মূল অসমিয়া গল্প - মর্ণিং টী
রুমী লস্কর বরা
অনুবাদ - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
গত দু’বছর ধরেই বন্দিতা কলকাতায় আছে। রাসেল স্ট্রীটে থাকা ‘অসম হাউস’-এর কাছেই বন্দিতা থাকে। এলাহাবাদ ব্যাঙ্কে তার চাকরি। বন্দিতা সম্পর্কিত কথাগুলো মেঘনা জানে গত দু’বছর থেকেই। কলেজের ছাড়াছাড়ির পরই তাদের মধ্যেকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। মেঘনার বিয়ে হয়ে গেল। বন্দিতা বছর খানেক মেঘনার সাথে চিঠি আদানপ্রদান করেছিল, কিন্তু সাংসারিক মেঘনা এই ব্যাপারটিতে কিছুটা পিছন পড়ে গিয়েছিল। মেঘনার তাৎক্ষণিক সাড়া না পাওয়াটাই বন্দিতার চিঠি বন্ধ হওয়ার একমাত্র কারণ অবশ্য নয়, বন্দিতাও অনেক ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
যাই হোক, ইন্টারনেট যুগ তাদের যোগাযোগ সুগম করে দিল। মেঘনার সন্তানও বড় হলো। দিল্লিতে জে এন ইউতে পড়ছে। এখন মেঘনার যথেষ্ট অবসর। ফেসবুকে প্রথম তাদের যোগাযোগ হলো। পরে হোয়াটস্অ্যাপে কথোপকথন। কলকাতায় বন্দিতা একাই আছে। মেঘনাও এলে তার ভালো লাগবে। ঘুরে ফিরে থাকতে মেঘনাও ভালোই বাসে।
ইতিমধ্যে ফোনেই তারা কোথায় যাবে, কী কী করবে কথাগুলো আলোচনা করেই রেখেছিল। বন্দিতা বলেছিল - ‘অ্যাই, তুই থাকা ক’দিন শুধু কলেজের দিনগুলোতেই বিচরণ করব বুঝেছিস ? নতুন সংসার, নতুন ঝামেলা। যাই যাই করতে থাকবি না। তুই এলে আমিও ছুটি নেব। কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজ অথবা কলকাতা ইউনিভার্সিটির এক্সপিরিয়েন্স আমাদের নেই। তাতে কী হলো ? কলেজ স্ট্রীটের বিখ্যাত ‘কফি হাউস’-এ বসব। আড্ডা দেবো, কফি খাবো। কলেজের ছেলেমেয়েদের দেখে দেখে ফেলে আসা দিনগুলির বিষাদ-মধুর মিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ব। গতানুগতিক বিরাগী পরিচ্ছেদগুলো থেকে অব্যাহতি নিয়ে আবেগবিধৌত হবো।
###
প্রাতঃভ্রমণ মেঘনার পুরোনো অভ্যাস। স্বাস্থ্যের প্রতি খুব সচেতনও বলা যায় না। ভোরের নির্মল, শান্ত প্রকৃতি, পাখির কাকলি, পুব দিগন্তে মেঘ সরিয়ে উদিত সূর্যের সুকোমল হাসিটির সঙ্গে প্রকৃতির ভিন্ন রূপের এই ‘কোলাজ’ উপভোগ করে মেঘনা উৎফুল্লিত হয়ে পড়ে। এটুকুই দিনটির আরম্ভের অনাবিল সুখানুভূতি। যার পর দিনজোড়া যান্ত্রিক ব্যস্ততা।
বন্দিতা আবার মেঘনার বিপরীত। তার মতে, ‘ওরে, দিনজোড়া মাথা সোজা করার সময় না পাওয়া ব্যস্ততার কথাটি যখনই মনে আসে, তখনই ভোরের এই সময়টুকুই ভালো করে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। এই সময়টিতে শোয়ার আমেজই আলাদা বুঝেছিস ? বিয়ে হয়ে হাজবেন্ড, বাচ্চা - এদের জন্য টিফিন তৈরি করতে ভোরে তাড়াতাড়ি ওঠার ভয়ে বিয়েই হলো না বাব্বাঃ। বাট আই এম হ্যাপী। মনের কথা শেয়ার করার জন্য তোর মতো বান্ধবী আছে। রিটায়ারমেন্টের পর কী করব ভাবিনি। চলে যাবে। কাল-এর কথা ভেবে ‘আজ’কে কেন বরবাদ করব ? সংসারীদের দেখেছি। বাচ্চাকাচ্চা থাকাদেরও বৃদ্ধাবস্থায় একাই কাটাতে হয়। কর্মসূত্রেই হোক, বিবাহ সূত্রেই হোক, আজকালকার বাচ্চারা দেখি বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকেই না। বৃদ্ধ বাবা-মা’দের একা একাই নিজের খেয়াল রাখতে হয়। সুতরাং থেকেও না থাকার দুঃখ নিয়ে ঘোরার চাইতে না থাকাই ভালো। হাঃ হাঃ হাঃ …। কিন্তু তা বলে আবার তুই কথাগুলো সিরিয়াসলি নিবি না। জীবনে কার, কখন, কী দিন আসে কে জানে। ব্যস্। ‘আজ’টি উপভোগ কর।’
সব কথাকেই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে
বিশ্লেষণ করে বন্দিতা। যা পাচ্ছে তাতেই সুখী। কলসীর মতো বেড়ে ওঠা বন্দিতার পেটটির
দিকে তাকালো মেঘনা। ফুটো
বেলুনের মতোই ঢিলেঢালা হাতের মাংসপেশীগুলো …… না। বন্দিতার সেসবে ভ্রুক্ষেপ নেই। যা খেতে মন যায় তাই খাবে। যা পরতে মন যায়, তাতে তাকে না মানালেও
সে পরবে। মোট
কথা জীবনটি বন্দিতার ভালো লাগা মতেই উদ্যাপন করবে। অন্যের পছন্দ অপছন্দে সে মাথা ঘামায়
না। বন্দিতাকে
এজন্যই মেঘনার ভালো লাগে। কোন রাখঢাক নেই। পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আসা নির্মল
জলধারার মতোই সে। মনের
ভেতর কী আছে বাইরে থেকেই দেখা যায়।
মেঘনা যেখানেই যায় ভোরের হাঁটার অভ্যাসটি অব্যাহত রাখে। হেঁটে আসার পর সে এক কাপ লাল চা দু’ফোঁটা মতো লেবুর রস দিয়ে খায়। সঙ্গে দু’টি মেরীগোল্ড বিস্কুট। বন্দিতার মতে, ‘সকাল সকালই কে টক দিয়ে শুরু করে রে ? তুইও যে … আমি তো একটি কাজু বরফি, একটি কালাকাঁদ, এক কাপ দুধ-চা খাবোই। পরে দিনজোড়া টক, তেতো, কষায় যা খাওয়ার আছে খাবই।’
###
রাসেল স্ট্রীটে বন্দিতা থাকা ফ্ল্যাটটি থেকে ডান দিকে গেলেই পার্ক স্ট্রীট। বাঁদিকে একটু এসে আবার বাঁদিকে ঘুরে দু’ফার্লং মতো হেঁটে রাস্তার কাছেই আছে ইলিয়েট পার্ক। গত কয়েকদিন সে এই পার্কটিতেই হাঁটতে বেরিয়ে এসেছে। সে ফিরে যাওয়া সময়েই বন্দিতা বিছানা ছাড়ে। তার জন্য এক কাপ লেমন টী, বন্দিতার নিজের জন্য এক কাপ দুধ চা তৈরি করে রাখে। নিজের রাজ্য থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও মেঘনার বহু দূরে আছে বলে লাগেনি। যেখানে আপন মানুষ থাকে, সেই জায়গাটিও কিজানি আপন আপন লাগে। সকালেই পিঠে বই-এর বোঝা নিয়ে টিউশন করতে আসা ঝাঁক ঝাঁক কিশোর কিশোরীর কথোপকথনে নিশার নিঝুম পরিবেশের যবনিকার খবর দেয়। স্ট্রীটফুডের দোকান দেওয়া ব্যবসায়ীদের দু’হাত ব্যস্ত হয়ে পড়ে। গরম গরম কচুরি, শিঙাড়া, লুচি ভাজার ফুরফুরে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বহিঃরাজ্যে থাকলে পথের পরিচয় জানতে ভোরের ভ্রমণই সুন্দর সময়।
