Skip to main content

নিথর মানবতার কাব্য সংকলন - 'হৃদপিণ্ডের ব্যথা'


নিথর মানবতার কাব্য সংকলন - ‘হৃদপিণ্ডের ব্যথা’

 

একটি কাব্যগ্রন্থ একজন কবি ও তাঁর পাঠকের মধ্যে তৈরি করে এক অমোঘ সম্পর্কের ইতিহাস। পাঠকের মননে তৈরি হয় কবি ও তাঁর কবিতার অন্তর্লীন পরিচিতি। কবিতার হাত ধরে সৃষ্টি হয় কবির মনের অন্তরমহলে জাগ্রত কথা ও ভাবনার প্রতি পাঠকের অনুসন্ধিৎসু কাব্যপিপাসা। কবি জাহানারা মজুমদারের ‘হৃদপিণ্ডের ব্যথা’ কাব্যগ্রন্থটি এক নজরে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম তার অসাধারণ প্রচ্ছদ এবং ছিমছাম বাঁধাই-এর সৌজন্যে। এবার কাব্যগ্রন্থের আলোচনার সূচনা পর্বে সংকলনের গভীরে পাঠ-সন্তরণের পূর্বে কাব্যসলিলের গভীরতা যাচাই-এর উদ্দেশে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক ব্লার্বে -
‘…… প্রথম গল্প লিখা ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে কলেজ ম্যাগাজিনে। স্নাতকের পরেই বিয়ে, বিয়ের পর লেখালেখি প্রায় স্তব্ধ। তারপর ধীরে ধীরে আবার লিখতে শুরু করেন। … ২০১৭ থেকে কবিতায় ঝুঁকে পড়েন জাহানারা। বরাক ও বাংলাদেশের অনেক যৌথকাব্যে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। … জাহানারার কবিতা আমাদের সময় এবং না-সময়ের কথা বলে, বলে জীবনযাপনে অসংগতির কথা, মাটির খুব কাছে থেকে জীবনকে দেখেছেন কবি। অসংগতি আর বৈষম্য তাঁকে বারবার হতাশ করে। নারী পুরুষের ভেদরেখা মুছে দেবার প্রয়াস তাঁর লেখায় উজ্জ্বল। দেশকে ভালোবাসা ইমানের অঙ্গ - এই বোধ লালিত হয় জাহানারার লেখায়। বারবার ফিরে তাকান অসহায় কান্নাগুলোর দিকে, এ কান্না থেমে যাক যেটা চান তিনি। মানুষের পৃথিবীতে মানুষ কেন তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হবে এ প্রশ্ন বারবার করেছেন তাঁর লেখায়। গদ্যছন্দে লিখতে পছন্দ করেন তিনি।‘
কবি জাহানারা মজুমদারের কবিতার এই নির্যাসটুকুই তাঁকে পাঠকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পথটি খুলে দেয় অক্লেশে।
‘হৃদপিণ্ডের ব্যথা’ কবির সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ যা প্রকাশিত হয়েছে ২০২০ এর কলকাতা বইমেলায়। প্রকাশক দেবাশিস ভট্টাচার্য, বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ। অত্যন্ত সুন্দর এবস্ট্র্যাক্ট ছবিতে প্রচ্ছদ এঁকেছেন অতনু গাঙ্গুলি।  
তাঁর প্রায় সব ক’টি কবিতায় ঝরে পড়েছে এক শূন্যতার কাঙালপনা, এক একাকীত্বের অস্থির প্রকাশ। সম্পর্কের স্খলন জন্ম দেয় একরাশ হতাশা। কবির এই বোধ তাঁকে কবিতায় ঝঙ্কৃত হতে উদ্বুদ্ধ করে। যত অনিয়ম, যত অসহায় অব্যবস্থার বিরুদ্ধে শাণিত কলমে সৃষ্টি হয় অসাধারণ কিছু পংক্তি, নিঃসরিত হয় বিরুদ্ধবাদী শ্লেষ -
মাঝেমাঝে পৃথিবী কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে
একই সরলরেখায় এসে যায় - পৃথিবী চন্দ্র সূর্য,
কিন্তু মানুষ প্রতি টুকরোতে নেমপ্লেট বসাতে ব্যস্ত।
(কবিতা - অখণ্ড চেয়েছিলাম)
কিংবা -
বিষাদে দীর্ঘ নিঃশ্বাস টানি, হৃদস্পন্দে কষ্ট
এ দেশ আমার, প্রমাণ দেবো আবার,
তাই নিদ্রাহীন আজ আমার স্বপ্নের শহর
হা রে আমার জন্মভূমি !
বার-বার কত বার হিসেব নেই
আমাকে ভেঙেচুরে,
আবার তাকিয়ে দেখি নিজেকে আয়নায় …
ক্লান্ত আমি !
যেন মৃত্যুর দিগন্ত অবধি প্রমাণ দিতে হবে
এ দেশ আমার।
