Skip to main content

সপ্তদশ বর্ষে স্বচ্ছ পারিপাট্যের পত্রিকা - ‘সাঁকো’


সাঁকো’ - সপ্তদশ বর্ষ, পূজা সংখ্যা বিগত শারদোৎসবে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি থেকে প্রকাশিত এমন একটি সাহিত্য পত্রিকা, যার গুণাগুণ বিচারের আগেই তার বহিরঙ্গ দেখে প্রাপকের (বা বলা যায় পাঠকের) মন ভরে যেতে বাধ্য এবং এর পুরো কৃতিত্ব পত্রিকার এই সংখ্যার অপূর্ব একটি প্রচ্ছদ যদিও পূজা সংখ্যা বলে সাধারণত যেরকমটি হয়ে থাকে, অর্থাৎ জগজ্জননীর পটচিত্র সম্বলিত গতানুগতিক প্রচ্ছদ কিন্তু এখানেই ব্যতিক্রম এই প্রচ্ছদের এবং দৃষ্টিনন্দন রঙিন এই প্রচ্ছদ দেখে ভিতরের পাতায় চোখ না বুলিয়ে পারা যায় না সেই ‘পেহলে দর্শনধারী, ফির গুণ বিচারী’ আপ্তবাক্যের যেন যথাযথ প্রয়োগ। প্রচ্ছদ দেখেই চোখ সার্থক, ভালোবেসে নিতে হয় হাতে। প্রচ্ছদ অলংকরণে আছেন বিশ্ব রায়, শান্তি আর্ট, হাইলাকান্দি। প্রচ্ছদ ওল্টালেই ফের এক চমক। এবার সাদাকালোয় আরেকটি অপরূপ চিত্র। সেও দশপ্রহরণধারিণী দুর্গার তবু এক কথায় চোখ জুড়ানো। এবং এর পর একের পর এক পৃষ্ঠা জুড়ে পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে ছাপাই ও নিখুঁত বর্ণ বিন্যাসে পত্রিকাটি আদ্যন্ত ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে তার গরিমা। বর্ণ বিন্যাস নেপথ্যে মান্না দেব।  
পত্রিকাটি যদিও ত্রৈমাসিক কিন্তু সার্বিক সংখ্যা নম্বরটি উল্লেখ না থাকায় এর নিয়মিত প্রকাশের কোনও তথ্য পাওয়া গেল না। উৎসবের শরৎ এবং আলোচ্য সংখ্যা নিয়ে একটি পৃষ্ঠাজোড়া ছিমছাম সম্পাদকীয় রয়েছে অবৈতনিক প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তথা সাহিত্যিক সুশান্ত মোহন চট্টোপাধ্যায়ের। পরবর্তী পৃষ্ঠায় সুবিন্যস্ত এবং নজরকাড়া সূচিপত্রের পরই রয়েছে আবারও শরৎ এবং আলোচ্য সংখ্যা নিয়ে সহ সম্পাদক পঙ্কজ কর (মণি)র - ‘সম্পাদনা সহযোগীর কলমে’।
পৃষ্ঠাজোড়া সূচিপত্রে দেখা যায় দু’টি নিবন্ধ, ৯ টি গল্প এবং ৩২ টি কবিতার সম্ভার। মোট ৫২ পৃষ্ঠার এই পত্রিকায় এই আয়োজন স্বভাবতই পত্রিকা গোষ্ঠীর দায়বদ্ধতা ও গরজকে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম।
সি এস মোহন-এর নিবন্ধ ‘সংকটকালে মহামায়ার স্তব ও শারদীয়া দুর্গাপূজা মহাপূজার বৈশিষ্ট্য’ শরৎ ও দুর্গা আরাধনার আবহে লিখিত একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা। বিস্তারের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও স্বল্পেই টানা হয়েছে সমাপ্তিরেখা যদিও সমাপন সুসংহত বলা যায়। কৃষ্ণা মিশ্র ভট্টাচার্যের নিবন্ধ ‘আমার কবিতা ভাবনা’ অসাধারণ একটি রচনা। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের কবিতার স্বরূপকে সংক্ষেপে সন্নিবিষ্ট করে নিজের কবিতা ভাবনার পাশাপাশি শরৎ নিয়ে একটি চমৎকার কবিতাও রয়েছে তাঁর এই নিবন্ধে। তবু পূর্বোল্লেখিত ধরণে এই নিবন্ধটিও সম্ভবত সম্পাদকের বেঁধে দেওয়া পরিসরের স্বল্পতার জন্য অতি সংক্ষিপ্তই হয়ে রইল।
