Skip to main content

তৃতীয় ভুবনের সাহিত্য


তৃতীয় ভুবনের সাহিত্য


সম্প্রতি বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ থেকে প্রকাশিত হয়েছে নারায়ণ মোদক সম্পাদিততৃতীয় ভুবনের সাহিত্য’, ৬ষ্ঠ সংখ্যা ২০২১ঢাউস ২৮৭ পৃষ্ঠার সংকলন। সংকলক, সম্পাদকের নিরলস প্রচেষ্টার ফসল এক এক করে এই ষষ্ঠ সংখ্যা। সম্পাদকের সহযোগী হিসেবে থেকেছেন গৌতম চৌধুরী এবং শিখা দাশগুপ্ত। সন্নিবিষ্ট হয়েছে মোট ৫৪ জন কবি সাহিত্যিকের রচনাকারো এক গুচ্ছ কবিতা কিংবা শুধুই গদ্য, আবার কারো গদ্য পদ্যের সংমিশ্রণমূলতঃ পত্রিকাধর্মী হলেও এটিকে কোনো অবস্থাতেই ছোট পত্রিকার পর্যায়ে ফেলা যাবে না। তাই একটি সংকলন গ্রন্থ হিসেবে ধরে নিয়েই এই আলোচনা।

শুধু কবিতায় হাজির হয়েছেন হর্ষবর্ধন চট্টোপাধ্যায়, শিখা দাশগুপ্ত, সুদীপ ভট্টাচার্য, পিনাক মাজি, মমতা চক্রবর্তী, বনশ্রী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, অরুণ চট্টোপাধ্যায়, শিপ্রা দাস, সঞ্জিতা দাস (লস্কর), অনুপ বণিক, রঞ্জিতা চক্রবর্তী, দীপক হোম চৌধুরী, প্রতিমা পাল (ভট্টাচার্য), মাধুরী পাল, সুশান্ত ভট্টাচার্য, শতদল আচার্য, সুবল চক্রবর্তী, সুব্রত দেববর্মা, অভিষেক সেন, বিপ্লব গোস্বামী, পূরবী নাথ, শ্রাবণী সরকার, কৃষ্ণা রাণী চন্দ, শুক্লা মিশ্র, মৌসুমী চক্রবর্তী, সত্যব্রত চৌধুরী, প্রতিমা শুক্লবৈদ্য, শঙ্করী প্রভা আচার্য, শুক্লা চন্দ, আশুতোষ দাস, ধ্রুবজ্যোতি দাস, শাশ্বতী ভট্টাচার্য, সঞ্জীব এবং মনোমোহন রায়গদ্যে কলম ধরেছেন মন্টু দাস, ডঃ গীতা সাহা, জ্যোতির্ময় রায়, শঙ্করী চক্রবর্তী, কস্তুরী হোম চৌধুরী, অনামিকা শর্মা, বিশ্বজিৎ নাথ, অনিন্দিতা চক্রবর্তী, সন্তোষ দত্ত, রতন চন্দ, গৌতম চৌধুরী, শিপ্রা শর্মা, নারায়ণ মোদক এবং বিনোদলাল চক্রবর্তীগদ্য-পদ্যের মিশ্রণে লিখেছেন ঋতা চন্দ, শর্বরী পাল, শিবানী গুপ্ত, পূর্ণিমা রাণী দে এবং জয়ন্তী নাথ

লেখক তালিকায় চোখ বুলালেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে তৃতীয় ভুবনের সাহিত্যের নামে মূলতঃ বরাকের লেখক কবিরই পয়োভারত্রিপুরা, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা প্রায় বাইরেঅন্যান্য রাজ্য বস্তুতঃ অধরাএকটি আঞ্চলিক সাহিত্যের সংকলনের ক্ষেত্রে তা মোটেও কাম্য নয়উপযুক্ত অনুপাত রক্ষা করাটা খুবই আবশ্যকএছাড়াও দেখা গেছে যে এ অঞ্চলের নামি দামি কবি লেখকদের অধিকাংশই এই সংকলনে অনুপস্থিতহাতে গোণা কয়েক জনের বাইরে পুরোপুরি আড়ালে আছেন প্রতিষ্ঠিত কবি সাহিত্যিকবৃন্দ

কবিতা অনেকটাই উতরে গেছে শুধু কবিতার বৈচিত্রের জন্য এবং কবিতার ধরাবাঁধা নিয়মের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলেতবে কিছু প্রতিষ্ঠিত কবির কিছু উন্নত মানের কবিতাও ঠাঁই পেয়েছে নিশ্চিত। কিন্তু গদ্যের ক্ষেত্রে এই কথাটি খাটছে নাকিছুটা ব্যতিক্রম জ্যোতির্ময় রায়ের প্রবন্ধপ্রসঙ্গঃ তৃতীয় ভুবনের সাহিত্যযথেষ্ট সমৃদ্ধ হলেও এখানেও তথ্যের আরোও খানিক বিস্তৃতির দরকার ছিল বৈকিআসলে এ ধরণের প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে কিছু নাম অনুল্লেখিত থেকে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়এবং এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছেবর্তমানের সাহিত্য জগতে উজ্জ্বল অনেক নক্ষত্রের নামই বাদ পড়েছেএখানেও লেখক আপাত দৃষ্টিতে বরাক ও ত্রিপুরার বাইরে বেরোননিমন্টু দাসের প্রবন্ধমহামহোপাধ্যায় পদ্মনাথ ভট্টাচার্য বিদ্যাবিনোদ জীবন ও সৃষ্টিতথ্যবহুল একটি ভালো প্রবন্ধবিদ্যাবিনোদের জীবনের বহু তথ্য তিনি তুলে ধরেছেনকিন্তু এই ব্যক্তিই যে বর্তমানের বিশাল এক সংগঠনঅসম সাহিত্য সভার মূল প্রস্তাবক সেই তথ্যটি অনুল্লেখিতসন্তোষ কুমার দত্তের প্রবন্ধবাঙালি ও বঙ্গদেশ টুকরো কথাএকটি ভালো রচনাঅথচ তার প্রথম শব্দটিতেই (সংখ্যা) ভুলপাঠককে ধন্দে ফেলে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্টউপরোক্ত দুটি প্রবন্ধের শিরোনামেওড্যাশঅনুপস্থিতগৌতম চৌধুরীর প্রবন্ধকোভিড-১৯ এবং তার উত্তরপর্বএকটি সময়োপযোগী এবং সুলেখিত, শুদ্ধ বানানসমৃদ্ধ প্রবন্ধ

