Skip to main content

সময়

প্রবীণ খুড়ার কথাটি পরিবেশ গহিন করে তুললো নেশা হলে প্রবীণ খুড়া মাঝে মাঝে কথা বলেন হাসান যখন দার্শনিকের মতো কথা বলে মানুষটি ডুকরে ওঠেন, তখনই জানা যায়, নেশা তুঙ্গে উঠেছে
মানুষটিকে লক্ষ করলাম সময় শরীরের সৌন্দর্য-সম্পদ অনেকটাই কেড়ে নিয়েছে কিন্তু মনের বল এখনো অটুট আছে বোধ হয় সেজন্যই কিজানি পাঁচ বছর বয়সের শিশু, কিশোর ও সফল যুবক যুবতি থেকে শুরু করে মাঝবয়েসি পর্যন্ত সব বয়সের লোকের সঙ্গে সমানভাবে মিলে যেতে পারে
ছোট বেলাতেই দেখা চেহারা এবং এখনের চেহারাটি মিলিয়ে দেখলাম মানুষটি নাটক পাগল নাটক বলতে ঘর বাড়ি, আহার নিদ্রা সব যেন ভুলে যান মিষ্টি গায়ের রং, আশায় উদ্দীপ্ত দুই চোখ, পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতার সুঠাম কমনীয় শরীরটি ? কোথায় ?? চোখের সামনেই কীভাবে পরিবর্তন হয়ে যায়
এহ্‌, মনটি খারাপ করছি কেন ? আমিও কি একই আছি ? আমাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ খুড়াও কি বলছিলেন না -
- আরে, আমার সেই বাচ্চা মেয়েটি কত বদলে গেল
পঁচিশ বছর সম্পূর্ণ পঁচিশ বছর পর এই জায়গাটিতে এসেছি অফুরন্ত আশা আর সীমাহীন উৎকণ্ঠা আমাকে ভেতরে ভেতরে চঞ্চল করে তুলেছিল সমাজে বেঁধে দেওয়া বয়সজনিত ফুর্তির সীমাবদ্ধতাকে মনে রেখেই তো নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করেছিলাম
পঁচিশ বছর স্কুলে টিফিন টাইমে চৌকিদারের বাজানো ঘণ্টার মতো শব্দদুটি মনের মধ্যে বাজতে থাকল অত্যাধুনিক ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম পাঁচ বছরে পৃথিবীটাকে খুবই কাছে নিয়ে এসেছে মানুষের আয়ুর গড় হিসাবে নাকি বারো বছরে এক যুগ হয় সেই হিসেবে দুটি যুগ পার হয়ে গেল
ভালোমন্দ বহু পরিবর্তন অঞ্চলটিকে ছুঁয়ে গেছে এবং ছাপও ফেলেছে বিগত বছরগুলোতে এই জায়গাটিতে একবারও আসতে পারিনি অথচ আমার জন্মস্থানের ঘরটি থেকে মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরত্ব আমি পড়া স্কুলটি থেকে এই জায়গাটির দূরত্ব মনে মনে আবার হিসেব কষে দেখলাম ঠিকই আছে
শ্রাবণের টিপটিপ বৃষ্টিধারার মতোই স্মৃতিগুলো মনোপ্রান্তরে ঝরে পড়ে প্লাবিত করে ফেলেছে সঙ্গীদের কথা ও মুখগুলো এক এক করে ভেসে এলো মানসপটে নামগুলো মনে করলাম এক সময় চোখে চোখ পড়লেও সহ্য করতে না পারা মানসীটি এখন কেন এত দরদ জাগছে ? ওহ্‌ ! বিগত পঁচিশ বছরে আমি কাউকেই একবারও মনে করিনি নাকি ?
সময় কীভাবে বদলে ফেলেছে মানুষের জীবন ধারণ পদ্ধতি সময় মানুষকে দৌড়োচ্ছে নাকি মানুষ সময়ের অনেক আগে থাকতে তৎপর হয়ে পড়েছে ?
