জীবন ছবির অনাবিল উচ্চারণ - ‘সপাট সহজ সন্ধ্যা’
এভাবেও পটচিত্রে সংরক্ষিত করে রাখা
যায় জীবন ছবির টুকরো স্মৃতি। কবিতার পটচিত্রে ভাবনাকে লিপিবদ্ধ করে রেখে দেয়া যায় আখর
কথার এ্যালবামে। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে চলার পথের অজস্র টুকিটাকিকে
যিনি ধরে রেখেছিলেন কাগজে কলমে তাঁর এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থ মাত্র এক। গল্প সংকলন
‘একটি শিশির বিন্দু’ প্রকাশিত হয়েছে এই সেদিন ২০২০এ। এর দু’বছর পর সদ্য অনুষ্ঠিত
অসম গ্রন্থমেলা, গুয়াহাটি ২০২২এ প্রকাশিত হলো তাঁর প্রথম কাব্য সংকলন। সম্যক
কৈফিয়ত ধরে রাখা আছে ব্লার্বে, এভাবে - ‘প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে অনিয়মিত লেখালেখির
অভ্যাসে কবিতা রচিত হয়েছে অজস্র। কিন্তু অগোছালো অসাবধানী স্বভাবের দরুণ বেশির
ভাগই হারিয়ে গেছে। অবশিষ্ট সংগ্রহ থেকে ষাটটি কবিতা নিয়ে এই সংকলন। বিষয়বস্তু
বিবিধ ও বিচিত্র। রচনাকাল লিখে রাখার অভ্যাস বিশেষ না থাকার জন্য সংকলিত কবিতাগুলোর
বিন্যাসে নির্ভুল কালানুক্রম রাখা সম্ভব হয়নি। তবে দীর্ঘ সময়কাল ধরে পরিমণ্ডলে ও
মননে ধারাবাহিক পরিবর্তনের ছায়াপাত এবং সেই সাথে কবির অনুভব ও প্রকাশভঙ্গির
ক্রমবিবর্তনের আভাস পাওয়া যেতে পারে এই সংকলনের পৃষ্ঠা পরম্পরায়।’ কবির বয়ানে -
‘... সেই থেকেই সব ধরণের লেখালেখি চলছে, কিন্তু ইচ্ছে বা উদ্যোগের অভাবে খুব
সামান্য লেখাই প্রকাশিত। ...... গল্প, কবিতা ও নাটকের আরো সংকলন প্রকাশের
অপেক্ষায়।
সেই যে দীর্ঘ লেখালেখির পরম্পরা তারই সুস্পষ্ট প্রকাশ সদ্য প্রকাশিত এই কাব্য সংকলন - ‘সপাট সহজ সন্ধ্যা’। একটুখানি ব্যতিক্রমী এই নামকরণ। এবং কতটা যথার্থ এই নামকরণ তা দুই মলাটের ভেতর চোখ বুলালে, কবিতার রসাস্বাদনে প্রতিভাত হয় পূর্ণমাত্রায়। ৭৪ পৃষ্ঠার এই সংকলনটির প্রতিটি কবিতা যেন এক অমোঘ ধারাবাহিকতায় ধরে রেখেছে এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। বস্তুতঃ এক ভিন্ন ঘরানার অনুসারী যেন সব ক’টি কবিতা। এবং অধিকাংশ কবিতায় ফুটে উঠেছে এক সপাট, সহজ সান্ধ্য আর্তি। শারদীয়া ১, শপথ, উঠোন, অভিমানিনীর প্রতি ইত্যাদি কবিতাগুলোয় এক সপাট বয়ান হয়েছে লিপিবদ্ধ। উদাহরণ -
মৌন হলেই নীরব হওয়া কি যায় -
কথারা কখনও কোনো কথা শুনে নাকি ?
