Skip to main content

কী করে বোঝাই ?

আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে
আমার মুক্তি ধূলায় ধূলায় ঘাসে ঘাসে
দেহ মনের সুদূর পারে হারিয়ে ফেলি আপনারে
গানের সুরে আমার মুক্তি র্ধ্বে ভাসে।।
মুক্তির গানে, আর্তির গানে এক একটি সকাল সুরে সুরে যেন মোহময় হয়ে উঠে অনুপমের গলায় 
ডিসেম্বর মাস এসে গেছে অথচ ঠাণ্ডা এল না এমন একটা ফিসফাস শুরু হয়েই গেছিল সবখানে শীতের সকালের আমেজটাই যেন হারিয়ে গেছে পৃথিবী থেকে কিন্তু ডিসেম্বর এলেই যে পৌষ এসে যায় না এ কথাটি কারো খেয়ালই থাকে না শীতের শুরু তো পৌষ নিয়েই - তা সবাই ভুলেই যায় আসলে মেয়ের নাম পৌষালি রাখাই যায় কারণ নামটা সুন্দর তা বলে পৌষ কিংবা বাংলা মাস নিয়ে আদিখ্যেতা করার কোন মানেই হয় না কে-ই বা এই সব বাংলা সন মাস তারিখের খবর রাখে ? কী জানি মাসগুলোর নাম ? মনেও থাকে না ছাই
সে যাই হোক পৌষও এল আর ঠাণ্ডাটাও এল ঠিকই সূত্র ধরে হাঁফিয়ে ওঠা গরমের পরেই এমন চনমনে ঠাণ্ডা যেন দেহ মনে নিয়ে এল এক অনির্বচনীয় সুখের বার্তা সোয়েটার, জ্যাকেটগুলো কোথায় যেন গুছিয়ে রাখা ছিল ? ফ্যানহীন রান্নাঘরের ঘর্মাক্ত দমবন্ধ পরিবেশ থেকে মুক্তির দিন ঘনিয়ে আসায় সুনন্দার অন্তরেও এক মন-ভালো-করা আনন্দ এসব কথা কারো সাথে শেয়ার করা যায় না একা একাই স্বাদ নিতে হয় এমনিতেও বছরের পর বছর ধরে দিনের একটা বড় সময় ওই রান্নাঘরে থাকার হ্যাপাটা আজকাল বড্ড অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে কিন্তু এর থেকে মুক্তির কোন উপায়ও নেই অনুপম সকাল নটা থেকে বলতে গেলে রাত নটা অবধি বাইরেই থাকে অফিস আর সাইট সামলে সেও নাজেহাল এর পর সপ্তাহে একটি মাত্র দিন বিশ্রাম তার প্রাপ্য বটে আর নাহলেও অনুপম রান্নাঘরে এলে কাজ এর বদলে অকাজটাই বেশি হয় সুনন্দাকে পাশেই থাকতে হয় এমন অভিজ্ঞতা সুনন্দার বেশ কয়েকবারই হয়েছে সুতরাং অনুপম রান্নাঘরের বাইরে থাকাটাই সমীচীন একটি মাত্র মেয়ে পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত আজকাল ঠিকঠাক পড়াশোনা শেষ করতে করতে বাচ্চাদের ন্যূনতম পঁচিশটি বসন্ত পেরিয়েই যায় এদিকে এতগুলো বছর রান্নাঘর সামলে একঘেয়েমির চূড়ান্ত হয়ে ওঠাটাই স্বাভাবিক পরবর্তী প্রজন্ম এসে হাল ধরতে ধরতে জীবনের বেশির ভাগ সময়ই চলে যায় সাধ আহ্লাদ মেটানোর ইচ্ছেটুকুর বিশেষ কিছু আর অবশিষ্ট থাকে নাতাও যদি সেই সুযোগটুকু থাকেযা সুনন্দা বা অনুপমের নেই
ড্রয়িং রুমে টিভিতে বাংলা সিরিয়াল চলছিল দেখতে না পেলেও তা শুনে শুনে লাগোয়া কিচেনে রান্নায় ব্যস্ত ছিল সুনন্দা হঠাৎ করে ঘাড়ের কাছে উষ্ণ নিঃশ্বাস টের পায় - ‘হাই ডার্লিং !!’ এক পলকের চমকে ওঠা শুধু সঙ্গে সঙ্গে বুঝে নেয় সুনন্দা আগের আর পাঁচটা রবিবার কিংবা ছকের বাইরে আজকের যেকোনও দিন - অনুপম এসে চমকে দেয় এভাবে সুনন্দার একাধারে চমকে ওঠা এবং শিউরে ওঠার পালা বাইরের দরজাটা বন্ধ আছে তো ? মেয়েটা ঘরে নেই তো ? এসব সতর্কতামূলক প্রশ্নের শেষে নিশ্চিন্ত সুনন্দা এবার নিশ্চিত পুলকে ভাসবে খানিক ধীরে ধীরে অনুপমের ঠোঁটজোড়া নেমে আসে ব্লাউজের উপরের উন্মুক্ত অংশে এবং এটাই সুনন্দার কাছে পরম আশ্চর্যের যে আজ এতগুলো বছর পরেও সেই একই শিহরণ, একই পুলক কী করে জাগে ভেতরটায় ? এবার অনুপমের ঠোঁট দুটি নিশ্চিত খুঁজে বেড়াবে সুনন্দার দুগাল কড়াইতে কী বসিয়েছে মনে থাকে না সুনন্দার হাতের খুন্তি হাতেই থেকে যায় কিছুটা মুহূর্ত স্বেচ্ছায় সঁপে দেয় অনুপমের ইচ্ছার কাছে সময় নেয় না অনুপম পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় সহজেই এ চিত্র সুনন্দার কাছে একাধারে পুলকের এবং নির্ভরতার চা খাবে ?’ জিজ্ঞেস করে সুনন্দা ইচ্ছে না থাকলেও ভালোবাসার দান ফিরিয়ে দিতে মন চায় না অনুপমের
এই চিত্রনাট্য বজায় আছে যদিও তার আবহটা বছর দুয়েক হলো পালটে গেছে সুনন্দাদের অনুপম এখন চাকরি থেকে স্বেচ্ছা অবসরে সময়ের বেশ কয়েক বছর বাকি থাকতেই জগৎজোড়া অর্থনৈতিক মন্দার জেরে কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় এই সিদ্ধান্ত সেদিক থেকে দেখলে রান্নাঘরের কাজটা অনুপম ভাগ করতেই পারত কিন্তু সেই ইচ্ছা বা এলেম কোনটাই তার নেই বলে সুনন্দার কাছে অনুপমের গৃহবাস খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারল না তাছাড়া এই কদিনে এটাও স্পষ্ট হয়ে গেছে যে অনুপম এখন আগের চাইতেও বেশি ব্যস্ত আগে অন্তত অফিস টাইমের পর কিছুটা সময় কাছে পাওয়া যেত কিন্তু এখন ঘরে থেকেও যেন অধরা অনুপম এবং এই নতুনত্বে সুনন্দাও কিন্তু খুব দুঃখী নয় কাছের মানুষটির নতুন ভূমিকায় সুনন্দাও খুশি দেদার গর্বিতও বটে অনুপম হয়তো নিজেও জানত না নিজের এই সুপ্ত প্রতিভা, এই কৃতিত্বের কথা চাকরি শেষের অবসর সময়টাকে কাটাতে সামাজিক মাধ্যমে নিজের পুরোনো বিদ্যাটি একটু ঝালিয়ে নিচ্ছিল অনুপম গানের গলা তার বরাবরই ভালো সেই যখন গান শিখত, তালিম নিত অনুপম - তখনই শ্রোতারা খুব তারিফ করত বোদ্ধাদের কাছ থেকেও প্রশংসা পেয়েছে অনেক এর পর চাকরিবাকরি করে সংসার করতে গিয়ে এসব হারিয়েই গেছিল প্রায় এখন আবার গুনগুন থেকে তরানা ফিরে এসেছে বিস্মৃত পথের নতুন হদিশ নিয়ে সামাজিক মাধ্যম ছেড়ে মঞ্চে এখন অনুপমের নিত্য নিমন্ত্রণ বেশ উপভোগ করছে অনুপম ব্যস্ততাও বেড়েছে স্বাভাবিক ভাবেই এসব চালিয়ে যেতে হলে অনেকটা সময়ের প্রয়োজন সুনন্দা যতটুকু পারছে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে অনুপমের দিকে একটা সময় এ নিয়ে চিন্তাও কম ছিল না সুনন্দার বয়স হওয়ার আগেই স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে বাড়িতে বসে কীভাবে সময় কাটাবে অনুপম এ নিয়ে অনেক ভেবেছে সুনন্দাও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় একটা অবসাদ এসে আচ্ছন্ন করে রাখে এমন মানুষদের সেই চিন্তাটিই মাথায় ঘুরপাক খেত সুনন্দার কিন্তু এভাবে যে এই সমস্যাটির সমাধান হয়ে যাবে তা কিন্তু সত্যি অভাবনীয়
