কবিতায় উন্মোচিত নির্মম বাস্তবের বাখান - ‘আমি শরণার্থী নই’
বাস্তব প্রেক্ষাপটে শরণার্থী শব্দটিকে
যদি কাটাছেঁড়া করা যায় তাহলে অভিধানের তোয়াক্কা না করে শেষ নির্যাসে যে কথাটি পরিস্ফুট
হয়ে ওঠে তা হলো - আজীবন ভিনদেশির তকমা এঁটে অবৈধ বসবাসকারী - তা সে শতাব্দী
প্রাচীন হলেও আপত্তির কিছু নেই। কঠিন, কঠোর হিংসাজনিত মনোভাব
এবং অশিক্ষা তথা মগজ ধোলাইজনিত কারণে শব্দগুলো সব সময় অভিধান মেনে চলতে পারে না। জনগণের সম্মিলিত মিথ্যা, জন, ধন ও পেশীবলের ক্ষমতায় শব্দগুলো বদলে যায় কালের নিয়মে। মিথ্যার উপর ভিত্তি করে লিখিত হয় ইতিহাস। সেই ইতিহাস স্বভাবতই সত্যের কাছাকাছি
পৌঁছাতে না পেরে বঞ্চনা ও ভুলের ফাঁদে আটকে দেয় সহজ সত্যকে। আর এভাবেই পৃথিবীর ইতিহাসে লিখা হয়
নিত্য দিনের ভুলের খতিয়ান,
যে খতিয়ানে লিখা থাকে অগণিত জনতার অপ্রকাশিত দীর্ঘশ্বাস।
তেমনি এক অশ্রুসজল দীর্ঘশ্বাসের প্রকাশিত সংস্করণ হলো কবি দীপিকা বিশ্বাসের সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ - ‘আমি শরণার্থী নই।’ সত্য বাস্তবকে এভাবেই নির্মোহ উচ্চারণে বলে যেতে হয় সমক্ষে। শুধু দুই মলাট নয়, দুই কবিতার মধ্যে তাই অগণিত সত্যকে উচ্চারণ করেছেন কবি আপন ভাষ্যে। প্রথম ও শেষ কবিতার উল্লেখ তাই প্রাসঙ্গিক। প্রথম কবিতা - ‘আমি শরণার্থী নই’ -
এক আকাশ মেঘের নীচে
ছুটে আসি একফালি জলের ধারে
অথবা নতমুখ গাছের ছায়ায়
সবুজ লঙ্কার অক্ষরে কত শতবার লিখেছি
পান্তা অথবা একজলে ফোটানো
ঝরঝরে ভাতের পরব
রোদে উজ্জ্বল মায়ের আঁচলে মাথা রেখে
যুগান্তের সঞ্চিত খননে
উঠে এসেছি এই তো আমি
এব আর সি-ছুট
ঘরছুট নই।
শেষ কবিতা - ‘আশ্রয়’ -
আমি শরণার্থী নই
ভাত চাইনি তোমার কাছে
পোশাকও চাইনি
তোমাকে গাছ ভেবে
ছায়া চেয়েছি মাত্র।
কবিতার মোড়কে এক গুচ্ছ কবিতা কথা বলেছে আত্মপ্রত্যয় নিয়ে, নদীর নিরবচ্ছিন্ন স্রোতধারার মতো। নস্টালজিয়া কবিকে কাঁদায়। কিছু পংক্তি অক্লেশে এসে ধরা দেয় কবিতায় -
আমাকে ডাকছে ভারতবর্ষ
তুমি কি ব্রহ্মপুত্র পারের মেয়ে
বরাকে ফেলেছ নোঙর ?
…… তুমি কি অসমদেশের
মেয়ে ?