হেঁকে আসে তারা নিজেদের মর্জিতে,
একা নয়, ওরা ভিড় করে একজোটে।
(কবিতা - অভিমানিনীর প্রতি)
কিংবা -
মলিন উঠোনটুকু পুলকে খুশিতে আজ
অবিকল হেসে উঠেছিল -
... কত যুগ পরে যেন এ উঠোনে আজ
একটি আসর বসে।
... বেচারা জানবে কী করে -
এই আসরের শেষে যে সকাল হবে
সেইদিনই মুসাবিদা, দলিল রচনা।
উঠোনের জাঁক আর ছড়ানো আবাস
সব কিছু ঘুচে যাবে বেমালুম।
স্পর্ধা বিকিরণ করে দাঁড়াবে এখানে
ঝকঝকে বহুতল, উঠোন ছাড়াই।
(কবিতা - উঠোন)।
আছে অনেক সহজ কথাও। ছোট ছোট দুঃখ ব্যথা, ছোট ছোট স্মৃতি, ঘটনার বর্ণনা। আছে সন্ধ্যারাগে রাঙানো বহু পংক্তি। বয়সের এক কাল্পনিক সীমারেখায় পৌঁছে স্মৃতির আবেগে এসেছে বিহ্বলতা।
ক্লিষ্ট দুঃখ জানালায় ছায়া-ফেলা
দুপুরেই কেন যে সন্ধে এল
চুপিসারে অভিমানী সেই ভর সন্ধেবেলা
তার চলে যাওয়া
(কবিতা - সন্ধে কথা)।
জীবনকে এঁকেছেন কবি আপন যাপিত বেলার অনুভবে আহৃত কিংবা অধরা ছন্দে। আছে তারও কৈফিয়ত।
শোভন শব্দরাজি আমাদের মসীমুখে
আসেই না এমন তো নয়,
ছন্দোবদ্ধ চরণের সারণিও দেখা দেয় হঠাৎ হঠাৎ
এমনকি অন্ত্যমিল, অবিকল পর্ব-পরম্পরা -
সেজে উঠে আমাদেরও হাতে,
সাতিশয় আয়াস ছাড়াই।
তবু তারা গান হয়ে ওঠে না, কারণ
গান হতে চায়নি কখনও।
(কবিতা - আমাদের গান)।
এভাবেই একের পর এক কবিতাগুলো যাথার্থ্য প্রকাশ করেছে নামকরণের। কিংবা বিপরীত অভিমুখে দাঁড়িয়ে বলা যায় নামকরণের সাফল্য বয়ে বেড়াচ্ছে কবিতার কথামালা। সব ভালো লাগা কবিতার ভিড়ে আলাদা করে উল্লেখ করতে ইচ্ছা হয় কিছু কবিতার। ঘুম আসে না, প্রবাহ, পরিযায়ী ইত্যাদি কবিতায় কবির নিজস্ব ঘরানার সুস্পষ্ট ছাপ।
সহজে সপাট কবিতাগুলি জীবন্ত হয়ে উঠেছে আপন স্বকীয়তায়। নামমাত্র কিছু বানান/ছাপার ভুল - সে বোধ করি অনিবার্য। সূচিপত্রহীন গ্রন্থের সুন্দর প্রচ্ছদ এঁকেছেন স্বনামধন্য চিত্রী উদয়ন বিশ্বাস। ‘কবিতার বইয়ের ক্ষেত্রে ভূমিকার প্রচলন তেমন নেই। বোধহয় এর বিশেষ প্রয়োজনও নেই ...... প্রথম কবিতার বই জনসমক্ষে আনতে গেলে একটা লিখিত কৈফিয়ত সামনে রাখাই বোধহয় সঙ্গত’- এমনি লিখছেন কবি তাঁর ‘নিবেদন’-এ। প্রকাশক - মায়া প্রকাশনী, পাণ্ডু, গুয়াহাটি। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে কবির ‘প্রয়াত সেজদাদা বিপুল ঘটকের স্মৃতির উদ্দেশে’।
পরিশেষে একটি প্রত্যাশা জেগে ওঠে স্বাভাবিক গরজে। অনেকেই কথা না রাখলেও একজন কবি নিশ্চিতই কথা রাখবেন বলেই এই প্রত্যাশা কবিরই কথার সুত্র ধরে -‘গল্প, কবিতা ও নাটকের আরো সংকলন প্রকাশের অপেক্ষায়’।
সেই যে দীর্ঘ লেখালেখির পরম্পরা তারই সুস্পষ্ট প্রকাশ সদ্য প্রকাশিত এই কাব্য সংকলন - ‘সপাট সহজ সন্ধ্যা’। একটুখানি ব্যতিক্রমী এই নামকরণ। এবং কতটা যথার্থ এই নামকরণ তা দুই মলাটের ভেতর চোখ বুলালে, কবিতার রসাস্বাদনে প্রতিভাত হয় পূর্ণমাত্রায়। ৭৪ পৃষ্ঠার এই সংকলনটির প্রতিটি কবিতা যেন এক অমোঘ ধারাবাহিকতায় ধরে রেখেছে এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। বস্তুতঃ এক ভিন্ন ঘরানার অনুসারী যেন সব ক’টি কবিতা। এবং অধিকাংশ কবিতায় ফুটে উঠেছে এক সপাট, সহজ সান্ধ্য আর্তি। শারদীয়া ১, শপথ, উঠোন, অভিমানিনীর প্রতি ইত্যাদি কবিতাগুলোয় এক সপাট বয়ান হয়েছে লিপিবদ্ধ। উদাহরণ -
মৌন হলেই নীরব হওয়া কি যায় -
কথারা কখনও কোনো কথা শুনে নাকি ?
