লীনা
অন্তঃসত্ত্বা।
খবরটি যেদিন প্রথম শুনল, সেদিন নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না প্রকাশ।
- সত্যি বলছ ?
- হ্যাঁ। এইমাত্র পেলাম খবরটা। - চুমকির চোখে মুখে খুশির মনমাতানো ঝিলিক।
- কী করে হলো ? - কথার পৃষ্ঠে প্রশ্নটি করেই খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে প্রকাশ।
- তিনি চাইলে এমনটাই হয়, বুঝলে ?
একরাশ খুশির দমকা হাওয়া যেন ফুরফুরে করে দিচ্ছিল প্রকাশেরও মন-প্রাণ। সমু ও লীনার বিয়ের রাতের সেই মনমাতানো গানের সঙ্গের উদ্দাম নাচের দৃশ্যটি বার বার এসে ভাসছিল চোখের সামনে। নতুন নাচের গান এসেছে বাজারে। শুনলে কিশোর কিশোরী থেকে শুরু করে যুবক যুবতিদের পা দু’টি ছন্দময় হয়ে ওঠে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। তার উপর বিয়েবাড়ির আনন্দ বলে কথা। আর সেই বিয়ে যদি হয় সমুর মতো কাছের কারো।
অথচ সমু কিংবা লীনা প্রকাশের কে-ই বা হয় ? আপাতঃ অর্থে কেউই না। আবার ভাবতে গেলে অন্তরের একেবারে কাছের দু’জন তো বটেই। প্রথমে পাড়াতুতো সম্পর্কে পরিচয়। তার পর সুখে দুঃখে কাছে আসতে আসতে এখন যেন নিজেরই কেউ হয়ে উঠেছে এই দুই কপোত কপোতি। বিয়ের আগে সমু দস্তুর মতো অনুমতি নেওয়ার মতো করে আলোচনা করেছে প্রকাশের সঙ্গে। আসলে সমুর নিজের লোক তো থেকেও নেই। তাই কী করে যেন প্রকাশই হয়ে উঠেছে তার সবচাইতে কাছের। প্রকাশ যতটুকু না, তার চাইতেও বেশি কাছের যেন চুমকি - প্রকাশের বউ। চুমকি ওদের দিদি আর প্রকাশ দাদা।
আর্থিক
অসঙ্গতির জন্য নিজের একটি ব্যবসা খোলার মতো উপায় সমুর ছিল না। প্রতিষ্ঠিত আপনজনেরা
মুখ ফিরিয়েছে কবেই। সেই থেকে একটি ফার্মাসিতে কাজ করে সমু। সমুর আছে কিছু শারিরীক
দুর্বলতাও। সবই প্রকাশের জানা। তাই নিয়ে বিয়ের আগে আলোচনা হয় দু’জনে। সমুর হার্টের
কিছু সমস্যা আছে। ডাক্তার বলেছেন এখনি অপারেশনের দরকার নেই। আপাতত ওষুধেই কাজ
চলবে। বিয়ের ব্যাপারেও বিশেষ আপত্তি দেখালেন না ডাক্তার। এর পর কাছের শহর থেকে কী
করে যেন এল লীনার সাথে বিয়ের প্রস্তাব। লীনার বাবারও একই আর্থিক অবস্থা। কন্যাদায়
থেকে মুক্তির আশায় দিন গুনছেন লীনার বাবা। লীনার না আছে রূপ না আছে পড়াশোনা।
খর্বকায় শীর্ণ দেহে যা কিছু সম্পদ তা হলো তার মায়ামাখা মুখখানি আর মনমাতানো কথা।
কথায় ভেসে আসে অন্তরের সারল্য। সমু নিজের দুর্বলতা সব খুলে বলে লীনার বাবাকে।
লীনাদের তখন অন্য কিছু ভাবার মতো উপায় ছিল না। জেনেশুনেও তাই এ বিয়েতে মত দিলেন
তাঁরা। যথাসম্ভব আপ্যায়নের মাধ্যমে লীনার বাবা মুক্ত হলেন কন্যাদায় থেকে। এর বাইরে
উপায় কিছু ছিল না সমুরও। তাই বাজলো সানাই, সমুর ঘরে কনে হয়ে এল লীনা। কয়েক দিনেই
একান্ত আপন হয়ে উঠল সবার - বিশেষ করে প্রকাশদের।
