বিমলেন্দু চক্রবর্তীর ‘একটি চশমা কিংবা তার বিনির্মাণ’
একই সত্যের সূত্র ধরে অতি সম্প্রতি গুয়াহাটির মজলিশ বইঘর থেকে প্রকাশিত হয়েছে কবি, গল্পকার বিমলেন্দু চক্রবর্তীর গল্প সংকলন - একটি চশমা কিংবা তার বিনির্মাণ। এটি গল্পকারের প্রথম গল্প সংকলন। এর আগে প্রকাশিত হয়েছিল একটি কবিতা সংকলন যা সাড়া জাগিয়েছিল পাঠক মহলে। খানিকটা ব্যতিক্রমী বটে এই আলোচ্য গ্রন্থটির নামাকরণ। আসলে এই শিরোনামে রয়েছে দুই মলাটের ভিতরে একটি গল্প। গল্পকারের চিন্তায় হয়তো এই গল্পটিই সবচাইতে বেশি আলোড়ন তুলেছে। তাই এই নামাকরণ। পঠনান্তে পাঠকের চিন্তায় কি সৃষ্টি হয়েছে একই আলোড়ন ? আলোচনা করা যাক।
মোট ১২৮ পৃষ্ঠার এই সংকলনে গ্রন্থিত হয়েছে ২১ টি গল্প। প্রথম মলাটের ভেতরের প্রচ্ছদে গল্পকারের সম্যক পরিচিতির কিছু অংশ এখানে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে। - “গল্পের হাতেখড়ি কলেজ জীবনে। প্রথম গল্প ‘জানা ছিল না’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। সময়টা ১৯৮০। বরাক উপত্যকার অধুনালুপ্ত লিটল্ ম্যাগাজিন ‘আগামী পৃথিবী’র প্রাক্তন সহ সম্পাদক বিমলেন্দু চক্রবর্তী পরবর্তী সময়ে উচ্চ শিক্ষার্থে গুয়াহাটিতে অবস্থান করেন এবং কর্মসূত্রে এই শহরেই পাকাপাকি ভাবে থিতু হন .........।”
বিষয় বৈচিত্রে প্রতিটি গল্পই ভিন্ন আবহের উপর লিখিত যদিও সার্বিক ভাবে কোথাও যেন বর্তমানকে ধরে রাখার একটি প্রয়াস লক্ষ করা যায় বিমলেন্দুর গল্পে। স্বামী স্ত্রীর মধ্যেকার একটি সুপ্ত নিটোল ভালোবাসার গল্প ‘সহধর্মিণী’ দিয়ে আলোচ্য গ্রন্থের অবতরণিকা। মায়াময় একটি যবনিকা তুলে ধরার লোভ সামলানো গেল না। - “বাতি নিভিয়ে দিলাম। হাত বাড়িয়ে ধরতে গেলাম দীর্ঘদিনের প্রেমিকাকে। নো রেসপন্স। মনে পড়ে গেল কাল রাতের কথা। সন্তর্পণে আবার হাত বাড়ালাম ...। ওপাশ থেকে ভেসে এল, যার হাতে পান খেয়েছ, তার কাছে যাও। হেসে বললাম, ওমা, সেই জন্যে রাগ ? বউদির হাতে পানই খেয়েছি পাণি তো গ্রহণ করিনি। টেনে বুকে নিয়ে ...। আদর খেতে খেতে সহধর্মিণী বলল, বউদির হাতের স্পর্শ কেমন লেগেছিল ... ?
