মূল অসমিয়া গল্প - মই ঠিকেই আছোঁ নে ?
রুমী লস্কর বরা
অনুবাদ - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
বোম্বে পর্যন্ত যাওয়ার ‘দাদর এক্সপ্রেস’টি কোন কারণে নাকি আজ দু’ঘণ্টা দেরি হবে। এইমাত্র কথাটি ঘোষণা করা হলো। এও এক বড় বিরক্তিকর মুহূর্ত। বিশেষ করে কোথাও ট্রেনে করে যাওয়ার থাকলে দির্দিষ্ট সময়ের আধঘণ্টা মতো আগেই এসে স্টেশনে তৈরি হয়ে থাকাটা নিয়ম। সময় মতো ট্রেন এলে ভালোই। কোনো কারণে দেরি হলেই হলো, বিরক্তিকর যন্ত্রণা। মধ্যে মধ্যে ট্রেনের ট্রেক থেকে আসা মলমূত্রের গন্ধে আমার বিবমিষা হয়। উপায় নেই। এদিকে বাইরে বেরোলে আসার সময় আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করে না। পরে আবার ক্ষুধায় পেট গুলোয়। তার উপর ট্রেন দু’ঘণ্টা দেরি করে আসবে জেনে ক্ষুধা আরো চাগাড় দিয়ে উঠল।
বিশেষ একটি রিসার্চের কাজে পাপা মানে বাবা বোম্বে যাবেন। হয়তো এক-দেড় মাস লেগে যেতে পারে। বাবার সঙ্গে দীর্ঘ দিনের বিচ্ছেদ আগে হয়নি। তাই মনটি বেশি খারাপ লাগবে বলে বাবা আমাকে আসতে মানা করেছিলেন যদিও আমি জানি আমার চাইতে বাবারই বেশি খারাপ লাগবে। তথাপি আমার জেদ উপেক্ষা করতে না পেরে বাবা স্টেশনে এগিয়ে দিতে যাওয়ার জন্য অনুমতি দিলেন। অবশ্য একটি কথা বাবা জানেন না - ইউনিভার্সিটিতে পড়া সহপাঠী পলাশের সঙ্গে আমার প্রেমের উন্মাদনা এসেছে। পলাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখেই নাকি দীপাংকর আজকাল দূরে সরে যাচ্ছে, মানে আমার সঙ্গে তার দূরত্ব কিছু বেড়ে গেছে। আমি ভালোবাসি পলাশকে। পলাশও ভালোবাসে আমাকে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা একে অন্যকে ‘ভালোবাসি’ শব্দটি স্পষ্ট করে বলিনি। কিন্তু আমি জানি পলাশকে যদি আমি বলি আজ ব্রহ্মপুত্রের পারে এসো। সে শতবাধা পেরিয়েও নির্দিষ্ট সময়ের আগেই এসে দাঁড়িয়ে থাকবে। যদি বলি - জানো, আমার বহুদূরে চলে যেতে ইচ্ছে করছে ওই পাখির ঝাঁকের মতো। সাথে সাথে পলাশও বলবে - ওহ্ রিয়েলি ? চলো; উড়তে আমারও ইচ্ছে হয়। তাতে আবার তোমার মতো বান্ধবীর সঙ্গে, আহ্ কী মজা ! বুঝেছো আলেকজান্ডার সেলকার্কের মতো বলতে ইচ্ছে হয় - ‘Had I wings of a dove’. এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে পলাশ মুচকি হেসে আমার দিকে তাকায়। আর সেরকম ভাবে তাকালে আমার গালে যেন কৃষ্ণচূড়ার রঙগুলি এসে বসে যায়। আজও সকালে কথা বলতে গিয়ে আমি পলাশকে বলেছিলাম - ‘বাবাকে পৌঁছে দিতে স্টেশনে যাব।’ সঙ্গে সঙ্গে পলাশ উৎসাহ ভরা কণ্ঠে বলল - ‘তাই নাকি ? আমিও যেতে পারি কিন্তু।‘
আমি আর জিজ্ঞেস করলাম না - ‘কেন ?’