বছর দুয়েকের মাথায় এল সেই পিলে চমকে দেওয়ার মতো খবর। লীনা অন্তঃসত্ত্বা। এই দু’বছরে সমুর হার্টের সমস্যা বেড়েছে অনেকটা। সুতরাং এই খবরটি সবার মনে নিয়ে এল এক অপার খুশির বার্তা। কিন্তু সে খুশি বেশিদিন দীর্ঘ হলো না। এক বর্ষার বৃষ্টিদিনে হঠাৎ করে পেটের ভেতরে প্রচণ্ড ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো লীনাকে। দু’দিন থেকে ছাড়া পেল ঠিকই কিন্তু পেটের বাচ্চাটিকে আর নিয়ে ফিরতে পারল না। অকাল গর্ভপাতে সন্তানের মুখ আর দেখতে পেল না লীনা। সেই থেকে এই আশাটি প্রায় নির্বাপিতই হয়ে গেল সবার অন্তর থেকে। মানসিক অবসাদগ্রস্ততা থেকে বেরিয়ে আসতে চুমকির সহায়তা কোনদিনই ভুলতে পারবে না লীনা। এক চিলতে এক ভাড়া ঘরে দু’জনের সংসার চলছিল নিত্য অসুখবিসুখকে সঙ্গে করে। এর মধ্যে সন্তানের আশা নিতান্তই এক বাতুলতা। সমুর অবস্থাও দিন দিন খারাপের দিকে। প্রায়ই কাজে যেতে পারে না সমু। ফার্মাসির মালিক খুবই সহৃদয় ছিলেন বলে যা বাঁচোয়া। লীনা আজকাল টুকটাক সেলাই এর কাজ করে কিছু টাকা হাত খরচ বের করে নেয়।
দেবদ্বিজে অগাধ ভক্তি লীনার। মন্দিরে মন্দিরে তার নিত্য যাতায়াত। মাঝে মাঝে এমন কিছু কথা বলে যে তা প্রকাশের বা চুমকির বিশ্বাসই হয় না। কী সব স্বপ্নে দেখার কথা বলে। আজকের দিনে কোথায় সেই ভক্তি আর কোথায় ভগবান ? এর মধ্যে সমুর শারীরিক অবস্থার অনেকটাই অবনতি হতে লাগলো। ডাক্তার বলে দিয়েছেন এবার অপারেশন ছাড়া আর গত্যন্তর নেই। এবং তা তাড়াতাড়িই করতে হবে। কিন্তু হার্টের অপারেশন করার মতো সেই ক্ষমতা কোথায় সমুর ? হাজার টাকাই যেখানে সমস্যা সেখানে লাখ টাকার অপারেশনের স্বপ্নই বা দেখে কী করে সমু ? লীনা হত্যে দিয়ে পড়ে প্রকাশ-চুমকির কাছে। কেমন মায়া জন্মে গেছে এত দিনে।
###
বেঙ্গালুরু স্টেশনে নেমে আর হাসপাতাল অবধি পৌঁছাতে পারবে কিনা বুঝতে পারছিল না লীনা। এই বিদেশ বিভুঁইয়ে কথ্য বাংলার বাইরে একটি শব্দ তার জানা নেই। কোনও রকমে দু-চারটি হিন্দি শব্দ হয়তো আয়ত্ত করেছে। সঙ্গে থাকা সমুর দূর সম্পর্কের ভাইটিরও একই দশা। ট্রেনে বারকয়েক বমি হয়ে প্রায় স্বর্গদ্বারে পৌঁছেই গিয়েছিল সমু। কপাল জোরে ফিরে এসেছে ঠিকই কিন্তু স্টেশনে নেমে প্রায় সংজ্ঞাহীন হয়ে আছে।
এর আগে গত পনেরোটি দিনে এক ঝড় বয়ে গেছে প্রকাশ-চুমকি-লীনাদের উপর দিয়ে। ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচার শেষ চেষ্টার মতো সবাই মিলে বিভিন্ন সহৃদয় ব্যক্তি ও সংগঠনের দ্বারস্থ হয়ে বেশ কিছু টাকা সংগ্রহ করে সমুকে বেঙ্গালুরু পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। সকাল সন্ধ্যা অফিসের আগে পরে লীনাকে স্কুটারের পিছনে বসিয়ে দরজায় দরজায় ঘুরেছে প্রকাশ। কেউ মুখ ফেরায়নি, মানবিকতা হারিয়ে যায়নি আজো। চুমকিও পাড়ার বান্ধবী সজ্জনদের নিয়ে করে গেছে অসাধ্য সাধন। শেষ পর্যন্ত রওয়ানা করে দেওয়ার মতো একটা উপায় হয়েছে। সমু চোখের সামনে অন্ধকার দেখছে। ওরা রওয়ানা হওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় হঠাৎ করে খেয়ালের বশে প্রকাশ কম্প্যুটারে বসে একটি ই-মেল লিখল বেঙ্গালুরুর বিখ্যাত সার্জন দেবী শেঠীকে -
“আপনার কথা
অনেক শুনেছি স্যার। ভগবান বলে কেউ আছেন কিনা জানি না কিন্তু আপনারাই আমাদের প্রকৃত
ভগবান। একটি গরিব দম্পতিকে পাঠাচ্ছি আপনার ভরসায়। আশা করি ভগবানের আশীর্বাদ থেকে
বঞ্চিত হবে না ওরা।”
সমুদের নামধাম জানিয়ে ছেড়ে দিল মেল। লীনার কাছে সমঝে দিল ডাক্তার শেঠীর ফোন নম্বর। ওদিকে শনিবার বন্ধের দিন সন্ধ্যার পর ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যে কোনওরকমে সমুকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছালো লীনারা। পৌঁছেই ফোন করল প্রকাশকে। প্রকাশ একটি এসএমএস ছেড়ে দিল ডাক্তার শেঠীর কাছে - স্যার। ওরা পৌঁছে গেছে হাসপাতালে।
এর পর যা হলো তা সবটুকুই এক চমৎকারিত্বের আখ্যান। ডাক্তার তখন ছুটির আমেজে নিজের ঘরে। রাত প্রায় দশটা। ফোন এল হাসপাতালের রিসেপশনে -
“মিঃ সমু বলে পেশেন্ট এসেছে। এক্ষুনি ইমার্গেন্সিতে নিয়ে যাও, আমি আসছি।”
সেই যে শুরু হলো দৌড়ঝাঁপ, তার শেষ হলো প্রায় দেড় মাস পর। একগুচ্ছ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে তিন তিন বার মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে অবশেষে অপারেশন করা গেলো সমুর এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকল সে। তবে কিছু ওষুধ সারা জীবন খেতে হবে বলে দিলেন ডাক্তার এবং সাথে কিছু টেস্ট রুটিনমাফিক করিয়ে যেতে হবে। সবচাইতে যে কথাটি অবাক করার মতো তা হলো এই যে এই দেড় মাসের সব খরচাপাতি মিলে সমুদের ব্যয় হলো নামমাত্র। অপারেশনের খরচ থেকে শুরু করে লীনাদের থাকা খাওয়া পর্যন্ত সব কিছু ফ্রীতে হলো। লীনার অবাধ যাতায়াত ছিল হাসপাতালে। অবোধ্য ভাষায় ডাক্তার নার্সদের সঙ্গে সব কথাই বলত লীনা। বুঝতও সবাই। সমু তো সবার কাছে এক বিস্ময়। হাসপাতালের সব ডাক্তার নার্সরা একডাকে সমুকে চেনে। চুমকি ঠিকই বলত - লীনার উপর সত্যি সত্যি ভগবানের হাত আছে।
ফিরে এসে সাবধানতার অবলম্বনে বছর পাঁচেক ধরে মোটামুটি ভালোভাবেই দিন চলতে থাকল সমুদের।
###
এবার নির্ঘাত এক বিকৃত শিশুর জন্ম দেবে লীনা। দ্বিতীয়বারের মতো লীনার গর্ভবতী হওয়ার প্রায় মাস ছয়েক পর যে ঘটনাটি ঘটলো তার জেরেই এমন কুকথা বেরিয়ে এল প্রকাশের মুখ থেকে। চুমকি বলল -
- লীনার সাথে ভগবান আছেন। তুমি দেখো, কিচ্ছুটি হবে না।
