Skip to main content

ব্যথা

মূল অসমিয়া গল্প - ব্যথা 
রুমী লস্কর বরা
অনুবাদ - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
 
অটো থেকে পলাশী নামলডাইরেক্টর অব সেকেণ্ডারি বোর্ডবলে লেখা সাইনবোর্ডটির দিকে সে সঘনে চোখ ঘুরিয়ে দেখল সঠিক এড্রেসে এসে নেমেছে যেন লাগলেও কিজানি কোথাও ভুল হতেও পারে সেরকম একটা সন্দেহ এমন সময়ে এসেথাকে তার উপর ব সময় আসা ঠাঁই হলে আলাদা কথা এই অফিস বা এই জায়গাটিতে আগে পলাশী আসেওনি আগে পলাশী স্কুল-কলেজের পরীক্ষাগুলো দিতে গেলেও এমন হতো ঠিকঠাক পরীক্ষার রুটিনখানা লিখে আনা সত্ত্বেও প্রথম পরীক্ষাটি দিয়ে উঠে আবার সঙ্গের দুতিনজনকে জিজ্ঞেস করে পরের পরীক্ষা অমুক তারিখে না, অমুক বিষয়টিই তো আছে সেদিন ? কিজানি সে কোথাও ভুল করতেও পারে এসব ক্ষেত্রে নিজে যতই শুদ্ধ বলে ভাবে না কেন, নিজে শুদ্ধ বলে ভাবাটিও নির্ভরযোগ্য কি না, আরো দশজনের সঙ্গে মিলিয়ে প্রমাণ দেখতে চায়
কোনওবারই পলাশী এভাবে একা ইন্টারভিউ দিতে আসেনি প্রতিবারই রঞ্জন তার সাথে থাকে টি ডি সি ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে বিয়ে হওয়া পলাশী অতি কষ্টে ঘরেই পড়ে এম এ ডিগ্রীটি নিয়েছিল। তার ডিগ্রীটি যোগ্যতা থাকা বলে বুঝানো শিক্ষক পোস্টে সাত বার অ্যাপ্লাই করেছিল। তার মধ্যে সে জেনেছিল তিন বার সিলেকশন লিস্টে তার নাম উঠেছিল। তার পর সেই শব্দ ‘শোনা’তে সীমাবদ্ধ থাকল। কার্যতঃ হয়ে উঠল না। সিলেকশনে নাম আসার পরের পর্যায়ের কাজের জন্য কার কাছে যেতে হয়, অথবা কী পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়, কেউ কেউ তাকে পরামর্শও দিয়েছিল। তারই সেই বিপরীত স্রোতের কাজগুলো করার ইচ্ছেটি জেগে উঠল না। এমন নয় যে তার চাকরি না করলেও হয়। আছে। চাকরির প্রয়োজন তার আছেতার উপর শিক্ষকতার কাজ করার সে সব সময় তীব্র এক বাসনা পুষে রেখে এসেছে। সেও শিক্ষিত বেকার। এই বেকারের ভাগ্য নিয়ে বেঁচে থাকাটিও বড় অসহনীয় হয়ে পড়ে। শিক্ষিত বেকারের হিসেবে তার একটি চাকরির প্রয়োজন আছে। দ্বিতীয়ত যদি চাকরি পায়, তার আধারে পলাশী তার ঘরোয়া সমস্যা বহু লাঘব করতে পারে। কিন্তু এই দুনিয়ায় সবার ভাগ্যে কি আর ‘প্রয়োজনীয়’ বস্তুগুলো উপলব্ধ হয় ?
ভ্যানিটিব্যাগের ভেতরে থাকা মোবাইলটি বেজে উঠল। পলাশী স্ক্রীণ চেক্‌ করে দেখল - রঞ্জনের ফোন।
- পৌঁছেছো ? অফিসটি খুঁজে পেয়েছ ?
- হ্যাঁ পেয়েছি।
- ঠিক আছে কিনা সাইনবোর্ডটি দেখেছ ভালো করে ?
- হ্যাঁ দেখেছি।
- ক্যান্ডিডেট দেখেছ ?
