Skip to main content

উৎকর্ষে, গুণমানে সমৃদ্ধ - ক্ষীণতনু ‘কল্পতরু’


একটি স্টেটমেন্ট সাইজের তিন ফর্মার পত্রিকা। অথচ ধারে ও ভারে নিজের জাত চিনিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। যদিও মহালয়া সংখ্যা, তবু একটি দেরি করেই বরাক উপত্যকার ‘কবির শহর’  শিলচর থেকে প্রকাশিত হল ত্রৈমাসিক সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘কল্পতরু’র শারদীয় নিবেদন - ‘মহালয়া-১৪২৯ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যা।
সম্পাদক - সাহিত্যিক স্বাগতা চক্রবর্তী। স্বল্প কথায় সম্পাদকীয়তে টেনে এনেছেন বিগত সময়ের অতিমারির বিভীষিকা। ফুটে উঠেছে প্রত্যয় - ‘... মানবজাতি আবার সহজ স্বাভাবিক জীবন ছন্দে ফিরে এসেছে ... জয় হোক মানুষের, জয় হোক মানুষের অজেয় প্রাণশক্তির।’
প্রথমেই নজর কেড়ে নেয় বিমলেন্দ্র চক্রবর্তীর অপরূপ প্রচ্ছদটি। দারুণ অর্থবহ চিত্র সম্বলিত প্রচ্ছদটি যেন ভিতরের সুরুচিসম্পন্ন সম্ভারের এক আবহ।
ভেতরের পৃষ্ঠা ওল্টালে প্রথমেই চোখে পড়ে সূচিপত্র। সূচিপত্রে চোখ বুলালেই শুধু চমক। একের পর এক ১২ জন  কবির মোট একুশটি কবিতা। আছেন অতন্দ্র যুগের কবিও। আছেন আজকের দিনে কবিতার আকাশে উজ্জ্বল সব নক্ষত্ররাও। কবি জিতেন নাগ, পীযূষ রাউত, বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, দীপক চক্রবর্তী, বিজয়কুমার ভট্টাচার্য, রবিশঙ্কর ভট্টাচার্যদের পাশাপাশি আছেন কবি আনওয়ারুল হক বড়ভুইয়া, শুভব্রত দত্ত, রাজীব ভট্টাচার্য, আশিসরঞ্জন নাথ, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী এবং মমতা চক্রবর্তী। এ অঞ্চলের কবিতাক্ষেত্রে সবাই অতি পরিচিত এবং কৃতী কবি নিঃসন্দেহে। প্রথমোক্ত দুই বরেণ্য কবির দু’টি করে কবিতা যেন কবিতা পাঠের আসরের মঙ্গলাচরণ। এঁদের কবিতার নিমগ্ন পাঠে আছে ‘খরা’, আছে ‘বন্যা’ আছে কাব্যময়তার পরশ। ‘বান’ এসেছে বিমলেন্দ্র চক্রবর্তীর কবিতায়ও। সব জ্যেষ্ঠ কবিরাই আছেন স্বমহিমায়। আছে বহু স্বচ্ছন্দ ছন্দ ও ছন্দহীন কাব্যময়তার মায়াময় প্রকাশ -
 
‘তুমি আমার সরস্বতী, বাজাও ভালো বীণা,
একে-একে ছবি এঁকে হয়েছো চিত্রকর,
আমার মনের লেখাগুলো কবিতা হয় কী না,
জানি না তাই, কে বলে আর, আমায় কবিবর ?’
(কবিতা - কানামাছি, বিজয়কুমার ভট্টাচার্য)।
 
চোখ আছে তার দৃষ্টি যে নেই অনাসৃষ্টির অতল জল
এই ভোরে আজ হঠাৎ করে বোধের হাতে ধরা পড়ে -
কী হবে আর ফিরিয়ে নিয়ে অপছন্দ স্বপ্নগুলো,
আগল ভাঙা বুকের ভেতর ঠিক তখনই, বর্ষা এলো।
(কবিতা - খরা, জিতেন নাগ)
 
