Skip to main content

বিষয় বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ - ‘প্রান্তিক’ পত্রিকার শারদ সম্ভার


গল্প, কবিতা, প্রবন্ধে-নিবন্ধে ভরপুর একটি সাহিত্য পত্রিকা মুখপত্রও বটে নবতম সংযোজন - নবীনের পাতা, সাহিত্য পত্রিকা অর্থে লিটল ম্যাগাজিনের যা মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সব মিলিয়ে এক জমজমাট শারদীয় সংখ্যা সাত বাই সাড়ে নয় ইঞ্চির সহজে হাতে নিয়ে পড়ার উপযুক্ত অথচ সাধারণ্যের চেয়ে আকারে বড় একটি ৮৬ পৃষ্ঠার সম্ভার। কল্পিত কোনও প্রথম বা দ্বিতীয় ভুবন নয়। এই উত্তর পূর্বের সাহিত্যাকাশে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার কোকরাঝাড়ের মতো একটি ছোট শহর থেকে প্রকাশিত এই ছোটপত্রিকাএবং এটাই প্রথম নয়। নিয়মিত এমনই একের পর এক সংখ্যা প্রকাশিত হয়ে চলেছে বছরে দু’বার। নববর্ষ এবং শারদ সংখ্যা হিসেবে।
নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের কোকরাঝাড় শাখা থেকে শারদীয় সংখ্যা ১৪২৯ হিসেবে প্রকাশিত হলো শাখার মুখপত্র ও সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রান্তিক’। এবারের সম্পাদক সাহিত্যিক সুজাতা ভদ্র - যদিও এ সংখ্যায় তাঁর কোনো লেখা নেই
নিভাবসাস-এর কোকরাঝাড় শাখারআপনজনশান্তি সরকারের প্রয়াণে তাঁর প্রতি ভব্য শ্রদ্ধাঞ্জলির পর সম্পাদকীয়তে স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসব থেকে শারদীয়া দুর্গোৎসব এবং এবারের সংখ্যা নিয়ে বিস্তৃত বিবরণ লিপিবদ্ধ হয়েছে আছেনবীনের পাতার বিশেষোল্লেখও
সাহিত্য অংশে প্রথমেই আসছে প্রবন্ধ বিভাগ এবং এই বিভাগের শ্রীগণেশ হয়েছে খ্যাতনামা অনুবাদক ও সাহিত্যিক বাসুদেব দাস-এর একটি প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে শিরোনামবাংলা ছোটগল্পে পশু চরিত্র’ - যদিও এখানে শিরোনামেই রয়েছে একটি ছাপার ভুল প্রবন্ধে শ্রী দাস অত্যন্ত দক্ষতা ও যত্নের সঙ্গে বহু নিদর্শন সহ উল্লেখ করেছেন বহু কালজয়ী গল্পের কথা যেখানে পশু চরিত্রই হয়ে উঠেছে গল্পের মুখ্য চরিত্র একটি অত্যন্ত যত্নশীল এবং মূল্যবান প্রবন্ধ বিপ্লব শর্মাররবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক’ প্রবন্ধটিও বিস্তৃত এবং সুলিখিত এটিও এক মূল্যবান প্রবন্ধ যেখানে রয়েছে বহু ঘটনাসমূহের বর্ণনা যার অনেক কিছুই হয়তো পাঠকের কাছে অজানাই হয়ে আছে আজও তবে এই প্রবন্ধটিতে রয়ে গেছে অসংখ্য বানান/ছাপার ভুল মিনাক্ষী সোম লিখেছেন প্রবন্ধশিবরাম থেকে শিব্রাম একাধিক তথ্য সহ গুছিয়ে লিখেছেন রম্য গুরু শিবরাম চক্রবর্তীর ব্যক্তি জীবন ও রচনা সম্ভারের কথা আত্মকথামূলক সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ লিখেছেন মহুয়া ঘোষ জীবন যুদ্ধের এক নিদারুণ উত্তরণের গল্প এই রচনাটিকে প্রবন্ধ বিভাগে সন্নিবিষ্ট না করে গদ্য বা অন্যান্য রচনা হিসেবেও বিন্যস্ত করা যেত ভারতপথিক রাজা রামমোহনকে নিয়ে সময়োপযোগী এবং সুলিখিত প্রবন্ধ লিখেছেন জয়দীপ দে বিস্তারিত বিষয়ভাবনাকে ছুঁয়ে গেছেন প্রবন্ধাকার। এখানেও শিরোনামে ছাপার ভুল
ভ্রমণ বিভাগে রয়েছে দুটি ভ্রমণ কাহিনি সুস্মিতা সেনগুপ্তেরউদীয়মান সূর্যের দেশেএবং প্রদীপ কুমার ভট্টাচার্যেরইতিহাসের ছেঁড়া পাতা - মালুঠি দুটি রচনাই আপন আপন বৈশিষ্ট্যে সুলিখিত তথ্যভিত্তিক এবং উৎকৃষ্ট লুকিয়ে আছে বহু অজানা তথ্য যা জানা উচিত।  