ছন্দেই চলছে সংসার তবু মাঝে মাঝেই খানিক ছন্দপতনের সুর ভেসে আসে মনের কোন গহীন দেশ থেকে ভেবে পায় না কেউই আবার একঘেয়েমিতে পেয়ে বসেছে সুনন্দার এদিকে শহরের নতুন আস্তানায় নতুন জীবন যাপন আর মেয়েটির উচ্চশিক্ষা - এই দুই চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে নতুন করে সংসারটাকে ছন্দে চালিয়ে যেতে সম্পদের প্রাচুর্য এক অনিবার্য শর্ত আগের মতো এখন আর মাসে মাসে বেতনের টাকা আসে না হাতে পেনশনের উপর নির্ভর করে চলতে হয় পেনশনের অঙ্কটা নেহাৎ মন্দ নয় যদিও তবু মনে হচ্ছে টায়টায় পেনশনের মোটা টাকা মাস ফুরালে হাতে আসবে জেনেই স্বেচ্ছা অবসরটা নিয়েছিল অনুপম এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে আলোচনা করেছিল সুনন্দার সঙ্গে ঠিকই কিন্তু সুনন্দা কোনও সহায়তা করতে পারেনি অনেকটা উদাসীন ভাবেই বলেছিল - ‘তুমি বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নাও অনুপমনির্লিপ্ত ভাবখানা যেন এমন - সংসার চালানোর দায় তোমার সুতরাং এ তুমিই বুঝো বাপু প্রথম দিকে খুব একটা বোঝা যায়নি যদিও অনুপম লক্ষ করছে পেনশনের টাকার পরও ব্যাঙ্কে জমানো টাকায় টান পড়ছে আজকাল কিছুটা শঙ্কিত হয়ে ওঠে অনুপম সাংস্কৃতিক জগতের হাতছানিতে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে মাসে বেশ কিছু টাকা গচ্চা যায় এদিকে সুনন্দাদেরও যুগোপযোগী দিন গুজরানের খরচ বেড়েই চলেছে ক্রমাগত মা-মেয়ের যুগলনন্দিতে প্রায়শঃ অনলাইন শপিং এর বদান্যতায় পার্সেল আসে ঘরে নজর এড়ায় না অনুপমের অথচ পেনশনটা বাড়ছে যদিও কিন্তু অনুপাতে এই বৃদ্ধি কিন্তু পিছনে পড়ে থাকছে অর্থাৎ কিছু ভাবতে হবে অন্যরকম নাহলে চলবে না সুনন্দাকে খরচ কমাতে বলে অনুপম এবং সেখান থেকেই সার্বিক একটা মানসিক অস্বাচ্ছন্দ্যের সৃষ্টি বাজে খরচ এবং প্রয়োজনীয় খরচের একটা তুলনাত্মক ব্যাখ্যা তুলে ধরে সুনন্দা বিচলিত হয় অনুপম একমাত্র স্ত্রী-কন্যার শুধু জীবন যাপন নয়, সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যাপারটাও সামাল দেওয়া তার একান্ত দায় বটে
অবসরের ছমাস পর একটা কাজে ঢুকেছিল অনুপম খরচপাতি সামলে কিছু টাকা আসতো ঠিকই হাতে কিন্তু কর্মক্ষেত্রের অস্বাচ্ছন্দ্যে কাজটা ছেড়ে দিয়ে আবার চলে এসেছে ঘরে কাজের ধরণটার সঙ্গে কিছুতেই নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছিল না অন্যথা কাজটা করছিল খুব সম্মানের সঙ্গেই এর পর করোনা আবহে আর কাজের সন্ধান করেনি অনুপম তার ভাবনা অন্যরকম
মাস ফুরালেই পেনশনের যতটা টাকা আসছে তার হাতে তার অর্ধেকটা বেতন পেলে আজকালকের হাজার হাজার বেকার ছেলেরা দস্তুর মতো বর্তে যায় পৃথিবীতে জায়গা ছাড়তে হয় - জানে অনুপম শুধু নিজে বাঁচা নয়, অন্যদেরও বাঁচতে দিতে হয় এমনিতেও করোনা এসে সমাজের, দেশের মেরুদণ্ডে আঘাত করে গেছে মোক্ষম লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক যুবতী ন্যূনতম বেতনে কাজ করার চেষ্টা চালিয়েও যেখানে ব্যর্থ হচ্ছে সেখানে অভিজ্ঞতাকে হাতিয়ার করে এ বয়সের লোকেদের বাড়তি রোজগারের চেষ্টা করাটা অনুচিত বলেই বোধ হয় অনুপমের নিজের মেয়েটিরও তো ভবিষ্যৎ আছে তাই যা পাচ্ছে তাতেই দিন গুজরানের পক্ষপাতী অনুপম এমনিতেও জীবনে যা পেয়েছে তা অনেক ছিন্নমূলের দ্বিতীয় প্রজন্মের পায়ের তলার মাটি নিজেকেই শক্ত করে নিতে হয় এবং সেটা ইতিমধ্যেই করতে পেরেছে অনুপম অন্তত নিজে সেরকমই ভাবে শহরে একটি তিন কামরার ফ্ল্যাট কিনে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে পেরেছে গাড়ি হয়েছে, অশন বসনের ব্যবস্থা হয়েছে অবসরকালীন কিছু টাকাপয়সা জমিয়ে রেখেছে ভবিষ্যতের জন্য আর কী চাই ?