- ভিতরে যাইইনি।
- ঠিক আছে। ওখানে কাউকে জিজ্ঞেস করে নাও, ইন্টারভিউ কোন কোঠায় হচ্ছে। এনি ওয়ে, ‘বেস্ট অব লাক্‌’।
পলাশী ‘হ্যাঁ’ বলে সংক্ষেপে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোনটি কাট্‌ করে দিল। ‘থ্যাঙ্ক্‌স্‌’ বলতে লজ্জা লাগল। যেন কথাটিতে বেশি ফর্মাল ফর্মাল লাগে। সে জানে, রঞ্জন তাকে সব কাজে হৃদয় থেকে বেস্ট উইশেস্‌ দিয়ে থাকে, তার মঙ্গল কামনা করে থাকে, সে যেমন রঞ্জনের সর্বাঙ্গীন উন্নতি কামনা করে।
ইস্‌। উৎকট গরম পড়েছে। কাল থেকে আশ্বিন ঢুকছেই। নগাঁও থেকে আসতে সে পথের কাছের, মাঠের মধ্যে জায়গায় জায়গায় উঁচু অংশে সাদা কাশগুলো হেলে পড়া দেখে এসেছে। সোনাপুরে পথের দু’পাশের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে জায়গায় জায়গায় থাকা সবুজ টিলাগুলোতে হেলে থাকা কৃশাঙ্গী কাশগুলো দেখে ভালো লেগেছিল। পলাশীর হাসি উঠল যদিও সে পরিবেশ-পরিস্থিতির কথা ভেবে হাসিটি মনের মধ্যেই গুটিয়ে রাখল। ইন্টারভিউ দিতে এসেছে পলাশী। এটা ওটা বইপত্র দেখে প্রস্তুত হয়ে থাকতে হয়, অথচ মাঠের মধ্যেকার সরু কাশ, সাদা মেঘ দেখে আশ্বিন আসার সংবাদ পড়ে এসেছে। পলাশীর একটি কথা মনে পড়ে গেল। রঞ্জনই বলেছিল - এক যুবক নাকি একবার তেমনি কিছু একটা ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিল। ছেলেটি এসেছিল জোড়হাট থেকে। ইতিমধ্যে যুবকটি বহুবার ইন্টারভিউ দিয়ে দিয়ে অভিজ্ঞ হয়ে পড়েছে। তখন ফাল্গুন মাস। ইন্টারভিউ কক্ষে এটা ওটা প্রশ্নের সাথে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো -
- আপনি যে জোড়হাট থেকে গুয়াহাটি এসেছেন, আসতে পথে কী কী দেখে এসেছেন ?
ছেলেটি হেসে চটজলদি উত্তর দিল -
- ফাগুন ...। এই পুরো রাস্তাটিতে আমি ফাগুনের ভিন্ন রূপ দেখে এসেছি স্যর। শুষ্ক পৃথিবীর রস শুষে রাঙা হয়ে গুচ্ছে গুচ্ছে গৌরবে ফুলে থাকা পলাশ, শিমূল, মাদারের ফুলগুলি যেন দুঃখীর রক্ত শুষে শুষে সমাজে উচ্চাসন শোভন করা কেরানি-আধিকারিকবৃন্দ। এদিকে, ঝড়ো হাওয়ার মনপ্রাণ অস্থির করা মাতাল হাওয়া। শুকনো পাতায় দেওয়া সবুজের আগমন বার্তা ......
- ব্যস্‌ ব্যস্‌ ...
চাকরিটি যুবকটি পেল না। সে নাকি ইন্টারভিউ বোর্ডে বসা লোক ক’জনকে বলেও এসেছিল - ‘চাকরিটি যে পাব না আমি জানি। মায়ের তাগিদাতেই তো এলাম দিতে। মা তো জানেন না চাকরির ঘোরতর খেলা।’
- আপনি কি ক্যান্ডিডেট ? ইন্টারভিউ কোথায় হচ্ছে জানেন কি ?
এদিকে ওদিকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে তাকিয়ে পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুধাবন করার চেষ্টা করতে থাকা পলাশীকে পেছন থেকে এসে একজন মহিলা বললেন। পলাশী মহিলাটির দিকে তাকালো। কোলে একটি শিশু। দেড়-দু’বছর হবে হয়তো। মহিলাটি ক্ষীণদেহী। অস্থিচর্ম সার। বেশি ক্ষীণ বলেই নাকি হাসলে ঠোঁটের দুই কোণের দিকে গাল দু’টিতে এতটাই ভাঁজ পড়ে দু’তিনটি রেখা বসে যায় যে মহিলাটির বেশ বয়স বলে মনে হয়। পলাশী মহিলার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। মাথা নেড়ে বলল -
- হ্যাঁ। আপনিও ক্যান্ডিডেট ?
- হ্যাঁ।
- তাহলে আমিও সেই জায়গাটি খুঁজছি। অফিসটিতে প্রথম এসেছি। কোনো হদিশ পাচ্ছি না। চলুন তো ওদিকটায়। ক্যান্ডিডেট যেন লাগা দু’জনকে দেখছি। তাঁরা হয়তো জানতে পারেন ইন্টারভিউ কোথায় হচ্ছে।
ক্ষীণকায়া মহিলাটি পলাশীর কথা সহাস্যে মেনে নিয়ে পলাশীর সঙ্গে এগিয়ে গেলেন। পলাশী দোনামনা হয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করল - ইন্টারভিউ কক্ষ কোথায় আছে জানেন নাকি ?
