Skip to main content

পথ চলার কাব্যগ্রন্থ - ‘কিছু শব্দ… কবিতা নয়’


এই তো সেদিনও ছিল ব্যস্ততা,
ট্রেন থামা স্টেশনের কোলাহলে
স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই ফেরে না সহজে
যারা গেছে, তারা গেছে অবহেলে
চলে যাব, দৃষ্টিতে চোখের শূন্যতা
এপিটাফে লিখে যাই জীবনের সমূহ ব্যর্থতা
 
এই যাত্রা, এই চলমানতা - এ যেন শেষের কবিতা কিন্তু বাস্তবে একেবারেই এক ভিন্ন চিত্রকল্প বলা যায় শেষের শুরু প্রথম কবিতার কিছু পঙ্‌ক্তি সেজে উঠেছে এভাবেই এবং৬৪ পৃষ্ঠার পুরো কাব্যগ্রন্থটি জুড়ে বজায় থেকেছে এই পথ চলার বৃত্তান্ত সাথে পারিপার্শ্বিকতার, সমাজের যত অনিয়ম, অব্যবস্থা তার বিরুদ্ধে একরাশ ঘৃণা, প্রতিবাদ এবং শ্লেষ নৈতিকতার পতন পীড়িত করে তোলে কবিমন।
বরাক মূলের কবি উজ্জ্বল দত্ত চৌধুরী জন্মসূত্রে এবং বর্তমানে কলকাতার বাসিন্দা হাতে এল তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ - ‘কিছু শব্দকবিতা নয় গ্রন্থের নামকরণে কবিতা নিয়ে যে দ্বিধা, যে জড়তা এবং সেই পথ চলা আর প্রতিবাদের ভাষা ব্যক্ত হয়েছে ভূমিকাতেও -
“... জীবনের বিভিন্ন সংগ্রামের সাথি হয়ে যে পথ চলা শুরু হয়েছিল কয়েক দশক আগে, আজও সেই সংগ্রাম অব্যাহত। এই সমাজের বুকে আর্থিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবন সংগ্রাম নিজের চোখে দেখে ও তাঁদের সংগ্রামের সাথি হয়ে বড় হয়ে ওঠার কারণে মানুষের দুর্দশা আজও আমাকে পীড়া দেয়। ...... ‘কিছু শব্দ... কবিতা নয়’ - এটাই আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ যেখানে বুকের পাঁজরে জেগে ওঠা কিছু শব্দের সহাবস্থান ঘটেছে, তা আদৌ কবিতা হয়ে উঠেছে কিনা বা কবিতা হয়ে উঠতে পারে কিনা, তার বিচারের দায়িত্ব আমি পাঠক/পাঠিকার উপর ন্যস্ত রাখলাম।......”
মোট ৪৩ টি কবিতার মধ্যে অধিকাংশ কবিতাতেই বার বার ফিরে এসেছে পথ চলার বৃত্তান্ত আর ধ্বস্ত সমাজ, ধ্বস্ত সামাজিকতা, রাষ্ট্রের অব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষ ও প্রতিবাদ। কখনো একপেশেও মনে হতে পারে। দেশ ও সমাজের শুধু কি অবক্ষয়ই কবির চোখে ধরা পড়ে ? বিশ্বময় উন্নত দিনযাপনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে দেশের, ব্যক্তিমানসের, ব্যক্তিসত্ত্বার সমাজের আর্থিক ও মানবিক উন্নতি কিংবা পরিবর্তিত সমাজ ব্যবস্থার দিকটি কি তাহলে অনুল্লেখিত থেকে গেল ? ‘ঘুমের দেশে’ কবিতায় কবি লিখছেন -
কবির ভুল হয় না,
কবিরা সত্যদ্রষ্টা হয়, ......
ঝর্ণাকে দেখে উপলব্ধি হয় পাহাড়ের বুক চেরা আর্তনাদ।
... বাতাসে শুধু বালির টুকরো,
ঝাপসা হয়ে আসে দৃষ্টি।
...... কানে বাজে না দূর থেকে ভেসে আসা আজানের সুর।
ঝোড়ো হাওয়ায় দুলতে থাকে নৌকাগুলো।
বসন্তের রং লাগে না গাছে,
ডালপালাহীন ধূসর একটি গাছ - একাকী।
অনিদ্রায় রাত্রি হয়,