(কবিতা - হৃদয়ে বিশ্বাস)।
এমনি আরো বহু কবিতায় কবি নিজেকে প্রতিভাত করেছেন স্পষ্টবাক অনুভূতিকে কবিতার শরীরে শব্দের মালা গেঁথে। তুলে ধরেছেন ঘরের অন্দরমহল থেকে শুরু করে সমাজের তথা রাষ্ট্রের অস্থিমজ্জায় গোপনে জায়গা করে নেওয়া ক্লেশ, দুঃখব্যথা, অনিয়ম, বজ্জাতি, স্বাধীনতাহীনতার উলঙ্গ রূপ। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন অন্ত্যজনের সব অপারগতা, অসহনীয় অত্যাচারের কথা।
আলোচ্য গ্রন্থে মোট ৯৬ পৃষ্ঠার মধ্যে ধরে রাখা হয়েছে ৯০ টি কবিতা। অধিকাংশই নিথর মানবতার গাথা। আছে অসুন্দরের বিরুদ্ধে কিছু শ্লেষ, কিছু প্রতিবাদ এবং সব শেষে আছে সত্য শিব সুন্দরের পথ চেয়ে কিছু আশা আকাঙ্ক্ষার উচ্চারণ। কিছু কবিতা বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে নিশ্চিত। উদাহরণ - একাকীত্বে প্রহর, ভালোবাসার জলছবি, মুখ ঢাকা চোখ, আমার সেরকম কোন দুঃখ নেই, ইচ্ছেরা ইত্যাদি। তবু এতসব অমানবিকতার কালবেলার শেষে কবি নিশ্চিত আবার পৃথিবী ভরে উঠবে ভালোবাসার মাধুরীতে।
নির্ঘুম রাত্রির চোখে অশ্রু ঝরে
ভোরের আলো ফাঁকা মাঠে নিঃশ্বাস ফেলে
সম্পর্কগুলো শরীর বেয়ে পাঁজর ছোঁয় না।
আমি আয়নায় সেই চেহারা খুঁজছি
যার অনুরণনে সবুজের বুক জুড়ে বাতাসের হাসি ফুটবে,
আকাশের জঠর থেকে মেঘেরা ভালোবাসা ছড়াবে,
যাবতীয় নিঃশব্দ শব্দ-মুখর হয়ে উঠবে।
(কবিতা - সেই চেহারা খুঁজছি)
কিংবা -
আমার চাষ করা ভালোবাসার জমি
একদিন হবে অনেক দূর,
তবুও বাতাসে অক্ষত থাকবে ভালোবাসার নিঃশ্বাস
আকাশের তারায় তারায় থাকবে দৃষ্টির সীমানা
সোনালি গ্রামের মাটির সোঁদাগন্ধে এঁকে যাওয়া স্পর্শ
সবুজের পাতায় পাতায় থাকবে ভালোলাগা দৃষ্টির অনুভূতি
পিপীলিকার মতো সারি সারি ক্ষুধার্তের
হাহাকারে থাকবে আমার ব্যথিত ভালোবাসা
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের নির্যাতিতের যন্ত্রণায় থাকবে
পাঁজরের অবিরত বৃষ্টিঝরা।
হে আমার বিশ্বজননী আমি তোমাকে ভালোবাসি
 …… না থাকুক আমার অস্থিমজ্জা
অথবা বর্তমান অবয়বের কোন এক টুকরো অবশিষ্ট
তবুও ভুলতে পারবে না আমার অস্তিত্বকে,
ভুলতে দেবো না তোমাকে
ভালোবাসার নিঃশ্বাস ছড়িয়ে থাকবে বিশ্বময়।
(কবিতা - অনন্ত ভালোবাসা)।
এভাবেই কবি ব্যক্ত করেছেন তাঁর প্রত্যয় - অনাগত বিশ্ব-ভবিষ্যতের। এভাবেই প্রতিবাদে, আকাঙ্ক্ষায় সেজে উঠেছে ‘হৃদপিণ্ডের ব্যথা’।
কলকাতায় প্রকাশিত একটি কাব্যগ্রন্থে বানান ভুলের আধিক্য প্রকাশকের দায়বদ্ধতার উপর নিশ্চিত এক প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়। প্রথম কবিতায়ই ছয়টি বানান ভুল বড্ড দৃষ্টিকটু হয়ে দাঁড়ায়। এর বাইরে পুরো সংকলনের মুদ্রণ, বর্ণ ও অক্ষরবিন্যাস যথেষ্ট উচ্চমানের সন্দেহ নেই। কবিতার পাঠশেষে পাঠক মননে কবির কবিতার প্রতি এক ভালো লাগা, এক পথ চাওয়ার অবধারিত বোধ জন্মে ওঠে। কবি এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন - মইন উদ্দিন লস্কর এবং কদর জাহান লস্করকে ‘যাঁদের জন্য আলোকময় পৃথিবী এবং যাঁদের জন্য শব্দের মোড়ক ঋণ স্বীকার, ঋণী থাকার প্রেক্ষাপট’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
‘হৃদপিণ্ডের ব্যথা’
জাহানারা মজুমদার
মূল্য - ১২০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৬৩৮৮৮৫১৯০ 
 
 

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...