আর এখানেই সুনন্দার মনের মধ্যে এক ভিন্ন চিন্তার বাস চিন্তা মূলতঃ অনুপমকে ঘিরেই সারাটি দিন ঘরে বসে বসে শরীরের না বারোটা বেজে যায় গান শুধু গান এত চমৎকার গায় অনুপম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড়াল থেকে শোনে সুনন্দা মন প্রাণ জুড়িয়ে যায় সে একটা দিক পরক্ষণেই ভবিষ্যতের চিন্তা এসে জায়গা করে নেয় মনে এভাবে খরচপাতি সামলে সরলরৈখিক ছন্দে চলবে তো জীবনটা ? এর চাইতে ভালো হতো অনুপম যদি আরোও কিছুদিন চাকরি করতো কিংবা এখনো যদি অন্য কোথাও কম মাসোহারাতে হলেও কাজকর্ম কিছু করতো তাহলে সংসারের চলমানতাটা আরোও মসৃণ হতো একাধারে শরীরের চলমানতাও তাই মাঝে মাঝে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অন্তরের উষ্মাটা প্রকাশ করে ফেলে সুনন্দা আর এতেই অনুপম ভীষণ করে মুষড়ে পড়ে যেন মাঝে মাঝে রেগে ওঠে অনুপম সব কথা, সব ভাবনা বলা যায় না সুনন্দাকে অন্যভাবে বুঝানোর চেষ্টা করে কিন্তু সুনন্দা আশ্বস্ত হয় না দেখে রেগে ওঠে অনুপম এ এক নতুন উপসর্গ সুনন্দার চোখে মুখ ফসকে কথার পৃষ্টে কথা জুড়ে দেয় সুনন্দাও একটা বিচ্ছিরি পরিবেশের সৃষ্টি হয় নিমেষে এই ব্যামো যত দিন যাচ্ছে ততই বাড়ছে প্রায় প্রতি মাসেই দুএকদিন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়
###
আকাশটা মেঘলা গত দুদিন ধরেই শীত এতদিনে জাঁকিয়ে বসেছে পৌষ যাই যাই করছে এবার সামনেই মাঘ মাঘের শীতে নাকি বাঘও পালায় দেহে অন্যূন পাঁচ পাঁচটি ব্যামো নিয়ে নাজেহাল সুনন্দা ডাক্তার মর্নিং ওয়াক-এর শলা দিয়েছেন তাই ভোরে উঠেই হাঁটতে বেরিয়ে যায় সুনন্দা অনুপমও আজকাল উঠে পড়ে সকাল সকালই শীতের রাতের একত্র লেপমুড়ি ওম ভোর অবধি গড়ায় না কারো তবু সুনন্দা বেরিয়ে যাবার পর বেশ খানিকটা দেরি করেই বিছানা ছাড়ে অনুপম বয়স বাড়ছে শরীরকে ঠিক রাখার চিন্তা দানা বাঁধছে মাথায় না হলে এসব কথা নিয়ে কি আর ভেবেছে কখনো ? দীর্ঘ চাকরি জীবনে টইটই করে ঘুরে বেড়িয়েছে অনুপম পাহাড় চড়েছে, নৌকো করে জল পেরিয়ে সাইটের কাজে পাড়ি জমিয়েছে কর্মসূত্রের দৌড়ঝাঁপেই শারীরিক কসরত হয়ে গেছে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এখন পরিস্থিতি পাল্টেছে তাই ঘুম থেকে উঠে ঘন্টাখানেক শারীরিক কসরতের পর মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হতে হতেই সুনন্দা ফিরে এসে চায়ের জল বসায় সব কিছু মিলে যায় কাটায় কাটায় এবার অনুপম বসবে হারমোনিয়মটা নিয়ে আর সুনন্দা মোবাইল খুলে সারা রাতের এবং সকালের মেসেজগুলো দেখবে, পড়বে