পার্কটিতে ঢুকতেই প্রথমে বাঁদিকে একটি পদপথ পাকা বাঁধা আর ডানদিকেও একই ভাবে পাকা বাঁধা। ভালো করে দেখলে এমন লাগে - একটি বৃহদাকারের শূন্য। তার মধ্যে আছে কৃত্রিম ভাবে নির্মিত দু’টি পুকুর। শূন্যটিকে দু’টি অর্ধ চাঁদের মতো ভাগ করেছে একটি পুকুর। নানা ধরণের ফল ফুলের গাছ। বিচিত্র রঙের পাখির কাকলি। তার মধ্যে মানুষের ব্যস্ত পদধ্বনি। সঘন শ্বাস-প্রশ্বাস। মেখনা প্রাতঃভ্রমণে এই মানুষদের বেশ উপভোগ করছে। ঢিলেঢালা মহিলা দু’জন নতুন মুখ দেখে মেঘনাকে ঘুরে ঘুরে চেয়ে যায়। কেউ মুচকি হেসে যায়।
পাকা পদপথের মধ্যের বনের দক্ষিণ কোণে আছে দু’টি মতো বড় গাছ। যাতে গোলাকৃতি করে পাকা বেদির মতো করে রাখা আছে। ইচ্ছে করলে কেউ কেউ সেখানে বসতে পারে। ষাটোর্ধ্ব মতো মনে হওয়া বয়স্ক লোক ব্যায়ামের নামে সেই নিরিবিলি জায়গাটিতে হাত-পা সঞ্চালন করেন। তাঁদের মধ্যে হাসির অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলে। এক জন শুরু করেন হাঃ হাঃ হাঃ …। অন্য এক জন তাঁর চাইতে উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করেন। অন্য আরেক জন তাঁর চাইতেও উচ্চস্বরে হাসতে চেষ্টা করেন। প্রথমে এই হাসি স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে বেরিয়ে আসে না। হাসতে হয়। হাসি এক ভালো এক্সারসাইজ্ শরীরের জন্য। হার্টের জন্য। ডাক্তারও নাকি এমন উপদেশ দিয়ে থাকেন।
জোর করে হাসির চেষ্টা করতে গিয়ে তাঁদের কারো মুখের অঙ্গভঙ্গি এবং হাসির শব্দ এমন অস্বাভাবিক হয়ে বেরোয় যে এক ভালো ‘কমেডি সীন’ হয়ে পড়ে তাঁদের অজ্ঞাতে তাঁদের লক্ষ করতে থাকা সবার জন্য। এক জনের অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি দেখে এবং হাসির শব্দ শুনে তাঁদের মধ্যে তখন স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে এক সময় হাসি বেরোতে থাকে।
হাঃ … হাঃ … হাঃ …
হাঃ … হাঃ … হাঃ …
হাঃ … হাঃ … হাঃ … হাঃ … উহ্ … উহ্ … উহ্ …
পেট ফেটে যায় পেট ফেটে যায় করে রে ……।
বাংলা ভাষা অথবা হিন্দি ভাষায়, তাঁরা হেসে হেসে পেটে ধরে ধরে, অর্ধস্পষ্ট ভাবে প্রকাশ করেন।
দৃশ্যটি উপভোগ করে মেঘনারও হাসি উঠে যায়। সেই জায়গাটি পেরিয়ে যাওয়া সবারই হাঁটার গতি মন্থর হয়ে পড়ে। বয়োজ্যেষ্ঠদের দিকে না তাকিয়ে পেরিয়ে যেতেই পারে না। যে তাকিয়ে যায়, সেও না হেসে পেরোতে পারে না।
জীবনের রস পানের অন্যতম পন্থা। নাগরিক জীবন। গ্রামের জীবন। তাঁদের মধ্যে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা চলে। কারো ঘর গ্রামে ছিল। বাবা ঠাকুর্দার ভোরের খেতকৃষির ব্যস্ততার কথা বলেন। তাঁদের ‘মর্নিং ওয়াক’ নয়। ‘মর্নিং ওয়ার্ক’ হতো। ভোরের হালটি, গোয়ালের গরুগুলির দেখভাল করা, বাড়ির শাকসবজি করা এসব ছিল শরীরী এক্সারসাইজ।
যান্ত্রিক এবং নাগরিক বস্তুকেন্দ্রিক ব্যস্ততায় তাঁদের শরীরে বয়ে আনা রোগসমূহ নিয়ে আলোচনা চলে। ক্যামিকেলযুক্ত ঔষধের চাইতে যে ভোরের এ ধরণের ভ্রমণ, এই হাসি তামাশা, কথা এবং প্রকৃতির থেকে সোজাসুজি প্রাপ্ত গাছ-পাতা, জড়ের রস কত উপকারী সেই বিষয়ও প্রাধান্য পায়।
বিদেশে কর্মসূত্রে থাকা সন্তানদের, নাতি-নাতিনীদের সাফল্যের কথা বলে কেউ কেউ গৌরব করেন। তেমন গৌরব করতে পারা বিশেষ কিছু না থাকাজন নির্বিকার ভাবে শোনেন। আর্দ্র হাসি নিয়ে ফ্লাক্স থেকে লাল চা বাটোয়ারা করেন। তাঁরা সকালের এই চা-পর্ব স্বেচ্ছায় নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিলেন। একদিন যদি একজন আনেন, পরদিন অন্যজন আনবেন। এভাবে বারো দিন মতো পর একজনের পালা পড়ে। চিনি না দেওয়া লাল চা, মেরীগোল্ড বিস্কুট, কলা, কেক থাকে। যে যেরকম খান। চায়ের পর্ব শেষ করে কথাবার্তা বলে বিদায় নিয়ে ভাগে ভাগে ঘরে যেতে যেতে ন’টা মতো বাজে।
###
সময় যাওয়ার সাথে সাথে পার্কের ভিতরে থাকা বেঞ্চগুলো ক্লান্ত লোকে ভরে পড়ে। কেউ জল খায়। কেউ বসে বসে ঘরের কাজে সহায় করা মহিলাকে ফোন করে সকালের আহার সাজাতে বলেন।
