিকার করে রাখা সমস্যা হয়ে যাবে। সুতরাং পূজা এবং দুর্গা শব্দদু’টি আমার
কলমে অনুল্লেখিত রাখতে আমি বাধ্য। এবং সেই কারণে শারদীয় এই হুজুগ আমার কাছে পূজা নয়, নিছক এক উৎসব মাত্র।‘
বাস্তব কিন্তু অন্য কথা বলে।
উৎসবের নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃত সত্যটি। দুর্গোৎসব অর্থে দুর্গা উপলক্ষে
কিংবা দুর্গাকে নিয়ে উৎসব। অর্থাৎ আগে দুর্গা, পরে উৎসব। এবং এটাই জলের মত
পরিষ্কার। প্রথমে পূজা এবং পরে উৎসব। পূজা উপলক্ষেই উৎসব। পূজা না থাকলে এই উৎসবটি
হতো না।
স্বভাবতই এই উৎসবের সময় সমাগত
হলেই আপামর হিন্দু বাঙালির মননে বেজে ওঠে শারদীয় সুর। এবং সবার আগে চোখের সামনে
স্পষ্ট ভেসে ওঠে মা দূর্গার প্রতিমা। এখানেও আক্রমণ কম নয়। সম্প্রতি আবিষ্কৃত
হয়েছে - ‘প্রতিমা’তে আর এখন নাকি দুর্গা নেই। দুর্গা আছেন ‘প্রতি মা’তে। অক্ষরের
জাগলারি দেখিয়ে নিজেকে জাহিরও করা হলো আর কিছু স্তাবকও তৈরি হলো। যত কারসাজি শুধু
এই একটিমাত্র ধর্ম নিয়েই। অথচ অন্য কোনও ধর্ম নিয়ে এমন বিরোধিতা, এমন শ্লেষ,
বিদ্রুপ দেখা যায় না। স্বধর্মীদেরও না, বিধর্মীদেরও না। সেই সাহসটুকু সঞ্চয় করে
ওঠা কারোও পক্ষেই সম্ভব নয়। সুতরাং নরম মাটিতেই নিরাপদে চাষবাস করা ভালো। এবং এতে
করে নিজের আখেরটা যদি গুছিয়ে নিতে পারা যায় তাহলে মন্দ কী ? তো কথা হচ্ছে ‘প্রতি
মা’তে তো দুর্গা অবশ্যই আছেন কিন্তু ‘প্রতিমা’তে নেই কেন ? হিন্দু ধর্মে
মূর্তিপূজার বিধান আছে এবং এই শারদীয় উৎসবের এক অঙ্গ হিসেবে মূর্তির এক বিশেষ
স্থান আছে। বস্তুতঃ মূর্তিকে
ঘিরেই যাবতীয় আয়োজন। আপামর ধর্মপ্রাণা মানুষ মণ্ডপে মণ্ডপে গিয়ে
মূর্তিকেই প্রণাম করেন। উপস্থিত মায়েদের নয়। মূর্তির মধ্যে ভগবানের অস্তিত্বকে
উপলব্ধি করেন সবাই। একেই বলে ভক্তি, একেই বলে বিশ্বাস। ভক্তি এবং বিশ্বাস শুধু
ভগবানের প্রতিই যে গড়ে ওঠে তা নয়। জনগণ মন অধিনায়ক, আরাধ্য গুরু - তা যে কোনও
ক্ষেত্রেরই হোন না কেন, দেশনায়ক সবার প্রতিই ভালোবাসার হাত ধরে সৃষ্টি হতেই পারে
বিশ্বাস এবং ভক্তি। এবার এই ভক্তির ধারকদের আবার ‘ভক্ত’ বলেও হেয় প্রতিপন্ন করার
অপচেষ্টা শুরু হয়েছে। যেন ‘ভক্ত’ শব্দটি বড়ই অবমাননাকর। অথচ এই ভক্তদের জন্যই
কিন্তু বাঙালি জনমানসে এত বড় একটি উৎসব। যুগে যুগে এমন কত কত নিঃস্বার্থ ভক্তদের
পরিচয় আমরা পেয়ে থাকি। তা বলে এদের কিন্তু অন্ধ ভক্ত বলে পরিচয় দেওয়া হয় না। এখন
নাম ফাটানোর তাগিদে কত কিছুই হয়। তবে ভক্তই যদি হতে হয় তাহলে অন্ধভক্তির প্রয়োজন
আছে বটে। নিজের মনের আকাঙ্ক্ষার পূরণ না হলেই আগুপিছু না ভেবে যদি ভক্তিতে চিড় ধরে
তবে বলতে হবে তিনি আসলেই ভক্ত নন। তাই ভক্ত এবং অন্ধ ভক্ত উভয়েই নমস্য এবং
