‘ঘাম-জলের ধান’। সম্প্রতি
গুয়াহাটির ব্রাহ্ম সমাজ প্রেক্ষাগৃহে উন্মোচিত হল ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাংলা সাহিত্যের
আকাশে পরিচিত দ্বিভাষিক তরুণ কবি অর্জুন দাস-এর দ্বিতীয় কাব্য সংকলন। এর আগে
প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম অসমিয়া কবিতার সংকলন ‘ভোকর ঈশ্বর’। সুতরাং ‘ঘাম-জলের ধান’ই কবির প্রথম প্রকাশিত
বাংলা কাব্যগ্রন্থ। এবং গ্রন্থ নামেই
যথার্থ হদিশ খুঁজে পাওয়া গেল কাব্যগ্রন্থটির বিষয় ভাবনার। শ্রমের
মাধ্যমে কষ্টার্জিত ফসলের সৃষ্টি যাঁরা করে চলেছেন মূলত তাঁদের জীবনযাত্রা নিয়েই রচিত
অধিকাংশ কবিতা। কোথাও হয়ত খাপ খেয়ে যায় কবির নিজস্ব যাপন কথার মতোই। তাই
এই জীবনের অন্দরমহলের ঊনকোটি যাপন এসে ধরা দেয় কবিতার শরীরে। একের
পর এক কবিতায় ধরা থাকে সেইসব যাপন ব্যথার উচ্চারণ।
পাকা ধানের গন্ধে মাতোয়ারা কবি তার কাব্যগ্রন্থের শ্রীগণেশ করেছেন ‘ধান কাটা শুরু হয়েছে’ কবিতাটির মাধ্যমে। গদ্য কবিতার ধাঁচে উচ্চারিত হয় ধান-বৃত্তান্ত -
কার্তিক মাসটা
আমাদের জন্য বড়ো সুখের মাস।
এ মাসেই পাকা ধানের গন্ধ এসে নাকে লাগে।
আমরা আজন্ম কৃষক। তাই পাকা ধানের হাসি
দেখতে পাই। এমন সময় মনের উল্লাসে মাঠে
ধান কাটি। ……
অধিকাংশ কবিতাই
গদ্য ছন্দে লিখা। সমকালীন অসমিয়া কবিতার সংক্ষিপ্ত পঙ্ক্তি বিন্যাসের ছাপ আছে কবিতাসমূহে। দুই
থেকে চার লাইনের অসংখ্য পঙ্ক্তি কবিতা জুড়ে। অর্জুনের
সরল সহজ সপাট কথনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অনন্ত অসাধারণ সব অনুভব। পঙ্ক্তি বিন্যাসের ধার না মেনেই সরল কথনে এগিয়ে চলে কবিতা। কাব্যময়তা
হয়ত খুঁজে পাওয়া যাবে না সব কবিতায় কিন্তু প্রতিটি কবিতা সহজ আত্মকথনে, অনুভবের নির্বেদ উচ্চারণে সাবলীল হয়ে উঠেছে নিঃসন্দেহে।
বিষয় বৈচিত্র্যে কোথাও এক ধারাবাহিকতাকে খুঁজে পাওয়া যায় কবিতায়। এক সঞ্চিত ক্ষোভ, দুঃখগাথার অমোঘ প্রকাশ। হারানো দিনের আবহে কবিতায় বারে বারে ফিরে আসে দেশ, কাঁটাতার, ভাষা নিয়ে কবির অন্তরের যাবতীয় বিশ্লেষণ। আসে নির্মল গ্রাম্য জীবনের অনাবিল সব ছবির মতো স্বচ্ছ নিটোল প্রতিস্থাপন।
সীমান্তে পা রেখে বুঝেছি
কাঁটাতার শুধু মানুষকেই
বেঁধে রাখতে পারে।
নদীকে পারে না,
পাখিদেরও পারে
না।
এদের কাউকেই
দেশ দিতে পারেনি কাঁটাতার।
আমরা দেশ পেয়েছি
আর দু’চোখ ভরে দেশহীনতা দেখেছি।
(কবিতা - সীমান্ত ১)।
ফুটে ওঠে ভাষাগত যন্ত্রণার দহনব্যথা -
মাঝে মাঝে বাংলা
ভাষায়
আমার তীব্রভাবে লিখতে ইচ্ছে হয়
তখন আমি ভুলে যাই
ভাষাগত সব সীমাবদ্ধতা,...