তার মধ্যে একজন আঙুল দিয়ে দেখালেন -
- আপনারা সোজা চলে যান। গিয়ে ডানদিকের বারান্দা ধরে যেতে থাকলে দেখবেনই ইন্টারভিউ হয়ে থাকা কোঠাটি।
মানুষটিকে একটি ধন্যবাদ জানিয়ে পলাশী নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে পৌঁছালো পলাশী প্রথমে ইন্টারভিউ কক্ষের বাইরের বারান্দায় ক্যান্ডিডেটের সিরিয়াল নাম্বার হ্যাং করে রেখেছে নাকি দেখল। কোথাও চোখে না পড়ায় একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারল ইন্টারভিউ কক্ষের পাশের কোঠাটিতে একজন ক্যান্ডিডেটদের নাম এন্ট্রি করছেন। পলাশী সেই হিসেবে তেইশ নম্বরে পড়ল।
নাম এন্ট্রি করে সে ইন্টারভিউ চলতে থাকা কোঠাটির বাইরের বারান্দায় পেড়ে রাখা বেঞ্চে অন্য ক্যান্ডিডেটদের সঙ্গে সারি পেতে বসল। তার সন্ধানী দৃষ্টি সবার মুখগুলি স্পর্শ করে গেল। পলাশী একবার অরিজিন্যাল সার্টিফিকেট-মার্কশীটগুলোতে ভালো করে আবার চোখ বুলিয়ে নিল। সে যে লেখিকা সেই বিষয়টি অবগত করাতে পারা বিষয়ের ফাইলটি দেখাবে কি ? মনে মনে একবার ভাবল কোনো লাভ হবে কি ? দেখা যাবে সময় মতো দেখা যাবে নির্দিষ্ট সময়ে ইচ্ছে হলে দেখাবে ইচ্ছে না হলে হাতেই রেখে দেবে
বলতে গেলে এবার চাকরির ক্ষেত্রে বয়সের সীমা সরকার আরো বাড়িয়ে না দিলে তার বয়স এখন চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে বলে না সাত বছর আগে শিক্ষয়িত্রী পোস্টে সে ইন্টারভিউ দিয়ে রেখেছিল তার পরেই অপেক্ষা আজ হবে এপয়েন্টমেন্ট, কাল হবে - এমন অবস্থায় আবার কিছু পুরোনো ক্যান্ডিডেটরা হৈচৈ লাগিয়ে দেওয়ায় স্থগিত করে দেওয়া হলো সেই তখনই ইন্টারভিউ দিয়ে রাখা ক্যান্ডিডেটদের এখন আবার ডেকেছে এই সাত বছরে তখনকার তেত্রিশ বছরের ক্যান্ডিডেটটি এখন চল্লিশ বছরের হলো তদুপরি এই যে দিনগুলি চলে যাচ্ছে, ঝাঁকে ঝাঁকে শিক্ষিতের হার বেড়ে যাচ্ছে। এখন ইন্টারভিউ বোর্ডে গুরুত্ব দেওয়া দিকগুলো হলো - ক্যান্ডিডেটের মার্কশীট নম্বর সঙ্গে বি এড লাগবে নেট, শ্লেট, এম ফিল থেকে শুরু করে বিশেষ বিশেষ ডিগ্রীগুলোও আজকের শিক্ষার্থীদের থাকবেই সেস্থলে আশি নব্বই দশকের শিক্ষিত বেকাররা, যারা আজ পনেরো বিশ বছর শুধু পরীক্ষা দিয়েই অপেক্ষারত, তাদের ব্যবস্থা কী হবে ? তখন তো আজকের মতো এমন জরুরী অবস্থাও ছিল না যে বি এড করতেই হবে। অথবা নেট, শ্লেট, এম ফিল হলে নম্বর বাড়বে তখন একটি বিষয়ের তিনটি প্রশ্নপত্রের উত্তর লিখে পাশ করা শিক্ষিত বেকাররা আজকের সেমেস্টার পদ্ধতিতে আশি নব্বই শতাংশ নিয়ে পাশ করাদের সঙ্গে ব্যবধান কীভাবে নির্ণয় করবে ? একজন সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত ক্যান্ডিডেটই যে একজন উৎকৃষ্ট শিক্ষক হতে পারবে, তার কোন নিশ্চয়তা নেই এই যে সাক্ষাৎকারগুলো - এসব এক একজন উচ্চ নম্বর নিয়ে পাশ করা ব্যক্তি চয়ন করবেন নাকি এক একজন উপযুক্ত শিক্ষক চয়ন করবেন ?