প্রাতঃস্মরণীয়।
ধর্ম না মানার এই হুজুগে
বিড়ম্বনাও কিছু কম নয়। জীবনটা তো সুনামে দুর্নামে কেটে যায় কিছু একটা করে কিন্তু
আসল সমস্যার সৃষ্টি হয় মৃত্যুর পর। তবে এক্ষেত্রে বিড়ম্বনাটি কিন্তু সংশ্লিষ্ট
ব্যক্তিটির নয়, তিনি তো অক্কা পেলেন। চলে গেলেন পার্থিব ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু
সমস্যায় নিমিজ্জিত হলেন পরিবার ও সমাজের ব্যক্তিরা। প্রথম সমস্যা হলো তাঁর
মৃতদেহটি নিয়ে। তাঁর অন্তিম সংস্কারটি হবে কী করে। মৃতদেহটি কি পোড়ানো হবে ? না
কবর দেওয়া হবে ? তর্কের খাতিরে, এবং শুধু তর্কের খাতিরেই নয়, ব্যক্তিটি অবধারিত
ভাবে হিন্দু বংশেই জাত বলে ধরে নেওয়া যায়, কারণ অহিন্দুদের মধ্যে এসব ন্যাকামি
প্রায় নেই বললেই চলে। এবার তাঁর মৃতদেহটি যদি কবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাহলে
সমাজ কেন তা মানবে ? আর যদি পোড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তবে তো তাঁর আজীবন লালিত
সংস্কার প্রথম পর্বেই ধুলিস্যাত। এরপর শ্রাদ্ধাদি সংস্কারেও অগণিত সমস্যা। সমাজ ও
পরিবারের এই এতসব সমস্যার মূলে কিন্তু এই মৃত উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিটিই দায়ী।
যাক সেসব কথা। যা নিয়ে লিখা, সেই
দুর্গা পূজার কথাতেই ফিরে আসা যাক। এবার দেখা গেল পুজো এলেই সবার মানস চক্ষে ভাসছে
দেবী দুর্গার মূর্তিটি। অগণিত ভক্তরা মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী মূর্তির দর্শন করে হাত
কপালে প্রণাম করছেন, কেউ আবার আভূমি প্রাণিপাতে কাঙ্ক্ষিত বর প্রার্থনা করছেন। কার
প্রার্থনা কতটুকু পূরণ হচ্ছে তা সময়েই বলবে কিন্তু পূরণ না হলেও ফি বছরে একই ধারা
চলছে নিরন্তর। ইংরেজিতে একটি খুব সুন্দর কথা আছে - You can fool all people for some time, you can
fool some person for all time but you can’t fool all person for all time. অর্থাৎ অনেক লোককে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানানো যায়, কিছু লোককে অনেক সময়ের জন্য বোকা বানানো যায় কিন্তু অনেক লোককে অনেক সময়ের
জন্য বোকা বানানো যায় না। তখনই এই প্রশ্ন জাগে মনে - কীসের জন্য অনন্ত কাল ধরে এই অনন্ত
ভক্তির ধারা বয়ে চলে অধিকাংশ লোকের অন্তরে ? এর একটি যুতসই জবাব
হলো - “বিশ্বাসে মেলায় কৃষ্ণ, তর্কে বহু
দূর”। সুতরাং তর্ক নয়, ন্যাকামো নয়,
বোকা বানানোর কারসাজি নয়, অনন্ত বিশ্বাসই হলো আত্মিক
প্রশান্তির মূলমন্ত্র।
অনেকেই আবার ঈশ্বর, ভগবান, গড এবং আল্লার অস্তিত্ব নিয়ে সন্দিহান। প্রথমোক্তদের তো এক কথায় নাকচও করে
দেওয়া হয় অবলীলায়। যারা এসব উল্টোকথার কারবারি
