Skip to main content

রিমঝিম বৃষ্টি - রেণুকা বিশ্বাস


সুখপাঠ্য উপন্যাস - রিমঝিম বৃষ্টি 


‘বর্ষীয়ান লেখিকা রেণুকা বিশ্বাস ১৯৭৭এ পিতৃবিয়োগের পরপিতৃতর্পণকবিতা দিয়েই তাঁর প্রথম লেখালেখির শুরুআশির দশকে নগাঁও থেকে প্রকাশিতমৃগনাভিছোট পত্রিকায় লেখিকার প্রথম গল্পযতিপাতপ্রকাশিত হয় ১৯৮৩ সালে লিখাভগ্নকালীর অন্তরালেপ্রথম উপন্যাস ১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত বহু গল্প উপন্যাস লিখেছেন এর পর প্রায় দীর্ঘ পনেরো বছর লেখালেখি সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল’ - এ তো গেল ব্লার্বের কথা। প্রকাশক ভিকি পাবলিশার্স, গুয়াহাটি। প্রকাশকাল জানুয়ারি ২০২১, অসম গ্রন্থমেলা, গুয়াহাটি। এর আগে প্রকাশিত হয়েছে লেখিকার গল্প সংকলন ‘স্বপ্নের বালুচরে’ ২০১০-এ এবং কাব্যসংকলন ‘ফেরারি ঘুড়ি’ ২০১৮তে।
পৃষ্ঠাসংখ্যার বিচারে ৭৭ পৃষ্ঠার একটি কাহিনি কতটা উপন্যাস হয়ে ওঠে সেই বিচারে না গিয়েও কাহিনির বিস্তার, বিন্যাস, বুনোট এবং ধারাবাহিকতাকে বিচার্য হিসেবে ধরলে ‘রিমঝিম বৃষ্টি’ এক কথায় একটি সার্থক উপন্যাস। উপন্যাস সার্থক এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকেও যে লেখিকা সন তারিখের কোনও বিশেষ উল্লেখ না করলেও হয়তো বা তাঁর নিজেরই অজান্তে একটি সময়কালকে তিনি ধরে রেখেছেন স্পষ্ট লেখনীতে। ঔপন্যাসিকের বয়ানে - ‘ছিন্নমূল মানুষদের দু-তিন পুরুষ লেগে যায় পায়ের নীচের মাটি শক্ত করতে’সেই সময়ের হিসেবে স্থান, কাল ও পাত্রপাত্রীর পরিপ্রেক্ষিতে কোথাও ব্যাহত হতে দেননি ঘটনাক্রম কোথাও কোন তথ্যত্রুটির অবকাশ রাখেননি
উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র পিয়া বা পিয়ালীকে উপস্থাপন করেছেন এক সবল, সফল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন চরিত্র হিসেবে সমগ্র উপন্যাস জুড়ে কোথাও সামান্য বিচ্যুতি নেই এই চরিত্রের পিয়ালীর শিশু বয়সের এক সরব স্বগতোক্তি ঘিরে আবর্তিত হয়েছে উপন্যাসের ঘটনাক্রম আর ঘটনাচক্রে প্রতিটি পার্শ্বচরিত্র হয়ে উঠেছে মুখ্য চরিত্রেরই মতো গুরুত্বপূর্ণ সীমিত সংখ্যক পার্শ্বচরিত্র থাকায় কোনো ধরণের জটিলতার সৃষ্টি হওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি চরিত্রের আধিক্য কখনো ব্যাহত হতে দেয়নি উপন্যাসের সরলরৈখিক বিস্তার তাই উপন্যাসটি শুধু সুখপাঠ্য নয় সহজপাঠ্য হিসেবেও পরিস্ফুট হয়েছে
কাহিনিবিন্যাসও হয়েছে যথোচিত অবোধ্য কিছু নেই ঘটনাক্রমকে কালানুযায়ী সাজানো হয়েছে অবিচ্ছেদ্য ধারাবাহিকতায় পাঠকমন তাই পঠনোন্মুখ হয়ে থেকেছে সম্পূর্ণ উপন্যাসটির পঠনে এবং শেষ অবধি পাঠকের অনুসন্ধিৎসা বজায় থেকেছে সমাপ্তিরেখার তালাশে উপন্যাসে নব্য আধুনিকতার ধারা হয়তো অনুপস্থিত যেহেতু ঘটনাক্রম এমন একটি সময়ের যখন হাতে হাতে মোবাইল ফোন ছিল না, যখন রেলের স্টেশনে স্টেশনে প্ল্যাটফর্মের জলের কল থেকেই পানীয় জল সংগ্রহ করতে হতো তাই উপন্যাসের নব্য ফর্মাটটিও এখানে অনুপস্থিত এবং স্বাভাবিকভাবেই কাহিনিনির্ভর এই উপন্যাসের পঠনে আধুনিকতার চাহিদাও অনুভূত হয় না পাঠকমননে ষাট থেকে আশির দশকের আর পাঁচটি উপন্যাসের মতোই এখানেও পুরোমাত্রায় উপস্থিত সেই আবেগ, সেই আমেজ যা বাংলা সাহিত্যের প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের কাছে নিবিড় সুপরিচিত এক অনুভব
