শেষ অঘ্রানের
ধানি গন্ধ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই শুরু হয়ে যেত আমাদের দৌড়ঝাঁপ। কাটা ধানগাছের গোড়ার
অংশগুলো পায়ে পায়ে মাড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে তৈরি হয়ে উঠত গাঁয়ের একচিলতে
ক্রিকেট মাঠ। শীতের নরম রোদে ক্রিকেটের মতো এমন সুস্বাদু টাইমপাস্ আর কিছুই ছিল
না তখন। স্কুল যেদিন বন্ধ থাকত সেদিন সারা দিন জুড়ে, আর তা না হলে
শুধু বিকেলের শেষ রোদে জমে উঠত ক্রিকেটের আসর। স্কুলের ফার্স্ট বয় রাজু থেকে শুরু
করে কৃষক বন্ধু অমল অবধি সব একই মাঠের সুহৃদ।
ফাস্ট বোলার
ছিল রত্নেশ্বর। তার ছোড়া বল খেলতে দস্তুর মতো হিমশিম খেতে হতো আমাদের। আমরা ভাবতাম
রত্নেশ্বর নির্ঘাত বহু দূর যাবে ক্রিকেটকে সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু বিধাতার লিখন কি আর
কেউ পড়তে পারে আগেভাগে ? সেই ফাস্ট বোলার রত্নেশ্বর একদিন সব ছেড়েছুড়ে চলে গেল
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে দূরদেশে।
দিন মাস বছর গড়াতে থাকল। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে। রত্নেশ্বর চাকরিবাকরি পেয়ে থিতু হলো জীবনে। আজ বহু যুগ পর খেলার মাঠ থেকে বহু দূর অবস্থানরত প্রৌঢ় রত্নেশ্বর অন্য আরেক কৃতিত্বে পরিচিত হয়ে আছে সমাজে। শুধু ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’ই নয়। রত্নেশ্বর দেখিয়ে দিয়েছে - ‘যে ক্রিকেট খেলে সে কবিতাও লিখে’। আজ রত্নেশ্বর এক প্রতিষ্ঠিত কবি যাঁকে এক ডাকে চেনে শিক্ষিত সমাজ।
সাহিত্য সংস্কৃতির জগতের সঙ্গে যাঁরা জড়িত তাঁরা জন্মসূত্রে না হলেও কর্মসূত্রে নাকি বড্ড আড্ডাবাজ হয়ে থাকেন। কথাটি বলেছিল বন্ধু রত্নেশ্বর। রত্নেশ্বর আজ এই জগতে একটি বহুচর্চিত নাম। রত্নেশ্বর আমার বালক বেলা থেকেই সহপাঠী বন্ধু হওয়ার সুবাদে ওর সব কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ওর লেখালেখির ব্যাপারেও আমি সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। খাতায়পত্রে নাম তার রত্নেশ্বর হলেও আমরা ওকে নাম ধরেই ডাকতাম। সেই সুবাদে কবি রত্নেশ্বর ভট্টাচার্য আমাদের কাছে নিতান্তই ‘মিঠু’। সেই তখন থেকে মিঠুকে দেখে দেখে কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডাবাজ হওয়ার কথাটি আমিও সত্য বলে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। মিঠুর মাথায় যেন আড্ডার পোকা ঘুরঘুর করে সব সময়। যত দিন যাচ্ছে ততই আরোও বেশি আড্ডাবাজ হচ্ছে মিঠু। তবে আড্ডার ধরণ আজ পালটে গেছে আমূল। আগে শুধু সহপাঠী কিংবা পাড়াতুতো বন্ধুদের সঙ্গেই হতো আড্ডা আর এখন মূলত কবি সাহিত্যিকদের সঙ্গে চলে এটা। জীবনের চক্র এভাবেই হয়তো এগোতে থাকে আপন ছন্দে।
তবে আমি মিঠুর সব চাইতে কাছের বন্ধু যেহেতু তাই আমি কবি সাহিত্যিক না হওয়া সত্ত্বেও আমাকে হাজির থাকতে হয় আড্ডাখানায়। মন্দ লাগে না আমারও। নিজে লেখালেখি থেকে শত যোজন দূরে অবস্থান করলেও মিঠুস সহচর হিসেবে আমি সাহিত্যের পরিমণ্ডলে এক পরিচিত এবং তুখোড় আড্ডাবাজ হিসেবে ইতিমধ্যেই বেশ নাম করে ফেলেছি। শ্রোতা, দর্শক কিংবা বোদ্ধাদের আকালের দিনে আমার তাই খুব কদর।