সেরকম বললে পলাশ বলবে - ‘এমনি।‘ যেভাবে আমিও পলাশের
বহু ‘কেন’র উত্তরে ‘এমনি’ বলে দিই। কিন্তু আমরা উভয়েই ভালো করে জানি এই ‘কেন’ আর ‘এমনি’র মধ্যে আমাদের প্রেমের
গূঢ়ার্থ লুকিয়ে আছে।
‘ওয়াক … ওয়াক’ ইস্ বমি এসে যাচ্ছে আমার। এক দমকা বাতাসের সাথে ট্রেনের ট্রেক থেকে আসা মলমূত্রের গন্ধটি যেন আমার নাকে মুখে ঢুকে গেল। থু … থু … থু …।
‘মা গো, তুমি চলে যাও নাহয় মামার সাথে। এখানে অসুবিধা পাবে এভাবে থাকলে।’
আমার অবস্থাটি লক্ষ করে বাবা বললেন। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম - না বাবা। কোন অসুবিধে নেই। জোর করে বিবমিষা দমানোর চেষ্টা করলাম। ক্ষুধাও লেগেছে। এদিকে ওদিকে পলাশকে দেখা যায় নাকি
বলে তাকালাম। নাহ্, পৌঁছায়ইনি। ফোন করব নাকি ? না, বাবা যে শ্যেনদৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছেন, ভালো হবে না। তার উপর অন্য মানুষের সাথে যেভাবে ফোনে
কথা বলি, পলাশের সঙ্গে ফোনে কথা বললে আমার মুখের প্রতিক্রিয়া
হয়তো ভিন্ন হয়ে যায়। ধরা পড়ে যাব।
‘বাবা, এক কাপ চা পেলে’ - মনের অস্বস্তি দমাতে বললাম। সঙ্গে সঙ্গে বাবা স্টেশনের ভিতরে থাকা চা-কফির দোকানটিতে অর্ডার দিলেন -
‘তিন কাপ কফি,
তিন পিস্ কেক।‘
মনের ঘেন্নার ভাবটি কিঞ্চিৎ ভুলে কেকপিস্ সহ চায়ের কাপ হাতে
মাত্র নিয়েছি; আমার কাঁধে ঝুলিয়ে রাখা সবুজ চূর্ণিটিতে কেউ টান
মেরেছে বলে মনে হলো। ঘুরে দেখলাম। স্নেহময় মুখের অথচ অযত্নে, অভাবে ধ্বংস হতে ধরা
লালচে অবিন্যস্ত চুল, শুষ্ক ঠোঁট, রুক্ষ
হাত-পা, কাপড় বলতে তার কোমরবন্ধনীখণ্ড মাত্র। তার সর্বশরীর নিরীক্ষণ করলাম। বুকে যুবতি হওয়ার বয়সের চিহ্ন স্পষ্ট
হতে শুরু হয়েছে। এসময়
তার বক্ষবন্ধনীর প্রয়োজন অতি আবশ্যক। কিন্তু অভাবী লোকের কি আর লাজ আছে ? তার দেহে যৌবন উঁকি
দিতে চাইছে, কিন্তু সে তাকে বস্ত্র, অলংকারে
স্বাগত জানাতে পারে না। অথচ যৌবনও তার উন্মুক্ত দেহকে উপহাস
করতে চায় না। আসবেই
সে তার সময় অনুসারে।
এক মুহূর্তের জন্য তার উপর তীব্র একরাশ ক্রোধও জন্মেছিল। এত মানুষ স্টেশনে ঘোরাঘুরি করছে সে আমার চূর্ণিটিই টানতে পেল ? তার উপর ওর সেই কাজে পলাশ এসে দুষ্টামি করছে বলে আনন্দে বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছিল আমার শরীরে। কিন্তু পলাশের পরিবর্তে মেয়েটিকে দেখে আমার আনন্দ-উৎসাহে ঠাণ্ডা জল পড়ার জন্যও রাগ উঠেছিল। কারণ আমার মন পলাশকেই যে খুঁজছে এই মুহূর্তে।
‘এই মেয়ে। কী করছিস ?’
