Skip to main content

'আমি শরণার্থী নই' - দীপিকা বিশ্বাস


কবিতায় উন্মোচিত নির্মম বাস্তবের বাখান - ‘আমি শরণার্থী নই

 

বাস্তব প্রেক্ষাপটে শরণার্থী শব্দটিকে যদি কাটাছেঁড়া করা যায় তাহলে অভিধানের তোয়াক্কা না করে শেষ নির্যাসে যে কথাটি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে তা হলো - আজীবন ভিনদেশির তকমা এঁটে অবৈধ বসবাসকারী - তা সে শতাব্দী প্রাচীন হলেও আপত্তির কিছু নেই কঠিন, কঠোর হিংসাজনিত মনোভাব এবং অশিক্ষা তথা মগজ ধোলাইজনিত কারণে শব্দগুলো সব সময় অভিধান মেনে চলতে পারে না জনগণের সম্মিলিত মিথ্যা, জন, ধন ও পেশীবলের ক্ষমতায় শব্দগুলো বদলে যায় কালের নিয়মে মিথ্যার উপর ভিত্তি করে লিখিত হয় ইতিহাস সেই ইতিহাস স্বভাবতই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে না পেরে বঞ্চনা ও ভুলের ফাঁদে আটকে দেয় সহজ সত্যকে আর এভাবেই পৃথিবীর ইতিহাসে লিখা হয় নিত্য দিনের ভুলের খতিয়ান, যে খতিয়ানে লিখা থাকে অগণিত জনতার অপ্রকাশিত দীর্ঘশ্বাস
তেমনি এক অশ্রুসজল দীর্ঘশ্বাসের প্রকাশিত সংস্করণ হলো কবি দীপিকা বিশ্বাসের সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ - ‘আমি শরণার্থী নই সত্য বাস্তবকে এভাবেই নির্মোহ উচ্চারণে বলে যেতে হয় সমক্ষে। শুধু দুই মলাট নয়, দুই কবিতার মধ্যে তাই অগণিত সত্যকে উচ্চারণ করেছেন কবি আপন ভাষ্যে। প্রথম ও শেষ কবিতার উল্লেখ তাই প্রাসঙ্গিক। প্রথম কবিতা - ‘আমি শরণার্থী নই’ -
এক আকাশ মেঘের নীচে
ছুটে আসি একফালি জলের ধারে
অথবা নতমুখ গাছের ছায়ায়
সবুজ লঙ্কার অক্ষরে কত শতবার লিখেছি
পান্তা অথবা একজলে ফোটানো
ঝরঝরে ভাতের পরব
রোদে উজ্জ্বল মায়ের আঁচলে মাথা রেখে
যুগান্তের সঞ্চিত খননে
উঠে এসেছি এই তো আমি
এব আর সি-ছুট
ঘরছুট নই।
শেষ কবিতা - ‘আশ্রয়’ -
আমি শরণার্থী নই
ভাত চাইনি তোমার কাছে
পোশাকও চাইনি
তোমাকে গাছ ভেবে
ছায়া চেয়েছি মাত্র।
কবিতার মোড়কে এক গুচ্ছ কবিতা কথা বলেছে আত্মপ্রত্যয় নিয়ে, নদীর নিরবচ্ছিন্ন স্রোতধারার মতো নস্টালজিয়া কবিকে কাঁদায় কিছু পংক্তি অক্লেশে এসে ধরা দেয় কবিতায় -
আমাকে ডাকছে ভারতবর্ষ
তুমি কি ব্রহ্মপুত্র পারের মেয়ে
বরাকে ফেলেছ নোঙর ?
…… তুমি কি অসমদেশের মেয়ে ?
…… লজ্জা এটুকুই, সন্তানকে পরিচয় প্রমাণ দিতে হচ্ছে মায়ের কাছে
(কবিতা - জয় আই অসম)
কবি দীপিকার কবিতায় উঠে আসে বহু অবক্ষয়, বহু অবর্ণনীয় দুঃখব্যথা সমাজের বহু ধ্বংসাত্মক মর্মগাথা আছে অপসৃয়মান সংসার বোধের পীড়া, আছে শিশু নিপীড়নের মতো অন্যায় অবিচারের প্রতি দৃকপাত কবিতার অসাধারণ চরণ ধরে বর্ণিত হয় মনের গহীনে জেগে ওঠা প্রতিবাদ -