আড্ডায় উঠে আসে কত যে কথা, কত কাহিনি। সবার জীবনযুদ্ধের এক একটি মোড়ে মুখোমুখি হওয়া সব জ্যান্ত কাহিনির বিশাল ভাণ্ডার। এসব শুনতে শুনতে আমিও ভাবি এমন তো আমার জীবনেও ঘটেছে। অথচ কেমন চলে গেছে বিস্মৃতির আড়ালে। আজ তাঁদের কথায় মনে হয় সত্যিই তো কত ভাবনাবিধুর ঘটনার সাক্ষী আমি নিজেও তো। কিন্তু লিখতে পারি না বলে এসব ঘটনা হারিয়ে যায় জীবনখাতার অ্যালবাম থেকে। মিঠুর মুখেই শুনেছিলাম - সাহিত্য সংস্কৃতির জগতে নাকি বড্ড ঈর্ষা। এ ওর পিছনে লেগে থাকার এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা নাকি লেগেই থাকে। কেউ কাউকে উঠতে দিতে চায় না উপরে। শুরু হয়ে যায় ল্যাং মারামারির খেলা। শুনে খুব কৌতুক বোধ করতাম আমি। যাক বাবা আমি এসব সাতেপাঁচে নেই। তাই জোর বেঁচে গেছি।
যাই হোক সেদিনও
বসেছিল আসর। যথারীতি আমিও ছিলাম। প্রথম
দফা চা-এর পর মিঠুই বলছিল তার অসাধারণ এক অভিজ্ঞতার কথা। আমারও
জানা ছিল না সেই ঘটনা। বলতে শুরু করে মিঠু -
“তখন আমি অমরপুরে থাকতাম। লেখালেখি চলছিল
চুটিয়ে যদিও এতটা প্রসার লাভ করেনি। কিন্তু অমরপুরের
মতো ছোট শহরে সাহিত্য সংস্কৃতির চল ছিল ভালোই। সেখানে
আমার পরিচয় ছিল বহু সজ্জন ব্যক্তির সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে
একজনের কথা আজ বলব। তাঁর নাম অনুপম শর্মা। নিপাট
ভদ্র মানুষ যাকে বলে। অমরপুরে যে পাড়াতে আমি ভাড়াবাড়িতে থাকতাম
তিনি সেখানেরই বাসিন্দা। আলাপে আলোচনায় প্রায়ই আমরা মিলিত হতাম। এক সহজ
সরল নিরহঙ্কার এই বন্ধুর সঙ্গের পারস্পরিক সম্বোধন আবার 'দাদা'। আমার দীর্ঘ ১১ বছরের অমরপুর বাসের সময়ে
আমরা খুবই কাছে চলে এসেছি নিজেদের। অনুপম-দার সংস্কৃতি-অন্ত প্রাণ। নিজে
খুব উঁচু দরের আবৃত্তিকার। বস্তুত সেই অঞ্চলের
তিনি ছিলেন এক অন্যতম বলিষ্ঠ আবৃত্তিকার। অনুষ্ঠানাদির সঞ্চালনায় দক্ষ হওয়ার
সুবাদে মঞ্চে মঞ্চে তাঁর নিত্য উপস্থিতি।
অমরপুরের বাংলা সংস্কৃতির জগৎ খুব পোক্ত। তাই অনুপম-দার বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো প্রায় প্রতিদিনই এটা ওটা লেগে থাকত। আমিও ছিলাম কর্মসূত্রে প্রচণ্ড ব্যস্ত। কিন্তু তারই ফাঁকে প্রায়ই মিলিত হতাম আমরা। মূলতঃ সাহিত্য সংস্কৃতির ব্যাপারেই চলতো আলোচনা।
এক ডিসেম্বরের আমেজলাগা শীতে অমরপুরের বৈশালী সাহিত্য গোষ্ঠী দ্বারা আয়োজিত হয়েছিল অঞ্চল ভিত্তিক কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা - 'কবিতার কথা'। ওই অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল একটি স্মরণিকা - 'কথা ও কবিতা', অনুপম-দার অনুরোধে যার সম্পাদক ছিলাম আমি। সেই স্মরণিকাতে আমার একটি কবিতাও ছিল। অকবিতাও বলা যায়। নাম ছিল - 'আবোলতাবোল'। অর্থাৎ যেমনটি আমি লিখি আর কি। তো সেই আবোলতাবোল পড়ে অনুপম-দার এতই ভালো লাগল যে অনুষ্ঠান শেষে আমাকে বললেন - ‘রত্নেশ্বর-দা, আপনার কবিতাটি আমার খুব ইচ্ছে হয়েছিল মঞ্চে পাঠ করি কিন্তু সময় করে উঠতে পারলাম না। আপনার লিখা আরো কিছু কবিতা আমাকে দেবেন তো’। বলা বাহুল্য যে দু'দিনের ওই অনুষ্ঠানের সঞ্চালকও ছিলেন অনুপম-দা। যাই হোক অবাক হলেও কথা মতো কয়েক দিন পর তাঁর হাতে সমঝে দিলাম আমার আরোও কয়েকটি অকবিতা।