এক সময় ভাগে ভাগে করা ধান খেতিতে ভরপুর মরাইগুলো দেখছি বিলীয়মান মাঠে রবিশস্য ফিশারি গ্রামে মাটির ঘরগুলোর জায়গায় গড়ে উঠেছে কংক্রিটের দেওয়াল নির্মিত ভবন
তখনকার চঞ্চলা, ধাবমান কলংধারাটিও এখন কুষ্ঠরোগী নারীর মতোই হয়ে পড়েছে কলং-এর বুকে জায়গায় জায়গায় মাটির ঢিবি অজানা বুনো লতার আধিপত্য জায়গায় জায়গায় স্থবির জলাধারের বুকে এক একটি চাংঘর সেখানে কোন ব্যবসায়ী শূকর ও মুরগি পুষছে ভাষা, বেশভূষায় অমিল এক শ্রেণীর লোকও কলং-এর পারে থিতু হয়েছে ফাটা বস্তা ও ভাঙা টিন দিয়ে ঘিরে নেওয়া শৌচালয় থেকে আসা উৎকট গন্ধ
কলং থেকে রাস্তা পেরিয়ে পঞ্চাশ মিটার দূরে রাজপথটি রাজপথের একপাশে আছে প্রশস্ত খেলার মাঠ মাঠের সাথেই আছে পাঠশালাটি মাঠের এক মাথায় থাকা সংস্কৃত পড়ানো শর্মা স্যার এবং ড্রিল শেখানোর জন্য আমাদের ড্রিল স্যারহয়ে পড়া স্যারদের ঘরদুটিও নেই তার জায়গায় গড়ে উঠেছে একটি অতিথিশালা সঙ্গে আছে একটি নাটঘর
খেলার মাঠটি একই আছে নেই শুধু তার বুকে খিলখিল করতে থাকা এক কালের সফল কিশোর কিশোরী নেই সেই কিতকিত, লুকোচুরি খেলাগুলি ধুসর এক ছবির মাঝে আমি আমাকেদেখলাম নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো শতিকার দৌড় এখন কে কত রানকরতে পারে কে কত উইকেট নিতে পারে আজকের মন্ত্রমুগ্ধ খেলা ক্রিকেটের বাহার
খেলার মাঠ জীবনটিই একটি ক্রীড়াক্ষেত্র প্রতি স্তরে স্তরে আমরা খেলছি নিত্য-নতুন খেলা কেউ হারছে, কেউ জিতছে
প্রবীণখুড়ার দার্শনিক ভাবাসক্ত সংলাপ কথা বলতেও প্রবীণখুড়া মঞ্চে নাটকের সংলাপ বলার ভঙ্গিতে বলেন সেজন্য প্রবীণখুড়া কথা বললে আমরা সংলাপ বলছেনবলে বলি কিন্তু … ?? প্রবীণ খুড়ার কথাগুলো আমাকে স্মৃতির গহ্বর থেকে ক্ষণিকের জন্য বাস্তবের মাটিতে নিয়ে এল কী হয়েছে ? এই মানুষদের কাছে পেতে এবং একসাথে এক বেলা খেয়ে স্ফূর্তি করার জন্য ভেতরে ভেতরে যেরকম ভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে রয়েছিলাম, এখন এঁদের কাছে পেয়েও আমি কেন গাড়ির ব্যাক গিয়ার লাগিয়ে পিছিয়ে যাওয়ার মতো যাচ্ছি ? কেন ? কেন পারছি না বাস্তবের এই মিলনানুভূতির সঙ্গে লীন হয়ে যেতে ? জীবনের ছেড়ে আসা বাঁকগুলোর দিকে কেন পিছিয়ে যাচ্ছি ?