বিভিন্ন প্রশ্ন এসে পলাশীকে ঘিরে ধরে হতাশায় ডুবিয়ে দিল ফিরে যাবে নাকি ? সাক্ষাৎকার দিয়ে কোন লাভ হবে কি ? কিন্তু … ? কিন্তু কী ? হ্যাঁ, পলাশী যদি ইন্টারভিউ না-ই দেয় এত দূর পথ কিলিয়ে এল কেন ? এখন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হয়েও ফিরে গেলে সে পলাতক সৈনিকের মতো হয়ে যাবে না নাকি ? লেখিকা হিসেবে তার একটা পরিচয় আছে মানুষ তাকে বহু সম্মানও দেয় কিন্তু আমাদের অসমে কতজন লেখক বা লেখিকা শুধু লেখালেখি করে বর্তে থাকতে পেরেছেন ? কাগজে-পত্রে লিখার বাবদ সময় বিশেষে সম্মানীয়টুকুও পান না। কখনো কাগজের অফিসে খবর করলে বলবে - ‘আপনি এলে নিয়ে যাবেন।’ কলম হলো নেশা। হাতের আঙুলে এখন সে আঠা হয়ে পড়েছে। ছাড়তে পারি না। কলম চালিয়ে থাকলেই জীবনও চলে যাওয়া হলে, ঘরোয়া সমস্যারও সমাধান হয়ে গেলে কথাই ছিল না। বিশেষ করে পলাশীর ঘরটির অভাবগুলো, সমস্যাগুলো, তার রুঢ় বাস্তব। কেবল রঞ্জনের বেতনের টাকা ক’টি দিয়ে সব দায়িত্ব পালন করে যাওয়া বহু কঠিন। এদিকে এরকম মুদ্রাস্ফীতির দিন।
- আপনার সিরিয়াল নাম্বার কত ?
পলাশীর কাছেই খুঁটিতে হেলান দিয়ে বহু সময় ধরে নির্বিকার হয়ে বসে থাকা পুরুষটি জিজ্ঞেস করলেন। সঙ্গে আরো দু’জন বসে আছেন। বয়সটা ঠিক ধরতে পারা যাচ্ছে না। চল্লিশের কাছাকাছি অথব পার হয়ে গেছে বলে মনে হয়। চুলে জ্যোৎস্নার রঙ লেগেছে। মাঝে মাঝে থাকা কালো চুলক’টি যেন জ্যোৎস্নার মধ্যের কালো মেঘের রেখা। মুখের বলিরেখা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। কপালের রেখাগুলিও স্পষ্ট। পলাশী ভাবছিল - পুরুষক’জন বোধ হয় কোনো ক্যান্ডিডেটের অভিভাবক হয়ে এসেছেন। কথাটি চট করে জিজ্ঞেস করতেও ভালো লাগল না। পুরুষ তিনজনকে সে আপাদমস্তক লক্ষ করল। হাতে হাতে তিনজনেরই জরাজীর্ণ সার্টিফিকেট, মার্কশীটের অরিজিনাল ফাইল এক একটি। সাধারণ টি-শার্ট। প্যান্টের নিচের সূতা বেরোনো। পায়ে গোড়ালির দিকে ক্ষয়ে যাওয়া স্যান্ডাল। তাঁদের মুখগুলি পলাশী পড়ার চেষ্টা করল। প্রত্যেকের বেশভূষা, মুখের অবয়ব বুঝিয়ে দিচ্ছে এত দিন ধরে তাঁরা জীবনের সঙ্গে, অর্থের সঙ্গে, সমস্যার সঙ্গে কীভাবে যুদ্ধ করে আসছেন। সময় যার চিহ্ন রেখে গেছে তাঁদের চুলে, বেশভূষায়, শরীরে, মনে। হয়তো বা -
- আপনার সিরিয়াল নাম্বার ?
- ওহ্‌, তেইশ নম্বর।
পুরুষটি প্রথমবারে করা প্রশ্নটি আবার করলেন পলাশীকে। পলাশী সপ্রতিভভাবে উত্তর দিয়ে সেও জিজ্ঞেস করল -
- আপনারা ...
- ক্যান্ডিডেট। আপনি কী ভেবেছিলেন ?