শুভব্রত দত্তের দু’টি কবিতার শিরোনাম একই থেকে গেল। আশিস রঞ্জন নাথ-এর আধুনিক কবিতা ‘মেরুদণ্ড’ তীব্র ব্যঞ্জনাময়। দীপক চক্রবর্তীর দু’টি কবিতাই ‘উনিশ’ নিয়ে। কবিতার আসরে নবীনদের অনুপস্থিতি লিটল ম্যাগাজিনের ধর্মের পরিপন্থী।
অসমিয়া ভাষার স্বনামধন্য কবি নীলিম কুমারের কবিতার আজকের দিনের বিশিষ্ট অনুবাদক সত্যজিৎ চৌধুরীকৃত অনুবাদ এই বিভাগের তথা সংখ্যাটির মান বাড়িয়েছে নিঃসন্দেহে।
এই স্বল্প পরিসরে এক এক করে চারটি গল্পের অন্তর্ভুক্তি এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা বলে মনে হতেই পারে। অণুগল্প নয় একটিও। যেমন ছিল না কবিতার বিভাগেও অণুকবিতা। গল্পকারদের নামও কবিদের মতোই চমকে দেওয়ার মতো। বিজয়া দেব-এর গল্প ‘উড়ো জন্ম’ জীবনের এক ভিন্নতর যাপন কথা সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের কোলাজে উঠে এসেছে আজকের সমাজনীতি, রাজনীতি থেকে শুরু করে নৈমিত্তিক বোধের ইতিকথা সহজ বুনোটে সুচারু নিবেদন সুপ্রদীপ দত্তরায়ের কাঠের চেয়ারএক শৈল্পিক উপস্থাপনা অতিমারি সময়ে লিখিত এই গল্পে অত্যন্ত মুনশিয়ানায় উঠে এসেছে সময় অতিমারি, শিল্পভাবনা, গরিবি আর স্বপ্নের এক সুগ্রথিত সহাবস্থান শেষটা যথেষ্ট প্রতীকী সম্পাদক স্বাগতা চক্রবর্তীর সন্ধ্যারবি ও শশাঙ্কপুরোটাই প্রতীকী চরিত্র নামেই বাজিমাত জীবনচক্র জুড়ে সকাল সন্ধ্যার অপরূপ এক আবহ চিত্রণ আলো-আঁধারির গমনাগমন ব্যতিক্রমী ভাবনা নিঃসন্দেহে শেষ গল্প কৃতী গল্পকার মিথিলেশ ভট্টাচার্যের জীবনচক্র আজকের সমাজে তৃণমূল স্তরের গরিবি, বঞ্চনা আর অরাজকতার এক নিটোল কথকতা খেটে খাওয়া মানুষের এক পরিচ্ছন্ন জীবনযাত্রার ছবি প্রতিটি চরিত্র এসেছে গল্পেরই প্রয়োজনে, বাহুল্য নেই কোথাও আঞ্চলিক ভাষার সংমিশ্রণে, ভাষায়, বুনোটে, সংলাপে এক জমজমাট গল্প শেষটায় বঞ্চিত, শোষিত চরিত্রের মুখেও উঠে আসে প্রতিবাদের প্রত্যয় এক বার্তাবহ গল্প
এক পঠনে শেষ হয়ে যায় পত্রিকা থেকে যায় রেশ, থেকে যায় চাহিদা কিছু লেখায় পুরোনো বানান রয়ে গেছে রয়ে গেছে কয়েকটি ছাপার ভুলও যা এ অঞ্চলের ছাপাখানাগুলোর এক স্থায়ী রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে উৎকর্ষে, গুণমানে সমৃদ্ধ কল্পতরুভবিষ্যতে নিশ্চিতই বর্ধিত কলেবরে প্রকাশিত হবে নবীন ও প্রবীণ কবি-লেখকদের সহাবস্থানে এ প্রত্যয় জাগাতে কল্পতরুএকশো ভাগ সফল

- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

কল্পতরু
সম্পাদক - স্বাগতা চক্রবর্তী
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৭০৬২১৫০৩১

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...