নবীনের পাতায় আছে দুটি রচনা নয়নিকা ভট্টাচার্যেরআমি আর বরাক নদী…’ নস্টালজিয়ার সাথে সমাজ সচেতনতা ও প্রকৃতিকে ভালোবাসার এক অপার মুগ্ধতা ভরা একটি চমৎকার রচনা নবীন হলেও যথেষ্ট পরিপক্কতার ছাপ স্পষ্ট এই বিভাগে নিলাঙ্কিতা ভট্টাচার্যের অণুগল্প সদৃশ রচনাটিও একটি বুদ্ধিদীপ্ত এবং সৃষ্টিশীল রচনা এখানেও রয়েছে ভবিষ্যতে যথেষ্ট পরিণত হয়ে ওঠার অঙ্গীকার
ছড়া বিভাগে তিনটি ছড়া লিখেছেন তরুণ মুখোপাধ্যায়, প্রাণকৃষ্ণ কর এবং সুব্রত ভট্টাচার্য  
কবিতা বিভাগে রয়েছে ১৪ পৃষ্ঠা জুড়ে মোট ২৩ জন কবির কবিতা সবগুলো কবিতাই ভালো যাঁরা লিখেছেন তাঁরা হলেন - অসিত বরণ রায়, গৌতম বসু, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, পৌষালী, বিশ্বজিৎ নাগ, সোমা দত্ত, শর্মিষ্ঠা চক্রবর্তী (কবিতায় বেশ কিছু বানান ভুল রয়ে গেছে), চিত্রা দাস ভৌমিক, বাবুল সূত্রধর, পান্না চক্রবর্তী, শুচিস্মিতা, দীক্ষিতা দে, সবর্ণা চট্টোপাধ্যায়, চিন্ময় কুমার বল, সান্ত্বনা সেন চৌধুরী (কবিনামে বানান ভুল), সুমনা মজুমদার (কবিতাটি গানও হতে পারে), মৈত্রেয়ী সিনহা এবং বর্ণালী শিকদার বিশেষোল্লেখের দাবি রাখে হিমু লস্কর, পারমিতা নাগ দে ও প্রাণজি বসাক-এর কবিতা আছে দুটি অনুবাদ কবিতাও মলয়া ডেকার অসমিয়া কবিতার অনুবাদ করেছেন সত্যজিৎ চৌধুরী এবং বারদৈ চিলা নার্জারীর বড়ো কবিতার অনুবাদ করেছেন দীপশিখা গুপ্ত সে অর্থে কবিতা বিভাগটি যথেষ্ট সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যে ভরপুর বলা যায়
গল্প বিভাগে আছে মোট আটটি গল্প রবীন কুমার ভট্টাচার্যের গল্পের জমজমাট বুনোট নারীর মাতৃত্বের উচাটন ফুটে উঠেছে গল্পে বানান বিভ্রাট, ছাপার ভুল এখানেও থাবা বসিয়েছে। ভাষায়, বুনোটে চমৎকার একটি ছোটগল্প অশোক কুমার রায়ের ‘নানা রঙের সাধীনতা’। বিষয় ভাবনাও ব্যতিক্রমী। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘র’ এবং ‘ড়’-এর স্থানচ্যুতি ঘটেছে। অনটনের এক নিদারুণ গাথা বিমল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘জগদ্ধাত্রী’ গল্পটি। গল্প এগিয়েছে তরতরিয়ে যদিও ক্লাইম্যাক্সের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। গল্প বলার মুনশিয়ানা আছে গৌতম হাটির গল্পে। শেষে একটা বার্তাও আছে। তবে বানান/ছাপার ভুলের ছড়াছড়িসবগুলো ‘কী’ - ‘কি’ হয়ে আছে। ভাষায়, বৈচিত্র্যে অসাধারণ অণুগল্প শান্তশ্রী সোম-এর ‘আকাশের গল্প’। পরতে পরতে যেন লুকিয়ে আছে অজানাকে জানার এক কৌতূহল। সজল পাল-এর গল্পটি গোছানো এবং যথেষ্ট সরেস। করোনার আবহে এক আধুনিক গল্প বলা যায় নিঃসন্দেহে। পিঙ্কি দে’র গল্পটি ঝরঝরে ভাষায় লিখা ছোট্ট একটি বর্ণনাত্মক রচনা। বিষয় ভাবনাটি সেভাবে প্রস্ফুটিত হতে পারেনি। সব শেষে শেফালি ব্রহ্মের গোছানো ছোটগল্প ‘সম্পর্ক’। বিষয় ভাবনায় পরিপুষ্ট। গল্প এগিয়েছে সরল গতিতে যদিও আগাগোড়া পুরোনো বানান সরল পঠনে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে।
শেষ পাতে নিয়মিত - ‘শাখা সংবাদ’। এ নিয়েই এবারের সংখ্যা। যথেষ্ট স্বচ্ছ, সুন্দর প্রচ্ছদ। সৌজন্যে - স্বরূপ পাল। কাগজ ও ছাপার কাজ এবং অক্ষর, শব্দ বিন্যাস উন্নত। সম্পাদনা সমিতির গরজ যথেষ্ট পরিলক্ষিত হয় যদিও প্রুফ রিডিং-এ পরবর্তীতে অধিক মনোনিবেশের এবং অধিক যত্নবান হওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

‘প্রান্তিক’
সম্পাদক - সুজাতা ভদ্র
মূল্য - ২০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৬৩৮৩৩০২৭৮

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...