হাঁটার অন্তে মেঘনাও একটু নিরিবিলিতে বসে ভালো পায়। যেখানে মানুষের উপস্থিতি অনুভব করা যায় না। ক্লান্তি জুড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সে চোখ বুজে পাঁচ মিনিট ধ্যান করে। সে বসে ধ্যান করতে করতে প্রাতঃভ্রমণকারীদের কেউ কেউ তার কাছেই বসে যায়। সেদিন সে এদিক ওদিক তাকিয়ে রয়েছিল। আগের চাইতে কিছু তাড়াতাড়িই বেরিয়ে এসেছিল প্রাতঃভ্রমণে। হাঁটার অন্তে সে পুকুরটির দিকে তাকালো। পুকুরটির পাড়ে বহাল তবিয়তে থাকা সেই বেঞ্চ দু’টি তার চোখে পড়েনি কেন ? ওই জায়গাটি বিচ্ছিন্ন ভাবে থাকার জন্যই কিজানি লোক গিয়ে সেখানে বসে না। মেঘনার ভালো লাগলো। অন্তত এমন পরিবেশই ‘মেডিটেশান’-এর জন্য ভালো হবে। শিকারি বেড়াল শিকার পাওয়া মাত্র জাপটে ধরার মতোই সেও গিয়ে বেঞ্চটিতে গিয়ে বসে পড়ল। প্রথম বেঞ্চটি ছেড়ে দ্বিতীয়টিতে বসল। যাতে তার মতো পৃথক জায়গার খোঁজে আসা কেউ এলেও খালি হয়ে থাকা প্রথম বেঞ্চটিতে বসতে পারে। কিছু সময় মেঘনা পুকুরটিতে জলকেলি করতে থাকা মাছগুলো দেখতে থাকল। ভোরের সূর্যের আগমনে ত্রিকোণ পুকুরটির লাল নীল ভেট ফুলগুলির পাপড়িগুলো বন্ধ হয়ে আসছে। মেঘনাও ধীরে ধীরে দু’চোখ বুজল। সে কোথায় বসে আছে, সেই অবস্থানও ভুলে এক অদৃশ্য জগতের আলোকবিন্দুতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বসে থাকল। কিছু সময় পর তার ধ্যান ভাঙল সামনে হওয়া কারো কথোপকথন এবং পদশব্দ শুনে। তার বসে থাকা বেঞ্চটির কাছে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছেন। পাকা খুঁটিগুলো দিয়ে পুকুরটিকে বেষ্টন করা, তার সামনে থাকা পাকা প্রশস্ত জায়গাটিতে কিছু কষ্ট করেই বসে পড়েছেন একজন লোক। মেঘনা প্রথমে লোকটির প্রতি দৃষ্টিপাত না করে দশ গজ দূরত্বে থাকা বেঞ্চটির দিকে তাকালো। বেঞ্চটি খালি। লোক ক’জন সেই বেঞ্চটি ছেড়ে সে বসে থাকা জায়গাটিতে এলেন কেন ? মনের মধ্যে প্রশ্নটি কিছু সময়ের জন্য দোলা দিতে থাকল।
খালি হয়ে থাকা বেঞ্চটি থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে এবার তার সামনে বসে থাকা লোকটির দিকে চাইল। লোকটি মোবাইলে কিছু দেখছেন। দাড়ি-গোঁফের দিকে লক্ষ করলে লোকটির ধর্ম যে ইসলাম সহজেই অনুমান হয়। তার অনুমান ঠিক প্রমাণিত হলো। ইতিপূর্বে আরো চার পাঁচ জন লোক আগে পিছে এসে সেই জায়গাটিতে জড়ো হলেন। প্রত্যেকেই এসে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরলেন। করমর্দন করে ‘সালাম আলিকুম’ ‘আচলাম আলিকুম’ বিনিময় করলেন।
দাঁড়িয়ে থাকাদের দিকে তাকিয়ে মেঘনার সামনে বসে থাকা লোকটি মেঘনার কাছে খালি হয়ে থাকা জায়গাটির দিকে অঙুলিনির্দেশ করে বসতে বললেন। বেঞ্চটিতে তিনজনের বেশি বসার অসুবিধা। একজন প্রথমে বসলেন। মেঘনা কী করবে ? উঠে চলে যাবে ? নাকি আরো খানিকক্ষণ বসবে ? ভেবে থাকতেই আরো একজন বসার জন্য এগিয়ে এলেন। বেঁটে এবং প্রয়োজনের অধিক শক্তপোক্ত লোকটি মেঘনা বসে থাকা জায়গার ডান দিকে মুখোমুখি বসে পড়লেন। মেঘনার বাঁদিকে সামনে বসে থাকা লোকটির দিকে সে আবার একবার তাঁদের অলক্ষ্যে তাকানোর চেষ্টা করল। হঠাৎ তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো লোকটির ট্রাউজারের কাছায় থাকা একটি পিস্তল। নঞর্থক কিছু ভাবনা মেঘনার মনটি পলকে ঘিরে ধরল।
সবার মধ্যেই আছে বয়সের ব্যবধান। ত্রিশোর্ধ্ব থেকে ষাটোর্ধ্ব পর্যন্ত। মেঘনার সামনে বাঁদিকে বসা ব্যক্তিকে সবাই ‘মোটো’ বলে সম্বোধন করছে।
মেঘনার উপস্থিতি তাঁদের মধ্যে সামান্য ক্রিয়া করেছিল যদিও তাঁদের আচরণে কোন ধরণের চোখে লাগা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায়নি। এমন মনে হলো যেন মেঘনার উপস্থিতি তাঁদের মধ্যে হওয়া কথাবার্তায় ব্যাঘাত জন্মাচ্ছে। সেই জোটটির মধ্যে সে একা। তখনও সে অনুমান করতে পারেনি প্রাতঃভ্রমণকারী তাঁরা কারা।
বেঞ্চটির দিকে বিগত কয়েক দিন সে নজর দেয়নি। লোক ক’জন গত কিছু দিন এখানে বসেছিলেন কি ? ভেবে ভেবে সময় ব্যয় করে থাকার অর্থ নেই। সে বসা থেকে উঠল।
- আর্রে ব্যায়ঠিয়ে ব্যায়ঠিয়ে। ডোন্ট মাইণ্ড, ও কে ?
তাঁদের দিকে না তাকিয়ে ঘুরে যাওয়ার
জন্য দাঁড়াতেই সামনে বসা লম্বা চওড়া হৃষ্টপুষ্ট দাড়িওয়ালা মুখের মানুষটি বললেন। লোকটির কথায় সে সত্যি সত্যি যাই বলেও
চলে যেতে পারলো না। সঙ্গে
সঙ্গে বাকিরাও সমস্বরে মেঘনাকে বসতে বললেন। অগত্যা সে বসে পড়ল।
একজন আরেকজনকে একটি উপনাম দিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসি-তামাশা করছিলেন। সামান্য কথায় উচ্চস্বরে হেসে ওঠেন। মেঘনার দিকে তাকিয়ে তার কাছে বসা লোকটি হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলেন -
- আপ শায়েদ য়াঁহা কা
নেহি হ্যায়।
- আসাম সে …
মেঘনার উত্তর শুনে সবাই নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করলেন সেকেণ্ডের জন্য। পরমুহূর্তে প্রায় একসাথে তিনজন বলে উঠলেন -
- নর্থ ইস্টের সঙ্গে
আমাদের পুরানা রিস্তা।
ভাঙা ভাঙা অসমিয়াতে লোক ক’জন বললেন। কথাবার্তার মধ্যে মেঘনা লক্ষ করল তাঁদের মধ্যে একজনের নাম শাহেনশাহ। একজনের নাম ? না না উপাধি হবে হয়তো - ‘খান’ বলে ডাকতে শুনেছিল। একজনকে সম্বোধন করেছিল সুলতান বলে। সম্পূর্ণ নাম জানতে পারেনি। এই তিনজনই খুব উৎসাহ নিয়ে কথা বলছিলেন। বাকিরা সহযোগ করে যাচ্ছিলেন এবং মেঘনাকে পর্যবেক্ষণ করা কথাটি মেঘনা বুঝতে পারছিল।
কার কথা শুনবে ? কার মুখের দিকে তাকাবে ? আসামের কোথায়, কখন, কে ছিলেন। কে মেঘালয়ে ছিলেন, কে অরুণাচলে ছিলেন। কার কার সাথে বন্ধুত্ব আছে। এক দিক থেকে বলে গেলেন।