আর ভুল বানানেই লিখতে থাকি -
সমস্ত অপমান ও বঞ্চনা,
ঠাকুরদাদার মৃত্যুদৃশ্য, ডি-ভোটারের যন্ত্রণা,
চোখের জলে ভিজে যাওয়া লিগেসির অক্ষরগুলি,
কা-র উপর গড়ে ওঠা ডিটেনশ্যন ক্যাম্প আর
দেশ থেকে দেশহীনতা......
(কবিতা - দহনকাল)।
অনুভূতির ছোঁয়ায় অনাবিল, অনবদ্য হয়ে উঠেছে অধিকাংশ কবিতা। যেমন - দেশ, আত্মবিলাপ, যখন একা হই, তা-কে, নিশিকথা, ঘোর, ঈশ্বরের সৈনিক ইত্যাদি। আছে কিছু অনন্য পঙ্ক্তি যা কবিতাকে করে তুলে বাঙ্ময় -
…তিন বিঘা মাটি খেয়ে
উঠোন ছুঁইয়েছে নদী
ওপারে বিশাল চর
খেয়েছে হৃদয় জমি … (কবিতা - শূন্য পাতার শূন্য গাথা)
…তুমি মৌন হেরে গিয়ে
কোথায় রাখো এই অনন্ত দহনলাল
ভিতরে আমার কুয়াশার গহ্বর
তুমি আজও দেখোনি সেই ঝড় ঝড় নিশিরাত। (কবিতা - নিশিকথা)
মানব জীবন, হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা জীবনের দুঃখবোধ, নৈরাশ্য, অপ্রাপ্তির ব্যথা আর মেঠো গন্ধের ককটেলে প্রকৃতি এসে ধরা দেয় অসাধারণ সব ব্যঞ্জনায়। এগুলোই
অর্জুনের কবিতার সম্পদ। আছে কিছু সিরিজ কবিতাও। যেমন সীমান্ত, অসমাপ্ত পদাবলি, অসুখ
ইত্যাদি। নিভৃতে এসেছে কিছু প্রেম ভালোবাসার অনন্য উচ্চারণও -
এই যে অবশেষে প্রেমে পড়া -
এই ঘোর আমাকে ছিঁড়ে খায়। …
আজ তার হাত ধরে
আমি যে পেরোতে চাই বিষাদপুকুর
কীভাবে সে কথাটি তাকে বলি।
(কবিতা - তা-কে)।
প্রায় নির্ভুল বানান গ্রন্থের অন্যতম সম্পদ। হাতে গোনা কয়েকটি থেকে গেছে - চোরাগোপ্তা হয়ে। বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি সমাজ, গুয়াহাটি থেকে সঞ্জয় চক্রবর্তী ও প্রসূন বর্মন দ্বারা প্রকাশিত গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘অভিজিৎ চক্রবর্তী স্যারকে’। স্বচ্ছ মুদ্রণে, শব্দ বিন্যাসে গ্রন্থিত কাব্য সংকলনটির অনুপম প্রচ্ছদ আকর্ষণীয় এবং প্রাসঙ্গিক হয়েছে - সৌজন্যে রাজদীপ পুরী।
সব মিলিয়ে এক
কবিতাময় আবেশ এসে আচ্ছন্ন করে রাখে পাঠশেষে। অর্জুন-এর কবিতার ঘোর এমনই।
পাকা ধানের গন্ধে মাতোয়ারা কবি তার কাব্যগ্রন্থের শ্রীগণেশ করেছেন ‘ধান কাটা শুরু হয়েছে’ কবিতাটির মাধ্যমে। গদ্য কবিতার ধাঁচে উচ্চারিত হয় ধান-বৃত্তান্ত -
এ মাসেই পাকা ধানের গন্ধ এসে নাকে লাগে।
আমরা আজন্ম কৃষক। তাই পাকা ধানের হাসি
দেখতে পাই। এমন সময় মনের উল্লাসে মাঠে
ধান কাটি। ……