বেশ কিছু জায়গায় উপন্যাসকার অহেতুক কিছু তৎসম শব্দের ব্যবহার করেছেন যদিও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে উপন্যাসকারের বয়স এবং উপন্যাসের কাল বিবেচনা করলে এমনটা হওয়া হয়তো তেমন দোষণীয় হয়নি কিংবা অপ্রাসঙ্গিকও হয়নি তবু আজকের পাঠক, কিংবা আজকের সাহিত্য ধারায় কোথাও একটুখানি অস্বস্তির সৃষ্টি হয় বৈকি যেমন বৎসর, কর্ণদ্বয়, ভ্রুযুগল, নাসিকাধ্বনি, বধূমাতা, গমন পথ, নয়ন, পদ্মপত্র, পাদস্পর্শ, বাক্যহারাইত্যাদি সহজ, চলতি ধারাবিবরণের মধ্যে এই শব্দসমূহের ব্যবহার হয়তো সচেতন ভাবে এড়িয়ে যাওয়া যেত
অন্যদিকে ভাষার মাধুর্যে কিছু কিছু বর্ণনা হয়ে উঠেছে অসাধারণ ব্যঞ্জনাময়ও পুরীর সাগরতীরে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অনাবিল বর্ণনা এখানে উল্লেখনীয়
দিগন্তরেখার পর্দা ভেদ করে নবীন প্রেমিকের প্রথম অভিসারের মতো লজ্জায় রাঙা হয়ে ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করছেন তরুণ অরুণদেব আপন লজ্জার লাল রঙে রাঙিয়ে দিয়েছেন তিনি বিশ্বভুবন - নীল জল, নীল আকাশ, গাছপালা, ঘরবাড়ি, দর্শনার্থী, পুণ্যার্থী সবাই, সবই হয়ে উঠেছে লালিমাময়।।
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্রজলকে একখানা বিশাল কালো চাদরের মতো দেখাচ্ছে রাস্তার বিজলিবাতির আলোর ধারা ক্ষীণ হয়ে লুটিয়ে পড়েছে বালুকাবেলায় সে আলোতে সুস্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে না কারও মুখের অভিব্যক্তি।।
এভাবেই সহজ সরল কথনের মধ্যেও ভাষার কারুকার্যে মহিমামণ্ডিত করেছেন উপন্যাসের অনাবিল চলন সংযোজন ঘটিয়েছেন কিছু নতুন শব্দেরও যেমন - হতোদর, একাগ্রমনষ্ক, সচমকেইত্যাদি পাঠে পাঠে পাঠক মন এগিয়ে চলে সমাপতনের অজানা অধ্যায়টির দিকে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে আগ্রহ, তীব্র হতে থাকে কৌতূহল মিলন নাকি বিচ্ছেদ এই দোটানায় এগিয়ে চলে উপন্যাসের পাঠ এই জায়গাটিতে লেখিকা একশো ভাগ মুন্সিয়ানায় টেনে নিয়ে গিয়েছেন উপন্যাসটিকে আগাগোড়া পাঠক মনে বজায় রাখতে পেরেছেন এই কৌতূহল, এই অন্তরস্থিত জিজ্ঞাসা এবং মাঝের পর্বসমূহকেও নিপুণ বয়ানে জড়িয়ে নিয়েছেন মূল কাহিনির সঙ্গে এক নিবিড় অদৃশ্য সুতোর বাঁধনে মাঝের ঘটনাক্রম আরোও খানিক দীর্ঘতর হলেও তা অবাঞ্ছিত মনে হতো না কখনো সেক্ষেত্রে সার্থক উপন্যাসের ন্যূনতম পৃষ্ঠাসংখ্যার অলিখিত চাহিদার দিকে আরোও একটু হলেও এগিয়ে যাওয়া যেত বৈকি
তবু বলতেই হয় - সাহিত্যের এই ভুবনে উপন্যাসের এই খরার দিনে রেণুকা বিশ্বাস নিশ্চিতভাবেই যোগ করেছেন এক আস্বাদযোগ্য কাহিনিসর্বস্ব উপন্যাস যা পাঠকমনে জায়গা করে নিতে পারবে নিঃসন্দেহে।
বানান/ছাপার ভুলের দায় অবশ্যই নিতে হবে প্রকাশককেও। আধুনিক এবং পুরোনো বানানের সংমিশ্রণ ঘটেছে বহু জায়গায়। এদিকটায় সচেতন হওয়ার সুযোগ ছিল বৈকি।
উপযুক্ত প্রচ্ছদ - সৌজন্যে নয়নজ্যোতি শর্মা। লেখিকা উপন্যাসটিকে উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘অকালে চলে যাওয়া মেয়ে বুলির স্মৃতিতে’কোনও ভূমিকা কিংবা আত্মকথন নেই উপন্যাসটিতে, যাঁর প্রয়োজন ছিল বৈকি। একটি উপন্যাস একটি ইতিহাস। এবং সেই ইতিহাসের ইতিকথা জানতে পাঠকমন সদাই উৎসাহী থাকে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্যও প্রয়োজনীয় নিঃসন্দেহে।
এত কিছু প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে বাংলা সাহিত্যের এই ক্রমোন্নতিময় অঙ্গনে ‘রিমঝিম বৃষ্টি’ হয়ে উঠেছে উপন্যাসোপম একটি সহজ, সফল উপন্যাস - এটাই শেষ কথা।

 

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

‘রিমঝিম বৃষ্টি’
রেণুকা বিশ্বাস
মূল্য - ১৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৯৫৪৩৮৪৯০২, ৯৮৬৪৮১৫২৫৫।

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...