…… লজ্জা এটুকুই, সন্তানকে পরিচয় প্রমাণ দিতে হচ্ছে মায়ের কাছে।
(কবিতা - জয় আই অসম)।
কবি দীপিকার কবিতায় উঠে আসে বহু অবক্ষয়, বহু অবর্ণনীয় দুঃখব্যথা। সমাজের বহু ধ্বংসাত্মক মর্মগাথা। আছে অপসৃয়মান সংসার বোধের পীড়া, আছে শিশু নিপীড়নের মতো অন্যায় অবিচারের প্রতি দৃকপাত। কবিতার অসাধারণ চরণ ধরে বর্ণিত হয় মনের গহীনে জেগে ওঠা প্রতিবাদ -
নদী তুমি খেলে যাও
পাতাল খুড়ে তুলে আনো জলের আলো
নির্জীব ফসলে ঢালো উৎসব
আরো একটা কাজ করো, নদী
জলের প্রলয়ে ভাসাও বিকৃত নখর
গুঁড়িয়ে দাও অপৌরুষ ক্ষমতাগুলি
নপুংসক করো সেইসব পুরুষদের
যারা একটা শিশুকেও নারী ভাবে
কখনো সহোদর হয় না কারো ……
(কবিতা - প্রলম্বিত বর্ণমালা)।
৪৮ পৃষ্ঠা জুড়ে আছে কবির মোট ৩৯ টি কবিতা। তিন লাইন থেকে তিন পৃষ্ঠাজোড়া কবিতা। কিছু কবিতা আপন ছন্দে যেন বহু কথা বলে। মাঝে মাঝে দিক পরিবর্তন করে চলে যায়, হারিয়ে যায় অজানায়। কিছু কবিতা বিশেষোল্লেখের দাবিও রাখে। যেমন - উড়ানের আগে, বিষাদ বর্ণমালা, নদীকথা, বাবা, কাঙাল ইত্যাদি।
এত এত বিষাদের মাঝে প্রত্যয়ের সুরও আসে ভেসে। যেন শেষ কথা ঝরে পড়ে নিরুদ্বিগ্ন উচ্চারণে -
আর কোন উচ্ছেদ নয়
বড় বড় গাছ পুঁতে জঙ্গলে সাজাবো জন্মভূমি
সব শহর এক একটা জংগল হয়ে যাবে আবার
অরণ্যে রচিত হবে পাখিদের গান
আর, গাঙশালিকের উদ্দাম চিৎকার বলে দেবে
সব জলাশয় সবার ডানা ভেজাবার।
(কবিতা - উচ্ছেদ)।
যেন ভেসে আসে মহেশ গল্পের সেই ফরিয়াদ - ‘আল্লা ..., যে তোমার দেওয়া মাঠের ঘাস, তোমার দেওয়া তেষ্টার জল তাকে খেতে দেয়নি তার কসুর তুমি যেন কখনো মাফ করো না।’
বানান, শব্দ সংযোজন, বাক্য বিন্যাস যথাযথ। ভিকি পাবলিশার্স, গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটির ব্লার্বে আছে কবির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং জীবনের নানা প্রাপ্তির বর্ণনা। কাব্যগ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন তাঁর বাবা এবং বুলি-কে যারা সবসময় তাঁর কান্নায় মিশে আছে এবং তাঁর মা-কে যিনি তাঁকে লিখার সুযোগ করে দেন।
পড়তে পড়তে একটা নেশায় যেন পেয়ে যায় পাঠককে। এবং মনে হয় আরো কিছু কবিতা থাকলে ভালো হতো। যেন সময়ের আগেই সমাপ্তিরেখা টেনে দেওয়া হলো।
তেমনি এক অশ্রুসজল দীর্ঘশ্বাসের প্রকাশিত সংস্করণ হলো কবি দীপিকা বিশ্বাসের সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ - ‘আমি শরণার্থী নই।’ সত্য বাস্তবকে এভাবেই নির্মোহ উচ্চারণে বলে যেতে হয় সমক্ষে। শুধু দুই মলাট নয়, দুই কবিতার মধ্যে তাই অগণিত সত্যকে উচ্চারণ করেছেন কবি আপন ভাষ্যে। প্রথম ও শেষ কবিতার উল্লেখ তাই প্রাসঙ্গিক। প্রথম কবিতা - ‘আমি শরণার্থী নই’ -
ছুটে আসি একফালি জলের ধারে
অথবা নতমুখ গাছের ছায়ায়
সবুজ লঙ্কার অক্ষরে কত শতবার লিখেছি
পান্তা অথবা একজলে ফোটানো
ঝরঝরে ভাতের পরব
রোদে উজ্জ্বল মায়ের আঁচলে মাথা রেখে
যুগান্তের সঞ্চিত খননে
উঠে এসেছি এই তো আমি
এব আর সি-ছুট
ঘরছুট নই।
শেষ কবিতা - ‘আশ্রয়’ -
আমি শরণার্থী নই
ভাত চাইনি তোমার কাছে
পোশাকও চাইনি
তোমাকে গাছ ভেবে
ছায়া চেয়েছি মাত্র।
কবিতার মোড়কে এক গুচ্ছ কবিতা কথা বলেছে আত্মপ্রত্যয় নিয়ে, নদীর নিরবচ্ছিন্ন স্রোতধারার মতো। নস্টালজিয়া কবিকে কাঁদায়। কিছু পংক্তি অক্লেশে এসে ধরা দেয় কবিতায় -
তুমি কি ব্রহ্মপুত্র পারের মেয়ে
বরাকে ফেলেছ নোঙর ?