ওকে এক ধমক দিয়ে এক পা পিছিয়ে যেতেই
ওর করুণ দু’টি চোখ আমার দৃষ্টিতে নিবদ্ধ হলো।
‘দিদি, তিন দিন ধরে কিছু খেতে পাইনি। দিদি কিছু একটা দিন। ভগবান মঙ্গল করবেন।’
সচরাচর ভিখারিরা বলা কথা। ভগবান ভালো রাখবেন বলে ওরা আশীর্বাদ
দেয়। সেই
ভগবানই ওদের যে ভিখারি করেছেন তা ভাবে না। মেয়েটির কম্পিত ঠোঁট, ভয় আর ভোকাতুর পেট,
প্রার্থনারত চোখ দু’টির দিকে তাকিয়ে আমার মনটি
গলেছিল। এমনিতেও
সে ছুঁয়ে দেওয়াতে আমি মুখে নিতে চাওয়া কেকপিসে যেন ট্রেনের লাইনের ট্রেক থেকে ভেসে
আসা গন্ধটি লেগে গেল। কফির কাপটি, কেকপিস্ ওর দিকে বাড়িয়ে
দিলাম। পরম
ইচ্ছায় সে আমার হাত থেকে একপ্রকার ছিনিয়ে নেওয়ার মতো নিয়ে নাতিদূরে উলঙ্গ হয়ে বসে থাকা
ওর চাইতে বয়সে ছোট দু’টি পাঁচ বছর, সাত বছর বয়সের শিশুর কাছে গিয়ে বসল। বোধহয় ওর ভাই-বোন। কেকপিস্ কি ওর বা ওর ভাই-বোনের ভুখ মেটাবে ? আমার খারাপ লাগলো। ধুত্তুরি। আরো কিছু খাদ্যবস্তু কিনে রাখা হলে। ঘরটিতে কত বস্তু খেতে ইচ্ছে না হলেই
ডাস্টবিনে ফেলি। অথচ
সেরকম ডাস্টবিনের খাদ্যও তাদের ভাগ্যে মেলে না। নাহলে সেই মেয়েটি কি আর মল-মূত্রের মধ্যে খাদ্যের
অন্বেষণ করে ? আমার চূর্ণি ধরে টান মেরে খাদ্যবস্তু খোঁজার আগে
ওর মতো কয়েকটি ছেলেমেয়ে ট্রেনের জানালা দিয়ে ফেলা আধখাওয়া বাদামের প্যাকেট,
বিস্কুটের প্যাকেট খুঁচিয়ে থাকা দৃশ্যটি দেখেই তো আমার ঘেন্না লেগেছিল।
- ‘মা। চলো দুঘণ্টা দেরি হবেই যখন অন্তত এক ঘণ্টার মধ্যে আমরা বাইরে কিছু একটা খেয়ে আসি।’ মনে প্রাণে, চোখে পলাশের জন্য অপেক্ষা করে থেকে উপায় না পেয়ে বাবার কথায় এমনি সম্মতি দিলাম।
- হবে বাবা। চলো তাহলে।
আমরা মানে বাবা, মা আর আমি পার্কিং প্লেসে রাখা গাড়িটিতে গেলাম।
‘কী খাবে ? আসার সময় কিছু খেয়েও আসোনি, না ? আর একটি কথা, ট্রেন আসবে বিকেল পাঁচটায়। তোমরা তত সময় অবধি বসে থাকতে লাগবে না। এমনিতেও গুয়াহাটির পরিস্থিতি দেখছ শুনছই তো। ঘরে চলে যাও। কিছু একটা খেয়ে আমাকে গাড়িতে করে আবার নামিয়ে দিয়ে চলে যাও। বুঝেছো মা ?’
আমি যাওয়া অবধি তোমরা থাকলে অনেক দেরি
হয়ে যাবে। দিন
দুপুরে পরিস্থিতি কীরকম হয়ে আছে। বিশেষ জরুরী না হলে, তোমাদের ছেড়ে যাই
না এভাবে। সেদিনের
বেলতলায় সেই চা জনজাতির মেয়েটিকে উলঙ্গ করার কথা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বিভিন্ন মতবাদ। কোথায় কী হয় ঠিকানা নেই। গাড়ির ভিতরে বসে থাকা ড্রাইভার রামলালকে
উদ্দেশ্য করে বাবা বললেন
- চলো তো অল্প বাইরে কিছু খেয়ে আসি। সে চোখ মুখ মুছে বসে গেল।
কোথায় খাবে ? কী খাবে ? বেশি দূরে যাব না। কাছেই … বাবার প্রশ্নটি শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠলাম -
‘হবে বাবা। কিছু একটা খেলেই হলো আর, চলো।‘
আসলে আমি পলাশের জন্য যে উৎকণ্ঠা নিয়ে
অপেক্ষা করছি, ধীরে ধীরে পলাশকে না দেখে যেন মনটি নিস্তেজ হয়ে আসছে। যাহ্ এল না তো এল না আর
পলাশ। এমন
করে ভেবে মরছি কেন ?