তাদের অধিকাংশই হলেন উচ্চ শিক্ষিত। দেশ এবং বিশ্ব জুড়ে আগে বলা মতো নরম মাটিতে ভালোই চাষাবাদ
করে খেয়ে পরে তারা বেঁচেছিলেন। এবার যখনই মাটি একটু শক্ত হলো অমনি গেল গেল রব।
আদাজল খেয়ে উঠে পড়ে লাগলেন সবাই। ধর্মে ধর্মে হানাহানির উদ্ধৃতিতে ভরে উঠলো বিশ্ব
চরাচর। এতদিন হানাহানি ছিল না। ছিল একতরফা অত্যাচার ও আক্রমণ। এদেরই পূর্বপুরূষ এই
অত্যাচারের বলি হয়ে দেশান্তরী হতে বাধ্য হলেন অথচ এরাই এখন শেকড়চ্যুত ভিটের দাওয়ায়
বসে কপাল চাপড়ে কাঁদেন আর নতুন সুখের ঠিকানায় এসে ভুল ধর্মনিরপেক্ষতার শ্লোগানে
পথে নামেন। কী বিচিত্র মানসিকতা এদের। ঈশ্বর ভগবানকে পথে নামিয়ে কী পৈশাচিক উল্লাস
এদের। কথায় কথায় এরা কবিগুরুকে উদ্ধৃতি দিতে ভুল করেন না। অথচ কবিগুরু ছিলেন
প্রকৃত ধর্ম নিরপেক্ষ। সব ধর্মের প্রতি ছিল তাঁর সমান মনোভাব। এটাই
ধর্মনিরপেক্ষতার মূল মন্ত্র। নরম মাটিতে চাষ করেননি কখনো। অন্য ধর্মের বিজয়গাথা
লিখে নিজ বা কোনও ধর্মেরই বিরোধিতা করেননি কখনো। তাঁর লিখা বিখ্যাত দু’টি পংক্তি
এখানে তুলে ধরা যায় প্রসঙ্গতঃ -
পথ ভাবে ‘আমি দেব’, রথ ভাবে ‘আমি’
মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসে
অন্তর্যামী।
আঁতেলবৃন্দ এখানে খুব উচ্ছসিত
ভাবে পথ, রথ এবং মূর্তিকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চায় কিন্তু বাকি শব্দ দু’টি ‘দেব’
এবং ‘অন্তর্যামী’কে দেখতে পায় না কিংবা দেখতে চায় না। এই দু’টি শব্দেই কিন্তু
আলোচ্য নিবন্ধের সারসত্যটি লুকিয়ে আছে। এই দেব দেবী, এই অন্তর্যামীরই আরাধনায়
আশ্বিনের শারদ প্রভাতে বেব্জে ওঠে আগমনি সুর। পূজার ফুলে, উপচারে, অন্তরের
পবিত্রতায়, ভক্তিতে, বিশ্বাসে, আকুলতায় জমে ওঠে দুর্গোৎসব। মণ্ডপে মণ্ডপে অঞ্জলি
মন্ত্রে অনুরণিত হয় বিশ্বমানবের মাঙ্গলিক স্তব।
পূজা আর উৎসব তাই হয়ে ওঠে একাকার।
যে উৎসবে সবার যোগদান অবাধ। ভাষা ধর্মের মাপকাঠিতে কাউকে ব্রাত্য করে রাখার চল নেই
এই উৎসবে। কারোও উপর চাপিয়েও দেওয়া হয় না কোনও ফতোয়া, ফরমান কিংবা ধর্মান্তকরণের
অপচেষ্টা। তাই তো নাক উঁচুরা বলেন - মা
তুঝে সালাম কিংবা স্যালুট মা। ‘মা
তোমায় নমস্কার’
বলতে দ্বিধা এদের। পাছে তকমাচ্যুত হয়ে যান।
পূজার ছলে তাই দেবী ভগবতীর কাছে
প্রার্থনা করি - মা এদের একটু সুবুদ্ধি দাও। একটু আধ্যাত্মিক চেতনার মাধ্যমে বিশ্বের,
দেশ ও দশের মঙ্গলে যেন মতি ফেরে এদের। ঘরে বাইরে অশুভ শক্তির থেকে বিশ্ববাসীকে
মুক্ত রেখো মা। ফি বছরে নিঃশঙ্ক চিত্তে যেন সবাই মেতে উঠতে পারে তোমার মহোৎসবে।
তোমায় করযোড়ে জানাই ভক্তিপূর্ণ প্রণাম।
মা তোমায় নমস্কার।
- - - - - - - - - - -
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
Comments
Post a Comment