…… লজ্জা এটুকুই, সন্তানকে পরিচয় প্রমাণ দিতে হচ্ছে মায়ের কাছে।
(কবিতা - জয় আই অসম)।
কবি দীপিকার কবিতায় উঠে আসে বহু অবক্ষয়, বহু অবর্ণনীয় দুঃখব্যথা। সমাজের বহু ধ্বংসাত্মক মর্মগাথা। আছে অপসৃয়মান সংসার বোধের পীড়া, আছে শিশু নিপীড়নের মতো অন্যায় অবিচারের প্রতি দৃকপাত। কবিতার অসাধারণ চরণ ধরে বর্ণিত হয় মনের গহীনে জেগে ওঠা প্রতিবাদ -
পাতাল খুড়ে তুলে আনো জলের আলো
নির্জীব ফসলে ঢালো উৎসব
আরো একটা কাজ করো, নদী
গুঁড়িয়ে দাও অপৌরুষ ক্ষমতাগুলি
নপুংসক করো সেইসব পুরুষদের
যারা একটা শিশুকেও নারী ভাবে
কখনো সহোদর হয় না কারো ……
৪৮ পৃষ্ঠা জুড়ে আছে কবির মোট ৩৯ টি কবিতা। তিন লাইন থেকে তিন পৃষ্ঠাজোড়া কবিতা। কিছু কবিতা আপন ছন্দে যেন বহু কথা বলে। মাঝে মাঝে দিক পরিবর্তন করে চলে যায়, হারিয়ে যায় অজানায়। কিছু কবিতা বিশেষোল্লেখের দাবিও রাখে। যেমন - উড়ানের আগে, বিষাদ বর্ণমালা, নদীকথা, বাবা, কাঙাল ইত্যাদি।
এত এত বিষাদের মাঝে প্রত্যয়ের সুরও আসে ভেসে। যেন শেষ কথা ঝরে পড়ে নিরুদ্বিগ্ন উচ্চারণে -
আর কোন উচ্ছেদ নয়
বড় বড় গাছ পুঁতে জঙ্গলে সাজাবো জন্মভূমি
সব শহর এক একটা জংগল হয়ে যাবে আবার
অরণ্যে রচিত হবে পাখিদের গান
আর, গাঙশালিকের উদ্দাম চিৎকার বলে দেবে
সব জলাশয় সবার ডানা ভেজাবার।
(কবিতা - উচ্ছেদ)।
যেন ভেসে আসে মহেশ গল্পের সেই ফরিয়াদ - ‘আল্লা ..., যে তোমার দেওয়া মাঠের ঘাস, তোমার দেওয়া তেষ্টার জল তাকে খেতে দেয়নি তার কসুর তুমি যেন কখনো মাফ করো না।’
বানান, শব্দ সংযোজন, বাক্য বিন্যাস যথাযথ। ভিকি পাবলিশার্স, গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটির ব্লার্বে আছে কবির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এবং জীবনের নানা প্রাপ্তির বর্ণনা। কাব্যগ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন তাঁর বাবা এবং বুলি-কে যারা সবসময় তাঁর কান্নায় মিশে আছে এবং তাঁর মা-কে যিনি তাঁকে লিখার সুযোগ করে দেন।
পড়তে পড়তে একটা নেশায় যেন পেয়ে যায় পাঠককে। এবং মনে হয় আরো কিছু কবিতা থাকলে ভালো হতো। যেন সময়ের আগেই সমাপ্তিরেখা টেনে দেওয়া হলো।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
‘আমি শরণার্থী নই’
দীপিকা বিশ্বাস
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫০৪৩৮৭৪
দীপিকা বিশ্বাস
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫০৪৩৮৭৪

অসাধারণ, অতুলনীয় আলোচনা। আমার পরম সৌভাগ্য, "আমি শরণার্থী নই" বইখানি আমার একাধিকবার পড়া -- স্বয়ং কবির হাত থেকে পেয়েছিলাম উপহার। বিদ্যুৎবাবু, আপনার আলোচনা সংক্ষিপ্ত, তবুও সমগ্র কবিতা গ্রন্থের নির্যাসকে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে হ্রস্ব পরিসরে। আমার অভিবাদন।
ReplyDeleteপত্রিকার পরিসরের কথা চিন্তা করে আলোচনা দীর্ঘ করার কোনও অবকাশ নেই। মন্তব্যের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
ReplyDelete