এরপর সম্ভবত বছরখানেক পরেই ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে অমরপুরের এক অগ্রণী প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে এক সাহিত্য সংস্কৃতিমূলক অনুষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান আয়োজিত প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানেই আগে আমি আমন্ত্রিত হতাম স্বরচিত কবিতা পাঠ করার জন্য। কিন্তু সেবার আমাকে বলা হয়নি। এর পেছনে হয়তো সেই ঈর্ষাজনিত কিছু ব্যাপার থাকলেও থাকতে পারে কারণ ওখানে এমন কিছু ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল যাদের কবিতা আমার কাছেই শ্রুতিকটু। তবে আবৃত্তিকার হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল অনুপম-দাকে।
আমন্ত্রিত না হলেও নিজের গরজেই গিয়ে হাজির হয়েছিলাম সেই মহান অনুষ্ঠানে।
কিছু বক্তৃতা, কিছু অন্যান্য পরিবেশনার পর এবার ডাক পড়ল অনুপম-দার। আমিও একটু নড়েচড়ে গুছিয়ে বসলাম, কারণ তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের আবৃত্তি আমার কাছে চিরদিনই আকর্ষণীয়।
আর সেই মুহূর্তে আমাকে হতবাক করে দিয়ে ভেসে এল অনুপম-দার বক্তব্য - ‘আজ আমি পাঠ করব আমাদেরই খুব কাছের প্রিয় কবি রত্নেশ্বর ভট্টাচার্যের একটি দীর্ঘ কবিতা - মত্ত নদীর আত্মকথা’।
এক পলকে স্তব্ধ হয়ে গেল উদ্যোক্তাদের যাবতীয় উদ্যোগ। সমবেত বিশাল সংখ্যক শ্রোতৃমণ্ডলীর কানাঘুষো ফিসফাস। সবাই হয়তো বলছিল - অনুপম দত্তের মতো আবৃত্তিকার এ করছেটা কী ? ব্যাটা আর কবি খুঁজে পেল না ? এদিকে আমি তো পালানোর পথ খুঁজে হয়রান। কোথায় মুখ লুকোব বুঝতে পারছি না। এরকম অভিজ্ঞতা তো আর আগে হয়নি। এবার আমি কী করব ? চোখ তুলে তাকাতেও পারছি না। একটা অস্বস্তি এসে গ্রাস করে নিচ্ছে ক্রমশঃ। তবে কি উঠে চলে যাব নিঃশব্দে ? না সেটা বড্ড দৃষ্টিকটু হয়ে যাবে। এমন বিড়ম্বনায় আগে পড়তে হয়নি কোনোদিন। তবে একটা চাপা সুখও যে খেলে বেড়াচ্ছিল সমগ্র সত্তা জুড়ে তাও অস্বীকার করার নয়। আজ বন্ধুর হাত ধরে যেন মনে হচ্ছিল আমার রাজ অভিষেক হচ্ছে। অগত্যা বসে রইলাম ঠায়।
ধীরে ধীরে এগোতে থাকে কবিতা আর নিস্তব্ধ হতে থাকে প্রেক্ষাগৃহ।
দীর্ঘ কবিতা শেষে একটা সময় ক্ষান্ত হলেন আবৃত্তিকার।
খোলা প্রেক্ষাগৃহে কতটা হাততালি পড়েছিল সেটা মনেও নেই আর বিচার্যও নয়। তবে এরপর যে একটা কাণ্ড হয়েছিল সেটি ভোলার নয়। আমার অতি পরিচিত অগ্রজা সম এক উদ্যোক্তা এগিয়ে এসে বললেন - ‘বাহ্ রত্নেশ্বর-দা, ভালো বুদ্ধি করলেন তো" ?