বুড়াগোঁসাই থান বলেই এই জায়গাটি প্রসিদ্ধ স্কুলে পড়ার সময় সতীর্থদের সাথে এসেছিলাম থানে নৈবেদ্য অর্পণ করে, সাথে ভোজ খেয়েছিলাম আমাদের মনে বিশ্বাস জন্মেছিল - ‘পরীক্ষার আগে আগে থানে নৈবেদ্য নিবেদন করে না গেলে পরীক্ষার ফলাফল ভালো হবে নাভয় ভক্তি বাড়ায় ঘরে কিছুই না খেয়ে একসাথে সবাই মিলে এসে প্রথমে বুড়াগোঁসাই থানে মাথা ঠেকাই তার পর ঠেলায় আনা হাঁড়িকড়াইগুলো বিলের পারে রাখি ভোজের আয়োজন মনে কী স্ফূর্তি ! আমি বড়ই পলায়নপর গোছের ছিলাম শাক সবজি কেটে দেওয়ার পর আমি কাহিনি শুনিয়ে শুনিয়ে সঙ্গীদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতাম ফলে আমার ভাগে পড়া কাজ থেকে আমি রেহাই পেয়ে যেতাম
পড়ায় ভালো নয় বলে পরিচিত দিলীপ, রঞ্জন, সুনীলরা বলেছিল - চল চল একসাথে খেয়ে নিই আগামীতে আমাদের আবার নতুনদের সাথে আসতে হবে তোরাই যা এগিয়ে যা শুধু বহু উপরে যাওয়ার পর আমাদের দিকে তাকাতে ভুলিস না
কথাগুলো বলে দিলীপ সেদিন কেঁদেছিল সেই কান্না দেখে আমি কাছে চলে গিয়েছিলাম ওকে না কাঁদার জন্য বলেছিলাম -
- তুইও ভালো করে পড়াশোনা কর তো কেন পারবি না ? সবারই মগজ সমান
আমাকে আশ্চর্যান্বিত করে সেদিন দিলীপ বলেছিল - ‘না, না সবার মগজ সমান হলে পৃথিবীতে সব মানুষই সব কাজে সমান পারদর্শী হতো কেউ ভালো লেখক, কেউ বিজ্ঞানী, কেউ বা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যে হয় তারা কেন আলাদা আলাদা হয়ে কাজ করে ? কেন, পাঠ্যবই-এ আমরা পড়েছিলাম না ? আপেলটি গাছ থেকে খসে পড়ার জন্য নিউটন যে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সূত্র বের করেছিলেন ? সেগুলো সেভাবে অন্য মানুষেরা ভাবেনি কেন ? তুইই কথাটি ভেবে দেখ তো - আমার পড়তে ইচ্ছে করে না তখন মাঠে আর বিলটিতে তরতর করতে থাকা মাছগুলি, গোশালার গরুগুলি এসবই মনে আসতে থাকে মাথায় পড়ার কথা একেবারেই আসে না
সেদিন অপলক নেত্রে আমি দিলীপের দিকে তাকিয়েছিলাম এ তো একেবারে গাধাও নয় তার মগজে চিন্তাশক্তিও কিছু আছে কেবল তার নেশা অন্য
- হুঁ পদ্মকর্ণিকা তখন খুব ভালো পেয়েছিলি না ? খা খা বাপু, কত খেতে পারিস লাগলে এক ব্যাদিয়ে পাঠাব ফ্রীজে রেখে রেখে খেতে পারবি
