“মাইগ্গো, অখন কিতা করতাম,
বুড়ি-এ আর দিন পাইলা না নি ?” - প্রবল উৎকণ্ঠা মায়ের চোখে মুখে।
আমি খনিকটা ভীত। মা কি এখন আমার উপর রাগ করবেন ? কারণ খবরটা তো আমিই এসে মা’কে দিলাম এইমাত্র - ‘অন্ধবুড়ি আসছেন’।
অন্ধবুড়ি। কেউ তাঁর নাম জানতো না। তিনি নিজেও কি জানতেন ? কীজানি ?
মাটিতেই খাঁজ কেটে কেটে তৈরি করা অন্তত পঞ্চাশটি সিঁড়ি ডিঙিয়ে উপরে উঠতে হয়। বৃদ্ধ, অসুস্থ মানুষদের জন্য এক কষ্টকর অভিজ্ঞতা। কিন্তু আমার মতো কিশোরদের কাছে উঠানামা নেহাতই জলভাত। ভিটে ছেড়েই বলতে গেলে দে-ছুট। বাঁদিকে উত্তরের ভিটের ছোট ঘর আর অতসী ফুলের সারি সারি গাছ এবং ডান পাশে কদম আর হরিতকী গাছদু’টো পেরোলেই প্রায় ‘পায়ের মুঠোয়’ নীচের পায়ে হাঁটা পথ। যে পথটি বাঁদিকে চলে গেছে একের পর এক গ্রামের দিকে - কখনো খানিকটা চওড়া, কখনো একেবারেই সরু হয়ে, ছোট বড় একাধিক নালা কিংবা জলধারা পেরিয়ে। ডানদিকে মোড় নিলে অপেক্ষাকৃত চওড়া আরোও একটি গ্রাম্য পথ। সরু ও চওড়া পথ দু’টি যেখানে মিশেছে ঠিক তার উল্টো দিকেই স্বচ্ছ শীতল পানীয় জলের কূপ। সারাটি দিন ধরে অফুরন্ত জলের জোগান ধরে যায় গ্রামবাসীদের। এই চওড়া পথটি দু’দিকেই প্রায় সমান দূরত্বে গিয়ে পড়েছে দুই পাকা সড়কে। পাকা বলতে মোরাম বিছানো পথ, ধুলির স্বর্গরাজ্য। সড়ক দু’টি ধরে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে দিনে প্রায় পাঁচটি বাস্ যাতায়াত করে দূরবর্তী শহরে। সময় হিসেবেই তাদের নামকরণ। ন’টার বাস্, বারোটার বাস্, তিনটের বাস্ কিংবা পাঁচটার বাস্ ইত্যাদি - যদিও নির্ধারিত সময়ের বেশ খানিকটা পরেই সেগুলো এসে পৌঁছাতো। তাতে অবশ্য বিশেষ আপত্তির কিছু ছিল না গ্রামবাসীর। সময়ের এত অভাব তখন ছিল না বলেই হয়তো বা। লোকেদের মুখে প্রায়শঃ প্রশ্ন শোনা যেত - ‘আজ বারোটার বাস্ ক’টায় এল’ জাতীয় প্রশ্ন।
পাকা সড়ক অবধি
অকারণে ঘুরা বেড়ানো আমার নিত্যদিনের রুটিন। কিশোর
বেলার সংক্ষিপ্ত পড়াশোনার বাইরে হাতে অফুরন্ত সময়। এ বাড়ি
ও বাড়ি ঘুরে ঘুরে বন্ধু বান্ধবীদের সাথে আড্ডা মারার মজাটাই আলাদা। বাস
আসার সময়গুলোতে মন যেন ছুটে যেতে চাইত হাওয়ার বেগে।
বাস্ দেখার সে কী উত্তেজনা। আর কেউ আমাদের বাড়িতে আসছেন খবর পেলে তো কথাই নেই। নির্ধারিত
সময়ের অন্তত ঘন্টাখানেক আগেই পৌঁছে যেতাম সড়কের ধারে। বাস্ দেরি করে এলে হয়তো দু’ঘন্টা ধরে অপেক্ষায় থাকতে হতো। না, তাতে কোনও ধৈর্যহীনতার ব্যাপার ছিল না। রাস্তার
পাশে লুটকি কিংবা পিষন্টির পাতা বিছিয়ে বসে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকতাম। মাঝে
মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে কাউকে উদ্দেশ্য করে মনে মনে প্রার্থনা জানাতাম যেন বাস্টি তাড়াতাড়ি এসে যায়। দূরে