হতভম্ব আমি। এমনিতেই
নিজেকে সামলাতে হিমসিম খাচ্ছিলাম। তার উপর এ কেমন
ব্যঙ্গ ? এ যেন সেই ঈর্ষারই প্রতিফলন। এক বাল্টি
দুধে এক ফোঁটা চোনা। ভীষণ এক ঘেন্না ধরে এসেছিল ভেতরটায়। কী বলব আমি ? এ তো আর ক্রিকেট খেলার মাঠ নয় যে একটা ভয়ংকর ইনসুইংগারে তাঁকে বোল্ড করে দেব। তাই চুপ করে থাকাই শ্রেয় বলে ভাবলাম। অতি কষ্টে কারুণ্যমিশ্রিত একটুকরো মুচকি হাসির চাইতে বেশি আর কিছুই তাঁকে উপহার দেওয়ার মতো ছিল না সেদিন আমার কাছে।
সেই থেকে শুরু। এমন কত ঘটনা যে দেখেছি জীবনে তার আর ইয়ত্তা নেই। এসব দেখে দেখেই লড়াইটা আরোও পোক্ত করে তুলেছি এতদিনে। যাই হোক - অনুপম-দার সাথে সেই যে বন্ধুত্ব, শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে তা আজও চলছে সমানে”।
থামলেন কবি রত্নেশ্বর - আমাদের মিঠু। কবিতায় মত্ত এক কবির আত্মকথা শুনে আমার চোখ ততক্ষণে কপালে।
দিন মাস বছর গড়াতে থাকল। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে। রত্নেশ্বর চাকরিবাকরি পেয়ে থিতু হলো জীবনে। আজ বহু যুগ পর খেলার মাঠ থেকে বহু দূর অবস্থানরত প্রৌঢ় রত্নেশ্বর অন্য আরেক কৃতিত্বে পরিচিত হয়ে আছে সমাজে। শুধু ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’ই নয়। রত্নেশ্বর দেখিয়ে দিয়েছে - ‘যে ক্রিকেট খেলে সে কবিতাও লিখে’। আজ রত্নেশ্বর এক প্রতিষ্ঠিত কবি যাঁকে এক ডাকে চেনে শিক্ষিত সমাজ।
সাহিত্য সংস্কৃতির জগতের সঙ্গে যাঁরা জড়িত তাঁরা জন্মসূত্রে না হলেও কর্মসূত্রে নাকি বড্ড আড্ডাবাজ হয়ে থাকেন। কথাটি বলেছিল বন্ধু রত্নেশ্বর। রত্নেশ্বর আজ এই জগতে একটি বহুচর্চিত নাম। রত্নেশ্বর আমার বালক বেলা থেকেই সহপাঠী বন্ধু হওয়ার সুবাদে ওর সব কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ওর লেখালেখির ব্যাপারেও আমি সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। খাতায়পত্রে নাম তার রত্নেশ্বর হলেও আমরা ওকে নাম ধরেই ডাকতাম। সেই সুবাদে কবি রত্নেশ্বর ভট্টাচার্য আমাদের কাছে নিতান্তই ‘মিঠু’। সেই তখন থেকে মিঠুকে দেখে দেখে কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডাবাজ হওয়ার কথাটি আমিও সত্য বলে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। মিঠুর মাথায় যেন আড্ডার পোকা ঘুরঘুর করে সব সময়। যত দিন যাচ্ছে ততই আরোও বেশি আড্ডাবাজ হচ্ছে মিঠু। তবে আড্ডার ধরণ আজ পালটে গেছে আমূল। আগে শুধু সহপাঠী কিংবা পাড়াতুতো বন্ধুদের সঙ্গেই হতো আড্ডা আর এখন মূলত কবি সাহিত্যিকদের সঙ্গে চলে এটা। জীবনের চক্র এভাবেই হয়তো এগোতে থাকে আপন ছন্দে।