পুরুষটি উত্তর দিয়ে আবার পলাশীকে পালটা প্রশ্ন করাতে পলাশী একটু থতমত খেল। সে তাঁদের কী ভেবেছিল ? বলবে কি ? কারো অভিভাবক বলে যে সে কিছু সময় আগে পর্যন্তও ভাবছিল ? উঁহু। সেভাবে বলাটা সমীচীন হবে না। সেরকম বলা মানে তাঁদের বয়সের সঙ্গে শরীরের পরিবর্তনটিও মনে করিয়ে দিয়ে অন্য এক হতাশার আবেষ্টনীতে ঠেলে দেওয়া হবে। তাহলে ? ফাঁকি ? হ্যাঁ, ফাঁকির সহায় নিতে লাগবে। কাউকে দুঃখী না করার জন্য এরকম ফাঁকি দেওয়ার প্রয়োজন আছে।
- ক্যান্ডিডেট যে বুঝেছি। কিন্তু কোথা থেকে ...
- আমি এসেছি লখিমপুর থেকে। ইনি তেজপুর থেকে আর ইনি শিবসাগর থেকে। আমি একটি জুনিয়র কলেজে যাই। টাকাপয়সা পাই না। শিক্ষার চর্চা করছি ধরে নিন।
নিরুদ্যম হাসি নিয়ে লখিমপুরের পুরুষটি বললেন। পলাশীর তখনো তাঁর নামটি জিজ্ঞেস করা হয়নি। জিজ্ঞেস করতেও আফসোস্‌ হচ্ছে। মানুষটি দেখতে তেমনই সহজ সরল।
- আগে ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন ?
পলাশীর প্রশ্নে পুরুষটি শুকনো হাসি নিয়ে আবার বললেন -
- ইন্টারভিউ ? এই নাটক বহুবার করেছি বুঝলেন। এখন আর মন যায় না। কী করবেন ? আমাদের মতো প্রাণীরা আশাতে বন্দি।
- সংসার ... ?
জিজ্ঞেস করব কি করব না করে শুনলেও শুনুন, না শুনলেও থাক বলে পলাশী ধীরে জিজ্ঞেস করল যদিও পুরুষটি শুনলেন। পলাশী আশা করার চাইতেও বহু বেশি ব্যক্তিগত কথা পুরুষটি পলাশীর কাছে অকপটে বলে গেলেন। তার এমন মনে হলো যেন ইন্টারভিউ কক্ষের বাইরে পলাশী এ এক অন্য ইন্টারভিউতে ব্যস্ত।
- সংসার আমার করা হয়ে ওঠেনি। বাবা ক্যান্সার রোগী। একটি অবিবাহিত বোন আছে। বিধবা দিদি তিন ভাগ্নে নিয়ে আমাদের ঘরে থাকে। খেতকৃষি করি যদিও বন্যা এসে সর্বস্বান্ত করে যায়। ফলে কৃষিজমি দু’বিঘা মতো আছে যদিও কাজে আসে না। সুতরাং -
লোকটি ‘সুতরাং’ শব্দটির পর কিছুক্ষণ দ্বিধাগ্রস্তভাবে রয়ে গেলেন। সেই ডট্‌ ডট্‌ ডট্‌টি পলাশীর বুঝতে বাকি থাকল না। সুতরাং তাঁর সংসার করার কথা ভাবার সুযোগ কোথায় ? এত সমস্যা, অভাব অনটনের মধ্যে তিনি কী করে সাহস করেন একটি মেয়েকে এনে তাঁর দারিদ্রের সমভাগী করার ? পলাশী বাকি দু’জন পুরুষের দিকে তাকালো। তাঁদের একজন ভাবলেশহীন ভাবে সামনের দেওয়ালটির দিকে তাকিয়ে আছেন, পলাশীর দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনেছেন। অন্যজন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছেন। পলাশী তাঁদের কিছু জিজ্ঞেস করল না। কী জিজ্ঞেস করবে ? তাঁদের শরীরের বেশভূষা, চিন্তাক্লিষ্ট মুখগুলি পরিচয় দিচ্ছে সময়ের দেওয়া, আজকের পরিস্থিতির দেওয়া নিষ্ঠুরতার ছবিটির কথা। অভাব অনটন, বেকার সমস্যার ভয়াবহ রূপের এঁরা একেকটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। এমনকি ... এমনকি পলাশীও ... ? হ্যাঁ তো, সেও এক দৃষ্টান্ত। অর্থের জন্য সেও তো রঞ্জনের উপর আজও নির্ভরশীল। রঞ্জন একা কোনদিক দেখবে ? চাই, তার একটি চাকরি চাই। সেও বেকার, পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে চায় নাকত কষ্ট করে মা-বাবা তাদের পড়ালেন। তার কী যে স্বপ্ন ছিল। একটি স্কুলে, নাহলে হায়ার সেকেণ্ডারি, কলেজে সে শিক্ষকতা করবে। ছাত্র ছাত্রীকে সে আন্তরিক ভাবে শিক্ষা দেবে। সৎ হতে পরামর্শ দেবে। জীবনের ব্যবহারিক দিকের শিক্ষা, জ্ঞান দিতেও সে চেষ্টা করবে। প্রয়োজনে তা তার বৃত্তিগত পাঠদানের অন্তর্ভুক্ত নাও হতে পারে।
- বুঝলেন, এবারও যদি কিছু একটা না হয় আর তো বয়স নেইই, সরকার কি চাকরিপ্রার্থীর বয়সের সীমা ষাট বছর পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারবে ? তা তো সম্ভব নয়ই। কী ভাব হয় জানেন - আমাদের মতো হালেরও নয় বীজেরও নয়, মা বাবার চিন্তা বাড়ানো অপদার্থ সন্তানরা সুইসাইড ...