মুখ ধোওয়া শেষ হওয়ার পরও যখন সুনন্দা ফিরে এল না তখন অনুপম সামনের ব্যালকনিতে গিয়ে খানিক বসলো টবের গাছগুলো সুনন্দার পরিচর্যায় সেজে উঠেছে দারুণ সচরাচর চোখে পড়ে না এসব অনুপমের আজ বাইরের গাছপালা আর শীতের সকালের প্রায় নির্জন রাস্তাটার সাথে এদিকেও চোখ গেল বেশ কিছু বড় বড় গাঁদা ফুটেছে টবে অনুপম ভাবে সুন্নদার হাতে যাদু আছে বৈকি অপরাজিতার ফুলগুলো যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে একটা ভালো লাগা আবেশ এসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে যেন অনুপমকে সুনন্দার পথ চেয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সুনন্দার মনের গভীরে ডুব দেয় অনুপম বিয়ের পর প্রথম থেকেই সব ব্যাপারে খুব সিরিয়াস সুনন্দা ঠিক যেমনটি সে চেয়েছিল মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবত কী করে যে একটা মেয়ে নিজের সবটুকু সত্ত্বা ঝেড়ে ফেলে একেবারেই নতুন সত্ত্বায় নিজেকে আবৃত করে ফেলে এত সহজে আসলে বাইরেটাই দেখে পুরুষ মানুষ মনের গভীরে কে আর ডুব দিতে যায় এই যে সত্ত্বার চকিত পরিবর্তন এটা তো পুরুষের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব অথচ কী অপরূপ দক্ষতায় মেয়েরা এই কাজটি করে গড়ে তুলছে এক একটি সংসার, এক একটি পরিবার এবং সেই পরিবারটি যখন এসে দাঁড়ায় সামান্যতমও অনিশ্চয়তার সামনে তখন স্বাভাবিক ভাবেই তাদের মনেই এর প্রতিক্রিয়া এসে দাঁড়ায় সবার আগে ঘর পোড়া গরুর মতো সিঁদূরে মেঘ দেখে ঘাবড়ে যায় মেয়েরাই - যখন সামান্যতম আঁচড় লাগে দেহে, মনে, সংসারে তাই তো এরা মাঝে মাঝেই একটু বেশি পরিমাণ প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে এসব তথ্য সাধারণতঃ ধরা পড়ে না পুরুষ হৃদয়ে অনুপমই বা এসব নিয়ে কদিন ভেবেছে ? আজ নেহাত এক টুকরো এই সকালের অবসরে ফুলেদের সাথে যেন নতুন করে দেখছে জগৎ সংসারকে, তার জগৎ জুড়ে অধিষ্ঠাত্রী দেবীর মতো সুনন্দাকে মনে মনে তার সাম্প্রতিক কাজকর্মে লজ্জিত বোধ করে অনুপম
ব্যালকনিতে বসেই ছিল অনুপম বেশ খানিকটা দেরি করেই ঘরে ঢুকলো সুনন্দা এসেই জিজ্ঞেস করলো - চা খেয়েছ ?
- না
- একদিনও কি করে খেতে পারো না ?
এমন প্রশ্নের জন্য ঠিক প্রস্তুত ছিল না অনুপম নীরবই রইল সুনন্দা কাপড় জামা পালটে চা করে নিয়ে এল নিঃশব্দে চায়ের পেয়ালা হাতে তুলে নিল অনুপম
কিন্তু সুনন্দাকে যেন আজ অন্যরকম দেখাচ্ছে মুখে বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ বলে - বসে বসে শরীরটাকে বরবাদ করে দেবে তুমি অনুপম
অনুপম রেওয়াজের জন্য মনে মনে প্রস্তুত হচ্ছিল এবার সুনন্দার প্রশ্নের জবাব দেওয়াটা তার কাছে অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ল পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় তাই - কী করব তাহলে ? রোজ সকালে যতটা পারি কসরত তো করছি এর চাইতে বেশি কী চাও তুমি সুনন্দা ? - বলে ভাবল একটু যেন কর্কশ শোনাল তার জবাবটা এতটা কি ঠিক হলো - এই সকাল বেলায় ?