দিলীপ ! আমার তন্ময়তা ভেঙে সে আমার হাতে তুলে দিল পনেরোটির মতো সতেজ পদ্মকর্ণিকা আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম শিশুর সরলতায় ভরা সুগোল ফর্সা মুখটিতে নিস্পাপ হাসি ব্যস্তভাবে সে আমার হাতে  পদ্মকর্ণিকা দিয়ে হুড়মুড় করে বেরিয়ে গেল তার পায়ে হাঁটু পর্যন্ত কাদা বিলে নেমে পদ্মকর্ণিকা আনা কর্দমাক্ত পা দুটি ধোওয়ার জন্য সে জলের কলটির কাছে গেল তার মনের স্ফূর্তি প্রতিটি আচরণে প্রকট হয়ে উঠেছে অথচ আমি ?? আমাদের প্রত্যেকের চোখে মুখে কী যেন এক চিন্তার রেখা আমাদের টাকাপয়সার কোন অভাব নেই বলে সে জানে তথাপি এই ভোজের জন্য আমাদের দিতে চাওয়া সামান্য অবদানও সে নিতে চাইল না এত বছর পর তার সাথে আমরা যে একসঙ্গে একবেলা খেতে আসব, সেটাই তার জন্য নাকি এক বিরাট অবদান মরা অবদান দিলে নাকি তার অক্ষমতাকে মনে করিয়ে দেওয়ার মতোই হবে নিজের ফিশারি থেকেই সে মাছ আনলো জহা চাল, হাঁস, সবজিও সে-ই দিল গ্রামের একমাত্র ডেয়ারিটি থেকে সে মোষের দুধের দইও এনেছে
- আমরা এগোতে পারলাম না পড়ে রইলাম এই গ্রামের জলকাদায় তোমরা নগরের বাসিন্দা হলে আমাদের সঙ্গে মিলেমিশে যে একবেলা খেতে এলে, এটাই আমাদের জন্য পরম প্রাপ্তি
প্রবীণ খুড়া আবার দুই পেগ-এর মতো দিলেন বুঝিবা পেটে কফোঁটা না পড়লে প্রবীণ খুড়া পাম্প বেরিয়ে যাওয়া বেলুনটির মতো হয়ে পড়েন ফোঁটা গলাধঃকরণ করার পর প্রবীণ খুড়া জীবনের অর্থ, বর্ণ বৈষম্য, শিল্প, সমাজ, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সব দিকের কথাকে আখ পেষাই-এর মতো নিংড়ে নিংড়ে রস বের করতে থাকেন
বিজু, বিজয়, প্রকাশ, শ্যামল, বিমানও এসেছে ওরা এখন এক একটা দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিক বিজু অবশ্য ব্যবসা করে মহানগরীর বাসিন্দা হিসেবে এই গ্রুপটিতে কেবল আমিইনারীকেপ্রতিনিধিত্ব করলাম খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেলআসববলে ওরা কথা দিয়েছিল যদিও ঘরোয়া জঞ্জাল থেকে সময়ে মুক্ত হয়ে আসতে পারেনি মৌসুমী এখন লণ্ডনে ওর আসা সম্ভব নয় ঠিক আছে প্রিয়াও দিল্লিতে চাকরির দায়িত্ব ছেড়ে সময়মতো আসতে পারেনি বলেদুঃখপ্রকাশ করে ফোন করেছে বাকি জিন্টির সাথে দেখা করেছিলাম যদিও ও নাকি এন জি ওর কাজে মাজুলি যাবে কিন্তু প্রথমে যোগাযোগ করে যখন বলেছিলাম, আমরা সেই বুড়াগোঁসাই থানে মিলব তখন যে তাদের আনন্দের পারভাঙা আতিশয্য তা ফোনেই বুঝতে পেরেছিলাম আমারও একটি মিটিং আছে আগামী কাল ভোর ছয়টায় ঘর থেকে রওয়ানা হতে হবে কিন্তু মিটিং-এর দোহাই দিয়ে আমি এই সময়টিকে হারাতে চাইছিলাম না আমরা মিলিত হলে হয়তো আমাদের হারানো ছেলেবেলা, হারানো কৈশোর ও যৌবনের প্রারম্ভিক কালটিকে কিছু সময়ের জন্য হলেও ফিরে পাব আমার মনেরই এই অনুভূতি অন্যরা কী বা ভেবেছিল ?
