বুকের ভিতর কবিতা তোর বসতবাড়ি
কপাট থেকে সিংহদুয়ার দিচ্ছে আড়ি
বরাক - চিরি - জিরির বুকে
রূপকথারা লুকিয়ে থাকে
জোছনা-রাতে জবাকুসুম ঝিমিয়ে পড়ে
চাঁদের আলোয় হৃদয়কমল যাচ্ছে ওড়ে
চোখের ভিতর, বুকের ভিতর -
কাঁচপোকারা দিব্যি নড়ে
নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকা -
আলোয় ভাসা আদ্যোপান্ত
বুকের ভিতর কাঁচপোকাদের
অসহ্যকর বাড়বাড়ন্ত…
(কবিতা - রূপকথা)
… এমনি সব হৃদয়-কথার পসরা নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কবি মমতা চক্রবর্তীর কাব্যগ্রন্থ ‘ভুবনডরের মাঝি’। কবি তাঁর এই ৬৪ পৃষ্ঠার কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর মা স্বর্গীয় মিনতি চক্রবর্তী, বাবা স্বর্গীয় মনীন্দ্র চক্রবর্তী এবং অকালপ্রয়াত একমাত্র ছোটবোন মঞ্জুলিকা চক্রবর্তীকে। গ্রন্থ জুড়ে আছে মোট ৫৫ টি কবিতা যার অধিকাংশই অণু কবিতা আকারের। এবং সেখানেও অন্তর্নিহিত হয়ে আছে গভীর বোধ, লুক্কায়িত অনুভূতির প্রতীকী প্রকাশ। পৃষ্ঠাজোড়া শুধুই দু’টি লাইন -
নদের পাড়ে, পথের ধারে অসূয়া-উৎসব
চোখের ভিতর, বুকের ভিতর দারুণ কলরব।
(কবিতা - নদের পাড়ে)
কিংবা -
তিন লাইনের -
বনলতা - প্রিয় ‘বনলতা সেন’
হা-হুতাশ মরু-বুকে
আশ্চর্য শ্যাম্পেন।
(কবিতা - বনলতা সেন)
না বলা কত কথাই না বলে দেয় এমন বিন্যস্ত পঙ্ক্তিরা। ‘ভুবনডরের মাঝি’ বৈচিত্র্যে ভরপুর কিছু কবিতার সংকলন। আছে পৃষ্ঠাজোড়া কিছু কবিতা, আছে ছড়ার ছন্দে একগুচ্ছ কবিতা। কবিতার আকাশে যেন কবির স্বচ্ছন্দ বিচরণ। তাঁর ইতিপূর্বে প্রকাশিত কবিতার গ্রন্থেও এমনই আভাস পাওয়া গিয়েছিল। তারই নিরবচ্ছিন্ন প্রকাশ এই কাব্যগ্রন্থ। ‘ভুবনডরের মাঝি’ কোনো মাঝির জীবনচরিতও নয়, নয় কোনও স্থানিক বৃত্তান্তও। এ শুধু কাব্যনদীতে মনমাঝির ‘অমল ধবল পালে তরণী বাওয়া’। সেদিক দিয়ে বিচার করলে যথেষ্ট ব্যঞ্জনাময় হওয়া সত্ত্বেও গ্রন্থনাম আক্ষরিক অর্থে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেনি। তবু…।। তবু এই কাব্যনদীতে আছে স্বচ্ছ সলিল কবিতার ধারা, আছে একের পর এক আত্মকথার উথালপাথাল। পার্থিব জীবনের মুখোশ-জীবনই হয়ে উঠেছে গ্রন্থের মূল থীম, কবিতার অন্তর্নিহিত নির্যাস। ব্লার্বে যেমন লিখছেন প্রসিদ্ধ গল্পকার মিথিলেশ ভট্টাচার্য - ‘... তাঁর আপাত সহজ-সরল প্রকাশভঙ্গির মধ্যে এমন এক তীর্যক শ্লেষ ফুটে ওঠে যা আজকের ক্লান্ত কবিতা পাঠককে উজ্জীবিত করে তোলে।’
বরাকের সাহচর্যে কবির বেড়ে ওঠা। তাই কবিতায় স্বাভাবিক ধারাতেই ফিরে ফিরে এসেছে বরাক - চিরি - জিরি। এসেছে ফিরে উনিশে মে’র দহনগাথা। কবিতা নামে ‘উনিশ’ এসেছে তিন বার। এর বাইরেও আছে উনিশ। কবির আত্মযাতনার প্রকাশ। তবে ‘উনিশে মে দু’হাজার কুড়ি (দুই)’ কবিতাটি ‘উনিশে মে দু’হাজার একুশ’ কবিতার আগে আসতে পারত।