প্রকাশ ভরসা পায় না। গর্ভের দু’মাস পর থেকেই লীনার খাওয়াদাওয়া প্রায় বন্ধ। ডাক্তারের দেওয়া পুষ্টিবর্ধক খাদ্য তো দূরের কথা সামান্য ডালভাতও খেতে পারে না। পেট জুড়ে অসংখ্য সমস্যা। ক্রমাগত গ্যাসট্রিকসদৃশ জ্বালাপোড়া। এর মধ্যে একদিন পড়ে গেল কলতলায়। তড়িঘড়ি করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। না বাচ্চার কোন মুভমেন্ট নেই। নৈরাশ্য যখন চরমে তখনই প্রকাশিতব্য প্রাণের স্পন্দন ধরা পড়লো যান্ত্রিক চোখে। বাড়ি ফিরে এল লীনা। সাত মাসের সময় একদিন ঘরের ইলেকট্রিক সুইচে হাত দিয়ে আটকে গেল লীনা। কেউ নেই ঘরে। মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিল না। প্রাণপণে আরেকটি হাত কোনরকমে বাড়িয়ে সুইচটি শুধু অফ করতে পেরেছিল আর কিচ্ছু বলতে পারে না। বহু সময় অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকার পর পাশের ঘরের কেউ একজন এসে দেখে সমুকে ফোন করায় সমু এসে আবার হাসপাতালে নিয়ে যায় লীনাকে। খর্বকায় লীনার বাচ্চাসহ ওজন তখন মোটে পঁয়ত্রিশ কেজি। সবাইকে অবাক করে দেখা গেল বাচ্চা সহ মা ঠিকই আছে। এই যখন অবস্থা তখন প্রকাশের মুখ থেকে এমন স্বগতোক্তি বেরিয়ে আসা অস্বাভাবিক নয় মোটেও।
ততদিনে প্রকাশরা বদলি হয়ে চলে এসেছে অন্য শহরে। নিত্য যোগাযোগ হয় ফোনে। লীনা আর চুমকি তো বলতে গেলে প্রতিদিনই খবরাখবর আদানপ্রদান করে। তার কিছুটা যায় প্রকাশের কানে, বাকিটা অপ্রকাশিতই থেকে যায়।
###
ফেব্রুয়ারির শেষটায় এসে এই শহরে শীতের প্রকোপ অন্যান্য বছর অনেকটাই কমে যায়। এবার যেন তার ব্যতিক্রম। কিছুতেই কমছে না কনকনে শীতের জ্বালা। স্বভাবতই ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায় অনেকটা। সেদিনও তেমনি ঘুমেই ছিল প্রকাশ। হঠাৎ চুমকি এসে ডেকে ওঠায় প্রকাশকে। চুমকির গলায় উত্তেজনার পারদ। প্রকাশকে একরকম ধাক্কা মেরে জাগিয়ে বলে - “লীনার একটি মেয়ে হয়েছে। একেবারে ফুটফুটে, তিন কেজি ওজন।”
তড়াক করে বিছানায় উঠে বসে প্রকাশ।
চুমকির থামার লক্ষণ নেই - “কী আশ্চর্য জানো ? যে ডাক্তারের অধীনে লীনা ছিল সেই ডাক্তার মানালি গেছে ছুটি কাটাতে। এমন সময় কাল রাত থেকেই লীনার পেট ব্যথা। সমুর ফার্মাসিতে বসেন যে ডাক্তার তাঁর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি রাতেই নার্সিং হোমে আসতে বলেন লীনাকে নিয়ে। সেখানে এসে পরীক্ষানিরীক্ষার পর বলেন রাতেই অপারেশন করতে হবে। অথচ নিয়মিত ডাক্তারের তো খবর নেই। সেই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এলেন প্রসূতি বিভাগের আরেকজন ডাক্তার। এর পর শেষরাতে নাদুসনুদুস, ফর্সা কন্যাশিশুটির জন্ম। এই মাত্র সব জানিয়ে ফোন করেছিল সমু। আমি বলেছিলাম না, লীনার উপর সর্বশক্তিমানের হাত আছে ?”