বিজয় বড় নিলাজ হয়ে গেল হাইস্কুল শিক্ষান্ত পরীক্ষা দেওয়ার আগে আগে সে আমার হাতে গুঁজে দিয়েছিল সাদা কাগজের টুকরোটি এভাবেই একদিন ভোজ খেতে মিলিত হয়েছিলাম কাগজের টুকরোটি সে আমার হাতে গুঁজে দিয়ে আর অপেক্ষা করেনি আমাকে কাগজের টুকরো দেওয়া কাজটি বিনীর দৃষ্টিগোচর হলো সে চিলের মতো সোঁত করে এসে আমার দিকে তাকিয়ে বলল - ‘আমাকে পড়তে দে, নাহলে সবাইকে শুনিয়ে দেব
বিনীর ব্ল্যাকমেলিং আমার মনে ক্রিয়া করল ওকে হাতে ধরে পদুমণি বিলের দিকে নিয়ে গেলাম টুকরোটি খুললাম ওহ্ বিজয়কে তখন পর্যন্ত তেমন দৃষ্টিতে না দেখা আমার দেহ-মনে সেই ভালোবাসার শব্দগুলো কী সুড়সুড়ি যে তুলেছিল আশ্চর্য ! সদাই দেখে থাকা বিজয় নয়, চিঠির বাক্যগুলোকেই বারে বারে চেয়ে থাকি, চেয়েই থাকি যেন মনে হচ্ছিল
বিশ্বাসই হচ্ছিল না, সর্বদা লজ্জার বেশ মুখে নিয়ে থাকা বিজয়ই এগুলো লিখেছে ? চিঠি এবং বিজয়ের মধ্যে এক অদ্ভুত বৈসাদৃশ্য দেখতে পেয়েছিলাম তখন আমাকে অবাক করে দিয়ে সে সুযোগ বুঝে জিজ্ঞেস করেছিল - ‘তুমিও আমি ভাবার মতো ভাবছ কি ? কাল থেকে স্কুলের ক্লাস অফ্‌ ! মিলব তো সেই পরীক্ষার সময় এর মধ্যে কোথায় মিলব ? না দেখলে আমি যে থাকতে পারব না
একসাথে পড়া ছাত্র সে তখন পর্যন্ত তার প্রতি আমার কোন ধরনের অনুরাগ আদি ভাব আসেনি ভাবতেও পারি না একসাথে পড়া ছাত্রের সঙ্গে প্রেম ? উঁহু ভালো লাগে না মন বার বার সেই কথাটি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল অবশ্য সে পড়াশোনায় ভালো বলে তাকে সমীহ করতাম শ্রেণীটিতে অন্য মেয়েদের চাইতে আমাকেই এইক্ষেত্রে বেছে নিয়েছিল বলেও কিছু গর্ব বাসা বেঁধেছিল বুঝিবা উঁহু সেদিন আমি বিজয়কে মুখ খুলে কিছু বলতে পারিনি বলেছিলাম - ‘পরে বলবসেই ক্ষণ সেই লগন আর এল না বিজয় চলে গিয়েছিল বাবার সাথে তেজপুর
- ‘যা আগে পাও শীঘ্র করে যাও আজই লগন কে জানে কাল যদি না থাকে জীবন
প্রবীণ খুড়ার কথায় বিজয় হাততালি দিল বিজয়ের অলক্ষিতে আমি ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি রেখেছে চুল ব্যাকব্রাশ করা রোজ জিমে গিয়ে গঠন করা তার শরীরটিকে চমক লাগিয়ে পরেছে পাতলা নীল বর্ণের টি শার্ট ব্ল্যাক জিনস্‌ দুই চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা
বিনী, রাখী, মাতু, পদ্মিনী, মরমীর অনুপস্থিতি বেশি করেই অনুভব করলাম ওরা সংসার নিয়ে ব্যস্ত দূরবর্তী গ্রামে মাতু ও পদ্মিনী থাকে আজকের ইন্টারনেট যুগের ফেসবুক, হোয়াটসএপের সঙ্গে এদের সম্বন্ধ নেই বিনী, রাখী, মরমীরও কি এই ভোজমেলায় আসতে বিশেষ ইচ্ছা হলো না ? না ঘরোয়া বন্ধন ?? ওরা কি এক অর্থে সময়ের হিসেবে চলতে থাকাপ্র্যাক্টিকেল উওমেননাকি ? আমিই শুধু কাজে অকাজে আবেদনময়ী অতীতের দোলনায় উঠে দুলতে থাকা আবেগসর্বস্ব নারী নাকি ??
- হেই ! What happened ? ইয়ার, এত বছর পর মিলেছি হাসতে হয় কথা বলতে হয় বৃষ্টিভেজা আড়ষ্ট শালিকটির মতো আছো কেন ?