তবে আমি মিঠুর সব চাইতে কাছের বন্ধু যেহেতু তাই আমি কবি সাহিত্যিক না হওয়া সত্ত্বেও আমাকে হাজির থাকতে হয় আড্ডাখানায়। মন্দ লাগে না আমারও। নিজে লেখালেখি থেকে শত যোজন দূরে অবস্থান করলেও মিঠুস সহচর হিসেবে আমি সাহিত্যের পরিমণ্ডলে এক পরিচিত এবং তুখোড় আড্ডাবাজ হিসেবে ইতিমধ্যেই বেশ নাম করে ফেলেছি। শ্রোতা, দর্শক কিংবা বোদ্ধাদের আকালের দিনে আমার তাই খুব কদর।
আড্ডায় উঠে আসে কত যে কথা, কত কাহিনি। সবার জীবনযুদ্ধের এক একটি মোড়ে মুখোমুখি হওয়া সব জ্যান্ত কাহিনির বিশাল ভাণ্ডার। এসব শুনতে শুনতে আমিও ভাবি এমন তো আমার জীবনেও ঘটেছে। অথচ কেমন চলে গেছে বিস্মৃতির আড়ালে। আজ তাঁদের কথায় মনে হয় সত্যিই তো কত ভাবনাবিধুর ঘটনার সাক্ষী আমি নিজেও তো। কিন্তু লিখতে পারি না বলে এসব ঘটনা হারিয়ে যায় জীবনখাতার অ্যালবাম থেকে। মিঠুর মুখেই শুনেছিলাম - সাহিত্য সংস্কৃতির জগতে নাকি বড্ড ঈর্ষা। এ ওর পিছনে লেগে থাকার এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা নাকি লেগেই থাকে। কেউ কাউকে উঠতে দিতে চায় না উপরে। শুরু হয়ে যায় ল্যাং মারামারির খেলা। শুনে খুব কৌতুক বোধ করতাম আমি। যাক বাবা আমি এসব সাতেপাঁচে নেই। তাই জোর বেঁচে গেছি।
অমরপুরের বাংলা সংস্কৃতির জগৎ খুব পোক্ত। তাই অনুপম-দার বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো প্রায় প্রতিদিনই এটা ওটা লেগে থাকত। আমিও ছিলাম কর্মসূত্রে প্রচণ্ড ব্যস্ত। কিন্তু তারই ফাঁকে প্রায়ই মিলিত হতাম আমরা। মূলতঃ সাহিত্য সংস্কৃতির ব্যাপারেই চলতো আলোচনা।
এক ডিসেম্বরের আমেজলাগা শীতে অমরপুরের বৈশালী সাহিত্য গোষ্ঠী দ্বারা আয়োজিত হয়েছিল অঞ্চল ভিত্তিক কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা - 'কবিতার কথা'। ওই অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল একটি স্মরণিকা - 'কথা ও কবিতা', অনুপম-দার অনুরোধে যার সম্পাদক ছিলাম আমি। সেই স্মরণিকাতে আমার একটি কবিতাও ছিল। অকবিতাও বলা যায়। নাম ছিল - 'আবোলতাবোল'। অর্থাৎ যেমনটি আমি লিখি আর কি। তো সেই আবোলতাবোল পড়ে অনুপম-দার এতই ভালো লাগল যে অনুষ্ঠান শেষে আমাকে বললেন - ‘রত্নেশ্বর-দা, আপনার কবিতাটি আমার খুব ইচ্ছে হয়েছিল মঞ্চে পাঠ করি কিন্তু সময় করে উঠতে পারলাম না। আপনার লিখা আরো কিছু কবিতা আমাকে দেবেন তো’। বলা বাহুল্য যে দু'দিনের ওই অনুষ্ঠানের সঞ্চালকও ছিলেন অনুপম-দা। যাই হোক অবাক হলেও কথা মতো কয়েক দিন পর তাঁর হাতে সমঝে দিলাম আমার আরোও কয়েকটি অকবিতা।