- ওহ্‌ মাই গড। না না। বলতে নেই। কী কথা মুখে আনছেন ? সেরকম একটি কাজ করলে আপনি তো গোটা পরিবারটিকেই মানসিক ভাবে হত্যা করে যাওয়া হবে। যেভাবে যুদ্ধ করে যাচ্ছেন, সেরকমই করতে থাকুন ... আর ...
আর কী ? পলাশী আর কী বলতে চাইছে ? একজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে হঠাৎ পরিচিত হয়ে সে এতগুলো কথা বা উপদেশ কী করে দিতে পারল ? সে কি একটু বেশি বলে ফেলল না ? কথাগুলো কী বলছিল মানুষটির সামনে একটু আগে ? সে মনে করল। মনেই ভাবল। না না। অপরিচিত হলেও মানুষটিও তো অপরিচিতের সামনে বলার মতো করে বলেননি। তার মানে পুরুষ মানুষটি কিছু একটা অনামী ভরসা পেয়েছেন পলাশীর থেকে। ফলে তিনি বুকের ভিতরটি কিছু খুলে দেখিয়ে দিয়েছেন। যার জন্য পলাশীও দেখছে মানুষটির ভিতরে এক বুক হতাশা, দীর্ঘশ্বাস পুরুষক’জনের মুখগুলি হাজার চেষ্টাতেও কারুণ্যের রেখাগুলি ম্লান করতে পারেনি। পলাশীর বুকটি অজানা আশঙ্কায় চিনচিন করে বেজে উঠল যেন। এসব ... এসব ... চারপাশে কী ঘটতে লেগেছে ? এভাবে কত যুবকের জীবন-যৌবন চলে গেছে ? কত যুবক উশৃঙ্খল হয়ে হাতে বন্দুক তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে ? কত জনের পরিবার অকাল অন্ধকার গ্রাস করে নিয়েছে ? কত জনের সংসার অচল হয়ে রয়ে গেছে ? সেরকম হয়তো এক এক জন বিবাহযোগ্য মেয়েও অবিবাহিত হয়ে থেকে গিয়েছে। চাকরি না হওয়া বা কর্মহীন যুবকের কাছে কোন মেয়ে বিয়ে হয়ে আসতে চাইবে ? পরিবারটির একমাত্র আশা-ভরসার স্থল এই পুরুষটির একটি চাকরির অতি প্রয়োজন। তাঁর চাকরিটির সাথে জড়িত হয়ে আছে পরিবারটির রুগ্ন মা-বাবা, অবিবাহিত বোন, বিধবা দিদিরও পরিবারটি। ক্যান্সার রোগী বাবার যন্ত্রণাকাতর চিৎকার পুরুষটির বুকে কুঠারাঘাত করে। প্রতি রাতে বাড়ির পেছনের বিশাল বৃক্ষটিতে হয়তো ঝুলে গিয়ে এই অশান্তি থেকে, এই অসহায়, অক্ষমবোধ থেকে বাঁচতে, চিরশান্তি পেতে মনটি অধীর হয়ে পড়ে।
পলাশীর এরকম লাগল - তার চাইতেও যেন লোকটির দুঃখ-অশান্তি বেশি। বলতে গেলে সবার ঘরেই তো অশান্তি আছে, দুঃখ আছে। সেখানে যদি চাকরির জন্য নির্ধারিত বয়স পেরিয়ে যেতে ধরা যুবক আছে, তাহলে তেমন ঘরে সেই সমস্যা নিত্য একটি করুণ, ভয়ানক, বীভৎস নাটকের সৃষ্টি করে চলেছে। কেন ? কেন পলাশী যেখানেই যায়, দুঃখী মানুষকেই পেয়ে সে মনটি ভারাক্রান্ত করে ফেলে ? লোকটির জন্য তারও তো কিছু করার অবলম্বন নেই। সেও অসহায়। সে ইন্টারভিউ না দিয়ে বেরিয়ে যাবে নাকি ? অন্তত একটি ক্যান্ডিডেট কমে যাবে। কিন্তু ... ? কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার এই কথাটিও মনে এল। পলাশী ইন্টারভিউ না দিয়ে চলে গেলেই যে সেই লোকটিই চাকরিটি পাবেন, তার কি নিশ্চয়তা আছে ? প্রায় দেড়শো পোস্টের বিপরীতে হাজারোর্ধ্ব ক্যান্ডিডেট। এও কি সে অবিবেচনার কাজ করবে না ? সেও তো সমস্যার ঊর্ধ্বে নয় ? তারও ঘরে রুগ্ন মা, রোগের ভারে যৌবনাবস্থাতেই বার্ধক্যকে কাছে টেনে আনার মতো বোনটি, অবিবাহিত বোন, তারও এক বেকার ভাই আছে। সেও তো ... হ্যাঁ, সেও হয়তো এই পুরুষটির মতো অন্তর্দ্বন্দ্বে ভুগে। আজ কাল করে করে তারও বয়স বেড়েই যাচ্ছে। সেও চেষ্টায় লেগে আছে একটি চাকরির জন্য। তারও অসহায় মুখটি পলাশীর মনে দোলা দিতে থাকল। পলাশী ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে পড়ল। ইন্টারভিউ দেবে কি দেবে না ? লোকটির কথা মনে এল। এবারও যে চাকরি হবে আপনি কী করে বলবেন ?