বিজয় বিজয়ের কথায় আমি ওর দিকে তাকিয়ে হাসলাম সময় পরিবেশকে বদলে দেয় পরিবেশ বদলে দেয় মানুষের চিন্তা, ধ্যান-ধারণা বিজয়ের মধ্যেও কত যে পরিবর্তন এল একটুও সংকোচ না করে সে আমার কাছেই বসে পড়ল আমার হাতটি তার হাতে তুলে নিল মনে করিয়ে দিল সেই তখনের চিঠিটির কথা এখন কি সেই চিঠির প্রাসঙ্গিকতা আছে ? বিজয়ও সংসারী হলো আর আমিও ……
- ‘সেই প্রশ্নের উত্তরের মেয়াদ পার হয়ে গেছে
কথাটি বিজয়ের দিকে না তাকিয়েই ধীরে বললাম
- হু হু আড্ডা পরেও মারবি তো এটা আমার ফিশারির চিতল মাছ খেয়ে দেখ
পদ্মপাতায় করে চিতল মাছের ভাজা পেটি কয়েক টুকরা এনে দিলীপ আমাদের হাতে দিয়ে আবার হুড়মুড় করে চলে গেল দিলীপের এই বালসুলভ আচরণে আমার দৃষ্টি আবার ক্ষণিকের জন্য কেড়ে নিল মনে যে তার কত ফুর্তি
আমরা এখানে সমবেত হয়েছি যান্ত্রিক ব্যস্ততার কোলাহল থেকে দূরে কিছুক্ষণের জন্য এককালের সতীর্থের সঙ্গে হাসিফুর্তি করব পুরোনো দিনকে স্মরণ করব এ ওর পেছনে লাগব সাময়িক অসন্তুষ্টিগুলো মনে করব স্কুলের গতানুগতিক পাঠ আহরণের অন্তে বার্ষিক পরীক্ষার আগে আগে শ্রেণীর সব ছাত্রছাত্রী বুড়াগোঁসাই থানে এসেছিলাম থানে ধূপ নৈবেদ্য দিয়ে প্রার্থনা করে ভোজ খেয়েছিলাম হাইস্কুল শিক্ষান্ত বর্ষের পর থেকেই কেউ কাউকে পেলাম না নিজের নিজের পড়াশোনা, কর্মব্যস্ততা, সংসারের ব্যস্ততা আমাদের অনুভূতিকে চেপে রেখেছিল
ফেসবুক, হোয়াটসএপের কুপ্রভাবকে যতই গালি দিই না কেন, আমাদের পুরোনো বন্ধু-বান্ধবীকে এখানে সমবেত করানোর মূলে ফেসবুক আর হোয়াটসএপ এ ওর সন্ধান করে একটি গ্রুপ সৃষ্টি করলাম সুখ দুঃখের কথা পাতার শেষে ঠিক করলাম আমরা সবাই মিলব তখনকার দিনের একসাথে ভোজভাত খাওয়া বুঢ়াগোঁসাই থানের প্রাঙ্গণে
কথামতোই কাজ মিলিত হলাম অসম এবং ভারতেরও বাইরে থাকা বন্ধুদেরও খবর দিলাম লণ্ডন ও জাপানে থাকা রুবুল ও মৃগাঙ্ক দুঃখ প্রকাশ করল ওরা এলে আবার মিলব বলে বললাম
আমরা প্রবাসীরা গ্রামেই থেকে যাওয়া বন্ধুদের সহযোগে কিছু একটা করারও সংকল্প করলাম দিলীপ এবং ভবেন, মন্টুর কত যে উৎসাহ ঠিক হলো একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী গঠন করা হোক দিলীপদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ রেখে চলব ওরা কাজগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবে
প্রথমবারের জন্য স্কুলটির খেলার মাঠে আমরা একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলাম গান ও নাচের প্রতিযোগিতা হলো ছবি আঁকা, খেলাধুলা, বিভিন্ন প্রতিযোগিতাও হলো গ্রামের ছেলে-মেয়েরা সত্যিই সাংস্কৃতিক দিশায় অনেকখানি এগিয়ে গেছে পুরস্কারপ্রাপ্ত ছেলে-মেয়েরা মা-বাবাদের সঙ্গে এল চুকচুক করে ওরা আমাদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করল গর্বিত হাসিতে কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা মা-বাবারা বলেন -
- আমি অমুকের পুত্রবধু তো আমি অমুকের মেয়ের দিকের নাতি তো আপনাদের কথা প্রায়ই আলোচনা হয় আমাদের বাবা, খুড়ারা বলে থাকেন ছেলে-মেয়েদেরও বলে - যে বড় হলে আপনাদের মতো ……
- না না শেষের কথাগুলো না শোনার ভান করি অন্য দিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিই গ্রামের এই সহজ সরল আবদারে আজকাল খুব মনোঃকষ্ট দেয় কর্মব্যস্ততা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার সিঁড়িতে উঠে যেতে থাকার অহরহ প্রচেষ্টায় থাকা মন-মগজে আঘাত লাগে এই আবদারের এভাবে ভালোবেসে প্রতিদান দিতে সময় এসে বাধা দেয় দোষী দোষী লাগে নিজেকে আহত মনটিকে আবার প্রবোধ দিই যে কাজ আমি করছি, যার জন্য আমার সময়ের অভাব, এও কি সামাজিক অবদান নয় ? সেই অবদানের জন্যই কি এই অমলিন আদর নয় ?
