Skip to main content

গদ্য পদ্যের বিচিত্রিত সম্ভার - শারদীয়া ‘উপহার’


মেঘালয়ের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস এক সমৃদ্ধ অধ্যায় এর শুরু যদিও মূলত শিলংকেন্দ্রিক তবু খাসি পাহাড়ের ভৌগোলিক অবস্থান থেকে বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে গারো পাহাড়ের বাংলা সাহিত্য চর্চার ইতিহাসও কিন্তু যুগপুরোনো এবং উল্লেখনীয় তুরা শহরকেন্দ্রিক সাহিত্য চর্চারও আছে এক সংগ্রামী এবং সমৃদ্ধ ইতিহাস আছেন কিছু বরেণ্য সাহিত্যিক যাঁদের লেখনীতে এ ইতিহাস সংগ্রহযোগ্য দলিল হয়ে আছে এ অঞ্চলের সাহিত্য চর্চার অঙ্গনে ১৯২৬ সনে প্রতিষ্ঠিততুরা নাট্য সমিতিএই ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে যদিও ষাটের দশকেই পত্রপত্রিকার পথ চলা শুরু বলে জানা যায়।  
সম্প্রতি এই সংস্থা দ্বারা প্রকাশিত হলউপহারপত্রিকার শারদীয়া সংখ্যা ১৪২৯ ১৯৮৫ সাল থেকে এই পত্রিকার পথ চলা। নিরবচ্ছিন্ন না হলেও ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে বহু সংখ্যা। আলোচ্য শারদ সংখ্যার সম্পাদক বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও অনুবাদক সত্যজিৎ চৌধুরী যিনি ১৯৮৮ সাল থেকেই এই পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে আছেন সময়ে সময়ে।
অতিমারি, সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্য, গারো পাহাড়ের বাংলা সাহিত্যকে সম্পাদক ছুঁয়ে গেছেন সম্পাদকীয়তে। তবে ‘উপহার’ নিয়ে আলাদা উল্লেখ প্রাসঙ্গিক হতো। তার আগে রয়েছে সভাপতির কলম। তুরা নাট্য সমিতির সভাপতি ঘূর্জটি চৌধুরী সমিতির বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেছেন সুচারুভাবে। আছে ‘উপহার’ পত্রিকার ‘প্রতিষ্ঠাতা’ সম্পাদক মজিদুর রহমান সরকারের বিস্তৃত প্রতিবেদন। দুই পৃষ্ঠাজোড়া সূচিপত্র পত্রিকার আলোচ্য সংখ্যার বিশালত্ব প্রমাণ করে।
প্রথমেই এসেছে কবিতা বিভাগ। অত্যন্ত সমৃদ্ধ এই বিভাগটি। মোট তিন ভাবে সজ্জিত আছে এই ‘কবিতামালা’ বিভাগ। উত্তর পূর্বাঞ্চলের কবিদের রচনায় কবিতা লিখেছেন ১৮ জন কবি। বিশেষোল্লেখের দাবি রাখে বিশ্বজিৎ নাগ, নীতিশ বর্মন, নির্মল কোচ, আসিসরঞ্জন নাথ, তুষারকান্তি নাথ, মৃদুলা দেবী, মীনাক্ষী চক্রবর্তী সোম, হেলমিনা খাতুন, কৌস্তভ বসু, কল্লোল চৌধুরী এবং গোবিন্দ ধর-এর কবিতাছড়ার ধারায় সজল পাল-এর কবিতা ‘মাতৃভাষা’ সময়োচিত এক প্রতিবেদন। এছাড়াও এই বিভাগে ভালো কবিতা লিখেছেন ডঃ নীলিমা গোস্বামী শর্মা, গুনিন চৌধুরী, ইকবাল হোসেন খান, জয়নাথ শর্মা, সোমা দত্ত এবং ধিরাজ বানাই। অনুবাদ কবিতা বিভাগে রয়েছে একগুচ্ছ কবিতা। অসমিয়া ভাষার বিশিষ্ট কবি নীলিম কুমার-এর ছয়টি কবিতার অনুবাদ করেছেন সম্পাদক সত্যজিৎ চৌধুরী। এছাড়াও তিনি অনুবাদ করেছেন অসমিয়া ভাষার কবি সুরেন্দ্র মোহন দাসের একটি কবিতা। সংগ্রাম জেনার ওড়িয়া