বাস বা অন্য গাড়ির আওয়াজ শুনলেই তীব্র এক উন্মাদনায় উঠে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতাম গাড়িটিকে
শনাক্ত করার জন্য। কল্পনায় আগন্তুক অতিথির পূর্ণ অবয়ব। বাস্টি এসে সেই জায়গাটি পাওয়ার আগেই তার গতি কমিয়ে নিয়েছে। এই তো
থামবে এবার। বাস্ থেকে নামবেন অতিথি। নেমেই
আমাকে দেখে আনন্দে জড়িয়ে ধরবেন। তারপর
অতিথিকে নিয়ে পায়ে হাঁটা পথটুকু গল্পগুজবে মগ্ন থেকে ঘরে ফিরে আসব গর্বিত আমি। মা এসে
আমাদের দেখেই বলবেন - ‘বাহ্ বেটা,
একেবারে সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছিস !!’ গর্বে আমার
বুক ফুলে উঠতো এমন কাজে। কিন্তু
সব সময় কৃতকার্য হতাম না। বাস্টি অন্য
কোনও কারণে মোড়ের কাছে এসে গতি একটুখানি কমিয়ে নিত ঠিকই কিন্তু তারপরই আবার গতি বাড়িয়ে, আমাকে নৈরাশ্যের রাজ্যে ডুবিয়ে হুস্হুস্ করে চলে যেত সামনের দিকে। একরাশ
নিরাশা এসে আচ্ছন্ন করে দিত আমাকে। মনে হতো
সেই দিনটিই যেন আমার কাছে এক নীরস, ব্যর্থ একটি দিন। আবারও শুরু হতো পরের বাসের বা
পরের দিনের প্রতীক্ষা। মায়ের মনেও নিরাশা। চিঠিতে তো লিখেছিল আজই পৌঁছাবে বলে।
কীজানি, হয়তো এর পরের বাসে বা কাল আসবে।
এমনি কোনও এক উদাস দুপুরে বাস্ রাস্তা থেকে ফিরে আসার পথে দেখতে পেলাম অন্ধবুড়িকে হাতে ধরে এগিয়ে নিয়ে আসছে একটি অপরিচিত ছোট্ট মেয়ে। আমার চাইতে ছোটই হবে। এর আগেও দেখেছি তাঁকে এভাবে কারো সাহায্য নিয়ে আসতে। তবে সব সময় তাঁর সঙ্গী বাঁধাধরা কেউ ছিল না। একেক দিন একেকটি মেয়ে বা ছেলে তাঁকে এই কাজে সহায়তা করত। ওরা সবাই এই গ্রামেরই কিংবা খানিক দূরের ছেলেমেয়েরা। সবাইকে আমি চিনতাম না। অন্ধবুড়িকে ‘মাসিমা’ বলে সম্বোধন করতাম। এমনটাই শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল আমাকে। বস্তুতঃ গ্রামের সব ছেলেমেয়েরাই এ ধরণের সম্বোধনে অভ্যস্ত ছিল। মাসিমাকে দেখেই বুঝে গেলাম তিনি আমাদের বাড়িতেই আসছেন। এই বুঝে নেওয়ার পেছনে এক গূঢ় কারণ ছিল।
মাসিমা অন্ধবুড়ি নামেই গ্রামে পরিচিত ছিলেন যদিও জন্মান্ধ ছিলেন না তিনি। এবাড়ি ওবাড়ি টইটই করে ঘুরে বেড়ানোর ফাঁকে বারকয়েক তাঁর বাড়িতেও গেছি। সংসারে তাঁর কেউ ছিল না। শুনেছিলাম এককালে সবই তাঁর ছিল। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সব হারিয়ে এখন তিনি নিতান্তই একা। মাঝবয়সে কোনও এক দুর্ঘটনায় কিংবা অসুখে হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। এর পর এতটা বছরে অন্ধত্ব যদিও বা সয়ে এসেছে কিছুটা কিন্তু এবার বার্ধক্য এসে যেন গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো তাকে কাবু করে ফেলেছে। তাঁর নাকি ছেলেও আছে বাইরে। সেও খোঁজখবর রাখে না। দুই চোখে দৃষ্টি না থাকলে চলার পথ কতটা কঠিন তখন সেসব বুঝতাম না। আমার চোখে তাঁর অন্ধত্বটাই স্বাভাবিক ছিল। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণ বংশজাত বিধবা। সুতরাং তখনকার পারিবারিক বা সামাজিক নিয়মের গণ্ডির মধ্যে থেকে খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে ছিল সাংঘাতিক ধরণের ছুঁৎমার্গ। অব্রাহ্মণের ঘরে তিনি খেতেন না। গ্রামের সবাই তা জানতো কিন্তু কেউই এ ব্যাপারে কোনো প্রতিবাদ বা আপত্তি করেনি। আসলে তখনকার সমাজে এই চিত্র খুবই সুলভ এবং স্বাভাবিক ছিল। এ নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথাও ছিল না। সবাই তাঁকে যতটা সম্ভব সাহায্য করতো। তিনিও হাত পেতে তা নিতেন কিন্তু নিজের ঘরেই প্রতিবেশী কোনও ব্রাহ্মণ ঘরের বউ বাচ্চাদের তৈরি করে দেওয়া খাবার খেতেন। কখনো কখনো তিনি দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা না থাকলে গ্রামেরই কোনো ব্রাহ্মণ বাড়িতে স্বনিমন্ত্রিত হয়ে দুপুরের আহার সারতেন। এই হাতে গোণা কিছু পরিবারের মধ্যে আমাদের ঘরটিও ছিল - যদিও আমাদের নিজেদেরই তখন নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর অবস্থা। অথচ তাঁর ক্ষেত্রে আমার মা ছিলেন সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। মায়েরও বয়স হয়েছে। তবু ছুটোছুটি করে কোথা থেকে কী করে যে যাহোক কিছু করে তাঁকে খাইয়ে ছাড়তেন তা তিনিই জানতেন। খাওয়াদাওয়ার পদের ব্যাপারে অন্ধবুড়ির কোন পছন্দ অপছন্দ ছিল না। ভিক্ষার চাল কাড়া আর আকাড়া। যতক্ষণ তিনি থাকতেন ততক্ষণই গল্পগুজবে জড়িয়ে থাকতেন মা’র সাথে। সাথে পথ দেখিয়ে যে নিয়ে আসতো তারও ভাগ্যে জুটে যেত দুপুরের খাওয়া। অলিখিত অধিকার বটে।
সুতরাং বাস্রাস্তা থেকে ফেরার পথে অন্ধবুড়িকে এদিকে আসতে দেখেই দৌড়ে এসে মা’কে খবরটি দিলাম। সেদিন বোধ করি হাড়ি চড়ানোর মতো কোনো সুবিধে ছিল না মায়ের হাতে, তাই অন্ধবুড়ির আগমনবার্তা শুনে মুষড়ে পড়লেন মা। তখন প্রায়ই হাড়ি চড়তো না আমাদের ঘরে। যদিও আমি তা টের পেতাম খুব কম। আমার জন্য যাহোক কিছু করে ব্যবস্থা একটা হয়েই যেত। বড়দের দেখেছি প্রায়শঃ অনাহারে থাকতে কিংবা আটার গোলা সেদ্ধ বা কাঁঠালবিচি সেদ্ধ করে খুব জম্পেশ করে খেতে। তখন বুঝতাম না এসব ছিল বিকল্প আহার।
অগত্যা মা হুমড়ি খেয়ে পড়লেন গিয়ে সেই পাশের ঘরের জ্যেঠিমার কাছে। এই একটাই ছিল ভরসার স্থল। ফেরাতেন না জ্যেঠিমা। দিনের পর দিন জুগিয়ে গেছেন আকস্মিক আবশ্যকতা। মা হিসাব রাখতেন জ্যেঠিমার থেকে এ যাবৎ কত কৌটো চাল ধার হলো।
- ও দিদি, অন্ধবুড়ি বুলে আইরা। ঘরো চাউল নাই এক কৌটাও। এনরে কেমনে ফিরাইতাম ?
