Skip to main content

ছোটোদের নানান রকম - সজল পাল , ম্যাথম্যাজিক - সায়ন্তন পাল



পিতা পুত্রের অভিনব গদ্য সংকলন 


এ অঞ্চলের খ্যাতিমান কবি, গল্পকার তথা শিশু সাহিত্যিক সজল পাল ও তাঁর সুযোগ্য পুত্র সায়ন্তন পালের একাধিক রচনা নিয়ে এক মলাটে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলো ‘ছোটদের নানান রকম ও ম্যাথম্যাজিক’ গ্রন্থটি। অভিনব বলা চলে নিশ্চিত। কিন্তু শিশু, কিশোরদের জন্য এই গ্রন্থটিকে একটি অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ বলাটি অধিক যুক্তিসঙ্গত হবে নিঃসন্দেহে।
শিশু মনস্তত্ত্বের গভীরে বিচরণ করে সাহিত্যের রসে তাকে ফুটিয়ে তোলার কাজটি সজল পাল মহাশয় ইতিপূর্বেও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেরে রেখেছেন। এবারেও তাঁর ব্যতিক্রম হয়নি। মোট ১১৯ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে সজল পাল মহাশয়ের রচনা আছে ৮৩ পৃষ্ঠা অবধি। এই রচনাসমূহকে তিনি তিনটি পর্বে ভাগ করে নিয়েছেন। প্রথম পর্ব জানবার নানা কথা। এই পর্বে রয়েছে মোট ১৫টি প্রাণী নিয়ে, তাদের বিশিষ্টতা নিয়ে শিশুদের জন্য এক তথ্যভিত্তিক মার্গদর্শন। বহু অজানা তথ্য এবং সেই তথ্যেরও বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিশুমনে জাগিয়ে তোলার মতো অনুসন্ধিৎসা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন এই রচনাকার। আছে ছবি সহ শিম্পাঞ্জি থেকে পিঁপড়ে অবধি বিভিন্ন রকম পশু পাখির বিচিত্র সব কাণ্ডকারখানার হদিশ।
দ্বিতীয় পর্ব - আমাদের পৃথিবী। মেঘ বৃষ্টি চাঁদ তারা নিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বিচিত্র সব কাণ্ডের সাথে সন্নিবিষ্ট হয়েছে নানা ধরণের প্রাণীদের বিষয়েও আরো একটু বিশদ ব্যাখ্যা। আপাতঃ দৃষ্টিতে আমাদের চোখের সামনে ঘটতে থাকা স্বাভাবিক ঘটনারাজির অন্দরে যে লুকিয়ে আছে কত অজানা তথ্যবহুল ঘটনারাজি তারই এক নিটোল সরস প্রতিবেদন। সহজ সরল ভাষায় প্রাঞ্জল করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে সবটুকু। নিজে একজন সাহিত্যিক হওয়ার সুবাদে এই কাজটি চমৎকার নৈপুণ্যে সেরে রেখেছেন শ্রী পাল। শিশু মনে পঠনসঞ্জাত তৃপ্তির উদ্রেক নিশ্চিত। এই পর্বে আছে ‘পৃথিবীর তিন ভাগ জলের গল্প’। এখানে আছে নদীর অন্তত পাঁচকাহন। তার মধ্যে নদ ও নদীর ব্যবধানটি অন্তত এক লাইনে সন্নিবিষ্ট করলে ভাল হোত বোধ করি। এই অধ্যায়ে সাগর মহাসাগরের উল্লেখ এবং সম্যক তথ্য থাকলেও উপসাগরের ব্যাখ্যা নেই। যদিও একথাটি বলে রেখেছেন রচনাকার - জানবার কোনো শেষ নেই। এই পর্বে ছায়াপথ এবং হামিং বার্ড নিয়ে দু’টি রচনা বিশেষোল্লেখের দাবি রাখে বৈকি। রিম্পি ও তার বাবার কথোপকথনের মাধ্যমে শিশুদের সাথে সাথে বড়দেরও যেন করিয়ে এনেছেন বিশ্বপরিক্রমা। এবং সবচাইতে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে যে প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে শিশুদের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পরিবেশ রক্ষার এক অমোঘ আবেদন। এখানেই গ্রন্থটি এক বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।
তৃতীয় পর্ব জীবজগতের টুকিটাকি। এই পর্বে সংক্ষেপে আমাদের এই জীব জগতের অফুরন্ত প্রাণীদের বিষয়ে রকমারি তথ্যের উল্লেখ রয়েছে। বিচিত্র সব তথ্য যা সাধারণতঃ অজানাই থেকে যায় আমাদের মনে। সেইসব তথ্যের বিষয়ে জেনে নিশ্চিত উপকৃত হবে শিশুরা। প্রাণীদের পুরো জগতটাকেই যেন হাজির করে দিয়েছেন আমাদের জানার এক্তিয়ারে।
এরপর গ্রন্থের বাকিটুকু হচ্ছে সায়ন্তন পালের ‘ম্যাথম্যাজিক’। অংকের একগাদা মজার খেলা গল্পচ্ছলে উপস্থাপন করেছেন তিনি। ৩২ পৃষ্ঠা জুড়ে এমন মোট ১২টি মজাদার অংক অংক খেলা। সপ্তর্ষি আঙ্কেল চরিত্রটি বাচ্চাদের কাছে এক প্রিয় চরিত্র হয়ে উঠেছে শুধুমাত্র অংকের ধাঁধাঁলো খেলার জন্য। লিখার ধরণটিও এখানে বিশেষ উল্লেখের দাবিদার। কোথাও যেন পিতার বয়ানশৈলীর পরিচয় ফুটে ওঠে রচনার মধ্যে। কে জানে সায়ন্তন পালও যে একদিন যোগ্য পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে একজন সফল গল্পকার হয়ে উঠবেন না ?
বিকাশ প্রকাশন, গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থটির প্রচ্ছদ পরিকল্পনা সজল পাল। গ্রন্থটিকে উৎসর্গ করা হয়েছে ‘যারা জানতে আগ্রহী সেই সব কচিকাঁচাদের উদ্দেশ্যে’। প্রথমেই বইটির চমৎকার একটি ভূমিকা লিখেছেন বিশিষ্ট গল্পকার কুমার অজিত দত্ত। লেখাগুলোর উৎপত্তি নিয়ে আছে লেখকদের ‘আমাদের কিছু কথা’ও। ছাপাই, বাঁধাই স্পষ্ট এবং স্বচ্ছ। বানান ভুল প্রায় নেই বললেই চলে। সেই হিসেবে একটি পরিচ্ছন্ন নিটোল পঠনোপযোগী গ্রন্থ।
পরিশেষে একটাই কথা বলার আছে। এই গ্রন্থটি আমাদের এই অঞ্চলের শিশু মনস্তত্ত্বের উপর এক উপযোগী প্রভাব ফেলতে সক্ষম বলেই মনে হয়। তাই এই গ্রন্থটিকে বিশেষ মর্যাদা প্রদানের মাধ্যমে সরকারি আর্কাইভে স্থান দেওয়া জরুরী। এবং অবশ্যই শিশু পাঠক্রমেও অন্তর্ভুক্তির যোগ্যতা রাখে এই গ্রন্থটি।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
 
‘ছোটদের নানান রকম’, সজল পাল
‘ম্যাথম্যাজিক’, সায়ন্তন পাল
মূল্য - ১৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৮৭৬৮৩৬১৮৩
      

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...