কবিতার অনুবাদ করেছেন অজিত পাত্র। বারদৈ চিলা নার্জারীর বোড়ো ভাষার কবিতার অনুবাদ করেছেন সুজাতা ভদ্র। সবগুলি কবিতা এবং অনুবাদ যথাযথ হয়েছে। ‘অন্যান্য অঞ্চলের কবিদের রচনা’ বিভাগে কবিতা লিখেছেন সুনন্দা সিনহা, সাধনা চক্রবর্তী, ভূদেব দাশগুপ্ত, নেপাল সূত্রধর চয়ন, মানস কুমার পান্ডা, স্বপন চন্দ, মধুছন্দা গাঙ্গুলী, পম্পা মন্ডল, সৌরভ বর্ধন, মৌসুমী মন্ডল, চৈতি, পৌষালী, কোহিনুর বেগম, পুলক রায়, স্বপন কুমার নাগ, প্রবীর কুমার চৌধুরী, প্রবীর কুমার চৌধুরী, সঞ্জিত ভট্টাচার্য এবং অভিজিৎ চ্যাটার্জী। সব মিলিয়ে কবিতার বিশাল আয়োজন।
পরবর্তী বিভাগের নাম ‘প্রবন্ধ ও গল্প’। এই ‘গদ্য’ বিভাগে রয়েছে মোট আটটি রচনা। প্রথমেই স্মৃতিকথায় শিলং ও তুরাকে তুলে ধরেছেন নিবন্ধকার কল্যাণ কুমার চক্রবর্তী। এ ধরণের নিবন্ধ পত্রিকার প্রকাশ স্থানের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দেয় বলে পত্রিকার এক সম্পদ বলে গণ্য করা হয় যা পত্রিকার এক অপরিহার্য সংযোজন। তুরার ইতিহাসে বিনিময় বাণিজ্য থেকে মুদ্রা বাণিজ্যের সংক্ষিপ্ত নিবন্ধ লিখেছেন কৌশিক কুমার বসু। অসমিয়া ভাষার বিশিষ্ট সাহিত্যিক রুমী লস্কর বরার একটি চমৎকার ছোট গল্পের বাংলা অনুবাদ করেছেন বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। ভাস্বতী ভট্টাচার্যের রম্য রচনা আম চর্চা সুখপাঠ্য। আমাশয়, আমালোচনা, আমানন্দ, আমপিত্যেশ আদি শব্দের নিপুণ চাতুর্যময় ব্যবহার যথাযথ হয়েছে। বাবলি চৌধুরীর ‘জীবন দর্শন’ স্বল্প কথায় দেশভাগ ও জীবন দর্শনের এক করুণ রসাশ্রিত ভয়ংকর সুন্দর রচনা। ‘ছায়াপথ’ দারুণ উপভোগ্য একটি অণুগল্প। বুনোট এবং ক্লাইম্যাক্সে সুখপাঠ্য। দিবাকর পুরকায়স্থের গল্প ‘এক অসমাপ্ত প্রেম’ চমৎকার বুনোটে, বর্ণনায় একটি মিষ্টি প্রেমের গল্প। সুলিখিত - কিন্তু বানান ভুলের আধিক্যে সুখপাঠ্য হয়ে ওঠেনি। গাড়ি, বাড়ি, বেশি সবই পুরোনো বানান। সবক’টি ‘কী’ এখানে ‘কি’ হয়ে আছে। এমনকি ‘বাঙালি’ শব্দটির বানানও ভুল। কিছু ছাপার ভুলও রয়ে গেছে। অধিকাংশ দাঁড়ির পর গ্যাপ নেই। সব শেষে আছে ডঃ অনিরুদ্ধ বর্মণের আত্মকথামূলক রচনা।
সব মিলিয়ে এক জমজমাট সম্ভার ‘উপহার’। প্রচ্ছদে চমৎকারিত্বের ছাপ ফেলেছেন অভিজিৎ চ্যাটার্জী। অক্ষরের ফন্ট সাইজ আরোও একটু বেশি হলে স্পষ্ট হতো। লাইনের মধ্যেকার স্পেসিং বেশি হয়েছে। লাইন স্পেসিং কমিয়ে ফন্ট সাইজ বড় করলে পঠনসুখ হতো পাঠকের। পরবর্তীতে এসব কিছু মাথায় রেখে ‘উপহার’ যে আরোও সমৃদ্ধ হয়ে পাঠকের দরবারে হাজির হবে তার ভরসা পাওয়া যায় বিষয় বৈচিত্র এবং সম্পাদকীয় গরজের মাধ্যমে।

- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

‘উপহার’
সম্পাদক - সত্যজিৎ চৌধুরী
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪০২৬৯৮৩৫৫

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...