হেঁকে আসে তারা নিজেদের মর্জিতে,
একা নয়, ওরা ভিড় করে একজোটে।
(কবিতা - অভিমানিনীর প্রতি)
কিংবা -
মলিন উঠোনটুকু পুলকে খুশিতে আজ
অবিকল হেসে উঠেছিল -
... কত যুগ পরে যেন এ উঠোনে আজ
একটি আসর বসে।
... বেচারা জানবে কী করে -
এই আসরের শেষে যে সকাল হবে
সেইদিনই মুসাবিদা, দলিল রচনা।
উঠোনের জাঁক আর ছড়ানো আবাস
সব কিছু ঘুচে যাবে বেমালুম।
স্পর্ধা বিকিরণ করে দাঁড়াবে এখানে
ঝকঝকে বহুতল, উঠোন ছাড়াই।
(কবিতা - উঠোন)।
আছে অনেক সহজ কথাও। ছোট ছোট দুঃখ ব্যথা, ছোট ছোট স্মৃতি, ঘটনার বর্ণনা। আছে সন্ধ্যারাগে রাঙানো বহু পংক্তি। বয়সের এক কাল্পনিক সীমারেখায় পৌঁছে স্মৃতির আবেগে এসেছে বিহ্বলতা।
ক্লিষ্ট দুঃখ জানালায় ছায়া-ফেলা
দুপুরেই কেন যে সন্ধে এল
চুপিসারে অভিমানী সেই ভর সন্ধেবেলা
তার চলে যাওয়া
(কবিতা - সন্ধে কথা)।
জীবনকে এঁকেছেন কবি আপন যাপিত বেলার অনুভবে আহৃত কিংবা অধরা ছন্দে। আছে তারও কৈফিয়ত।
শোভন শব্দরাজি আমাদের মসীমুখে
আসেই না এমন তো নয়,
ছন্দোবদ্ধ চরণের সারণিও দেখা দেয় হঠাৎ হঠাৎ
এমনকি অন্ত্যমিল, অবিকল পর্ব-পরম্পরা -
সেজে উঠে আমাদেরও হাতে,
সাতিশয় আয়াস ছাড়াই।
তবু তারা গান হয়ে ওঠে না, কারণ
গান হতে চায়নি কখনও।
(কবিতা - আমাদের গান)।
এভাবেই একের পর এক কবিতাগুলো যাথার্থ্য প্রকাশ করেছে নামকরণের। কিংবা বিপরীত অভিমুখে দাঁড়িয়ে বলা যায় নামকরণের সাফল্য বয়ে বেড়াচ্ছে কবিতার কথামালা। সব ভালো লাগা কবিতার ভিড়ে আলাদা করে উল্লেখ করতে ইচ্ছা হয় কিছু কবিতার। ঘুম আসে না, প্রবাহ, পরিযায়ী ইত্যাদি কবিতায় কবির নিজস্ব ঘরানার সুস্পষ্ট ছাপ।
সহজে সপাট কবিতাগুলি জীবন্ত হয়ে উঠেছে আপন স্বকীয়তায়। নামমাত্র কিছু বানান/ছাপার ভুল - সে বোধ করি অনিবার্য। সূচিপত্রহীন গ্রন্থের সুন্দর প্রচ্ছদ এঁকেছেন স্বনামধন্য চিত্রী উদয়ন বিশ্বাস। ‘কবিতার বইয়ের ক্ষেত্রে ভূমিকার প্রচলন তেমন নেই। বোধহয় এর বিশেষ প্রয়োজনও নেই ...... প্রথম কবিতার বই জনসমক্ষে আনতে গেলে একটা লিখিত কৈফিয়ত সামনে রাখাই বোধহয় সঙ্গত’- এমনি লিখছেন কবি তাঁর ‘নিবেদন’-এ। প্রকাশক - মায়া প্রকাশনী, পাণ্ডু, গুয়াহাটি। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে কবির ‘প্রয়াত সেজদাদা বিপুল ঘটকের স্মৃতির উদ্দেশে’।
পরিশেষে একটি প্রত্যাশা জেগে ওঠে স্বাভাবিক গরজে। অনেকেই কথা না রাখলেও একজন কবি নিশ্চিতই কথা রাখবেন বলেই এই প্রত্যাশা কবিরই কথার সুত্র ধরে -‘গল্প, কবিতা ও নাটকের আরো সংকলন প্রকাশের অপেক্ষায়’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
‘সপাট সহজ সন্ধ্যা’
বিশ্বজিৎ ঘটক
মূল্য - ১৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫৩৪৪৭১২, ৮৭২৩৯২৫০৫১।
বিশ্বজিৎ ঘটক
মূল্য - ১৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫৩৪৪৭১২, ৮৭২৩৯২৫০৫১।
খুব ভালো লাগলো আলোচনা। কবিতার অংশগুলো মন ছুঁয়ে গেল।
ReplyDelete