আবারও এক অবিশ্বাস্য খবর। আবারও নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না প্রকাশ। কিছু বাস্তব যেন একেবারেই রূপকথার মতো শোনায় কখনো কখনো। চোখ যায় সামনের দেওয়ালে মিটিমিটি হাসিতে ঝুলতে থাকা ভগবানের ছবিটির দিকে। লীনার কথা ভাবতে ভাবতেই একের পর এক যুদ্ধশেষে বিজয়ীর মুকুট পরা ছোট্ট দেবশিশুটির একটি নাম স্বগতোক্তির মতো বেরিয়ে এল প্রকাশের ভেতর থেকে - ‘বিজয়িনী’।
ছ’দিনের মাথায় ছবি এল বিজয়িনীর। বেঙ্গালুরুর সেই হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সদের পাঠানো উপহার পাশে নিয়ে মিটিমিটি হাসছে বিজয়িনী - ভগবানের সন্তান।
খবরটি যেদিন প্রথম শুনল, সেদিন নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না প্রকাশ।
- সত্যি বলছ ?
- হ্যাঁ। এইমাত্র পেলাম খবরটা। - চুমকির চোখে মুখে খুশির মনমাতানো ঝিলিক।
- কী করে হলো ? - কথার পৃষ্ঠে প্রশ্নটি করেই খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে প্রকাশ।
- তিনি চাইলে এমনটাই হয়, বুঝলে ?
একরাশ খুশির দমকা হাওয়া যেন ফুরফুরে করে দিচ্ছিল প্রকাশেরও মন-প্রাণ। সমু ও লীনার বিয়ের রাতের সেই মনমাতানো গানের সঙ্গের উদ্দাম নাচের দৃশ্যটি বার বার এসে ভাসছিল চোখের সামনে। নতুন নাচের গান এসেছে বাজারে। শুনলে কিশোর কিশোরী থেকে শুরু করে যুবক যুবতিদের পা দু’টি ছন্দময় হয়ে ওঠে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। তার উপর বিয়েবাড়ির আনন্দ বলে কথা। আর সেই বিয়ে যদি হয় সমুর মতো কাছের কারো।
অথচ সমু কিংবা লীনা প্রকাশের কে-ই বা হয় ? আপাতঃ অর্থে কেউই না। আবার ভাবতে গেলে অন্তরের একেবারে কাছের দু’জন তো বটেই। প্রথমে পাড়াতুতো সম্পর্কে পরিচয়। তার পর সুখে দুঃখে কাছে আসতে আসতে এখন যেন নিজেরই কেউ হয়ে উঠেছে এই দুই কপোত কপোতি। বিয়ের আগে সমু দস্তুর মতো অনুমতি নেওয়ার মতো করে আলোচনা করেছে প্রকাশের সঙ্গে। আসলে সমুর নিজের লোক তো থেকেও নেই। তাই কী করে যেন প্রকাশই হয়ে উঠেছে তার সবচাইতে কাছের। প্রকাশ যতটুকু না, তার চাইতেও বেশি কাছের যেন চুমকি - প্রকাশের বউ। চুমকি ওদের দিদি আর প্রকাশ দাদা।
বছর দুয়েকের মাথায় এল সেই পিলে চমকে দেওয়ার মতো খবর। লীনা অন্তঃসত্ত্বা। এই দু’বছরে সমুর হার্টের সমস্যা বেড়েছে অনেকটা। সুতরাং এই খবরটি সবার মনে নিয়ে এল এক অপার খুশির বার্তা। কিন্তু সে খুশি বেশিদিন দীর্ঘ হলো না। এক বর্ষার বৃষ্টিদিনে হঠাৎ করে পেটের ভেতরে প্রচণ্ড ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো লীনাকে। দু’দিন থেকে ছাড়া পেল ঠিকই কিন্তু পেটের বাচ্চাটিকে আর নিয়ে ফিরতে পারল না। অকাল গর্ভপাতে সন্তানের মুখ আর দেখতে পেল না লীনা। সেই