শাহেনশাহ গুণগুণ করলেন আজান ফকিরের দু’টি জিকির এবং মহাপুরুষ শংকরদেবের লিখা দু’টি বরগীতের কলি। অসমের একজন বিখ্যাত গায়ক ও চিত্রনির্মাতা শাহেনশাহের ঘরে থেকে একটি গানের সুর করেছিলেন। শাহেনশাহ প্রযোজনা করা একটি ছবিতে সেই গানটি গেয়েছিলেন।
মেঘনার মন ভালো হয়ে গেল। কিন্তু … ? অসমে থেকে দীর্ঘকাল ব্যবসা করা শাহেনশাহ অসম ছেড়েছিলেন মনের দুঃখে। অসমের একটি উগ্রপন্থী সংগঠন শাহেনশাহের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একজন ইঞ্জিনিয়ারকে অপহরণ করে মোটা টাকা দাবি করেছিল। অথচ অসমেরই সহজ সরল বন্ধু শাহেনশাহকে এই বিপদের দিনে কীরকম সাহায্য করেছিল শাহেনশাহ আবেগসিক্ত হয়ে কথাগুলো বলে গেলেন। অসমের খবর রাখেন এখনো শাহেনশাহ। দল-সংগঠন, জাতি-জনজাতি, দাবি-ধর্ণা, বিপ্লব- আন্দোলনে ভারাক্রান্ত করা অসমে আসতেও চিন্তা করতে হয়। কোথায়, কখন, কোন সংগঠন পথ-বন্ধ, অসম-বন্ধ আহবান করে ঠিকানা নেই।
স্বদেশের প্রশংসা শুনে ভালো লাগা মেঘনার মনটি ভেতরে ভেতরে লজ্জানত হয়ে পড়েছিল শাহেনশাহের পরের কথাগুলো শুনে। আমেজে চুমুক দিয়ে থাকা চায়ের কাপে যেন হঠাৎ একটি মাছি এসে পড়ল।
শাহেনশাহ বলে গেলেন। অসমের মানুষকে বড় ভালো লাগে তবুও। খান এবং সুলতানও শাহেনশাহের মতো একই ধরণের অভিজ্ঞতার কথাই বললেন। এত দল-সংগঠন, পূজা-পার্বণ। টাকা দাবি। এসবে দেওয়া অশান্তির পরেও অসমের কোন জায়গায় আজও আপন বন্ধু আছে, কোন জায়গায় আত্মীয় আছে জানালেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও মানুষের মনের সরলতায় তাঁরা মুগ্ধ। সম্মোহিত অসমের প্রকৃতির প্রেমে। খানের কোমরে থাকা পিস্তলটির তখনই রহস্যভেদ হলো। খান প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। সেলফ্ ডিফেন্সের জন্য এই পিস্তল।
মেঘনা হাতের ঘড়িটির দিকে তাকালো। সাতটা কুড়ি। বন্দিতা অফিসে যাবে না। তারা দু’জন এক জায়গায় যাওয়ার কথা।
- আবার দেখা হবে …
উঁহু। কথাটি বলার আগেই সে বসা থেকে উঠেছিল। খান, সুলতান, শাহেনশাহ এবং মোটো একবাক্যে বললেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বসা থেকে উঠেও দাঁড়ালেন।
- এভাবে যেতে পারবে না।
- তাহলে … ??
মুখে কিছু বলেনি সে। দৃষ্টিতেই প্রশ্ন রেখেছিল। শাহেনশাহ বললেন প্রথমে -
- আমাদের সঙ্গে যেতে
লাগবে।
- কোথায় ? আর কেন ?
মোটো এবং সুলতান সশব্দে হাসলেন। মেঘনা খানিক অপ্রস্তুত হলো।
- না না। প্রশ্ন হবে না। চলো।
কোথায় থাকো তুমি ?
মোটোর মেঘনার প্রতি প্রথম প্রশ্ন। মেঘনা তার থাকা জায়গাটির কথা বলল।
###
হাংগার ফুড স্ট্রীট। স্ট্রীট্ ফুডের দোকানে পথচারীরা জটলা বেঁধেছেন সকালের চায়ের কাপের জন্য। গরম গরম ধোঁয়া ওঠা চা। মাটির কাপে চুমুক দিয়ে হাই-হ্যালো, হাসিতে হাংগার ফুড স্ট্রীটের সরু জায়গাটি ভরে পড়েছে। পথের উপরেই মোড়া পেতে বসেছেন। শিঙাড়া, কচুরি, ইডলি। সেই পথটিতে ক্ষণিকের জন্য গাড়ি, বাইক চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। সকালের চায়ের কাপের জন্য লোকের এমন সমাগম …। বহুদিন না খাওয়ার অন্তে যেন এই চায়ের কাপের এই আগ্রহী আয়োজন। ‘হাংগার ফুড স্ট্রীট’ নামটি মনে মনে আওড়াল মেঘনা। লোকের হাসি-ঠাট্টা, চায়ের কাপের সাথে দেশ বিদেশের আড্ডা। কারো মোবাইলে গজল বাজছে। কারো মোবাইলে আবার ভজন। এইসব লোক সদাই আসেন শুধু এক কাপ চায়ের জন্যই ? উঁহু …। এই চায়ের কাপে হয়তো আছে মানসিক ক্ষুধা নিবৃত্তিরও উপায়। পরিচিত-অপরিচিতের কথা নেই। হাংগার ফুড স্ট্রীটের এই ‘মর্ণিং টী’র জন্য যিনিই আসছেন, সবাই তাঁকে ‘গুড মর্ণিং’ জানাচ্ছেন।
শাহেনশাহ গাড়িটি নাতিদূরে রাখলেন। শাহেনশাহদের দলটিতে যাওয়া মেঘনাকে দেখে অনেকেই এগিয়ে এসে ‘করমর্দন’ করলেন। মেঘনাও হাংগার ফুড স্ট্রীটে সমবেত ‘মর্ণিং টী’ পার্টির অস্থায়ী সদস্য হয়ে পড়ল। কার জাত কী, কার ধর্ম কী - কিছুরই চিহ্ন নেই। ব্যস্ মানুষের জটলা।
###
সকালের খবর। সুশান্ত দীক্ষিত নামের ব্যক্তিটি মোবাইলেই খবর শুনছিলেন।
- আর্রে ইয়ার, চায়ে কে সাথ মন কা বাত করো। তুম ভি ইয়ার। বুড্ঢা হো গয়া। সুলতান সুশান্ত দীক্ষিতকে বলা কথাটিতে সব্বাই হাসির গুঞ্জন তুললেন। হেসে থাকতেই একজনের হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেল। দু’জনের মতো লোক মূর্তির মতো বসে রইলেন। মুখের হাসি তো দূর কথাও যেন হারিয়ে গেল। সুশান্ত দীক্ষিতের মোবাইলে ভেসে আসে সংবাদপাঠকের কণ্ঠ --
- জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামা নামের জায়গায় পাকিস্তানের দুর্ধর্ষ আত্মঘাতী সন্ত্রাসবাদীর
আক্রমণে নিহত হলেন দুই কুড়িরও বেশি ভারতীয় সেনা।
ক্ষণিকের জন্য যেন সময় স্থবির হয়ে রইল। মেঘনার অস্বস্তিও বেড়ে গেল। সংবাদটি সম্পর্কে কেউ কেউ দুঃখ প্রকাশ করে সন্ত্রাসবাদের ডেকে আনা বিভীষিকার কথা বলে গৃহাভিমুখী হয়েছেন। শাহেনশাহ, সুলতান, খান, মোটোর মুখে কথা নেই। গাড়িটির দিকে যন্ত্রচালিতের মতো এগিয়ে গেছেন। মেঘনা মোটোর সঙ্গে সঙ্গে যেতে থাকল। শাহেনশাহ গাড়ি চালাচ্ছেন।
কারো মুখে কথা নেই কেন ? একজন অন্যজনের সাথে চোখে চোখেই কথা বলা যেন অনুমান হলো। পাকিস্তানী সন্ত্রাসবাদীর জঘন্য কাণ্ড। তাঁদের এই নীরবতা কেন ?