জ্যেঠিমাও পড়লেন সমস্যার গভীর জালে। অন্ধবুড়ি তো তাঁর ঘরে খাবেন না। অগত্যা উপযুক্ত পরিমাণ চাল, সাথে খানিকটা সবজিও তুলে দিলেন মায়ের হাতে। বিচিত্র নিয়মে অব্রাহ্মণ জ্যেঠিমার দেওয়া চালেই উদরপূর্তি হলো ব্রাহ্মণ অন্ধবুড়ি ও তাঁর পথসখা মেয়েটির। চালে দোষ নেই, ভাতে দোষ - এটাই নিয়ম ছিল।
খেতে বসে - ‘ও দিদি, আপনেও বইযাইন’ - অন্ধবুড়ি মা’কে আহ্বান জানালেন।
- আর কইন না যেন্, আইজ আমার বর্ত।
- আইজ কিওর বর্ত ?
মা হয়তো মনে মনে বারের হিসেব কষে বললেন - ‘সুমতি’। বা ‘সঙ্কটা’।
সঙ্কট থেকে তখন বোধ করি এরাই রক্ষা করতেন অসুরক্ষিত মানবমানবীদের। কত ব্রতের যে কথা শুনতাম তখন। মঙ্গলচণ্ডী, সূর্যব্রত, ঝটপট, বিপদনাশিনী ......। তিন চারটি ঘর মিলে একসাথে ব্রত উদযাপন হতো। একা একা ব্রতের উপচার জোগানোর মতো ক্ষমতা বোধ করি সবার ছিল না। তাই এই যৌথ ব্যবস্থা। সকাল থেকে উপোস করে দুপুরে ব্রতকথা পাঠ করে বা মুখে মুখে শুনিয়ে এর পর যৌথ আহার।
- তে আইচ্ছা, বলে খেতে শুরু করলেন অন্ধবুড়ি। কাছেই বসে মা। কত গল্প, কত কথা।
ছেড়ে আসা দেশের গল্প, নিজের অভাগা জীবনের কষ্টকথা। মাও মাঝে মাঝেই মেলে ধরতেন নিজেকে। যেন কাছের বন্ধু। অন্ধবুড়িকে খাইয়ে বাসনকোসন ধুয়ে মায়ের মুখে যে এক প্রশান্তি তা আমার চোখ এড়াত না। ছিন্নমূলের নতুন জীবনের বন্ধুর পথ চলার কষ্টকর অভিজ্ঞতার বর্ণনে ভারী হয়ে উঠত বাতাস। তখন এসব কথার এতসব মানে বুঝতাম না।
বিকেলে আঁধার ঘনিয়ে আসার আগেই নিজের ঘরের উদ্দেশে পা বাড়াতেন অন্ধবুড়ি। শিশুসখার হাতে বাঁ হাত আর ডান হাতে অন্ধের লাঠি।
###
আজ তিরিশ বছর
পর দিন দুয়েকের জন্য সময় করে এসেছি সেই আমার জন্মভূমিতে। কত কিছু পালটে
গেছে পৃথিবীতে। বিশ্বায়নের ছোঁয়া লেগেছে আমার
ফেলে আসা সেই গ্রাম এবং তার আশেপাশের অঞ্চলেও। গ্রামেই থেকে যাওয়া ছেলেবেলার বন্ধু
অঞ্জনকে সঙ্গে নিয়ে পরদিন সকালেই বেরিয়েছি চারপাশটা ঘুরে দেখতে। আমাদের
সেই বাড়িটি আর আমাদের নেই এখন। নতুন মালিক তাঁর