জেগে ওঠে কঙ্কালসার স্মৃতি।
পাঠক মন দোলায়িত হয়। সত্যিই কি কবিরা সত্যদ্রষ্টা ? হয়তো এই কবিতার শিরোনামেই আছে এই জিজ্ঞাসার উত্তর - ‘ঘুমের দেশে’। একজন কবি তাঁর কবিতার একচ্ছত্র স্রষ্টা। পাঠক তাঁদের পাঠমননে। হয়তো তাই ঘুমের দেশে - যেখানে হয়তো সত্যদর্শন হয় না।
পথ চলার মতোই কবি প্রথম থেকে শেষ অবধি যেন কবিতার পথেই করেছেন বিচরণ। কবি এগিয়ে যেতে চান সামনে - সুষ্ঠু সমাজের পথে। কিছু কবিতার শিরোনামেই তার পরিচয় - ‘রাস্তার ডাক’, ‘কে যাবি আয় রে’, এবং সবার শেষে - ‘পিছন ফেরা নয়’। যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে পথ চলার বৃত্তান্ত - পঙ্‌ক্তির পর পঙ্‌ক্তি। হয়তো এভাবেই কবি হেঁটে চলেন সব দ্বিধা, সব জড়তা কাটিয়ে কবিতার হাত ধরে আগামীর লক্ষ্যে।
গ্রন্থ জুড়ে আছে বেশ কিছু কবিতা স্বনামধন্য ব্যক্তিদের প্রতি - জয় গোস্বামী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, পূর্ণেন্দু পত্রী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কবি নজরুল, শঙ্খ ঘোষ। কবির অধিকাংশ কবিতাই অন্ত্যমিলে রচিত। আধুনিক গদ্য কবিতার সংখ্যা কম। বেশ কিছু কবিতায় রয়ে গেছে কিছু অধুনা লুপ্তপ্রায় কাব্যিক শব্দ, কিছু বিভক্তি-প্রত্যয়। তবু কিছু শব্দ - পঙ্‌ক্তি চমকে দেওয়ার মতো। কিছু আক্ষরিক ব্যঞ্জনা বার বার পড়ার মতো।
অ্যাবস্ট্র্যাক্ট চিত্রকর্মের প্রচ্ছদের সঙ্গে গ্রন্থনামের বিন্যাস যথাযথ হয়নি। রেখাচিত্রের গোলোকধাঁধায় হারিয়ে যেতে চায় নামলিপি। পাঁচ বাই আট ইঞ্চির পাকা বাঁধাইয়ের গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন তাঁর বাবা ও মা’কেকর্পোরেট পাবলিসিটি, বসিরহাট থেকে প্রকাশিত গ্রন্থে রয়ে গেছে বেশ ক’টি বানান ভুলও। তবু সব কিছু ছাপিয়ে কোথাও যেন এক প্রত্যাশার আবহ সৃষ্টি হয় কবিতার সূত্র ধরে।
পথ চলতে চলতে শুনতে পাওয়া যায় এক গভীর প্রত্যয়ের সুর -
“আজকে দেখো দিচ্ছে হামা ওই যে পথশিশু
পথের বুকেই পথ পাবে সে, পথেই সবকিছু।”
(কবিতা - পথশিশু তোমার ঔরসে)
কিংবা -
“এসো বন্ধু এসো, একবার তুমি রাস্তায়,
এসো গেয়ে যাই জীবনের জয়গান,
সুরে সুরে হোক আমাদের পরিচয়
দেখব আকাশে সোনালি সূর্যোদয়।”
(কবিতা - একবার এসো রাস্তায়)।
অদূর ভবিষ্যতে পাঠকের দেখা হবে কবির সাথে নব নব প্রত্যয়ের কবিতার সঙ্গে - এমন প্রত্যাশা জাগাতে সফল হয়েছে কবির প্রথম প্রয়াস - এমনটা হলফ করে বলা যায়।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

‘কিছু শব্দ... কবিতা নয়’
উজ্জ্বল দত্ত চৌধুরী
মোল্য - ৮০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩২৩০৫০৬৮

Comments

  1. আকর্ষণীয় রিভিউ পড়লাম, যথাযোগ্য লেখনী সম্মানের সাথে খামতিগুলো দেখিয়ে দিলেন, প্রশংসনীয় 🙏👏👏

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...