- নামো বোন
…
গাড়ি বন্দিতা থাকা এপার্টমেন্টের সামনেই যে রেখেছেন, তখনই মেঘনা লক্ষ করল। মেঘনা নামতে যেতেই মোটো এবং সুলতান গাড়ির পিছনের সিট থেকে নেমে দরজাটি খুলে দিলেন। বাহ্যিক জড়তা ঝেড়ে ফেলে মেঘনা গাড়ি থেকে নামল। কিছু একটা বিদায়সূচক কথা বলতে গিয়েও মুখ হা করে রইল। শাহেনশাহ বললেন -
- আল্লাহ্ সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখতে বলে গিয়েছিলেন। অহিংসভাবে শান্তি কামনা করতে বলে গেছেন। ইসলাম শব্দের অর্থ ‘শান্তি’। স্বধর্মের কিছু কাফেরের জন্য আমরাও
অন্যের কাছে লজ্জানত হই। সন্দের আবর্তে এসে যেতে হয়। যেভাবে বোন তুমিও লজ্জিত হয়েছিলে তোমার
স্বরাজ্যের উগ্রপন্থীর দ্বারা হওয়া আমাদের দুর্গতির কথা শুনে।
শাহেনশাহের কথায় মেঘনার বলার আর কিছুই ছিল না। সবার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে সে ‘বাই’ জানালো। সুলতান ও খান একসাথে বললেন -
যেদিন অবধি এখানে থাকবে আমাদের সঙ্গে ‘মর্ণিং টী’তে থাকতে হবে। খোদা না করে কখনো কোন বিপদে পড়লে আমাদের
মধ্যের কোন বান্দাকে মনে করবে। বেঁচে থাকলে যেভাবেই হোক হাজির হবো। কাল সকালে আবার দেখা হবে।
মুচকি হেসে মেঘনা ধন্যবাদ জানালো। সে দৃষ্টির আড়াল না হওয়া পর্যন্ত শাহেনশাহরা গেলেন না।
###
- বাপ্ রে। এ…ত্ত দেরি পর্যন্ত মর্ণিং ওয়াক করলি ? আমি একসাথে ‘মর্ণিং টী’ খাব বলে বসে আছি।
দরজাটি খুলে দিয়েই বন্দিতার অভিমানভরা কণ্ঠ সরব হয়ে উঠল। অন্যমনস্কভাবে ঈষৎ হেসে মেঘনা বলল -
- মর্ণিং টী … ??
অনুবাদ - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
গত দু’বছর ধরেই বন্দিতা কলকাতায় আছে। রাসেল স্ট্রীটে থাকা ‘অসম হাউস’-এর কাছেই বন্দিতা থাকে। এলাহাবাদ ব্যাঙ্কে তার চাকরি। বন্দিতা সম্পর্কিত কথাগুলো মেঘনা জানে গত দু’বছর থেকেই। কলেজের ছাড়াছাড়ির পরই তাদের মধ্যেকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। মেঘনার বিয়ে হয়ে গেল। বন্দিতা বছর খানেক মেঘনার সাথে চিঠি আদানপ্রদান করেছিল, কিন্তু সাংসারিক মেঘনা এই ব্যাপারটিতে কিছুটা পিছন পড়ে গিয়েছিল। মেঘনার তাৎক্ষণিক সাড়া না পাওয়াটাই বন্দিতার চিঠি বন্ধ হওয়ার একমাত্র কারণ অবশ্য নয়, বন্দিতাও অনেক ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।
যাই হোক, ইন্টারনেট যুগ তাদের যোগাযোগ সুগম করে দিল। মেঘনার সন্তানও বড় হলো। দিল্লিতে জে এন ইউতে পড়ছে। এখন মেঘনার যথেষ্ট অবসর। ফেসবুকে প্রথম তাদের যোগাযোগ হলো। পরে হোয়াটস্অ্যাপে কথোপকথন। কলকাতায় বন্দিতা একাই আছে। মেঘনাও এলে তার ভালো লাগবে। ঘুরে ফিরে থাকতে মেঘনাও ভালোই বাসে।
ইতিমধ্যে ফোনেই তারা কোথায় যাবে, কী কী করবে কথাগুলো আলোচনা করেই রেখেছিল। বন্দিতা বলেছিল - ‘অ্যাই, তুই থাকা ক’দিন শুধু কলেজের দিনগুলোতেই বিচরণ করব বুঝেছিস ? নতুন সংসার, নতুন ঝামেলা। যাই যাই করতে থাকবি না। তুই এলে আমিও ছুটি নেব। কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজ অথবা কলকাতা ইউনিভার্সিটির এক্সপিরিয়েন্স আমাদের নেই। তাতে কী হলো ? কলেজ স্ট্রীটের বিখ্যাত ‘কফি হাউস’-এ বসব। আড্ডা দেবো, কফি খাবো। কলেজের ছেলেমেয়েদের দেখে দেখে ফেলে আসা দিনগুলির বিষাদ-মধুর মিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ব। গতানুগতিক বিরাগী পরিচ্ছেদগুলো থেকে অব্যাহতি নিয়ে আবেগবিধৌত হবো।
###
প্রাতঃভ্রমণ মেঘনার পুরোনো অভ্যাস। স্বাস্থ্যের প্রতি খুব সচেতনও বলা যায় না। ভোরের নির্মল, শান্ত প্রকৃতি, পাখির কাকলি, পুব দিগন্তে মেঘ সরিয়ে উদিত সূর্যের সুকোমল হাসিটির সঙ্গে প্রকৃতির ভিন্ন রূপের এই ‘কোলাজ’ উপভোগ করে মেঘনা উৎফুল্লিত হয়ে পড়ে। এটুকুই দিনটির আরম্ভের অনাবিল সুখানুভূতি। যার পর দিনজোড়া যান্ত্রিক ব্যস্ততা।
বন্দিতা আবার মেঘনার বিপরীত। তার মতে, ‘ওরে, দিনজোড়া মাথা সোজা করার সময় না পাওয়া ব্যস্ততার কথাটি যখনই মনে আসে, তখনই ভোরের এই সময়টুকুই ভালো করে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। এই সময়টিতে শোয়ার আমেজই আলাদা বুঝেছিস ? বিয়ে হয়ে হাজবেন্ড, বাচ্চা - এদের জন্য টিফিন তৈরি করতে ভোরে তাড়াতাড়ি ওঠার ভয়ে বিয়েই হলো না বাব্বাঃ। বাট আই এম হ্যাপী। মনের কথা শেয়ার করার জন্য তোর মতো বান্ধবী আছে। রিটায়ারমেন্টের পর কী করব ভাবিনি। চলে যাবে। কাল-এর কথা ভেবে ‘আজ’কে কেন বরবাদ করব ? সংসারীদের দেখেছি। বাচ্চাকাচ্চা থাকাদেরও বৃদ্ধাবস্থায় একাই কাটাতে হয়। কর্মসূত্রেই হোক, বিবাহ সূত্রেই হোক, আজকালকার বাচ্চারা দেখি বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকেই না। বৃদ্ধ বাবা-মা’দের একা একাই নিজের খেয়াল রাখতে হয়। সুতরাং থেকেও না থাকার দুঃখ নিয়ে ঘোরার চাইতে না থাকাই ভালো। হাঃ হাঃ হাঃ …। কিন্তু তা বলে আবার তুই কথাগুলো সিরিয়াসলি নিবি না। জীবনে কার, কখন, কী দিন আসে কে জানে। ব্যস্। ‘আজ’টি উপভোগ কর।’
মেঘনা যেখানেই যায় ভোরের হাঁটার অভ্যাসটি অব্যাহত রাখে। হেঁটে আসার পর সে এক কাপ লাল চা দু’ফোঁটা মতো লেবুর রস দিয়ে খায়। সঙ্গে দু’টি মেরীগোল্ড বিস্কুট। বন্দিতার মতে, ‘সকাল সকালই কে টক দিয়ে শুরু করে রে ? তুইও যে … আমি তো একটি কাজু বরফি, একটি কালাকাঁদ, এক কাপ দুধ-চা খাবোই। পরে দিনজোড়া টক, তেতো, কষায় যা খাওয়ার আছে খাবই।’