দূর থেকে ভেসে এল গীর্জার ঘণ্টা। চেনাজানা ঢেউগুলো নীরবে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। আমরা ভেসে চলছি অনেক দূরে ...।” এ যেন নিত্যদিনের চেনাজানা আবহটিকেই এক অনাবিল গল্পময়তায় পাঠকের দরবারে নিবেদন। মার্জিত অথচ উপযুক্ত ভাষার প্রয়োগে এভাবেই প্রতিটি গল্প এগিয়েছে তার আপন ছন্দে।
দ্বিতীয় গল্প ‘লিটমাস’ একটি অনবদ্য বোধের গল্প। হারিয়ে যাওয়া সামাজিকতা এবং সম্পর্কের গল্প। স্থানীয় ভাষার উপযুক্ত প্রয়োগে গল্পের বুনোট হয়েছে শক্ত। গল্পের প্রতিটি চরিত্র যেন কথা বলেছে এই গল্পে তার সীমাবদ্ধতার মধ্যে।
নামাকরণের গল্প ‘একটি চশমা ও তার বিনির্মাণ’ একটি রহস্যময়তায় মোড়া টানটান গল্প। একটি যুগ পুরোনো চশমাকে আবর্ত করে মসৃণ গতিতে গড়ে উঠেছিল যে কাহিনিটি, শেষটায় এসে যেন ঝটিতি থেমে গেল। পাঠক মনে বোধ করি আরোও খানিকটা প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু এখানেই কল্প কাহিনি আর বাস্তবের তফাৎ। লেখক সেই কাজটিই করে দেখিয়েছেন। বাস্তবে ফিরিয়ে দিয়েছেন পাঠককুলকে। একই কথা খাটে তার ‘দ্বিধা’ গল্পেও। এখানেও গল্পের বুনোটের কথা আলাদা করে উল্লেখ না করে উপায় নেই।
গল্প - ‘দুই মেরু এক সাঁকো’। পাহাড়ের স্বচ্ছ নীলের মতোই এক অনাবিল প্রেমের গল্প। বিষয়বস্তুতে হয়তো নতুনত্ব নেই কিন্তু গল্পের নির্মোহ চলনে আদ্যন্ত মজে থাকতে হয় পাঠককে। শেষটাও দুর্দান্ত। অসাধারণ একটি গল্প ‘রঙ-তুলি ও একটি আহত পাখি’। সিদ্ধান্তের পুনর্মূল্যায়নের গল্প। চমৎকার একটি বার্তা লেখক পৌঁছে দিতে পেরেছেন পাঠক মননে। গল্পের মতোই যথাযথ তার শিরোনাম। অনায়াসে এটিও হতে পারত গ্রন্থের নাম।
‘ঢল’ গল্পটির মাধ্যমে গল্পকার তুলে ধরেছেন সমকালকে। সাথে আছে মানবিকতার বার্তাও। ‘একটি কুকুরের গল্প নয় মিশেল’ নামের গল্পটি সুচিন্তিত বোধের গল্প। একটি সারমেয়কে নিয়ে এক গুঢ় মনস্তত্ত্বের ভালো একটি গল্প। কিন্তু চরিত্রদের ভিড়ে কিছু নামের বিসংগতি পাঠককে ধন্দে ফেলে দেয়। যেমন অসীমা হয়ে গেছে সীমা। ‘অনুরোধ’ গল্পটিও মনস্তত্ত্বের উপর একটি ছিমছাম গল্প।
এভাবেই গ্রন্থ জুড়ে জমে উঠেছে সুখপাঠ্য গল্পের সম্ভার। কিছু গল্প হয়তো আরো খানিক ভালো হওয়ার দাবি রাখে তবু অধিকাংশ গল্পেই গল্পময়তার আবেশ ছড়িয়ে রয়েছে পরতে পরতে। বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয় সংলাপের যাথার্থ্য। উপযুক্ত স্থানে ঠিক ততটাই সংলাপ যতটা বাস্তবের সঙ্গে খাপ খায়। কোথাও কোন অতিশয়োক্তিকে স্থান দেননি গল্পকার। সহজবোধ্য অথচ শৈল্পিক ভাষার প্রয়োগও উল্লেখযোগ্য। সব মিলিয়ে এক উচ্চ মানের গল্প সংকলন। পাঠক মহলে সমাদৃত হওয়ার যোগ্য।
মানানসই প্রচ্ছদ এঁকেছেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী উদয়ন বিশ্বাস। ব্যতিক্রমী কাব্যিক কৃতজ্ঞতা ও উৎসর্গলিপি - ‘কৃতজ্ঞতার দুঃসাহস অক্ষরস্রোতের নেপথ্যে মাতৃদুগ্ধ ও পিতৃঋণ’। গল্পসমূহের সার্বিক পরিমিত বয়ানের মতোই কোন ভূমিকা কিংবা আত্মকথাকে এড়িয়ে গেছেন গল্পকার। সরাসরি পাঠকের দরবারে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর অনুভব।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
বিমলেন্দু চক্রবর্তী
মূল্য - ২২০ টাকা
যোগাযোগ - ৯১২৭০৫৬৪৮৪
Comments
Post a Comment