বিষয় বৈচিত্র্যে কোথাও এক ধারাবাহিকতাকে খুঁজে পাওয়া যায় কবিতায়। এক সঞ্চিত ক্ষোভ, দুঃখগাথার অমোঘ প্রকাশ। হারানো দিনের আবহে কবিতায় বারে বারে ফিরে আসে দেশ, কাঁটাতার, ভাষা নিয়ে কবির অন্তরের যাবতীয় বিশ্লেষণ। আসে নির্মল গ্রাম্য জীবনের অনাবিল সব ছবির মতো স্বচ্ছ নিটোল প্রতিস্থাপন।
সীমান্তে পা রেখে বুঝেছি
কাঁটাতার শুধু মানুষকেই
বেঁধে রাখতে পারে।
নদীকে পারে না,
এদের কাউকেই
দেশ দিতে পারেনি কাঁটাতার।
আমরা দেশ পেয়েছি
আর দু’চোখ ভরে দেশহীনতা দেখেছি।
(কবিতা - সীমান্ত ১)।
ফুটে ওঠে ভাষাগত যন্ত্রণার দহনব্যথা -
আমার তীব্রভাবে লিখতে ইচ্ছে হয়
তখন আমি ভুলে যাই
ভাষাগত সব সীমাবদ্ধতা,...
আর ভুল বানানেই লিখতে থাকি -
সমস্ত অপমান ও বঞ্চনা,
ঠাকুরদাদার মৃত্যুদৃশ্য, ডি-ভোটারের যন্ত্রণা,
চোখের জলে ভিজে যাওয়া লিগেসির অক্ষরগুলি,
কা-র উপর গড়ে ওঠা ডিটেনশ্যন ক্যাম্প আর
দেশ থেকে দেশহীনতা......
(কবিতা - দহনকাল)।
অনুভূতির ছোঁয়ায় অনাবিল, অনবদ্য হয়ে উঠেছে অধিকাংশ কবিতা। যেমন - দেশ, আত্মবিলাপ, যখন একা হই, তা-কে, নিশিকথা, ঘোর, ঈশ্বরের সৈনিক ইত্যাদি। আছে কিছু অনন্য পঙ্ক্তি যা কবিতাকে করে তুলে বাঙ্ময় -
উঠোন ছুঁইয়েছে নদী
ওপারে বিশাল চর
খেয়েছে হৃদয় জমি … (কবিতা - শূন্য পাতার শূন্য গাথা)
কোথায় রাখো এই অনন্ত দহনলাল
ভিতরে আমার কুয়াশার গহ্বর
তুমি আজও দেখোনি সেই ঝড় ঝড় নিশিরাত। (কবিতা - নিশিকথা)
এই ঘোর আমাকে ছিঁড়ে খায়। …
আজ তার হাত ধরে
আমি যে পেরোতে চাই বিষাদপুকুর
কীভাবে সে কথাটি তাকে বলি।
(কবিতা - তা-কে)।
প্রায় নির্ভুল বানান গ্রন্থের অন্যতম সম্পদ। হাতে গোনা কয়েকটি থেকে গেছে - চোরাগোপ্তা হয়ে। বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি সমাজ, গুয়াহাটি থেকে সঞ্জয় চক্রবর্তী ও প্রসূন বর্মন দ্বারা প্রকাশিত গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘অভিজিৎ চক্রবর্তী স্যারকে’। স্বচ্ছ মুদ্রণে, শব্দ বিন্যাসে গ্রন্থিত কাব্য সংকলনটির অনুপম প্রচ্ছদ আকর্ষণীয় এবং প্রাসঙ্গিক হয়েছে - সৌজন্যে রাজদীপ পুরী।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘ঘাম-জলের ধান’
অর্জুন দাস
মূল্য - ১৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৮৬৪১৯৯৩২৩
অর্জুন দাস
মূল্য - ১৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৮৬৪১৯৯৩২৩

Comments
Post a Comment