থেকে এই আশাটি প্রায় নির্বাপিতই হয়ে গেল সবার অন্তর থেকে। মানসিক অবসাদগ্রস্ততা থেকে বেরিয়ে আসতে চুমকির সহায়তা কোনদিনই ভুলতে পারবে না লীনা। এক চিলতে এক ভাড়া ঘরে দু’জনের সংসার চলছিল নিত্য অসুখবিসুখকে সঙ্গে করে। এর মধ্যে সন্তানের আশা নিতান্তই এক বাতুলতা। সমুর অবস্থাও দিন দিন খারাপের দিকে। প্রায়ই কাজে যেতে পারে না সমু। ফার্মাসির মালিক খুবই সহৃদয় ছিলেন বলে যা বাঁচোয়া। লীনা আজকাল টুকটাক সেলাই এর কাজ করে কিছু টাকা হাত খরচ বের করে নেয়।
দেবদ্বিজে অগাধ ভক্তি লীনার। মন্দিরে মন্দিরে তার নিত্য যাতায়াত। মাঝে মাঝে এমন কিছু কথা বলে যে তা প্রকাশের বা চুমকির বিশ্বাসই হয় না। কী সব স্বপ্নে দেখার কথা বলে। আজকের দিনে কোথায় সেই ভক্তি আর কোথায় ভগবান ? এর মধ্যে সমুর শারীরিক অবস্থার অনেকটাই অবনতি হতে লাগলো। ডাক্তার বলে দিয়েছেন এবার অপারেশন ছাড়া আর গত্যন্তর নেই। এবং তা তাড়াতাড়িই করতে হবে। কিন্তু হার্টের অপারেশন করার মতো সেই ক্ষমতা কোথায় সমুর ? হাজার টাকাই যেখানে সমস্যা সেখানে লাখ টাকার অপারেশনের স্বপ্নই বা দেখে কী করে সমু ? লীনা হত্যে দিয়ে পড়ে প্রকাশ-চুমকির কাছে। কেমন মায়া জন্মে গেছে এত দিনে।
###
বেঙ্গালুরু স্টেশনে নেমে আর হাসপাতাল অবধি পৌঁছাতে পারবে কিনা বুঝতে পারছিল না লীনা। এই বিদেশ বিভুঁইয়ে কথ্য বাংলার বাইরে একটি শব্দ তার জানা নেই। কোনও রকমে দু-চারটি হিন্দি শব্দ হয়তো আয়ত্ত করেছে। সঙ্গে থাকা সমুর দূর সম্পর্কের ভাইটিরও একই দশা। ট্রেনে বারকয়েক বমি হয়ে প্রায় স্বর্গদ্বারে পৌঁছেই গিয়েছিল সমু। কপাল জোরে ফিরে এসেছে ঠিকই কিন্তু স্টেশনে নেমে প্রায় সংজ্ঞাহীন হয়ে আছে।
এর আগে গত পনেরোটি দিনে এক ঝড় বয়ে গেছে প্রকাশ-চুমকি-লীনাদের উপর দিয়ে। ডুবন্ত মানুষের খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচার শেষ চেষ্টার মতো সবাই মিলে বিভিন্ন সহৃদয় ব্যক্তি ও সংগঠনের দ্বারস্থ হয়ে বেশ কিছু টাকা সংগ্রহ করে সমুকে বেঙ্গালুরু পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। সকাল সন্ধ্যা অফিসের আগে পরে লীনাকে স্কুটারের পিছনে বসিয়ে দরজায় দরজায় ঘুরেছে প্রকাশ। কেউ মুখ ফেরায়নি, মানবিকতা হারিয়ে যায়নি আজো। চুমকিও পাড়ার বান্ধবী সজ্জনদের নিয়ে করে গেছে অসাধ্য সাধন। শেষ পর্যন্ত রওয়ানা করে দেওয়ার মতো একটা উপায় হয়েছে। সমু চোখের সামনে অন্ধকার দেখছে। ওরা রওয়ানা হওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় হঠাৎ করে খেয়ালের বশে প্রকাশ কম্প্যুটারে বসে একটি ই-মেল লিখল বেঙ্গালুরুর বিখ্যাত সার্জন দেবী শেঠীকে -
