Skip to main content

মনোমোহন মিশ্রের ‘সিলেটি কুট্টি মহাভারত’


“মহাভারতের কথা অমৃত সমান, কাশীরাম দাস কহে শুনে পুণ্যবান।” এই পংক্তিটি বাংলা ভাষা সাহিত্যে অতি জনপ্রিয় এবং চিরস্থায়ী একটি পংক্তি। বাংলায় সবচেয়ে জনপ্রিয় মহাভারত অনুবাদক ছিলেন কবি কাশীরাম দাস। এরপর রয়েছে হরিসিদ্বান্ত তর্কবাগীশ এর ৪৩ খন্ডের মহাভারত। এরপর সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের সঞ্জয় ভট্ট নামে আরেকজন মহাভারতের বাংলা অনুবাদ করেন। সেটি 'সঞ্জয় ভারত' নামে পরিচিতি পায়। কিন্তু জানা যায় যে সঞ্জয়ের অনুবাদ কাশীরামেরও আগের। অর্থাৎ মহাভারতের অনুবাদে সিলেট সন্তানের অবদান অগ্রগণ্য।
তবে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা মহাভারত রচনাকার হিসাবে সঞ্জয়ের চাইতে চট্টগ্রামের পরমেশ্বর দাসের দিকে যুক্তির পাল্লা বেশি ভারি। হিসাবমতে পরাগলি মহাভারতনামে পরিচিত পরমেশ্বর দাসের পাণ্ডববিজয় কাব্য’ ‘সঞ্জয় ভারতেরপ্রায় ত্রিশ বছর আগে লেখা। কিন্তু সিলেটি বাংলাতে মহাভারতের অনুবাদ কিংবা সংক্ষিপ্ত সংস্করণের ইতিহাস সেভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি। হয়তো সেভাবে প্রচার ও অনুসন্ধানের অভাবে বহু তথ্য রয়ে গেছে অজানা।
তবে মহাভারতের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ সিলেটি ভাষাতেই রচিত হয়েছে এই করোনাকালে। বিধুভূষণ ভট্টাচার্যের সিলেটি মহাভারত।
মহাভারত কথার প্যাচ/আমির্তির লাখান
বিধুভূষণ ভটে কইরাম/সিলেটি বাখান
জানা মতে এতদিন এটাই ছিল মহাভারতের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পূর্ণ সংস্করণ। মাত্র হাজার খানেক শব্দের মধ্যে। এছাড়া সম্প্রতি বরাক বঙ্গের সাহিত্য ভুবন থেকে প্রকাশিত হইয়েছে অভিজিৎ চক্রবর্তীর ‘সিলেটি মহাভারত’। আনুমানিক আড়াই হাজার শব্দর মধ্যে এটি লিখিত
কিন্তু ইতোমধ্যে আসামের বরাক উপত্যকার বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক তথা সম্পাদক মনোমোহন মিশ্র লিখেছেন কুট্টি মহাভারত। রচনাকাল ২০০৭ সাল। মুদ্রিত বইয়ের বইয়ের প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সাল। সিলেটিতে কুট্টি মানে ছোট্ট। মাত্র ৭৫০ শব্দেই বর্ণিত হয়েছে মহাভারত। সুতরাং এযাবৎ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এটাই হবে মহাভারতের ক্ষুদ্রতম সংস্করণ।
সমাপ্তিতে মনোমোহনের পংক্তি -
“বড় বড় বীরর কিচ্ছা, আর গীতার সারকথা -
মনোমোহন মিশ্রয় কইন - আর লাগে কিতা।”
পাঠকের সুবিধার্থে ভিতরের শেষ প্রচ্ছদে আছে কিছু বিশেষ বিশেষ সিলেটি শব্দের বাংলা অর্থও।
‘প্রাক্‌ কথন’-এ অনুবাদকার এই অনুবাদের কারণ এবং গরজের উল্লেখ করে লিখছেন -
“ইদানীং মহাকাব্যগ্রন্থ ‘মহাভারত’ পাঠের সময়, সুযোগ অনেক কমে গেছে। ঘরে ঘরে অবশ্য-পাঠ্য এই গ্রন্থটি আজকাল বিশেষ পড়া হয় না। বলা বাহুল্য আজকের সময়ের প্রেক্ষিতেও মহাভারতের প্রত্যেকটি ঘটনা হুবহু মিলে যায়। বর্তমান কালের রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক যে কোন পরিকাঠামোতেই মহাভারতের প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনার মিল নজরে পড়ে। আজকের ব্যস্ততম জীবন যাপন এবং দীর্ঘ রচনা পাঠের প্রতি সাধারণের অনীহার কথা মনে রেখে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে বাংলার উপভাষা সিলেটিতে এই ‘কুট্টি মহাভারত’ রচনার প্রয়াস করলাম। গীতাসারও রচনার সঙ্গে যুক্ত করা হলো যাতে আজকের প্রজন্ম বাণীগুলি শ্রবণ তথা হৃদয়ঙ্গম করার প্রতি সচেতন হতে পারে...।।”
