Skip to main content

বিষয় বৈচিত্রে বিশেষ কাব্যগ্রন্থ - ‘তোমাকে খুঁজতে গিয়ে’


শেষ পৃষ্ঠার কবিতা - ‘তোমাকে খুঁজতে গিয়ে’। শেষ থেকেই যেন শুরু।
তোমাকে খুঁজতে গিয়ে -
জনারণ্য থেকে পাহাড়,
নদীর চড়াই-উত্‌রাই
বনভূমি থেকে চিল্কা
তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে
চলে গেছে…
কত মধুমাস …
 
গ্রন্থের শুরু থেকে শেষ অবধি বিষয় বৈচিত্রে কোথাও যেন লুকিয়ে থাকে এই খোঁজ। কবিতায় কবিতায় চলতে থাকে অনাদি অনন্ত খোঁজ। জীবন খাতার প্রতিটি পাতা ঋদ্ধ হয় অনুভবে, অভিজ্ঞতায় আর কবিতায় ধরা থাকে সেইসব অনন্ত দুঃখ সুখের গাথা। সেই কথাটিই ব্লার্বে লিখেছেন গ্রন্থের বর্ণ সংস্থাপক বন্দনা বিশ্বাস।
মমতা চক্রবর্তীর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘তোমাকে খুঁজতে গিয়ে’। পাকা বাঁধাইয়ে জ্যাকেট কভারে মোড়া ৬৪ পৃষ্ঠার এই কাব্যগ্রন্থটিতে আছে মোট ৫৫ টি কবিতা। কলকাতার রাধা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ভূমিকাহীন এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘ভাষা শহিদদের পুণ্যস্মৃতির উদ্দেশে’। কবি মমতা চক্রবর্তীর এ যাবৎ প্রকাশিত সব ক’টি কাব্যগ্রন্থে যে বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়ে আসছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য এই শহিদ তর্পণ। এবার আর কবিতায় নয়, পুরো গ্রন্থটিই তুলে দেওয়া হলো ভাষা শহিদদের উদ্দেশ্য করে।
বরাবরের মতোই বহুধা বৈচিত্রে সজ্জিত এ পর্বের কবিতাগুলো। বরাবরেরই মতো কবিতায় ফিরে এসেছে এক গুচ্ছ স্মৃতি কবিতা, ভালোবাসার বাঙ্ময় কবিতা, নদী ও নারীর কবিতা। অনবদ্য কিছু পঙ্‌ক্তি সমৃদ্ধ করে কবিতার পথ চলা -
চন্দ্রাবতীর পানসি ভাসে
হৃদয় দরিয়ায়...
‘আজি শ্রাবণ ঘন গহন মোহে’
কীসের ইশারায়
(কবিতা - হৃদয় দরিয়ায়)
কিংবা -
শ্রাবণের দিনরাত জুড়ে
বেহুলাকথা একা ভাসে
একরোখা জেদ মেখে
কলার মান্দাসে
কোথায় উজান কন্যা কোথা বা নগর
জলে ও জঞ্জালে কন্যা ভাসে নিরন্তর ...।
(কবিতা - শ্রাবণের দিনরাত)
অধিকাংশ না হলেও বহু কবিতা আছে ছন্দে গাঁথা। অন্ত্যমিলে জাদুকরি ছোঁয়া। প্রথম কবিতা ‘পুণ্যশ্লোকে বিদ্যাসাগর’ থেকে শুরু করে ‘নদী ও নারী’ পর্যন্ত অন্যূন কুড়িটি এমন কবিতা রয়েছে। সবখানি যেন এক বৈচিত্র্যের খেলা। কবির স্বল্প দৈর্ঘের কবিতাগুলো বরাবরের মতোই অর্থবহ, প্রাসঙ্গিক -
কিছু শব্দ খেলা করে
ঘোরে - বেঘোরে
সুরে - বেসুরে
কিছু শব্দ খেলা করে
বুকের গভীরে
(কবিতা - কিছু শব্দ খেলা করে)
কিংবা -
ঘুঘু ডাকা নিঃশব্দ নিদাঘ
কৃতকর্মের কাছে নতজানু
কিংবা বীতরাগ
কর্পূরের মতো উবে যাওয়া
গোলাপি বিকেলের হাতে
সঁপেছি প্রথম পরাগ
(কবিতা - নিঃশব্দ নিদাঘ)
মমতার কবিতায় শব্দেরা এভাবেই খেলা করে বেড়ায়। কবিতার দেহে এঁকে দেয় যাথার্থ্যের অনুষঙ্গ। ‘স্বগত সংলাপ’ কবিতাটি আবার দুই পৃষ্ঠা জোড়া আত্মকথন। কোভিড কালের কালবোশেখির দিনের স্বগত সংলাপ। নদীরা এসেছে যথারীতি - বরাক, চিরি, ধলেশ্বরী, জাটিঙ্গা, সোনাই, ভুবনডর - সব কবির কবিতায় ঘোরাফেরা করে নিয়ত। কবিতায় অধরা থাকেনি বর্তমানও। ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে লিগ্যাসি সবই এসেছে একে একে।
অর্থবহ প্রচ্ছদ এঁকেছেন ডঃ স্বপন পাল। বর্ণ সংস্থাপন ও নামলিপি অনেকটা পুরোনো ধাঁচের যেমন বাঁধাইয়ের ব্যাপারটাও। তবে বর্ণ ও শব্দ বিন্যাস যথাযথ। গ্রন্থের অন্দরে লুকিয়ে আছে কিছু ভুল বানান - অনেকটা পুরোনো বানানের সূত্র ধরে। এদিকটায় আরোও সচেতনতার প্রয়োজন ছিল বইকী।
কবি মমতা চক্রবর্তীর কবিতার মূল সম্পদ তাঁর শব্দের ব্যবহার, কবিতার ভাব এবং লালিত্য - যা সর্বার্থে বজায় রয়েছে এই গ্রন্থেও। সার্থকতা খুঁজতে গিয়ে তাই আতস কাঁচের প্রয়োজন পড়ে না।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

‘তোমাকে খুঁজতে গিয়ে’
মমতা চক্রবর্তী
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৭০৮৬২২৫১৫৯

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...