Skip to main content

মাটি-মানুষের কাব্যগ্রন্থ - ‘পৃথিবীর হতে পারে মানুষ’


কবির ভাষ্যে - ‘পৃথিবীর হতে পারে মানুষ’। কথাটি হয়তো এভাবেও বলা যায় কিংবা যেত - মানুষের হতে পারে পৃথিবী। অর্থাৎ এই পৃথিবী বহুল অর্থে মানুষের বাসযোগ্য হতে পারে কিংবা পারত। মাটি ও মানুষের এই যে সহাবস্থান, এই যে পারস্পরিক সহবাস, সহযোগিতা, সহমর্মিতা - এর মধ্যেই নিহিত হয়ে আছে সময়, অতীত ও ভবিষ্যতের বিশ্লেষণ ও ভাবনা। অথচ এই একটি জায়গাতেই মানুষ বহু লক্ষ যোজন পিছিয়ে রয়েছে পৃথিবী থেকে। মানুষে মানুষে অন্তর্দ্বন্দ, বিভেদ, স্বার্থপরতার ইঁদুরদৌড়ে ব্রাত্য পৃথিবী আর হয়ে ওঠেনি - যা হয়ে উঠতে পারত। পৃথিবীর এই অন্তর্ভাবনাতেই লুকিয়ে আছে মানুষের যুগ যুগান্তরের কৃতকর্ম। আর ঠিক এই জায়গাটিকেই ‘পাখির চোখ’ করে ভূমিষ্ঠ হয়েছে কিংবা বলা যায় পাঠকস্থ হয়েছে কবি অভীককুমার দে’র সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথিবীর হতে পারে মানুষ’।
ভূমিকাহীন এই কাব্যগ্রন্থের ব্লার্বে তুলে ধরা হয়েছে এই সারসত্যটিকেই। - “মানুষের ভিতর মানুষ থাকে না বলেই আজ মানুষে মানুষে এত দূরত্বের ঢেউ। ... আজ মানুষে মানুষে ভয়-ঘৃণা-হিংসা-দ্বেষ এই নিয়েই চলছে লড়াই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কিন্তু সৃষ্টির সৌন্দর্যকে অস্বীকার করে তো কিছু নয়। এই ভুবনের মানুষই ধারক ও বাহক। ... ‘পৃথিবীর হতে পারে মানুষ’ অর্থাৎ মানুষের জন্যই পৃথিবী আর পৃথিবীর জন্যই মানুষ। ভেতর জাগিয়ে সমবেত পায়ে এগিয়ে আসতে হবে পৃথিবীর জন্য।”
৬০ পৃষ্ঠার এই কাব্যগ্রন্থে রয়েছে মোট ৪৪ টি কবিতা। অধিকাংশ কবিতাতেই সরাসরি কিংবা অন্তর্নিহিত ভাষ্যে মানুষের কথাই বলা হয়েছে। মানুষের সহজাত বিচিত্র চরিত্রসমূহকেও চিত্রিত করা হয়েছে আধুনিক কবিতার শব্দছকে। এবং সব কটি কবিতাই আধুনিক কবিতার আদলে। ছন্দকবিতা নেই। তবু মাটি ও মানুষকে নিয়ে শব্দের সহাবস্থান কবিতাগুলোকে লাল কার্পেটে স্বাগত জানিয়ে সযত্নে রেখে দেয় ভাবীকালের মহাফেজখানায় -
যদিও সূর্য কোনো ডুবুরি নয়,
দিনের শেষে আলোটাই ডুবে যায়।
দিনের আলো ওড়না বিছিয়ে ঘুমোলেই
সাগরজলে জোয়ার আসে।
যত সব দেনা-পাওনার হিসেব কষে দেখি -
মনের জলবিছানায় জীবিকার ঘুম নেই।
বুকের ভেতর ইচ্ছেমায়ার নীল চোখ
চেয়ে থাকে জলশিল্প।
(প্রথম কবিতা - জলশিল্প)
অভীকের কবিতা মাঝে মাঝেই ঝলসে ওঠে এই শব্দকুহকের বিন্যাসে। রিক্তের বেদন শব্দমহিমায় গেঁথে রয় পাঠকমনে। এই অনাবিল উচ্চারণ, এই শব্দের মায়াময়তাই কবির সম্পদ। পৃথিবী জুড়ে মানুষের রোজনামচাকেই শিল্পময়, চিত্রময় করে রাখার চেষ্টায় কবির কলম সদাজাগ্রত। কবিতায় সময়কে ধরে রাখার এক অভিনব আয়োজন। কবি আজীবন জীবনের কাছে নতজানু -
জীবনের কাছে নতজানু হতে হতে
লেখা হয়ে যায় মৃত্যু।
এক জীবন কাঁদে
ঈষৎ ঘুমের ঘোর কেটে গেলে
চোখের সামনে জেগে থাকে
বালকপুরাণ।