সাধু প্রচেষ্টা এবং আন্তরিক দায়বদ্ধতার এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন অবশ্যই - কিন্তু বিশাল এক ‘মহাভারত’কে ‘কুট্টি’ আকারে সন্নিবিষ্ট করা তো মোটেও সহজসাধ্য নয়। ‘কোনটা ছেড়ে কোনটা রাখি’ ধরণের এক দোদুল্যমানতার অবকাশ তো থেকেই যায়। এবং সেই জায়গাটিতে মনোমোহন দেখিয়েছেন এক অনবদ্য মুনশিয়ানা। মূল ঘটনা সমূহ এড়িয়ে যাননি কিছুই প্রায়। অতি বিচক্ষণতার সঙ্গে ৭৪ লাইন পয়ার ও ৪০ লাইন লাচাড়িতে লিপিবদ্ধ করেছেন সম্পূর্ণ মহাভারত।
শুরুটা এরকম -
‘হস্তিনাপুরর্‌ রাজা শান্তনুর বড় পুলা দেবব্রত মহাবীর
বাপর্‌ কথা মানলা যদি, তে করলা মনস্থির
রাজা বনতা নায়, বিয়াও করতা নায় - কাটলা যদি কিরা
নাম পড়ল ‘ভীস্ম’ তান নিজর ইচ্ছায় মরা।’
এর পর হস্তিনাপুরের বর্ণনা, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ শেষে পাণ্ডবের বনবাস ও অজ্ঞাতবাসের বর্ণনা, যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং গীতাসার একই পয়ারে লিখিত। গীতাসারের ভূমিকাটিও উল্লেখযোগ্য -
‘কুরু পাণ্ডবর যুদ্ধ যখন আরম্ভ হইবার জোগাড়
অর্জুনর মাথাত হামাইছিল আচানক এক বিচার;
কৌরবর দল-অ ভাই বন্ধু দেখি তান মন-অ লাগল দুখ
এরারে মারি রাজা বনি পাইবা কিজাত সুখ।
কৃষ্ণয় দেখলা লাগছে বেরা, অখন করা কিতা ?
বুঝ দিলা অর্জুনরে যেতা কইয়া। অউটা অইল ‘গীতা’।’
এরপর ১২ লাইনের গীতাসার শেষে -
‘কৃষ্ণর বিশ্বরূপ দেখি অর্জুন আচরিত অই গেলা
যুদ্ধ করার লাগি তখন তান গাণ্ডিব উঠাইলা।
রথর চালক যাঁর স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ ভগবান
তাইনর কিওর চিন্তা, তান কে নিতা পরাণ। ...
এরপর ত্রিপদী লাচাড়িতে যুদ্ধের বয়ান -
‘মহাভারতর মহারণ,
হুনলে ইতার বিবরণ,
গার লুম্‌ খাড়া অই যায় গিয়া।
কেবা বাঁচের, কেবা মরের,
কেবা বুকুত বল্লম মারের
কার কল্লা কোন্‌বায় উড়ি পড়ের গিয়া।...’
লাচাড়িতে যুদ্ধশেষে যুধিষ্ঠিরের স্বর্গারোহন পর্যন্ত সন্নিবিষ্ট হওয়ার পর উপসংহারে আছে -
‘ফুরাইল যদি মহাযুদ্ধ, রইল না আর কুন্তা
রাজা গেলা, রাজ্য গেল, জ্বলল - লাখে লাখে চিতা।
ধর্মর অইল জয়, আর অধর্মর পরাজয়,
‘গীতা’র বচন শুনি মাইন্‌ষে ধন্য ধন্য কয়।
বড় বড় বীরর কিচ্ছা ......।’
যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনায় বীর অভিমন্যুর পাশাপাশি বীর, বন্ধুবৎসল, দানবীর কর্ণেরও উল্লেখ কাঙ্ক্ষিত ছিল যদিও এত ক্ষুদ্র পরিসরে কত আর অগণিত চরিত্রকে সন্নিবিষ্ট করা যায় ? এতটুকুতেই যেন এক সম্পূর্ণ মহাভারত হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘কুট্টি মহাভারত’।    
প্রাক্‌ কথনে উল্লিখিত উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ সফল হয়েছে এ কথা নিশ্চিত। মহাভারতের সারাৎসার এই মিনিট দশেকের পঠনেই অনুধাবন করা গেল, হৃদয়ঙ্গম করা গেল নিশ্চিত। চার বাই ছয় ইঞ্চির আট পৃষ্ঠার এই ‘কুট্টি’ মহাভারতের প্রকাশক শ্রীমতী তুলসী মিশ্র। শিলচর সানগ্রাফিক্সের চিত্রাদি সম্বলিত স্পষ্ট ঝকঝকে মুদ্রণও প্রশংসার দাবি রাখে।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

‘সিলেটি কুট্টি মহাভারত’
মনোমোহন মিশ্র
মূল্য - ৩০ টাকা।

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...