- কেন ? ঘরের বাইরে বেরোতে তোমার কেন এত অনীহা অনুপম ? তোমার এই বয়সে সবাই তো প্রাইভেট চাকরি করে অনেকগুলো টাকা কামাচ্ছে প্রতি মাসে দত্ত-দা, অবিনাশ-বাবু ওরা তো তোমার চাইতেও বয়সে বড় কিন্তু দেখেছ তো কেমন অবসরের পরেও দিব্যি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি জুটিয়ে নিয়েছেন তুমিও তো চেষ্টা করে দেখতে পার ?
ধীরে ধীরে ভাঙছে অনুপম জীবনের অঙ্ক সহজ পাটিগণিত নয় বুঝতে পারে বিলক্ষণ সিদ্ধান্তের পার্থক্যটাও ঠিক এই মুহূর্তে বুঝিয়ে বলার নয় তবু ভেতরে ভেতরে একদলা দুঃখবোধ জট পাকাতে থাকে অনুপমের অন্তরে বুকের মাঝে এক টুকরো ব্যত্থা জন্ম নেয় অজান্তেই সেখান থেকে চোখের কোণ সিক্ত হতে চায় জোর করে আটকে রাখে অনুপম একসাথে পথ চলার অঙ্গীকারে আবদ্ধ এক দম্পতির মাঝে চিন্তাধারার ব্যবধান থাকাটা অসম্ভব কিছু নয় কিন্তু অনুপমের অন্তরে সুনন্দার কথাগুলো বড্ড বাজে
- সে তুমি বুঝবে না সুনন্দা শুধু এই কথাটি বলেই সুনন্দার সামনে থেকে চলে আসে অনুপম
আজ আর হারমোনিয়মে সুর লাগবে না অনুপমের সকালটা ইতিমধ্যেই বেসুরো হয়ে গেছে নিজের লোকেরা যখন নিজের ভাবনা থেকে অনেকটা দূরে চলে যায় তখন সুর থাকে না কোনকিছুতেই এ বিশ্ব চরাচরে বিরাজ করে শুধুই এক বিস্তৃত শূন্যতা এই মুহূর্তে অনুপমের সামনে শুধুই এই শূন্যতা আর একগাদা কষ্ট অনুপম কী করে বলে বোঝায় সুনন্দাকে তার যাপন ব্যথা ? কী করে খুলে বলে সব কথা ? মনে মনে কাল্পনিক সংলাপ আওড়ায় অনুপম - তুমি কি জানো সুনন্দা - আমার ঘুম আসে না রাতে ? বিছানায় তুমি যখন আমার পাশে শুয়ে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়ো আমি তখন ঠায় জেগে থাকি অনন্ত সময় আমার অতীত, আমার অতৃপ্ত কর্মকাল আমাকে প্রতিনিয়ত ভাবনার বেড়াজালে আবদ্ধ করে রাখে শেষ রাতে আমি অজান্তেই হারিয়ে যাই আমার ফেলে আসা বিশ্বে প্রতি রাতে আমি স্বপ্নলোকে ঘুরে বেড়াই আমার অসমাপ্ত কর্মজীবনের আনাচে কানাচে আমি স্পষ্ট দেখি সেইসব স্থান যেখানে দাঁড়িয়ে আমি আগেরই মতো সরকারি কাজের তদারকি করছি আমার সহকর্মী, আমার অধস্তন কাজের লোকেরা আগেরই মতো আমাকে সম্মান করছে কঠিন কঠিন কাজ আমি নিমেষে সমাধা করে তৃপ্তিসুখ খুঁজে পাচ্ছি সবাই আমাকে বাহবা দিচ্ছে আগেরই মতো
সকালে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর সে কী অসহ্য মনোবেদনা - সে তোমাকে কী করে বোঝাই বলো সুনন্দা ? তুমি তো অতীত ভুলে এক আপন বিশ্ব রচনা করে নিয়েছ কিন্তু আমি ? আমার তো অতীত এসে আমাকে প্রতিনিয়ত ভাবায়, কাঁদায় সুনন্দা কী করে বোঝাই ?

- - - - - - - - - - - -

- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...