ছোট থেকেই শিক্ষকতার বৃত্তিকে ভালো পাওয়া, ছোটবেলায় খেলা শিক্ষয়িত্রীর ভূমিকায় পলাশী অবতীর্ণ হয়ে তার সঙ্গীদের ছাত্রছাত্রী বানিয়ে আমেজ পাওয়া কথাগুলি বিদ্যুৎ বেগে মনের ভেতর এসে পলাশীর ঠোঁটে এক শুষ্ক হাসি ছড়িয়ে পড়ল।
- পলাশী কাশ্যপ ?
পিয়োনটি ইন্টারভিউ কক্ষের দরজা খুলে পলাশীর নাম ডাকল। পলাশী সচকিত হয়ে দাঁড়াল। পলাশী জেনেছে। তার এখন পরীক্ষার্থীর ভূমিকায় অভিনয় করতে হবে। মুখে এক কৃত্রিম হাসি বুলিয়ে সে সবাইকে নমস্কার জানিয়ে ভেতরে ঢুকল। যে ভূমিকায় সে ইতিমধ্যে সাত বার অবতীর্ণ হয়েছে।
- বসুন।
- ধন্যবাদ ...।
পলাশী চেয়ারটি সামান্য টেনে পিছিয়ে বসল।
- আপনার অরিজিনাল সার্টিফিকেট, মার্কশীট ... ?
পলাশী ফাইলটি এগিয়ে দিল। একজনের পর একজন ইন্টারভিউ কক্ষে বসা ব্যাক্তিরা পলাশীকে এটা ওটা প্রশ্ন করে গেলেন। পলাশী বিনম্রভাবে উত্তর দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।
এমন ইন্টারভিউগুলোতে তার একটা ভয়ও ঢুকে থাকে। সে যতটুকু জানে বা পড়েছে, তার মধ্যে হয়তো প্রশ্নকর্তার প্রশ্ন ছুঁয়েও না যেতে পারে। কখনো আবার জানা কথাও উচিত সময়ে যথাযথভাবে মনে আসে না। কিন্তু প্রশ্নকর্তার বিচারে তো ‘জানে না’ বলেই রেকর্ড হয়ে যাবে। ছাত্র-ছাত্রীকে কাল যে পাঠের শিক্ষা দেবে, শিক্ষককে সেই পাঠ প্রথমে নিজে ভালো করে অগ্রিম অনুশীলন করতে হবে। কিন্তু ... কিন্তু এধরণের প্রশ্ন ইন্টারভিউ কক্ষে কেউই অবতারণা করেননি।
এক সময় পলাশী ইন্টারভিউ কক্ষ থেকে গতানুগতিক পদ্ধতিতেই বেরিয়ে এল। বাইরে বারান্দায় সেই নির্দিষ্ট স্থানে খুঁটিতে হেলান দিয়ে নির্বিকার হয়ে বসে থাকা পুরুষক’জনের দৃষ্টিতে ব্যগ্রতা, উৎকণ্ঠা প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে। তিনজনই পলাশীর দিকে তাকিয়ে হাসলেন। এক এক করে তিনজনই বলে গেলেন -
- হলো ? বহু সময় নিল দেখছি। আপনার চাকরি হবেই, দেখবেন।
অন্যজন বললেন -
- মিষ্টি খাওয়াবেন কবে বলুন।
একজন বললেন -
- হোক। আপনার যদি চাকরিটা হয়ে যায়, আমাদের ভালো লাগবে। বেকার হয়ে বসে থাকার অন্তর্দ্বন্দ্ব কী আমাদের থেকে ভালো করে কে উপলব্ধি করতে পারবে ?