মনের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছেন। জীবনসংগ্রাম শেষে মা’ও গত হয়েছেন আজ দু’বছর আগে। ফিরে ফিরে তাকাচ্ছিলাম
চারদিকে। মায়ের স্মৃতি এসে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল সারাক্ষণ। বাবার অবসরের
পর একা তাঁরা দু’জনের পক্ষে আর বেশিদিন সেখানে থাকা সম্ভব হচ্ছিল
না। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও এক বুক বিষাদকে সঙ্গী
করে নিজেদের হাতে গড়ে তোলা ভিটেমাটি ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন আমাদের, পুত্রদের কাছে - দূরে দূরান্তরে।
গ্রামের পায়ে হাঁটা পথগুলো পাকা হয়েছে, বাসরাস্তা চওড়া হয়েছে। এখন সারা দিন রাত ধরে রকমারি গাড়ির ছুটোছুটি। রাস্তার পাশে এখন আর পাতা বিছিয়ে বসে থাকার সুবিধে নেই। পালটে গেছে, হারিয়ে গেছে সব কিছু। পরিবেশ পরিস্থিতির এতসব উন্নয়ন দেখেও যেন ভালো লাগে না কিছুই। মনে হয় হারিয়ে গেছে সব কিছু। কেন এমন হয় ? উন্নয়ন কি নাহলে হতো না ?
অঞ্জনদের বাড়ির
কাছাকাছি জায়গাতেই ছিল অন্ধবুড়ির ঘর। পায়ে পায়ে সেদিকে যেতেই চোখে পড়ল একটি বিশাল ইমারত।
কাছে যেতেই চোখে পড়ল সাইনবোর্ড - ‘অন্নপূর্ণা বৃদ্ধাশ্রম’। আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে
রইলাম। পাশে দাঁড়িয়ে অঞ্জন বলছিল - ‘অন্ধবুড়ি তাঁর জীবনযন্ত্রণা থেকে
মুক্তি পেয়েছেন এ বৃদ্ধাশ্রম গড়ে ওঠার বহু আগেই।’
আমার ঝাপসা চোখের
সামনে তখন ভেসে আসছে একের পর এক দৃশ্যপট আর কিছু হারিয়ে যাওয়া অবয়ব। এক গ্রীষ্মের প্রখর
রোদে পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক অভুক্ত অন্ধ বৃদ্ধা। আর পরম যত্নে সামনে বসে তাঁর খাওয়ার
তদারকি করছেন এক রিক্ত নিঃস্ব অন্নপূর্ণা।
আমি খনিকটা ভীত। মা কি এখন আমার উপর রাগ করবেন ? কারণ খবরটা তো আমিই এসে মা’কে দিলাম এইমাত্র - ‘অন্ধবুড়ি আসছেন’।
অন্ধবুড়ি। কেউ তাঁর নাম জানতো না। তিনি নিজেও কি জানতেন ? কীজানি ?