রাসেল স্ট্রীটে বন্দিতা থাকা ফ্ল্যাটটি থেকে ডান দিকে গেলেই পার্ক স্ট্রীট। বাঁদিকে একটু এসে আবার বাঁদিকে ঘুরে দু’ফার্লং মতো হেঁটে রাস্তার কাছেই আছে ইলিয়েট পার্ক। গত কয়েকদিন সে এই পার্কটিতেই হাঁটতে বেরিয়ে এসেছে। সে ফিরে যাওয়া সময়েই বন্দিতা বিছানা ছাড়ে। তার জন্য এক কাপ লেমন টী, বন্দিতার নিজের জন্য এক কাপ দুধ চা তৈরি করে রাখে। নিজের রাজ্য থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও মেঘনার বহু দূরে আছে বলে লাগেনি। যেখানে আপন মানুষ থাকে, সেই জায়গাটিও কিজানি আপন আপন লাগে। সকালেই পিঠে বই-এর বোঝা নিয়ে টিউশন করতে আসা ঝাঁক ঝাঁক কিশোর কিশোরীর কথোপকথনে নিশার নিঝুম পরিবেশের যবনিকার খবর দেয়। স্ট্রীটফুডের দোকান দেওয়া ব্যবসায়ীদের দু’হাত ব্যস্ত হয়ে পড়ে। গরম গরম কচুরি, শিঙাড়া, লুচি ভাজার ফুরফুরে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বহিঃরাজ্যে থাকলে পথের পরিচয় জানতে ভোরের ভ্রমণই সুন্দর সময়।
পার্কটিতে ঢুকতেই প্রথমে বাঁদিকে একটি পদপথ পাকা বাঁধা আর ডানদিকেও একই ভাবে পাকা বাঁধা। ভালো করে দেখলে এমন লাগে - একটি বৃহদাকারের শূন্য। তার মধ্যে আছে কৃত্রিম ভাবে নির্মিত দু’টি পুকুর। শূন্যটিকে দু’টি অর্ধ চাঁদের মতো ভাগ করেছে একটি পুকুর। নানা ধরণের ফল ফুলের গাছ। বিচিত্র রঙের পাখির কাকলি। তার মধ্যে মানুষের ব্যস্ত পদধ্বনি। সঘন শ্বাস-প্রশ্বাস। মেখনা প্রাতঃভ্রমণে এই মানুষদের বেশ উপভোগ করছে। ঢিলেঢালা মহিলা দু’জন নতুন মুখ দেখে মেঘনাকে ঘুরে ঘুরে চেয়ে যায়। কেউ মুচকি হেসে যায়।
পাকা পদপথের মধ্যের বনের দক্ষিণ কোণে আছে দু’টি মতো বড় গাছ। যাতে গোলাকৃতি করে পাকা বেদির মতো করে রাখা আছে। ইচ্ছে করলে কেউ কেউ সেখানে বসতে পারে। ষাটোর্ধ্ব মতো মনে হওয়া বয়স্ক লোক ব্যায়ামের নামে সেই নিরিবিলি জায়গাটিতে হাত-পা সঞ্চালন করেন। তাঁদের মধ্যে হাসির অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলে। এক জন শুরু করেন হাঃ হাঃ হাঃ …। অন্য এক জন তাঁর চাইতে উচ্চস্বরে হাসতে শুরু করেন। অন্য আরেক জন তাঁর চাইতেও উচ্চস্বরে হাসতে চেষ্টা করেন। প্রথমে এই হাসি স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে বেরিয়ে আসে না। হাসতে হয়। হাসি এক ভালো এক্সারসাইজ্ শরীরের জন্য। হার্টের জন্য। ডাক্তারও নাকি এমন উপদেশ দিয়ে থাকেন।
জোর করে হাসির চেষ্টা করতে গিয়ে তাঁদের কারো মুখের অঙ্গভঙ্গি এবং হাসির শব্দ এমন অস্বাভাবিক হয়ে বেরোয় যে এক ভালো ‘কমেডি সীন’ হয়ে পড়ে তাঁদের অজ্ঞাতে তাঁদের লক্ষ করতে থাকা সবার জন্য। এক জনের অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি দেখে এবং হাসির শব্দ শুনে তাঁদের মধ্যে তখন স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে এক সময় হাসি বেরোতে থাকে।
হাঃ … হাঃ … হাঃ …
বাংলা ভাষা অথবা হিন্দি ভাষায়, তাঁরা হেসে হেসে পেটে ধরে ধরে, অর্ধস্পষ্ট ভাবে প্রকাশ করেন।
দৃশ্যটি উপভোগ করে মেঘনারও হাসি উঠে যায়। সেই জায়গাটি পেরিয়ে যাওয়া সবারই হাঁটার গতি মন্থর হয়ে পড়ে। বয়োজ্যেষ্ঠদের দিকে না তাকিয়ে পেরিয়ে যেতেই পারে না। যে তাকিয়ে যায়, সেও না হেসে পেরোতে পারে না।
জীবনের রস পানের অন্যতম পন্থা। নাগরিক জীবন। গ্রামের জীবন। তাঁদের মধ্যে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা চলে। কারো ঘর গ্রামে ছিল। বাবা ঠাকুর্দার ভোরের খেতকৃষির ব্যস্ততার কথা বলেন। তাঁদের ‘মর্নিং ওয়াক’ নয়। ‘মর্নিং ওয়ার্ক’ হতো। ভোরের হালটি, গোয়ালের গরুগুলির দেখভাল করা, বাড়ির শাকসবজি করা এসব ছিল শরীরী এক্সারসাইজ।
যান্ত্রিক এবং নাগরিক বস্তুকেন্দ্রিক ব্যস্ততায় তাঁদের শরীরে বয়ে আনা রোগসমূহ নিয়ে আলোচনা চলে। ক্যামিকেলযুক্ত ঔষধের চাইতে যে ভোরের এ ধরণের ভ্রমণ, এই হাসি তামাশা, কথা এবং প্রকৃতির থেকে সোজাসুজি প্রাপ্ত গাছ-পাতা, জড়ের রস কত উপকারী সেই বিষয়ও প্রাধান্য পায়।
বিদেশে কর্মসূত্রে থাকা সন্তানদের, নাতি-নাতিনীদের সাফল্যের কথা বলে কেউ কেউ গৌরব করেন। তেমন গৌরব করতে পারা বিশেষ কিছু না থাকাজন নির্বিকার ভাবে শোনেন। আর্দ্র হাসি নিয়ে ফ্লাক্স থেকে লাল চা বাটোয়ারা করেন। তাঁরা সকালের এই চা-পর্ব স্বেচ্ছায় নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিলেন। একদিন যদি একজন আনেন, পরদিন অন্যজন আনবেন। এভাবে বারো দিন মতো পর একজনের পালা পড়ে। চিনি না দেওয়া লাল চা, মেরীগোল্ড বিস্কুট, কলা, কেক থাকে। যে যেরকম খান। চায়ের পর্ব শেষ করে কথাবার্তা বলে বিদায় নিয়ে ভাগে ভাগে ঘরে যেতে যেতে ন’টা মতো বাজে।
###
সময় যাওয়ার সাথে সাথে পার্কের ভিতরে থাকা বেঞ্চগুলো ক্লান্ত লোকে ভরে পড়ে। কেউ জল খায়। কেউ বসে বসে ঘরের কাজে সহায় করা মহিলাকে ফোন করে সকালের আহার সাজাতে বলেন।
হাঁটার অন্তে মেঘনাও একটু নিরিবিলিতে বসে ভালো পায়। যেখানে মানুষের উপস্থিতি অনুভব করা যায় না। ক্লান্তি জুড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সে চোখ বুজে পাঁচ মিনিট ধ্যান করে। সে বসে ধ্যান করতে করতে প্রাতঃভ্রমণকারীদের কেউ কেউ তার কাছেই বসে যায়। সেদিন সে এদিক ওদিক তাকিয়ে রয়েছিল। আগের চাইতে কিছু তাড়াতাড়িই বেরিয়ে এসেছিল প্রাতঃভ্রমণে। হাঁটার অন্তে সে পুকুরটির দিকে তাকালো। পুকুরটির পাড়ে বহাল তবিয়তে থাকা সেই বেঞ্চ দু’টি তার চোখে পড়েনি কেন ? ওই জায়গাটি বিচ্ছিন্ন ভাবে থাকার জন্যই কিজানি লোক গিয়ে সেখানে বসে না। মেঘনার ভালো লাগলো। অন্তত এমন পরিবেশই ‘মেডিটেশান’-এর জন্য ভালো হবে। শিকারি বেড়াল শিকার পাওয়া মাত্র জাপটে ধরার মতোই সেও গিয়ে বেঞ্চটিতে গিয়ে বসে পড়ল। প্রথম বেঞ্চটি ছেড়ে দ্বিতীয়টিতে বসল। যাতে তার মতো পৃথক জায়গার খোঁজে আসা কেউ এলেও খালি হয়ে থাকা প্রথম বেঞ্চটিতে বসতে পারে। কিছু সময় মেঘনা পুকুরটিতে জলকেলি করতে থাকা মাছগুলো দেখতে থাকল। ভোরের সূর্যের আগমনে ত্রিকোণ পুকুরটির লাল নীল ভেট ফুলগুলির পাপড়িগুলো বন্ধ হয়ে আসছে। মেঘনাও ধীরে ধীরে দু’চোখ বুজল। সে কোথায় বসে আছে, সেই অবস্থানও ভুলে এক অদৃশ্য জগতের আলোকবিন্দুতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বসে থাকল। কিছু সময় পর তার ধ্যান ভাঙল সামনে হওয়া কারো কথোপকথন এবং পদশব্দ শুনে। তার বসে থাকা বেঞ্চটির কাছে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছেন। পাকা খুঁটিগুলো দিয়ে পুকুরটিকে বেষ্টন করা, তার সামনে থাকা পাকা প্রশস্ত জায়গাটিতে কিছু কষ্ট করেই বসে পড়েছেন একজন লোক। মেঘনা প্রথমে লোকটির প্রতি দৃষ্টিপাত না করে দশ গজ দূরত্বে থাকা বেঞ্চটির দিকে তাকালো। বেঞ্চটি খালি। লোক ক’জন সেই বেঞ্চটি ছেড়ে সে বসে থাকা জায়গাটিতে এলেন কেন ? মনের মধ্যে প্রশ্নটি কিছু সময়ের জন্য দোলা দিতে থাকল।