এরপর সম্ভবত বছরখানেক পরেই ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে অমরপুরের এক অগ্রণী প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে এক সাহিত্য সংস্কৃতিমূলক অনুষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান আয়োজিত প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানেই আগে আমি আমন্ত্রিত হতাম স্বরচিত কবিতা পাঠ করার জন্য। কিন্তু সেবার আমাকে বলা হয়নি। এর পেছনে হয়তো সেই ঈর্ষাজনিত কিছু ব্যাপার থাকলেও থাকতে পারে কারণ ওখানে এমন কিছু ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল যাদের কবিতা আমার কাছেই শ্রুতিকটু। তবে আবৃত্তিকার হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল অনুপম-দাকে।
আমন্ত্রিত না হলেও নিজের গরজেই গিয়ে হাজির হয়েছিলাম সেই মহান অনুষ্ঠানে।
কিছু বক্তৃতা, কিছু অন্যান্য পরিবেশনার পর এবার ডাক পড়ল অনুপম-দার। আমিও একটু নড়েচড়ে গুছিয়ে বসলাম, কারণ তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের আবৃত্তি আমার কাছে চিরদিনই আকর্ষণীয়।
আর সেই মুহূর্তে আমাকে হতবাক করে দিয়ে ভেসে এল অনুপম-দার বক্তব্য - ‘আজ আমি পাঠ করব আমাদেরই খুব কাছের প্রিয় কবি রত্নেশ্বর ভট্টাচার্যের একটি দীর্ঘ কবিতা - মত্ত নদীর আত্মকথা’।
এক পলকে স্তব্ধ হয়ে গেল উদ্যোক্তাদের যাবতীয় উদ্যোগ। সমবেত বিশাল সংখ্যক শ্রোতৃমণ্ডলীর কানাঘুষো ফিসফাস। সবাই হয়তো বলছিল - অনুপম দত্তের মতো আবৃত্তিকার এ করছেটা কী ? ব্যাটা আর কবি খুঁজে পেল না ? এদিকে আমি তো পালানোর পথ খুঁজে হয়রান। কোথায় মুখ লুকোব বুঝতে পারছি না। এরকম অভিজ্ঞতা তো আর আগে হয়নি। এবার আমি কী করব ? চোখ তুলে তাকাতেও পারছি না। একটা অস্বস্তি এসে গ্রাস করে নিচ্ছে ক্রমশঃ। তবে কি উঠে চলে যাব নিঃশব্দে ? না সেটা বড্ড দৃষ্টিকটু হয়ে যাবে। এমন বিড়ম্বনায় আগে পড়তে হয়নি কোনোদিন। তবে একটা চাপা সুখও যে খেলে বেড়াচ্ছিল সমগ্র সত্তা জুড়ে তাও অস্বীকার করার নয়। আজ বন্ধুর হাত ধরে যেন মনে হচ্ছিল আমার রাজ অভিষেক হচ্ছে। অগত্যা বসে রইলাম ঠায়।
ধীরে ধীরে এগোতে থাকে কবিতা আর নিস্তব্ধ হতে থাকে প্রেক্ষাগৃহ।
দীর্ঘ কবিতা শেষে একটা সময় ক্ষান্ত হলেন আবৃত্তিকার।
খোলা প্রেক্ষাগৃহে কতটা হাততালি পড়েছিল সেটা মনেও নেই আর বিচার্যও নয়। তবে এরপর যে একটা কাণ্ড হয়েছিল সেটি ভোলার নয়। আমার অতি পরিচিত অগ্রজা সম এক উদ্যোক্তা এগিয়ে এসে বললেন - ‘বাহ্ রত্নেশ্বর-দা, ভালো বুদ্ধি করলেন তো" ?
সেই থেকে শুরু। এমন কত ঘটনা যে দেখেছি জীবনে তার আর ইয়ত্তা নেই। এসব দেখে দেখেই লড়াইটা আরোও পোক্ত করে তুলেছি এতদিনে। যাই হোক - অনুপম-দার সাথে সেই যে বন্ধুত্ব, শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে তা আজও চলছে সমানে”।
থামলেন কবি রত্নেশ্বর - আমাদের মিঠু। কবিতায় মত্ত এক কবির আত্মকথা শুনে আমার চোখ ততক্ষণে কপালে।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
Comments
Post a Comment