নদী তুমি খেলে যাও
পাতাল খুড়ে তুলে আনো জলের আলো
নির্জীব ফসলে ঢালো উৎসব
আরো একটা কাজ করো, নদী
জলের প্রলয়ে ভাসাও বিকৃত নখর
গুঁড়িয়ে দাও অপৌরুষ ক্ষমতাগুলি
নপুংসক করো সেইসব পুরুষদের
যারা একটা শিশুকেও নারী ভাবে
কখনো সহোদর হয় না কারো ……
(কবিতা - প্রলম্বিত বর্ণমালা)
৪৮ পৃষ্ঠা জুড়ে আছে কবির মোট ৩৯ টি কবিতা। তিন লাইন থেকে তিন পৃষ্ঠাজোড়া কবিতা। কিছু কবিতা আপন ছন্দে যেন বহু কথা বলে। মাঝে মাঝে দিক পরিবর্তন করে চলে যায়, হারিয়ে যায় অজানায়। কিছু কবিতা বিশেষোল্লেখের দাবিও রাখে। যেমন - উড়ানের আগে, বিষাদ বর্ণমালা, নদীকথা, বাবা, কাঙাল ইত্যাদি।
এত এত বিষাদের মাঝে প্রত্যয়ের সুরও আসে ভেসে। যেন শেষ কথা ঝরে পড়ে নিরুদ্বিগ্ন উচ্চারণে -
আর কোন উচ্ছেদ নয়
বড় বড় গাছ পুঁতে জঙ্গলে সাজাবো জন্মভূমি
সব শহর এক একটা জংগল হয়ে যাবে আবার
অরণ্যে রচিত হবে পাখিদের গান
আর, গাঙশালিকের উদ্দাম চিৎকার বলে দেবে
সব জলাশয় সবার ডানা ভেজাবার।
(কবিতা - উচ্ছেদ)।
যেন ভেসে আসে মহেশ গল্পের সেই ফরিয়াদ - ‘আল্লা ..., যে তোমার দেওয়া মাঠের ঘাস, তোমার দেওয়া তেষ্টার জল তাকে খেতে দেয়নি তার কসুর তুমি যেন কখনো মাফ করো না।’
বানান, শব্দ সংযোজন, বাক্য বিন্যাস যথাযথ। ভিকি পাবলিশার্স, গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটির ব্লার্বে আছে কবির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং জীবনের নানা প্রাপ্তির বর্ণনা। কাব্যগ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন তাঁর বাবা এবং বুলি-কে যারা সবসময় তাঁর কান্নায় মিশে আছে এবং তাঁর মা-কে যিনি তাঁকে লিখার সুযোগ করে দেন।
পড়তে পড়তে একটা নেশায় যেন পেয়ে যায় পাঠককে। এবং মনে হয় আরো কিছু কবিতা থাকলে ভালো হতো। যেন সময়ের আগেই সমাপ্তিরেখা টেনে দেওয়া হলো।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

‘আমি শরণার্থী নই’
দীপিকা বিশ্বাস
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫০৪৩৮৭৪ 

Comments

  1. অসাধারণ, অতুলনীয় আলোচনা। আমার পরম সৌভাগ্য, "আমি শরণার্থী নই" বইখানি আমার একাধিকবার পড়া -- স্বয়ং কবির হাত থেকে পেয়েছিলাম উপহার। বিদ্যুৎবাবু, আপনার আলোচনা সংক্ষিপ্ত, তবুও সমগ্র কবিতা গ্রন্থের নির্যাসকে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে হ্রস্ব পরিসরে। আমার অভিবাদন।

    ReplyDelete
  2. পত্রিকার পরিসরের কথা চিন্তা করে আলোচনা দীর্ঘ করার কোনও অবকাশ নেই। মন্তব্যের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...