গল্প বিভাগে প্রথম গল্প বরাকের কৃতি গল্পকার মঞ্জরী হীরামণি রায়-এর। সমসাময়িক কালে তাঁর প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন ‘ঝিঁকা’তেও প্রকাশিত হয়েছে ‘বিলোলতৃষ্ণা’ গল্পটি। বৃষ্টিজনিত মাদকতার আবেশে রচিত ভাষার পারিপাট্যে এক অনিন্দ্যসুন্দর ছোটগল্প। ঋতা চন্দের গল্পটি ছোটদের নিয়ে লিখা। ভালো বুনোট, ভালো প্লট। একটি সহজ বার্তা নিয়ে এসেছে গল্পটি। পরের গল্পটি নিষ্ঠুর বাস্তবের প্রেক্ষাপটে লিখা একটি অণুগল্প। লিখেছেন অনামিকা শর্মা। সুদীপ্তা বিশ্বাসও লিখেছেন অণুগল্প আত্মকথন ধাঁচে।  শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প ‘নিয়তি’বাস্তব প্রেক্ষাপটে লিখা এক জমজমাট গল্প। তবু শেষটায় এখানেও এক আত্মকথনের সুর শোনা যায়। নিয়তির শেষ প্রহারও এসে গেছে বড্ড তাড়াতাড়ি। ঘটনারাজির ঘনঘটায় এক ছিমছাম অণুগল্প - শঙ্করী চক্রবর্তীর ‘সময় বিভ্রাট’বাহারুল ইসলাম মজুমদারের গল্পের শিরোনামের সঙ্গে ব্র্যাকেটে ‘সম্পূর্ণ কাল্পনিক’ কথাটি লিখার অর্থ বোঝা গেল না। অন্যান্য গল্প কি শুধুই সত্য ঘটনার উপর আধারিত হয় ? চমৎকার একটি প্লট কিন্তু গল্পের আদি ও অন্ত কেমন তাড়াহুড়োয় লিখা মনে হয়। ঘটনার ঘনঘটা গল্পের সাহিত্যমানকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। মনে হয় এক বিদেশি গল্পের ধাঁচও এসে পড়েছে। সুশান্তমোহন চট্টোপাধ্যায়ের গল্প ‘মর্ত্যের ভগবান’ও অণু গল্পেরই আকার নিয়েছে যদিও গোছানো একটি গল্প। একটি সার্থক গল্প বলা চলে। পুজোর ভাবনায় লিখা স্বপন কুমার দত্তের রম্য রসনা এ সংখ্যার এক বিশেষ সম্পদ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। শব্দের কারিকুরি ও সংলাপের যাথার্থ্যে এক উপভোগ্য রম্য রচনা।
এর পরই শুরু হয়ে যায় কবিতা বিভাগ। ভালোয় মন্দে এগিয়ে গেছে কবিতার মিছিল। ছোট পত্রিকার কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে যা সাধারণত কবিতায় পুষিয়ে নিতে হয়। এখানেও ব্যত্যয় ঘটেনি। যাঁদের কবিতার উল্লেখ করতে হয় বিশেষ করে তাঁরা হলেন সুশান্ত ভট্টাচার্য, জয়শ্রী ভট্টাচার্য, রবীন্দ্রনাথ কাশ্যপ, বাপ্পি দেবনাথ নীহার, রফি আহমেদ মজুমদার, ডঃ অভিজিৎ মিত্র, পঙ্কজ কর, মাধবী শর্মা, ডঃ মমতা চক্রবর্তী এবং সুস্মিতা অধিকারী। এছাড়াও যাঁরা ভালো কবিতা লিখেছেন তাঁরা হলেন - চিরঞ্জীব দাস, দিলীপ দাস, মানস কান্তি চক্রবর্তী, মাশুক আহমেদ মজুমদার, তরুণ কুমার মালাকার, অখিল চন্দ্র পাল, শিখা দাসগুপ্ত, মৌটুসী চৌধুরী, উত্তম দত্ত, শর্বরী পাল, কবিতা দাস, স্বপন কুমার সরকার, পূরবী নাথ, অরুন্ধতী নাথ, পূর্ণিমা সূত্রধর, কিরন দেবী, ধ্রুবজ্যোতি দাস, জয়ন্তী নাথ, তনু দাস, পূজা সূত্রধর এবং চুম্পী রাণী দাস।
সব মিলিয়ে এক জমজমাট পূজা সংখ্যা। কাগজের মান এবং পৃষ্ঠা বিন্যাস অত্যন্ত নিটোল ও উঁচুমানের। বানান ভুলের সংখ্যাও নিতান্তই নগণ্য। শুধু কোথাও এক সার্বিক সাহিত্যমানের অভাব যেন বোধ হয় যা হয়তো কিছু বাধ্যবাধকতাকে পাশ কাটিয়ে ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ বিকশিত হয়ে উঠবে। অন্তত এমন একটি আশার ফুলকি অনুভূত হয় পাঠশেষে। শেষ প্রচ্ছদে সাঁকো সংগীত এবং সাঁকো প্রকাশনার প্রকাশিত গ্রন্থ সমূহের তালিকা ও ষষ্ঠ পৃষ্ঠায় সাঁকো সম্মাননার তালিকায় চোখ বুলালে পত্রিকা গোষ্ঠীর দৃঢ় প্রত্যয় স্পষ্ট অনুভূত হয়।

- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

‘সাঁকো’ - ১৪২৮ পূজা সংখ্যা
মূল্য ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫৩৭৭৩৯৪/৮১৩৪০৯৬৯০৯

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...