Skip to main content

সৃষ্টিবিন্দু থেকে বলছি, অপর্ণা দেব


সৃষ্টিবিন্দু থেকে উঠে আসা অণুগল্পের সংকলন


গল্পের অবয়ব পাঠকের কাছে অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ। পরমাণু (এক লাইনের) থেকে বড় গল্প (অন্তত ১০ পৃষ্ঠার) - পাঠকের পড়ার ধরণটাই আলাদা। ভালো লাগা না লাগার ব্যাপারটি তো রয়েছেই। লেখিকার চাইতেও সমাজসেবার মাধ্যমে যিনি বেশি পরিচিত তাঁর লেখার হাতটিও যে দুর্বল নয় মোটেই তার প্রমাণ এর আগেও পাওয়া গেছে। এই ধারায় সর্বশেষ সংযোজন অপর্ণা দেব এর অণুগল্প সংকলন ‘সৃষ্টিবিন্দু থেকে বলছি’।

৬৮ পৃষ্ঠার এই সংকলনে আছে মোট ৩৩টি অণুগল্প। এবং আশ্চর্যজনক ভাবে প্রতিটি গল্পই দুই পৃষ্ঠার। একেবারে যথার্থই অণুগল্প। দুই পৃষ্ঠার কথাকল্পেই মনের কথাটি সাজিয়ে তুলেছেন নিজের মতো করে। অপর্ণা দেব-এর লিখার ধরণ বরাবরই একটু অন্য ধারার। এখানেও সেই ধারাটি বজায় থেকেছে পুরোপুরি। অধিকাংশ গল্পই আবর্তিত হয়েছে বরিষ্ঠ নাগরিকদের জীবন ধারার মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণে - যে কাজটি তিনি করে আসছেন দীর্ঘ দিন ধরে - সযতনে, নিষ্ঠায়।

কবি লেখকদের কাজই হলো জীবনবোধের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভবগুলিকে সামনে এনে ধরা এবং সেই কাজটিই এক গুচ্ছ অণুগল্পের ছোঁয়ায় অত্যন্ত সুচারু রূপে সেরেছেন গল্পকার। সচরাচর ধারণার বাইরে, দৃষ্টি অগোচরে থাকা কিছু কথা, রহস্যময় জীবনের কিছু টুকরো টুকরো স্মৃতি, সংলাপকে পাখির চোখ করে গল্পের অবয়বে এঁকেছেন জীবনেরই জলছবি। অণুগল্পের নামে পাঠক মনে ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে ছেড়ে দেননি গল্পকার। প্রতিটি গল্পের শেষ পর্যন্ত নিজেই সামলে রেখেছেন গল্পের রাশ।

এক এক করে প্রতিটি গল্পের আলোচনা করার কোন অবকাশ রাখেননি গল্পকার। কারণ গ্রন্থের শেষে প্রতিটি গল্পের উৎসমুখের বর্ণনা নিজেই করেছেন লিপিবদ্ধ। এবং সেয় উৎসমুখেই রয়ে গেছে তাঁর ভাবনারও বহিঃপ্রকাশ - হয়তো তাঁর নিজেরও অজান্তে।

আছে তিনটি সিরিজও। লক ডাউন, আনলক এবং যাপন কথা। এ ছাড়া সিরিজায়িত না হয়েও এ রাজ্যের সাপ্রতিক বিভীষিকা এনআরসির ভাগ্যবিড়ম্বনা জড়িত বিষয়ের উপর আছে বেশ ক’টি গল্প। লক ডাউন সিরিজে আছে দু’টি গল্প, আনলকে চারটি এবং যাপন কথায় দশটি। এই যাপন কথা সিরিজটি এক কথায় এক অনবদ্য ভাবনার ফসল। প্রতিটি গল্পে একই চরিত্র। সেই নমিতার মনোজীবনের নানা পর্যায়ে উদ্ভুত সমস্যা ও কষ্টের কথাগুলি সাজিয়ে রাখা আছে সব ক’টি গল্পে। মনের ভেতর থরে থরে জমা হয়ে থাকা ব্যথার সশব্দ প্রকাশ। এই গল্পগুলি একত্রিত করে এক সুতোয় গাঁথতে পারলে নির্দ্বিধায় এক অসাধারণ বড় গল্প হয়ে যেতেই পারে।

‘কদমগাছ’, ‘যঞ্জাহুতি’, ‘জীবন কথন’, ‘নতুন জীবন ও অপন’, ‘কিরণময়ী’ ইত্যাদি গল্পের কথা আলাদা করে উল্লেখ না করলেই নয়। আছে সমাজের অন্দরমহলে আজও লুকিয়ে থাকা কিছু অন্ধ সংস্কারের কথাও। চোখে আঙুল দিয়ে যেন দেখিয়ে দিয়েছেন সেইসব আপাত অদেখা মুহূর্তগুলো - তাঁর ‘অবাক পৃথিবী’, ‘যাপন কথা - দুই’, ‘যাপন কথা - ছয়’ ‘যাপন কথা - সাত’ ‘যাপন কথা - নয়’ ‘যাপন কথা - দশ’ ইত্যাদি গল্পে।

এই সংকলটি পড়ে তাই এমনটা মনে হতেই পারে যে লেখিকা অপর্ণা এবং সমাজসেবী অপর্ণা যেন মিলেমিশে এখানে হয়ে গেছেন একাকার। এবং সেটাই স্বাভাবিক। তবে একটি কথা না বললেই নয়। লেখিকা অপর্ণা দেব কিন্তু ভাষা ও বানানের ক্ষেত্রে বরাবরই সজাগএখানেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি বলেই বোধ হয় পাঠক মনে একের পর এক গল্পের রসাস্বাদনের স্পৃহা জন্মায় স্বাভাবিক ছন্দে। আর এখানেই এই সংকলনের যথার্থতা।

অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এক প্রচ্ছদ এঁকেছেন রাজদীপ পুরী। প্রকাশক সৃষ্টিবিন্দু প্রকাশনা, করিমগঞ্জ। লেখিকা গ্রন্থটিকে উৎসর্গ করেছেন তাঁর জীবনের রূপকার তাঁর মা’কে।

গল্প পড়া শুরু করার আগে প্রখ্যাত গল্পকার রণবীর পুরকায়স্থের ‘নান্দীমুখ’টি যেন গল্প পড়ার খেইটি ধরিয়ে দিয়েছে মাধুর্যময় বয়ানে
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
 
‘সৃষ্টিবিন্দু থেকে বলছি’
অপর্ণা দেব
মূল্য - ১০০ টাকা।
যোগাযোগ - ৯৪৩৫৫৯৬৭২০

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...