সমুদের নামধাম জানিয়ে ছেড়ে দিল মেল। লীনার কাছে সমঝে দিল ডাক্তার শেঠীর ফোন নম্বর। ওদিকে শনিবার বন্ধের দিন সন্ধ্যার পর ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্যে কোনওরকমে সমুকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছালো লীনারা। পৌঁছেই ফোন করল প্রকাশকে। প্রকাশ একটি এসএমএস ছেড়ে দিল ডাক্তার শেঠীর কাছে - স্যার। ওরা পৌঁছে গেছে হাসপাতালে।
এর পর যা হলো তা সবটুকুই এক চমৎকারিত্বের আখ্যান। ডাক্তার তখন ছুটির আমেজে নিজের ঘরে। রাত প্রায় দশটা। ফোন এল হাসপাতালের রিসেপশনে -
“মিঃ সমু বলে পেশেন্ট এসেছে। এক্ষুনি ইমার্গেন্সিতে নিয়ে যাও, আমি আসছি।”
সেই যে শুরু হলো দৌড়ঝাঁপ, তার শেষ হলো প্রায় দেড় মাস পর। একগুচ্ছ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে তিন তিন বার মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে অবশেষে অপারেশন করা গেলো সমুর এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকল সে। তবে কিছু ওষুধ সারা জীবন খেতে হবে বলে দিলেন ডাক্তার এবং সাথে কিছু টেস্ট রুটিনমাফিক করিয়ে যেতে হবে। সবচাইতে যে কথাটি অবাক করার মতো তা হলো এই যে এই দেড় মাসের সব খরচাপাতি মিলে সমুদের ব্যয় হলো নামমাত্র। অপারেশনের খরচ থেকে শুরু করে লীনাদের থাকা খাওয়া পর্যন্ত সব কিছু ফ্রীতে হলো। লীনার অবাধ যাতায়াত ছিল হাসপাতালে। অবোধ্য ভাষায় ডাক্তার নার্সদের সঙ্গে সব কথাই বলত লীনা। বুঝতও সবাই। সমু তো সবার কাছে এক বিস্ময়। হাসপাতালের সব ডাক্তার নার্সরা একডাকে সমুকে চেনে। চুমকি ঠিকই বলত - লীনার উপর সত্যি সত্যি ভগবানের হাত আছে।
ফিরে এসে সাবধানতার অবলম্বনে বছর পাঁচেক ধরে মোটামুটি ভালোভাবেই দিন চলতে থাকল সমুদের।
###
এবার নির্ঘাত এক বিকৃত শিশুর জন্ম দেবে লীনা। দ্বিতীয়বারের মতো লীনার গর্ভবতী হওয়ার প্রায় মাস ছয়েক পর যে ঘটনাটি ঘটলো তার জেরেই এমন কুকথা বেরিয়ে এল প্রকাশের মুখ থেকে। চুমকি বলল -
- লীনার সাথে ভগবান আছেন। তুমি দেখো, কিচ্ছুটি হবে না।
প্রকাশ ভরসা পায় না। গর্ভের দু’মাস পর থেকেই লীনার খাওয়াদাওয়া প্রায় বন্ধ। ডাক্তারের দেওয়া পুষ্টিবর্ধক খাদ্য তো দূরের কথা সামান্য ডালভাতও খেতে পারে না। পেট জুড়ে অসংখ্য সমস্যা। ক্রমাগত গ্যাসট্রিকসদৃশ জ্বালাপোড়া। এর মধ্যে একদিন পড়ে গেল কলতলায়। তড়িঘড়ি করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। না বাচ্চার কোন মুভমেন্ট নেই। নৈরাশ্য যখন চরমে তখনই প্রকাশিতব্য প্রাণের স্পন্দন ধরা পড়লো যান্ত্রিক চোখে। বাড়ি ফিরে এল লীনা। সাত মাসের সময় একদিন ঘরের ইলেকট্রিক সুইচে হাত দিয়ে আটকে গেল লীনা। কেউ নেই ঘরে। মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছিল না। প্রাণপণে আরেকটি হাত কোনরকমে