ছড়ার ছন্দে, অন্ত্যমিলে থাকা কবিতাগুলো কথাও ছন্দের ককটেল হয়ে উঠেছে। এমনি কিছু কবিতা - ‘তিল্কার তিতিলি’, ‘ফুটফুটে রোদ্দুর’, ‘গাছগাছালি’, ‘বিনু তেলি’, বৃষ্টিধারা ১,২,৩’, ‘দুনিয়াটা আজগুবি’, ‘মনখারাপের বালাইষাট’, ‘নোটবন্দি’ ইত্যাদি। ‘বিনু তেলি’ কবিতায় গ্রন্থ নামের আভাস আসে। ‘… ভুবনডরের বিনু তেলি / গতর খাটে ঘাটে……’। জুড়িন্দা-বার্কিতে মানুষ পারাপার করে বলেই মাঝি - ‘ভুবনডরের মাঝি’ - গ্রন্থের আকর শব্দ।
এত এত মুখোশের কথা, এত দুঃখগাথার
রোদনভরা বসন্তের শেষেও কবির কলমে জেগে থাকে প্রত্যয়, জেগে থাকে আত্মবিশ্বাস।
এখানেই কবির সার্থক কাব্যচর্চা। কবির মননে নির্ভীক সবুজ প্রকৃতির আকাঙ্ক্ষা জেগে
থাকে অবিরত -
প্রিয় কিশলয়
ইতস্তত মেঘেদের ঘোরাফেরা
আষাঢ়ের গাভীন মাঠে
কচি সোঁদা গন্ধ
আজও মনে হয়
প্রার্থনার সময়
অস্ফুটে দিনগুলি কী যে কথা কয়
শোনো কিশলয় -
তোমার সবুজ বুক থাকুক নির্ভয়।
(কবিতা - প্রিয় কিশলয়)
কলকাতার ‘চিন্তা’ থেকে প্রকাশিত ভূমিকাহীন এই গ্রন্থের চমৎকার প্রচ্ছদের সৌজন্যে রাজীব চক্রবর্তী। অক্ষর, শব্দ, বাক্য বিন্যাস, বাঁধাই, ছাপাই স্বচ্ছ, আকর্ষণীয় এবং মননশীল। কিছু বানান/ছাপার ভুল থেকে গেছে। বিশেষ করে প্রথম কবিতাতেই। তবু শেষ কথা বলে কবিতার অন্তর্নিহিত বক্তব্য এবং তার যথাযথ কাব্যিক উপস্থাপন। এখানেই গ্রন্থের সার্বিক সাফল্য।
কপাট থেকে সিংহদুয়ার দিচ্ছে আড়ি
বরাক - চিরি - জিরির বুকে
জোছনা-রাতে জবাকুসুম ঝিমিয়ে পড়ে
চোখের ভিতর, বুকের ভিতর -
নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকা -
বুকের ভিতর কাঁচপোকাদের
অসহ্যকর বাড়বাড়ন্ত…
… এমনি সব হৃদয়-কথার পসরা নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কবি মমতা চক্রবর্তীর কাব্যগ্রন্থ ‘ভুবনডরের মাঝি’। কবি তাঁর এই ৬৪ পৃষ্ঠার কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর মা স্বর্গীয় মিনতি চক্রবর্তী, বাবা স্বর্গীয় মনীন্দ্র চক্রবর্তী এবং অকালপ্রয়াত একমাত্র ছোটবোন মঞ্জুলিকা চক্রবর্তীকে। গ্রন্থ জুড়ে আছে মোট ৫৫ টি কবিতা যার অধিকাংশই অণু কবিতা আকারের। এবং সেখানেও অন্তর্নিহিত হয়ে আছে গভীর বোধ, লুক্কায়িত অনুভূতির প্রতীকী প্রকাশ। পৃষ্ঠাজোড়া শুধুই দু’টি লাইন -
নদের পাড়ে, পথের ধারে অসূয়া-উৎসব
চোখের ভিতর, বুকের ভিতর দারুণ কলরব।
(কবিতা - নদের পাড়ে)
কিংবা -
তিন লাইনের -
বনলতা - প্রিয় ‘বনলতা সেন’
হা-হুতাশ মরু-বুকে
আশ্চর্য শ্যাম্পেন।
(কবিতা - বনলতা সেন)