কথাটি সেরকম করে ভেবে মনটিকে বুঝালাম।
স্টেশন থেকে বেরিয়েছি। ঠিক একটু এগিয়ে গেছি এমন সময় … স্টেশন থেকে একটা বিকট শব্দ এল। আমাদের গাড়িটির উপরেও কোন কিছু বস্তু ধপধপ করে পড়া যেন মনে হলো। বাবা যথেষ্ট শংকিত হয়ে রামলালকে গাড়ির স্পীড বাড়াতে দিলেন। মা ভয়ে আতংকে চিৎকার করে উঠলেন। বাবা আমার মাথাটি নীচের দিকে চেপে ধরে বললেন -
- ‘মা, মাথা নিচু করো।‘
আমি বাবার কথা শুনলাম না। পেছন দিকের গাড়ির গ্লাসের মধ্য দিয়ে
ছেড়ে আসা স্টেশনের দিকে তাকালাম। আর্ত চিৎকার, যন্ত্রণাকাতর উচ্চরব। মধ্যে মধ্যে মানুষের দুপ্ দুপ্ দাপ্ দাপ্ আসা যাওয়া। কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরীর দিকে যাওয়া ধোঁয়া
আর জায়গায় জায়গায় ভস্মীভূত জিনিসপত্র, আহত মানুষ।
উফ্ উফ্। আমার কেমন লাগছে। সেই তখন আমি কেক দেওয়া মেয়েটিও তো স্টেশনের বাইরে বেরোয়নি। সে আছে কি অক্ষত হয়ে ? আর এই সময়ের মধ্যে পলাশ এসেছিল নাকি ? যদি এসেছিল ? যদি এসেছিল ? সামনে কখনও না দেখা এমন ভয়ংকর দৃশ্য এবং আনুষঙ্গিক এই ভাবনাগুলোতে অধীর হয়ে মন ও মস্তিষ্ক যেন চিন্তা করতে না পারা হয়ে গেল। আমার পা দু’টোও ঠাণ্ডা হয়ে আছে। হাতগুলিও। কপাল ঘামছে। বাবা … বাবা …. অজ্ঞান হয়ে পড়লাম।
###
আমার চারপাশে উৎসুক হয়ে দাঁড়িয়ে বাবা-মা আর দু’জন ডাক্তার। একজন নার্স। এ কী ? আমি হাসপাতালে ? সাদা বিছানা-চাদরে ঢাকা বেডটি, সবুজ পর্দা ও আশেপাশে থাকা বস্তু এবং লোকদের দেকেই অনুমান করেছিলাম। হ্যাঁ হাসপাতাল নয় ব্যক্তিগত নার্সিংহোমে আমি। কিন্তু কীভাবে ? কী হয়েছিল আমার ? আমার আশ্চর্যবোধক দৃষ্টিকে বাবা, মা, ডাক্তারও বোধহয় নিরীক্ষণ করছিলেন।
ডাক্তার বললেন - ‘এখন কেমন ইয়াং গার্ল ? জাস্ট রিল্যাক্স। টেনশন নেবে না।’
মা’দের দিকে তাকিয়ে ডাক্তার বললেন
- ‘Now she is OK. ভয়ের কারণ নেই।’
আমার দু’চোখ পলাশকে খুঁজে ফিরছে। এসেছিল নাকি পলাশ ? হুলুস্থুলে আমার
মোবাইল কোথায় পড়লো বাবা-মা বুঝতেই পারেননি হয়তো। সেই মেয়েটি জীবিত আছে কি ? পলাশের একটি খবর
পেতে আমি যে কোনও একটি উপায় ভেবে অধীর হয়ে পড়েছি।
ভেতরে ভেতরে একটা আতংক। সত্যি কি ডাক্তারে বলা মতো আমি OK ?
হয়তো শারীরিক ভাবে। কিন্তু মানসিক ভাবে ?
‘আমি ঠিক আছি তো ?’