আসা যাক ছোটগল্পের আলোচনায় দুএকটি ছাড়া সব কটি গল্পের বাঁধনই খুব দুর্বলগল্প লিখার সাম্প্রতিক ধাঁচ প্রায় সবখানেই অনুপস্থিত ভাষার যথেচ্ছাচার প্রয়োগ এবং ধারাবাহিকতার অভাব অত্যন্ত প্রকটকোথাও খেই যায় হারিয়ে তো কোথাও অপরিপক্কতার ছায়াব্যতিক্রম হিসেবে ধরা যায় পূর্ণিমা রাণি দেপৌষ পার্বণ’, অনামিকা শর্মারধনেখালি’, রতন চন্দ-এরফিরে দেখাসংকলক নারায়ণ মোদক তাঁরঅধিকারগল্পে বর্তমান সময়ের নিম্নগামী সামাজিক মানসিকতাকে সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেনকিন্তু এখানেও ছাপার ভুল রয়েছে একাধিকশিপ্রা শর্মা (মহন্ত)-এর দুটি গল্প উতরে গেছে যদিও শেষ গল্পসান্ধ্য অভিযান’-এ শেষ লাইনটি না থাকলে প্রকৃত ছোটগল্পের সমাপ্তিরেখা যথার্থ হতো।  

বস্তুতঃ গোটা গ্রন্থ জুড়েই বানান ভুলের ছড়াছড়িপ্রুফ রিডিং-এর ব্যর্থতায় অজস্র বানান/ছাপার ভুল - সূচিপত্র থেকেই যার শুরুএকটি সংকলন প্রকাশের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটিতে এবং অতি অবশ্যই মানগত ক্ষেত্রে মনোযোগী হওয়া একান্তই আবশ্যককারণ, বহির্ভুবনে এ জাতীয় সংকলন গোটা অঞ্চলের প্রতিভূএবং বহির্ভুবনের চোখে এ জাতীয় সংকলন একটি দর্পণের কাজ করে থাকে যার মাধ্যমে এই ভুবনের সাহিত্যের মান সম্পর্কে একটি ধারণা জন্মায়

এত বিশাল একটি সম্ভারের প্রতিটি রচনার আলোচনা আলাদা ভাবে করা পরিসরের অভাবে সম্ভব নয়কিন্তু একজন সংকলকের যে অপরিসীম অধ্যবসায় তার চিহ্ন অনুভব করা যায় নিঃসন্দেহেপরবর্তীতে এই ভুবনের প্রতিষ্ঠিত কবি সাহিত্যিকদের আনুপাতিক প্রতিস্থাপন হলে নিশ্চিতই এ প্রয়াস বহুলাংশে সার্থক হয়ে উঠবে

প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদের ছবি - সৌজন্যে সুদীপ ভট্টাচার্যপ্রকাশক রবিবারের সাহিত্য আড্ডা, করিমগঞ্জ, আসামছাপাই স্পষ্টসহজ কথায় লিখা অত্যন্ত সুচারু একটি সম্পাদকীয় নিঃসন্দেহে ঋদ্ধ করেছে সংখ্যাটিকেকিন্তু এখানেও আঞ্চলিকতার যাথার্থ্যের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছেশনবিল, খাসপুর, দুর্গানগর আশ্রমের কথা উল্লেখিত হয়েছে যেগুলি সবই বরাকেরঅথচ এই ভুবনের দুই পীঠস্থান কামাখ্যা ও ভুবনেশ্বরী দেবীর মন্দির বা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ নদীদ্বীপ মাজুলির উল্লেখ নেইউল্লেখ নেই শিলং, তাওয়াং, বড়াইলের সৌন্দর্যমোট কথা এই সংকলনটি আদ্যোপান্তবরাকের সাহিত্যহয়ে উঠেছেতৃতীয় ভুবনের সাহিত্যহয়ে ওঠেনিআমরা ভবিষ্যতের পানে চেয়ে থাকতেই পারি কারণ এর মূল কান্ডারি নিঃসন্দেহে একজন পোড় খাওয়া সাহিত্যিক
 
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
তৃতীয় ভুবনের সাহিত্য
সম্পাদক - নারায়ণ মোদক
মূল্য - ২০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫০৭৬০৬৯

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...