মাটিতেই খাঁজ কেটে কেটে তৈরি করা অন্তত পঞ্চাশটি সিঁড়ি ডিঙিয়ে উপরে উঠতে হয়। বৃদ্ধ, অসুস্থ মানুষদের জন্য এক কষ্টকর অভিজ্ঞতা। কিন্তু আমার মতো কিশোরদের কাছে উঠানামা নেহাতই জলভাত। ভিটে ছেড়েই বলতে গেলে দে-ছুট। বাঁদিকে উত্তরের ভিটের ছোট ঘর আর অতসী ফুলের সারি সারি গাছ এবং ডান পাশে কদম আর হরিতকী গাছদু’টো পেরোলেই প্রায় ‘পায়ের মুঠোয়’ নীচের পায়ে হাঁটা পথ। যে পথটি বাঁদিকে চলে গেছে একের পর এক গ্রামের দিকে - কখনো খানিকটা চওড়া, কখনো একেবারেই সরু হয়ে, ছোট বড় একাধিক নালা কিংবা জলধারা পেরিয়ে। ডানদিকে মোড় নিলে অপেক্ষাকৃত চওড়া আরোও একটি গ্রাম্য পথ। সরু ও চওড়া পথ দু’টি যেখানে মিশেছে ঠিক তার উল্টো দিকেই স্বচ্ছ শীতল পানীয় জলের কূপ। সারাটি দিন ধরে অফুরন্ত জলের জোগান ধরে যায় গ্রামবাসীদের। এই চওড়া পথটি দু’দিকেই প্রায় সমান দূরত্বে গিয়ে পড়েছে দুই পাকা সড়কে। পাকা বলতে মোরাম বিছানো পথ, ধুলির স্বর্গরাজ্য। সড়ক দু’টি ধরে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে দিনে প্রায় পাঁচটি বাস্ যাতায়াত করে দূরবর্তী শহরে। সময় হিসেবেই তাদের নামকরণ। ন’টার বাস্, বারোটার বাস্, তিনটের বাস্ কিংবা পাঁচটার বাস্ ইত্যাদি - যদিও নির্ধারিত সময়ের বেশ খানিকটা পরেই সেগুলো এসে পৌঁছাতো। তাতে অবশ্য বিশেষ আপত্তির কিছু ছিল না গ্রামবাসীর। সময়ের এত অভাব তখন ছিল না বলেই হয়তো বা। লোকেদের মুখে প্রায়শঃ প্রশ্ন শোনা যেত - ‘আজ বারোটার বাস্ ক’টায় এল’ জাতীয় প্রশ্ন।
এমনি কোনও এক উদাস দুপুরে বাস্ রাস্তা থেকে ফিরে আসার পথে দেখতে পেলাম অন্ধবুড়িকে হাতে ধরে এগিয়ে নিয়ে আসছে একটি অপরিচিত ছোট্ট মেয়ে। আমার চাইতে ছোটই হবে। এর আগেও দেখেছি তাঁকে এভাবে কারো সাহায্য নিয়ে আসতে। তবে সব সময় তাঁর সঙ্গী বাঁধাধরা কেউ ছিল না। একেক দিন একেকটি মেয়ে বা ছেলে তাঁকে এই কাজে সহায়তা করত। ওরা সবাই এই গ্রামেরই কিংবা খানিক দূরের ছেলেমেয়েরা। সবাইকে আমি চিনতাম না। অন্ধবুড়িকে ‘মাসিমা’ বলে সম্বোধন করতাম। এমনটাই শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল আমাকে। বস্তুতঃ গ্রামের সব ছেলেমেয়েরাই এ ধরণের সম্বোধনে অভ্যস্ত ছিল। মাসিমাকে দেখেই বুঝে গেলাম তিনি আমাদের বাড়িতেই আসছেন। এই বুঝে নেওয়ার পেছনে এক গূঢ় কারণ ছিল।
মাসিমা অন্ধবুড়ি নামেই গ্রামে পরিচিত ছিলেন যদিও জন্মান্ধ ছিলেন না তিনি। এবাড়ি ওবাড়ি টইটই করে ঘুরে বেড়ানোর ফাঁকে বারকয়েক তাঁর বাড়িতেও গেছি। সংসারে তাঁর কেউ ছিল না। শুনেছিলাম এককালে সবই তাঁর ছিল। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সব হারিয়ে এখন তিনি নিতান্তই একা। মাঝবয়সে কোনও এক দুর্ঘটনায় কিংবা অসুখে হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। এর পর এতটা বছরে অন্ধত্ব যদিও বা সয়ে এসেছে কিছুটা কিন্তু এবার বার্ধক্য এসে যেন গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো তাকে কাবু করে ফেলেছে। তাঁর নাকি ছেলেও আছে বাইরে। সেও খোঁজখবর রাখে না। দুই চোখে দৃষ্টি না থাকলে চলার পথ কতটা কঠিন তখন সেসব বুঝতাম না। আমার চোখে তাঁর অন্ধত্বটাই স্বাভাবিক ছিল। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণ বংশজাত বিধবা। সুতরাং তখনকার পারিবারিক বা সামাজিক নিয়মের গণ্ডির মধ্যে থেকে খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে ছিল সাংঘাতিক ধরণের ছুঁৎমার্গ। অব্রাহ্মণের ঘরে তিনি খেতেন না। গ্রামের সবাই তা জানতো কিন্তু কেউই এ ব্যাপারে কোনো প্রতিবাদ বা আপত্তি করেনি। আসলে তখনকার সমাজে এই চিত্র খুবই সুলভ এবং স্বাভাবিক ছিল। এ নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথাও ছিল না। সবাই তাঁকে যতটা সম্ভব সাহায্য করতো। তিনিও হাত পেতে তা নিতেন কিন্তু নিজের ঘরেই প্রতিবেশী কোনও ব্রাহ্মণ ঘরের বউ বাচ্চাদের তৈরি করে দেওয়া খাবার খেতেন। কখনো কখনো তিনি দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা না থাকলে গ্রামেরই কোনো ব্রাহ্মণ বাড়িতে স্বনিমন্ত্রিত হয়ে দুপুরের আহার সারতেন। এই হাতে গোণা কিছু পরিবারের মধ্যে আমাদের ঘরটিও ছিল - যদিও আমাদের নিজেদেরই তখন নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর অবস্থা। অথচ তাঁর ক্ষেত্রে আমার মা ছিলেন সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা। মায়েরও বয়স হয়েছে। তবু ছুটোছুটি করে কোথা থেকে কী করে যে যাহোক কিছু করে তাঁকে খাইয়ে ছাড়তেন তা তিনিই জানতেন। খাওয়াদাওয়ার পদের ব্যাপারে অন্ধবুড়ির কোন পছন্দ অপছন্দ ছিল না। ভিক্ষার চাল কাড়া আর আকাড়া। যতক্ষণ তিনি থাকতেন ততক্ষণই গল্পগুজবে জড়িয়ে থাকতেন মা’র সাথে। সাথে পথ দেখিয়ে যে নিয়ে আসতো তারও ভাগ্যে জুটে যেত দুপুরের খাওয়া। অলিখিত অধিকার বটে।
সুতরাং বাস্রাস্তা থেকে ফেরার পথে অন্ধবুড়িকে এদিকে আসতে দেখেই দৌড়ে এসে মা’কে খবরটি দিলাম। সেদিন বোধ করি হাড়ি চড়ানোর মতো কোনো সুবিধে ছিল না মায়ের হাতে, তাই অন্ধবুড়ির আগমনবার্তা শুনে মুষড়ে পড়লেন মা। তখন প্রায়ই হাড়ি চড়তো না আমাদের ঘরে। যদিও আমি তা টের পেতাম খুব কম। আমার জন্য যাহোক কিছু করে ব্যবস্থা একটা হয়েই যেত। বড়দের দেখেছি প্রায়শঃ অনাহারে থাকতে কিংবা আটার গোলা সেদ্ধ বা কাঁঠালবিচি সেদ্ধ করে খুব জম্পেশ করে খেতে। তখন বুঝতাম না এসব ছিল বিকল্প আহার।
অগত্যা মা হুমড়ি খেয়ে পড়লেন গিয়ে সেই পাশের ঘরের জ্যেঠিমার কাছে। এই একটাই ছিল ভরসার স্থল। ফেরাতেন না জ্যেঠিমা। দিনের পর দিন জুগিয়ে গেছেন আকস্মিক আবশ্যকতা। মা হিসাব রাখতেন জ্যেঠিমার থেকে এ যাবৎ কত কৌটো চাল ধার হলো।
- ও দিদি, অন্ধবুড়ি বুলে আইরা। ঘরো চাউল নাই এক কৌটাও। এনরে কেমনে ফিরাইতাম ?