অনুবাদ - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
বোম্বে পর্যন্ত যাওয়ার ‘দাদর এক্সপ্রেস’টি কোন কারণে নাকি আজ দু’ঘণ্টা দেরি হবে। এইমাত্র কথাটি ঘোষণা করা হলো। এও এক বড় বিরক্তিকর মুহূর্ত। বিশেষ করে কোথাও ট্রেনে করে যাওয়ার থাকলে দির্দিষ্ট সময়ের আধঘণ্টা মতো আগেই এসে স্টেশনে তৈরি হয়ে থাকাটা নিয়ম। সময় মতো ট্রেন এলে ভালোই। কোনো কারণে দেরি হলেই হলো, বিরক্তিকর যন্ত্রণা। মধ্যে মধ্যে ট্রেনের ট্রেক থেকে আসা মলমূত্রের গন্ধে আমার বিবমিষা হয়। উপায় নেই। এদিকে বাইরে বেরোলে আসার সময় আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করে না। পরে আবার ক্ষুধায় পেট গুলোয়। তার উপর ট্রেন দু’ঘণ্টা দেরি করে আসবে জেনে ক্ষুধা আরো চাগাড় দিয়ে উঠল।
বিশেষ একটি রিসার্চের কাজে পাপা মানে বাবা বোম্বে যাবেন। হয়তো এক-দেড় মাস লেগে যেতে পারে। বাবার সঙ্গে দীর্ঘ দিনের বিচ্ছেদ আগে হয়নি। তাই মনটি বেশি খারাপ লাগবে বলে বাবা আমাকে আসতে মানা করেছিলেন যদিও আমি জানি আমার চাইতে বাবারই বেশি খারাপ লাগবে। তথাপি আমার জেদ উপেক্ষা করতে না পেরে বাবা স্টেশনে এগিয়ে দিতে যাওয়ার জন্য অনুমতি দিলেন। অবশ্য একটি কথা বাবা জানেন না - ইউনিভার্সিটিতে পড়া সহপাঠী পলাশের সঙ্গে আমার প্রেমের উন্মাদনা এসেছে। পলাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখেই নাকি দীপাংকর আজকাল দূরে সরে যাচ্ছে, মানে আমার সঙ্গে তার দূরত্ব কিছু বেড়ে গেছে। আমি ভালোবাসি পলাশকে। পলাশও ভালোবাসে আমাকে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা একে অন্যকে ‘ভালোবাসি’ শব্দটি স্পষ্ট করে বলিনি। কিন্তু আমি জানি পলাশকে যদি আমি বলি আজ ব্রহ্মপুত্রের পারে এসো। সে শতবাধা পেরিয়েও নির্দিষ্ট সময়ের আগেই এসে দাঁড়িয়ে থাকবে। যদি বলি - জানো, আমার বহুদূরে চলে যেতে ইচ্ছে করছে ওই পাখির ঝাঁকের মতো। সাথে সাথে পলাশও বলবে - ওহ্ রিয়েলি ? চলো; উড়তে আমারও ইচ্ছে হয়। তাতে আবার তোমার মতো বান্ধবীর সঙ্গে, আহ্ কী মজা ! বুঝেছো আলেকজান্ডার সেলকার্কের মতো বলতে ইচ্ছে হয় - ‘Had I wings of a dove’. এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে পলাশ মুচকি হেসে আমার দিকে তাকায়। আর সেরকম ভাবে তাকালে আমার গালে যেন কৃষ্ণচূড়ার রঙগুলি এসে বসে যায়। আজও সকালে কথা বলতে গিয়ে আমি পলাশকে বলেছিলাম - ‘বাবাকে পৌঁছে দিতে স্টেশনে যাব।’ সঙ্গে সঙ্গে পলাশ উৎসাহ ভরা কণ্ঠে বলল - ‘তাই নাকি ? আমিও যেতে পারি কিন্তু।‘
‘ওয়াক … ওয়াক’ ইস্ বমি এসে যাচ্ছে আমার। এক দমকা বাতাসের সাথে ট্রেনের ট্রেক থেকে আসা মলমূত্রের গন্ধটি যেন আমার নাকে মুখে ঢুকে গেল। থু … থু … থু …।
‘মা গো, তুমি চলে যাও নাহয় মামার সাথে। এখানে অসুবিধা পাবে এভাবে থাকলে।’
‘বাবা, এক কাপ চা পেলে’ - মনের অস্বস্তি দমাতে বললাম। সঙ্গে সঙ্গে বাবা স্টেশনের ভিতরে থাকা চা-কফির দোকানটিতে অর্ডার দিলেন -
এক মুহূর্তের জন্য তার উপর তীব্র একরাশ ক্রোধও জন্মেছিল। এত মানুষ স্টেশনে ঘোরাঘুরি করছে সে আমার চূর্ণিটিই টানতে পেল ? তার উপর ওর সেই কাজে পলাশ এসে দুষ্টামি করছে বলে আনন্দে বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছিল আমার শরীরে। কিন্তু পলাশের পরিবর্তে মেয়েটিকে দেখে আমার আনন্দ-উৎসাহে ঠাণ্ডা জল পড়ার জন্যও রাগ উঠেছিল। কারণ আমার মন পলাশকেই যে খুঁজছে এই মুহূর্তে।
‘এই মেয়ে। কী করছিস ?’