পলাশী ফ্যাকাশে হেসে তিনজনের দিকেই আবার চাইল। এই মুহূর্তে কী বলবে ? কী বলবে না ? তার নির্বোধের মতো লাগল। বুকের ভেতর কোথাও এক ব্যথা অনুভব করল। অজানা দুঃখবোধে তার দু’চোখ সজল হয়ে উঠল। ধরা পড়লে লজ্জা পাবে। কিছু একটা বলতে পলাশী মুখ খুলেছিল। ঠোঁটদু’টি কেঁপে উঠায় সেই মুহূর্তে কিছু না বলাই ভালো হবে বলে খানিক মৌন হয়ে রইল। তাঁদেরও ইন্টারভিউ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পলাশী রইবে নাকি ? সে ঘড়িটির দিকে দেখল। দু’টো বেজেছে। নগাঁও ঘুরে যাওয়ার কথা। বেশি দেরি পর্যন্ত থাকাও সম্ভব হবে না। তার উপর তাঁদের ইন্টারভিউ কক্ষে ডাকবে নাকি সেদিন নিমন্ত্রিত সবার পরীক্ষা হয়ে যাওয়ার পর। কারণ, তাঁদের ইন্টারভিউর কলিং লেটার পাওয়াতে বিলম্ব হয়েছে। তাঁদের সিরিয়াল নাম্বার আজ দু’দিন আগেই পেরিয়ে গেছে। কিছু সময় থেকে পুরুষক’জনকে তার প্রবোধ দেওয়ার ইচ্ছা জেগেছিল। এই যে কিছু সময় আগে একজন বলেছিলেন - সুইসাইড ...। এ তো জীবনের সমস্যার সমাধান নয়। এই মুহূর্তে তাঁদের সেরকম কিছু কথা বলার পরিবেশটিও সময়োচিত হবে না। সেও অসহায়। সময় তারও হাত দু’টি বেঁধে রেখেছে। প্রথমত সে তার নিজের সমস্যারই তো সমাধান করতে পারেনি। কিন্তু তাঁদের জন্যও কিছু একটা করার মানসিকতা তাকে ভিতরে ভিতরে অধীর করে তুলেছে। কোনো পথের ভিক্ষুক হাতে ভিক্ষার পাত্র নিয়ে ঘুরতে থাকলে সেই পাত্রে কেউ দু’এক টাকা ছুঁড়ে দিলে ভিখারিটি আশীর্বাদ দেয় - ‘ভগবান মঙ্গল করুন।’ যে ভগবানের নাম নিয়ে দাতাকে কৃপা করার কথা বলছে সেই ভগবানই কিন্তু তাকেও ভিখারি করেই রেখেছেনপলাশীদের মতো সমস্যাজর্জর প্রাণীদের সেই একই দশা। তার দুর্বল মনেও অদৃশ্য শক্তিকে প্রার্থনা জানাল - ‘এঁদের দিকে চোখ মেলে তাকাও প্রভু।’
এর বাইরে পলাশীরও অন্য অবলম্বন নেই। তার মতো সমস্যাজর্জরিতরা অন্য সমস্যাগ্রস্ত লোকের জন্য অদৃশ্যজনের কাছে প্রার্থনাই জানাতে পারে - একজন অন্যজনের কারণে ত্যাগ করারও যেখানে সুবিধা থাকে না। ফোন নাম্বারটি সে নেবে কি ? আফসোস্‌ হলো। কী বা ভাববে ? পুরুষক’জনের সঙ্গে ভবিষ্যতেও একটা যোগসূত্র রাখার ইচ্ছে জেগে ওঠা সত্ত্বেও সে কী ভেবে যেন থমকে রইল। অন্য কিছু করতে না পারলেও একজন অন্যজনকে সমবেদনা-সহানুভূতির মাধ্যমে তো কিছু উৎসাহ দিতে পারবে।
না হলো না। তাঁদের ফোন নাম্বার নেওয়া হলো না। অবশ-ভারাক্রান্ত পদক্ষেপে সে তাঁদের ইন্টারভিউর জন্য আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে ধীরে ধীরে অফিসটি থেকে বেরিয়ে এসে রাজপথে উঠল। রাজপথের ব্যস্ততাময় কোলাহল, যানজটের ভিড় পলাশীর বুকে আঘাত করছে। আহ্‌ ব্যথা ? বুকের ভিতর এত ব্যথা ...।

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...