বাড়িয়ে সুইচটি শুধু অফ করতে পেরেছিল আর কিচ্ছু বলতে পারে না। বহু সময় অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকার পর পাশের ঘরের কেউ একজন এসে দেখে সমুকে ফোন করায় সমু এসে আবার হাসপাতালে নিয়ে যায় লীনাকে। খর্বকায় লীনার বাচ্চাসহ ওজন তখন মোটে পঁয়ত্রিশ কেজি। সবাইকে অবাক করে দেখা গেল বাচ্চা সহ মা ঠিকই আছে। এই যখন অবস্থা তখন প্রকাশের মুখ থেকে এমন স্বগতোক্তি বেরিয়ে আসা অস্বাভাবিক নয় মোটেও।
ততদিনে প্রকাশরা বদলি হয়ে চলে এসেছে অন্য শহরে। নিত্য যোগাযোগ হয় ফোনে। লীনা আর চুমকি তো বলতে গেলে প্রতিদিনই খবরাখবর আদানপ্রদান করে। তার কিছুটা যায় প্রকাশের কানে, বাকিটা অপ্রকাশিতই থেকে যায়।
###
ফেব্রুয়ারির শেষটায় এসে এই শহরে শীতের প্রকোপ অন্যান্য বছর অনেকটাই কমে যায়। এবার যেন তার ব্যতিক্রম। কিছুতেই কমছে না কনকনে শীতের জ্বালা। স্বভাবতই ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায় অনেকটা। সেদিনও তেমনি ঘুমেই ছিল প্রকাশ। হঠাৎ চুমকি এসে ডেকে ওঠায় প্রকাশকে। চুমকির গলায় উত্তেজনার পারদ। প্রকাশকে একরকম ধাক্কা মেরে জাগিয়ে বলে - “লীনার একটি মেয়ে হয়েছে। একেবারে ফুটফুটে, তিন কেজি ওজন।”
তড়াক করে বিছানায় উঠে বসে প্রকাশ।
চুমকির থামার লক্ষণ নেই - “কী আশ্চর্য জানো ? যে ডাক্তারের অধীনে লীনা ছিল সেই ডাক্তার মানালি গেছে ছুটি কাটাতে। এমন সময় কাল রাত থেকেই লীনার পেট ব্যথা। সমুর ফার্মাসিতে বসেন যে ডাক্তার তাঁর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি রাতেই নার্সিং হোমে আসতে বলেন লীনাকে নিয়ে। সেখানে এসে পরীক্ষানিরীক্ষার পর বলেন রাতেই অপারেশন করতে হবে। অথচ নিয়মিত ডাক্তারের তো খবর নেই। সেই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এলেন প্রসূতি বিভাগের আরেকজন ডাক্তার। এর পর শেষরাতে নাদুসনুদুস, ফর্সা কন্যাশিশুটির জন্ম। এই মাত্র সব জানিয়ে ফোন করেছিল সমু। আমি বলেছিলাম না, লীনার উপর সর্বশক্তিমানের হাত আছে ?”
আবারও এক অবিশ্বাস্য খবর। আবারও নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না প্রকাশ। কিছু বাস্তব যেন একেবারেই রূপকথার মতো শোনায় কখনো কখনো। চোখ যায় সামনের দেওয়ালে মিটিমিটি হাসিতে ঝুলতে থাকা ভগবানের ছবিটির দিকে। লীনার কথা ভাবতে ভাবতেই একের পর এক যুদ্ধশেষে বিজয়ীর মুকুট পরা ছোট্ট দেবশিশুটির একটি নাম স্বগতোক্তির মতো বেরিয়ে এল প্রকাশের ভেতর থেকে - ‘বিজয়িনী’।
ছ’দিনের মাথায় ছবি এল বিজয়িনীর। বেঙ্গালুরুর সেই হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সদের পাঠানো উপহার পাশে নিয়ে মিটিমিটি হাসছে বিজয়িনী - ভগবানের সন্তান।
Comments
Post a Comment