‘দিদি, তিন দিন ধরে কিছু খেতে পাইনি। দিদি কিছু একটা দিন। ভগবান মঙ্গল করবেন।’
- ‘মা। চলো দুঘণ্টা দেরি হবেই যখন অন্তত এক ঘণ্টার মধ্যে আমরা বাইরে কিছু একটা খেয়ে আসি।’ মনে প্রাণে, চোখে পলাশের জন্য অপেক্ষা করে থেকে উপায় না পেয়ে বাবার কথায় এমনি সম্মতি দিলাম।
- হবে বাবা। চলো তাহলে।
আমরা মানে বাবা, মা আর আমি পার্কিং প্লেসে রাখা গাড়িটিতে গেলাম।
‘কী খাবে ? আসার সময় কিছু খেয়েও আসোনি, না ? আর একটি কথা, ট্রেন আসবে বিকেল পাঁচটায়। তোমরা তত সময় অবধি বসে থাকতে লাগবে না। এমনিতেও গুয়াহাটির পরিস্থিতি দেখছ শুনছই তো। ঘরে চলে যাও। কিছু একটা খেয়ে আমাকে গাড়িতে করে আবার নামিয়ে দিয়ে চলে যাও। বুঝেছো মা ?’
কোথায় খাবে ? কী খাবে ? বেশি দূরে যাব না। কাছেই … বাবার প্রশ্নটি শেষ করতে না দিয়ে বলে উঠলাম -
স্টেশন থেকে বেরিয়েছি। ঠিক একটু এগিয়ে গেছি এমন সময় … স্টেশন থেকে একটা বিকট শব্দ এল। আমাদের গাড়িটির উপরেও কোন কিছু বস্তু ধপধপ করে পড়া যেন মনে হলো। বাবা যথেষ্ট শংকিত হয়ে রামলালকে গাড়ির স্পীড বাড়াতে দিলেন। মা ভয়ে আতংকে চিৎকার করে উঠলেন। বাবা আমার মাথাটি নীচের দিকে চেপে ধরে বললেন -
উফ্ উফ্। আমার কেমন লাগছে। সেই তখন আমি কেক দেওয়া মেয়েটিও তো স্টেশনের বাইরে বেরোয়নি। সে আছে কি অক্ষত হয়ে ? আর এই সময়ের মধ্যে পলাশ এসেছিল নাকি ? যদি এসেছিল ? যদি এসেছিল ? সামনে কখনও না দেখা এমন ভয়ংকর দৃশ্য এবং আনুষঙ্গিক এই ভাবনাগুলোতে অধীর হয়ে মন ও মস্তিষ্ক যেন চিন্তা করতে না পারা হয়ে গেল। আমার পা দু’টোও ঠাণ্ডা হয়ে আছে। হাতগুলিও। কপাল ঘামছে। বাবা … বাবা …. অজ্ঞান হয়ে পড়লাম।
###
আমার চারপাশে উৎসুক হয়ে দাঁড়িয়ে বাবা-মা আর দু’জন ডাক্তার। একজন নার্স। এ কী ? আমি হাসপাতালে ? সাদা বিছানা-চাদরে ঢাকা বেডটি, সবুজ পর্দা ও আশেপাশে থাকা বস্তু এবং লোকদের দেকেই অনুমান করেছিলাম। হ্যাঁ হাসপাতাল নয় ব্যক্তিগত নার্সিংহোমে আমি। কিন্তু কীভাবে ? কী হয়েছিল আমার ? আমার আশ্চর্যবোধক দৃষ্টিকে বাবা, মা, ডাক্তারও বোধহয় নিরীক্ষণ করছিলেন।
ডাক্তার বললেন - ‘এখন কেমন ইয়াং গার্ল ? জাস্ট রিল্যাক্স। টেনশন নেবে না।’
ভেতরে ভেতরে একটা আতংক। সত্যি কি ডাক্তারে বলা মতো আমি OK ?
সুন্দর
ReplyDeleteধন্যবাদ
ReplyDelete