না বলা কত কথাই না বলে দেয় এমন বিন্যস্ত পঙ্ক্তিরা। ‘ভুবনডরের মাঝি’ বৈচিত্র্যে ভরপুর কিছু কবিতার সংকলন। আছে পৃষ্ঠাজোড়া কিছু কবিতা, আছে ছড়ার ছন্দে একগুচ্ছ কবিতা। কবিতার আকাশে যেন কবির স্বচ্ছন্দ বিচরণ। তাঁর ইতিপূর্বে প্রকাশিত কবিতার গ্রন্থেও এমনই আভাস পাওয়া গিয়েছিল। তারই নিরবচ্ছিন্ন প্রকাশ এই কাব্যগ্রন্থ। ‘ভুবনডরের মাঝি’ কোনো মাঝির জীবনচরিতও নয়, নয় কোনও স্থানিক বৃত্তান্তও। এ শুধু কাব্যনদীতে মনমাঝির ‘অমল ধবল পালে তরণী বাওয়া’। সেদিক দিয়ে বিচার করলে যথেষ্ট ব্যঞ্জনাময় হওয়া সত্ত্বেও গ্রন্থনাম আক্ষরিক অর্থে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেনি। তবু…।। তবু এই কাব্যনদীতে আছে স্বচ্ছ সলিল কবিতার ধারা, আছে একের পর এক আত্মকথার উথালপাথাল। পার্থিব জীবনের মুখোশ-জীবনই হয়ে উঠেছে গ্রন্থের মূল থীম, কবিতার অন্তর্নিহিত নির্যাস। ব্লার্বে যেমন লিখছেন প্রসিদ্ধ গল্পকার মিথিলেশ ভট্টাচার্য - ‘... তাঁর আপাত সহজ-সরল প্রকাশভঙ্গির মধ্যে এমন এক তীর্যক শ্লেষ ফুটে ওঠে যা আজকের ক্লান্ত কবিতা পাঠককে উজ্জীবিত করে তোলে।’
বরাকের সাহচর্যে কবির বেড়ে ওঠা। তাই কবিতায় স্বাভাবিক ধারাতেই ফিরে ফিরে এসেছে বরাক - চিরি - জিরি। এসেছে ফিরে উনিশে মে’র দহনগাথা। কবিতা নামে ‘উনিশ’ এসেছে তিন বার। এর বাইরেও আছে উনিশ। কবির আত্মযাতনার প্রকাশ। তবে ‘উনিশে মে দু’হাজার কুড়ি (দুই)’ কবিতাটি ‘উনিশে মে দু’হাজার একুশ’ কবিতার আগে আসতে পারত।
ছড়ার ছন্দে, অন্ত্যমিলে থাকা কবিতাগুলো কথাও ছন্দের ককটেল হয়ে উঠেছে। এমনি কিছু কবিতা - ‘তিল্কার তিতিলি’, ‘ফুটফুটে রোদ্দুর’, ‘গাছগাছালি’, ‘বিনু তেলি’, বৃষ্টিধারা ১,২,৩’, ‘দুনিয়াটা আজগুবি’, ‘মনখারাপের বালাইষাট’, ‘নোটবন্দি’ ইত্যাদি। ‘বিনু তেলি’ কবিতায় গ্রন্থ নামের আভাস আসে। ‘… ভুবনডরের বিনু তেলি / গতর খাটে ঘাটে……’। জুড়িন্দা-বার্কিতে মানুষ পারাপার করে বলেই মাঝি - ‘ভুবনডরের মাঝি’ - গ্রন্থের আকর শব্দ।
প্রিয় কিশলয়
ইতস্তত মেঘেদের ঘোরাফেরা
আষাঢ়ের গাভীন মাঠে
কচি সোঁদা গন্ধ
আজও মনে হয়
প্রার্থনার সময়
অস্ফুটে দিনগুলি কী যে কথা কয়
শোনো কিশলয় -
তোমার সবুজ বুক থাকুক নির্ভয়।
(কবিতা - প্রিয় কিশলয়)
কলকাতার ‘চিন্তা’ থেকে প্রকাশিত ভূমিকাহীন এই গ্রন্থের চমৎকার প্রচ্ছদের সৌজন্যে রাজীব চক্রবর্তী। অক্ষর, শব্দ, বাক্য বিন্যাস, বাঁধাই, ছাপাই স্বচ্ছ, আকর্ষণীয় এবং মননশীল। কিছু বানান/ছাপার ভুল থেকে গেছে। বিশেষ করে প্রথম কবিতাতেই। তবু শেষ কথা বলে কবিতার অন্তর্নিহিত বক্তব্য এবং তার যথাযথ কাব্যিক উপস্থাপন। এখানেই গ্রন্থের সার্বিক সাফল্য।
- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
‘ভুবনডরের মাঝি’
মমতা চক্রবর্তী
মূল্য - ২৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৭০৮৬২২৫১৫৯
মমতা চক্রবর্তী
মূল্য - ২৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৭০৮৬২২৫১৫৯

Comments
Post a Comment