খালি হয়ে থাকা বেঞ্চটি থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে এবার তার সামনে বসে থাকা লোকটির দিকে চাইল। লোকটি মোবাইলে কিছু দেখছেন। দাড়ি-গোঁফের দিকে লক্ষ করলে লোকটির ধর্ম যে ইসলাম সহজেই অনুমান হয়। তার অনুমান ঠিক প্রমাণিত হলো। ইতিপূর্বে আরো চার পাঁচ জন লোক আগে পিছে এসে সেই জায়গাটিতে জড়ো হলেন। প্রত্যেকেই এসে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরলেন। করমর্দন করে ‘সালাম আলিকুম’ ‘আচলাম আলিকুম’ বিনিময় করলেন।
দাঁড়িয়ে থাকাদের দিকে তাকিয়ে মেঘনার সামনে বসে থাকা লোকটি মেঘনার কাছে খালি হয়ে থাকা জায়গাটির দিকে অঙুলিনির্দেশ করে বসতে বললেন। বেঞ্চটিতে তিনজনের বেশি বসার অসুবিধা। একজন প্রথমে বসলেন। মেঘনা কী করবে ? উঠে চলে যাবে ? নাকি আরো খানিকক্ষণ বসবে ? ভেবে থাকতেই আরো একজন বসার জন্য এগিয়ে এলেন। বেঁটে এবং প্রয়োজনের অধিক শক্তপোক্ত লোকটি মেঘনা বসে থাকা জায়গার ডান দিকে মুখোমুখি বসে পড়লেন। মেঘনার বাঁদিকে সামনে বসে থাকা লোকটির দিকে সে আবার একবার তাঁদের অলক্ষ্যে তাকানোর চেষ্টা করল। হঠাৎ তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো লোকটির ট্রাউজারের কাছায় থাকা একটি পিস্তল। নঞর্থক কিছু ভাবনা মেঘনার মনটি পলকে ঘিরে ধরল।
সবার মধ্যেই আছে বয়সের ব্যবধান। ত্রিশোর্ধ্ব থেকে ষাটোর্ধ্ব পর্যন্ত। মেঘনার সামনে বাঁদিকে বসা ব্যক্তিকে সবাই ‘মোটো’ বলে সম্বোধন করছে।
মেঘনার উপস্থিতি তাঁদের মধ্যে সামান্য ক্রিয়া করেছিল যদিও তাঁদের আচরণে কোন ধরণের চোখে লাগা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায়নি। এমন মনে হলো যেন মেঘনার উপস্থিতি তাঁদের মধ্যে হওয়া কথাবার্তায় ব্যাঘাত জন্মাচ্ছে। সেই জোটটির মধ্যে সে একা। তখনও সে অনুমান করতে পারেনি প্রাতঃভ্রমণকারী তাঁরা কারা।
বেঞ্চটির দিকে বিগত কয়েক দিন সে নজর দেয়নি। লোক ক’জন গত কিছু দিন এখানে বসেছিলেন কি ? ভেবে ভেবে সময় ব্যয় করে থাকার অর্থ নেই। সে বসা থেকে উঠল।
- আর্রে ব্যায়ঠিয়ে ব্যায়ঠিয়ে। ডোন্ট মাইণ্ড, ও কে ?
একজন আরেকজনকে একটি উপনাম দিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসি-তামাশা করছিলেন। সামান্য কথায় উচ্চস্বরে হেসে ওঠেন। মেঘনার দিকে তাকিয়ে তার কাছে বসা লোকটি হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলেন -
- আসাম সে …
মেঘনার উত্তর শুনে সবাই নিজেদের মধ্যে দৃষ্টি বিনিময় করলেন সেকেণ্ডের জন্য। পরমুহূর্তে প্রায় একসাথে তিনজন বলে উঠলেন -
ভাঙা ভাঙা অসমিয়াতে লোক ক’জন বললেন। কথাবার্তার মধ্যে মেঘনা লক্ষ করল তাঁদের মধ্যে একজনের নাম শাহেনশাহ। একজনের নাম ? না না উপাধি হবে হয়তো - ‘খান’ বলে ডাকতে শুনেছিল। একজনকে সম্বোধন করেছিল সুলতান বলে। সম্পূর্ণ নাম জানতে পারেনি। এই তিনজনই খুব উৎসাহ নিয়ে কথা বলছিলেন। বাকিরা সহযোগ করে যাচ্ছিলেন এবং মেঘনাকে পর্যবেক্ষণ করা কথাটি মেঘনা বুঝতে পারছিল।
কার কথা শুনবে ? কার মুখের দিকে তাকাবে ? আসামের কোথায়, কখন, কে ছিলেন। কে মেঘালয়ে ছিলেন, কে অরুণাচলে ছিলেন। কার কার সাথে বন্ধুত্ব আছে। এক দিক থেকে বলে গেলেন।
শাহেনশাহ গুণগুণ করলেন আজান ফকিরের দু’টি জিকির এবং মহাপুরুষ শংকরদেবের লিখা দু’টি বরগীতের কলি। অসমের একজন বিখ্যাত গায়ক ও চিত্রনির্মাতা শাহেনশাহের ঘরে থেকে একটি গানের সুর করেছিলেন। শাহেনশাহ প্রযোজনা করা একটি ছবিতে সেই গানটি গেয়েছিলেন।
মেঘনার মন ভালো হয়ে গেল। কিন্তু … ? অসমে থেকে দীর্ঘকাল ব্যবসা করা শাহেনশাহ অসম ছেড়েছিলেন মনের দুঃখে। অসমের একটি উগ্রপন্থী সংগঠন শাহেনশাহের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের একজন ইঞ্জিনিয়ারকে অপহরণ করে মোটা টাকা দাবি করেছিল। অথচ অসমেরই সহজ সরল বন্ধু শাহেনশাহকে এই বিপদের দিনে কীরকম সাহায্য করেছিল শাহেনশাহ আবেগসিক্ত হয়ে কথাগুলো বলে গেলেন। অসমের খবর রাখেন এখনো শাহেনশাহ। দল-সংগঠন, জাতি-জনজাতি, দাবি-ধর্ণা, বিপ্লব- আন্দোলনে ভারাক্রান্ত করা অসমে আসতেও চিন্তা করতে হয়। কোথায়, কখন, কোন সংগঠন পথ-বন্ধ, অসম-বন্ধ আহবান করে ঠিকানা নেই।
স্বদেশের প্রশংসা শুনে ভালো লাগা মেঘনার মনটি ভেতরে ভেতরে লজ্জানত হয়ে পড়েছিল শাহেনশাহের পরের কথাগুলো শুনে। আমেজে চুমুক দিয়ে থাকা চায়ের কাপে যেন হঠাৎ একটি মাছি এসে পড়ল।
শাহেনশাহ বলে গেলেন। অসমের মানুষকে বড় ভালো লাগে তবুও। খান এবং সুলতানও শাহেনশাহের মতো একই ধরণের অভিজ্ঞতার কথাই বললেন। এত দল-সংগঠন, পূজা-পার্বণ। টাকা দাবি। এসবে দেওয়া অশান্তির পরেও অসমের কোন জায়গায় আজও আপন বন্ধু আছে, কোন জায়গায় আত্মীয় আছে জানালেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও মানুষের মনের সরলতায় তাঁরা মুগ্ধ। সম্মোহিত অসমের প্রকৃতির প্রেমে। খানের কোমরে থাকা পিস্তলটির তখনই রহস্যভেদ হলো। খান প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। সেলফ্ ডিফেন্সের জন্য এই পিস্তল।
মেঘনা হাতের ঘড়িটির দিকে তাকালো। সাতটা কুড়ি। বন্দিতা অফিসে যাবে না। তারা দু’জন এক জায়গায় যাওয়ার কথা।
- আবার দেখা হবে …
উঁহু। কথাটি বলার আগেই সে বসা থেকে উঠেছিল। খান, সুলতান, শাহেনশাহ এবং মোটো একবাক্যে বললেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বসা থেকে উঠেও দাঁড়ালেন।
- এভাবে যেতে পারবে না।
- তাহলে … ??