(কবিতা - বালকপুরাণ)।
শব্দশিল্পের তুখোড় শিল্পী অভীকের এক একটি কবিতা এমনই কাব্যময় যে ইচ্ছে হয় মানুষের ভিড়ে সশব্দে উচ্চারিত হয় শব্দের আকুল মায়া। শব্দের মোহনীয়তায় জেগে ওঠে সারবত্তা, মাটি ও মানুষের ইতিহাস, সময়ের কথকতা। মাটির পৃথিবীর চলমান ইতিহাস ছুঁয়ে কবিতার অঙ্গে অঙ্গে, ছত্রে ছত্রে আসে বর্ষা, আসে জল, অরণ্য, আকাশ, নদী..., অন্তিম গন্তব্য -
তখন, মাটির কাছে ফুল
চোখ মেলে দেখছে -
আমার মুখের উপর
একটি দিনের ভাবনা
সাবমেরিনের মতো,
ডুবে ডুবে সাঁতার কাটে সময়।
বিকেলের সূর্য লাল হলেই মুছে যায় স্বপ্ন,
পাখিটির ক্লান্ত ছায়া মাটিতে পড়ে না, তবু
সন্ধ্যার আয়োজনে রঙিন মেঘ...।
আঁধার ঢেলে তারাদের জ্বলতে দেখে চুপচাপ।
(কবিতা - শোকাহত)
শুধু কল্পনায় বিরাজ করেই কবি পৃথিবীর জন্য তাঁর দায়বদ্ধতা সেরে রাখেবনি। মাঝে মাঝেই জাত-ধর্মের মিথ্যে মুখোশটিকে উন্মুক্ত করার প্রয়াস দেখিয়েছেন। এও তো মানুষেরই সৃষ্ট এক ‘জঞ্জাল’ যা পৃথিবীকে কলুষিত করে আসছে যুগে যুগে।
অভীকের কবিতার একটি নির্দিষ্ট ধাঁচ আছে। তাঁর কবিতাকে পড়তে জানতে হয়। কথার পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা কথাটিকে তুলে নিতে হয়। আবার কবিতা-শেষে খুঁজে নিতে হয় অব্যক্ত কথার খেইটি। প্রতিটি কবিতা যেন মনে হয় আরো দীর্ঘ হতে পারত। বহু কথা বলেও যেন বাকি থেকে যায় বহু কথা। আর এই বাকি কথার খোঁজে উল্টে যেতে হয় কবির কবিতার পাতা। একের পর এক। পাঠককে ধরে রাখার এ এক অনবদ্য কৃতিত্ব দেখাতে পেরেছেন অভীক তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে। এই দ্বন্দ, এই অব্যক্ত কথার খেই ধরে তাই চলতে থাকে অন্বেষণ - শেষ কথার -
এযাবৎ প্রমাণিত -
মানুষ প্রাণী মাত্র, পৃথিবীর জঞ্জাল।
এ সত্য মানে না বলেই পরিচয় খোঁজে, কিন্তু কার !
... বিকারগ্রস্ত মানুষ
পৃথিবীর খেয়েই পৃথিবী খায়।
... দমবন্ধ ঘরে যদিবা কাঁচা হয় হৃদয়ের মাটি
আবার পৃথিবীর হতে পারে মানুষ।
(কবিতা - পৃথিবীর হতে পারে মানুষ)
ঝকঝকে ছাপাই ও বাঁধাইযুক্ত কবি গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন ‘অণুরিতাকে’। নীহারিকা পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থে বানান ভুলের সংখ্যা একেবারেই কম যদিও কিছু কিছু কবিতায় যতি চিহ্নের প্রয়োগে কিছু কার্পণ্য অনুভূত হয়।
সব মিলিয়ে আজকের দিনে উত্তর পূর্বের কাব্যজগতে সবচাইতে সক্রিয় ত্রিপুরার কবি অভীককুমার দে’র এই কাব্যগ্রন্থটি নিঃসন্দেহে এক সুখপাঠ্য এবং উজ্জ্বল কাব্যপ্রতিভার নিদর্শন।

- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

‘পৃথিবীর হতে পারে মানুষ’
অভীককুমার দে
মূল্য - ১৪০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৮৬২২৩৯৬১৬

Comments

  1. খুব সুন্দর আলোচনা অইছে। ধন্যবাদ দাদা।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...