জ্যেঠিমাও পড়লেন সমস্যার গভীর জালে। অন্ধবুড়ি তো তাঁর ঘরে খাবেন না। অগত্যা উপযুক্ত পরিমাণ চাল, সাথে খানিকটা সবজিও তুলে দিলেন মায়ের হাতে। বিচিত্র নিয়মে অব্রাহ্মণ জ্যেঠিমার দেওয়া চালেই উদরপূর্তি হলো ব্রাহ্মণ অন্ধবুড়ি ও তাঁর পথসখা মেয়েটির। চালে দোষ নেই, ভাতে দোষ - এটাই নিয়ম ছিল।
খেতে বসে - ‘ও দিদি, আপনেও বইযাইন’ - অন্ধবুড়ি মা’কে আহ্বান জানালেন।
- আর কইন না যেন্, আইজ আমার বর্ত।
- আইজ কিওর বর্ত ?
মা হয়তো মনে মনে বারের হিসেব কষে বললেন - ‘সুমতি’। বা ‘সঙ্কটা’।
সঙ্কট থেকে তখন বোধ করি এরাই রক্ষা করতেন অসুরক্ষিত মানবমানবীদের। কত ব্রতের যে কথা শুনতাম তখন। মঙ্গলচণ্ডী, সূর্যব্রত, ঝটপট, বিপদনাশিনী ......। তিন চারটি ঘর মিলে একসাথে ব্রত উদযাপন হতো। একা একা ব্রতের উপচার জোগানোর মতো ক্ষমতা বোধ করি সবার ছিল না। তাই এই যৌথ ব্যবস্থা। সকাল থেকে উপোস করে দুপুরে ব্রতকথা পাঠ করে বা মুখে মুখে শুনিয়ে এর পর যৌথ আহার।
- তে আইচ্ছা, বলে খেতে শুরু করলেন অন্ধবুড়ি। কাছেই বসে মা। কত গল্প, কত কথা।
ছেড়ে আসা দেশের গল্প, নিজের অভাগা জীবনের কষ্টকথা। মাও মাঝে মাঝেই মেলে ধরতেন নিজেকে। যেন কাছের বন্ধু। অন্ধবুড়িকে খাইয়ে বাসনকোসন ধুয়ে মায়ের মুখে যে এক প্রশান্তি তা আমার চোখ এড়াত না। ছিন্নমূলের নতুন জীবনের বন্ধুর পথ চলার কষ্টকর অভিজ্ঞতার বর্ণনে ভারী হয়ে উঠত বাতাস। তখন এসব কথার এতসব মানে বুঝতাম না।
বিকেলে আঁধার ঘনিয়ে আসার আগেই নিজের ঘরের উদ্দেশে পা বাড়াতেন অন্ধবুড়ি। শিশুসখার হাতে বাঁ হাত আর ডান হাতে অন্ধের লাঠি।
###
গ্রামের পায়ে হাঁটা পথগুলো পাকা হয়েছে, বাসরাস্তা চওড়া হয়েছে। এখন সারা দিন রাত ধরে রকমারি গাড়ির ছুটোছুটি। রাস্তার পাশে এখন আর পাতা বিছিয়ে বসে থাকার সুবিধে নেই। পালটে গেছে, হারিয়ে গেছে সব কিছু। পরিবেশ পরিস্থিতির এতসব উন্নয়ন দেখেও যেন ভালো লাগে না কিছুই। মনে হয় হারিয়ে গেছে সব কিছু। কেন এমন হয় ? উন্নয়ন কি নাহলে হতো না ?
- - - - - - - - - - -
- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
Comments
Post a Comment