মুখে কিছু বলেনি সে। দৃষ্টিতেই প্রশ্ন রেখেছিল। শাহেনশাহ বললেন প্রথমে -
- কোথায় ? আর কেন ?
মোটো এবং সুলতান সশব্দে হাসলেন। মেঘনা খানিক অপ্রস্তুত হলো।
- না না। প্রশ্ন হবে না। চলো।
কোথায় থাকো তুমি ?
###
হাংগার ফুড স্ট্রীট। স্ট্রীট্ ফুডের দোকানে পথচারীরা জটলা বেঁধেছেন সকালের চায়ের কাপের জন্য। গরম গরম ধোঁয়া ওঠা চা। মাটির কাপে চুমুক দিয়ে হাই-হ্যালো, হাসিতে হাংগার ফুড স্ট্রীটের সরু জায়গাটি ভরে পড়েছে। পথের উপরেই মোড়া পেতে বসেছেন। শিঙাড়া, কচুরি, ইডলি। সেই পথটিতে ক্ষণিকের জন্য গাড়ি, বাইক চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। সকালের চায়ের কাপের জন্য লোকের এমন সমাগম …। বহুদিন না খাওয়ার অন্তে যেন এই চায়ের কাপের এই আগ্রহী আয়োজন। ‘হাংগার ফুড স্ট্রীট’ নামটি মনে মনে আওড়াল মেঘনা। লোকের হাসি-ঠাট্টা, চায়ের কাপের সাথে দেশ বিদেশের আড্ডা। কারো মোবাইলে গজল বাজছে। কারো মোবাইলে আবার ভজন। এইসব লোক সদাই আসেন শুধু এক কাপ চায়ের জন্যই ? উঁহু …। এই চায়ের কাপে হয়তো আছে মানসিক ক্ষুধা নিবৃত্তিরও উপায়। পরিচিত-অপরিচিতের কথা নেই। হাংগার ফুড স্ট্রীটের এই ‘মর্ণিং টী’র জন্য যিনিই আসছেন, সবাই তাঁকে ‘গুড মর্ণিং’ জানাচ্ছেন।
শাহেনশাহ গাড়িটি নাতিদূরে রাখলেন। শাহেনশাহদের দলটিতে যাওয়া মেঘনাকে দেখে অনেকেই এগিয়ে এসে ‘করমর্দন’ করলেন। মেঘনাও হাংগার ফুড স্ট্রীটে সমবেত ‘মর্ণিং টী’ পার্টির অস্থায়ী সদস্য হয়ে পড়ল। কার জাত কী, কার ধর্ম কী - কিছুরই চিহ্ন নেই। ব্যস্ মানুষের জটলা।
###
সকালের খবর। সুশান্ত দীক্ষিত নামের ব্যক্তিটি মোবাইলেই খবর শুনছিলেন।
- আর্রে ইয়ার, চায়ে কে সাথ মন কা বাত করো। তুম ভি ইয়ার। বুড্ঢা হো গয়া। সুলতান সুশান্ত দীক্ষিতকে বলা কথাটিতে সব্বাই হাসির গুঞ্জন তুললেন। হেসে থাকতেই একজনের হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেল। দু’জনের মতো লোক মূর্তির মতো বসে রইলেন। মুখের হাসি তো দূর কথাও যেন হারিয়ে গেল। সুশান্ত দীক্ষিতের মোবাইলে ভেসে আসে সংবাদপাঠকের কণ্ঠ --
ক্ষণিকের জন্য যেন সময় স্থবির হয়ে রইল। মেঘনার অস্বস্তিও বেড়ে গেল। সংবাদটি সম্পর্কে কেউ কেউ দুঃখ প্রকাশ করে সন্ত্রাসবাদের ডেকে আনা বিভীষিকার কথা বলে গৃহাভিমুখী হয়েছেন। শাহেনশাহ, সুলতান, খান, মোটোর মুখে কথা নেই। গাড়িটির দিকে যন্ত্রচালিতের মতো এগিয়ে গেছেন। মেঘনা মোটোর সঙ্গে সঙ্গে যেতে থাকল। শাহেনশাহ গাড়ি চালাচ্ছেন।
কারো মুখে কথা নেই কেন ? একজন অন্যজনের সাথে চোখে চোখেই কথা বলা যেন অনুমান হলো। পাকিস্তানী সন্ত্রাসবাদীর জঘন্য কাণ্ড। তাঁদের এই নীরবতা কেন ?
গাড়ি বন্দিতা থাকা এপার্টমেন্টের সামনেই যে রেখেছেন, তখনই মেঘনা লক্ষ করল। মেঘনা নামতে যেতেই মোটো এবং সুলতান গাড়ির পিছনের সিট থেকে নেমে দরজাটি খুলে দিলেন। বাহ্যিক জড়তা ঝেড়ে ফেলে মেঘনা গাড়ি থেকে নামল। কিছু একটা বিদায়সূচক কথা বলতে গিয়েও মুখ হা করে রইল। শাহেনশাহ বললেন -
শাহেনশাহের কথায় মেঘনার বলার আর কিছুই ছিল না। সবার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে সে ‘বাই’ জানালো। সুলতান ও খান একসাথে বললেন -
মুচকি হেসে মেঘনা ধন্যবাদ জানালো। সে দৃষ্টির আড়াল না হওয়া পর্যন্ত শাহেনশাহরা গেলেন না।
###
- বাপ্ রে। এ…ত্ত দেরি পর্যন্ত মর্ণিং ওয়াক করলি ? আমি একসাথে ‘মর্ণিং টী’ খাব বলে বসে আছি।
দরজাটি খুলে দিয়েই বন্দিতার অভিমানভরা কণ্ঠ সরব হয়ে উঠল। অন্যমনস্কভাবে ঈষৎ হেসে মেঘনা বলল -
Comments
Post a Comment