আগের সেই বুড়াগোঁসাই থানের পরিবেশ দেখতে চেয়েও হতাশ হলাম এও সময়ের প্রগতির পরশ কিন্তু আমার মতো আবেগবিহ্বল একজন আবার এই কথা বারম্বার মেনে নিয়েও অতীতের আবেচেয়ে বিষাদের দীর্ঘশ্বাস ফেলছে রাজপথটির তেমাথাটিকে ভাগ করেছে একটি প্রকাণ্ড বট গাছ তেমাথা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ঢুকে যাওয়া মেঠো রাস্তাটি ধরে প্রায় দেড় কিলোমিটার আসতে হয় মাঠের এক মাথায় নীরবতাকে আরো সরব করে রেখেছে বুড়াগোঁসাই থান থানটি পর্যন্ত আসতে ভেতরের রাস্তার দুদিকে বিস্তীর্ণ প্রান্তর কচুরিপানার ডোবা বিল, জলাশয়ে ভরা শীতের দিনে পায়ে ধূলির রঙ খেলে খেলে আমরা পেয়েছিলাম অনির্বচনীয় আনন্দ থানটির চৌপাশ প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড তেঁতুল আর আম গাছে ভরে আছে
জায়গাটিতে এলেই কিছু একটা অদৃশ্য শক্তির অস্তিত্বের অনুভব ভক্তিতে বিগলিত করে রাখত এখন সেই নির্জনতা নেই শীতের দিনে এখানে পিকনিক পার্টির ধুম ওঠে আইস্ক্রিম, আঙ্কল চিপস্‌, পানিপুরির দোকানও হলো
ঢুকে আসা পথটির দুদিকে থাকা কচুরিপানা ডোবার সুশোভিত ফুলগুলি নেই সেখানে পড়ে রয়েছিল ঝাঁক ঝাঁক বক আর কাণিবক, কালিম পাখি কোনও একজন মন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট হওয়া ভূমিহীনকে এই জায়গায় সংস্থাপন করা হলো মন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট সবাই কচুরিপানা ডোবার উপর গড়ে তুলেছে একটি গ্রাম আদর্শ গ্রাম
- ‘পুরোনো দিন বিরক্ত করছে কি ? তুমি একই আছো মধুছন্দা
বিজয় ঘুরে এসে আবার আমার কাছেই বসে পড়ল এখন ফাঁকি দিই কী করে ? আমার হাতে বিজয়ের গুঁজে দেওয়া সেই কাগজের টুকরোটি …… ? আশ্চর্য এক সময় বিজয়ের দিকে বিশেষ প্রেমের দৃষ্টিতে দেখতে না চাওয়া আমি আজ বিজয়ের কথাবার্তায় মুগ্ধ হতে শুরু করেছি নাকি ? বিজয়ের বর্তমানের চালচলন, স্ট্যাটাস্‌, শারীরিক গঠন এই সব কিছু মিলে কেন তার প্রতি য়ামার দৃষ্টি কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে ?
- ‘আমি জানি তুমি ভাবুক প্রকৃতির এর জন্যই তো তুমি লিখতে পারো মানুষের দুঃখ যন্ত্রণা এও জানি, তুমি আমাদের সেই মুহূর্তটিকে স্মরণ করছ Infact আমার কথাও ভাবছ am I right ?’
? কী আশ্চর্য ! বিজয়ের শেষ বাক্যটি শুনে লজ্জিত হলাম মানুষের মনের কথা পড়তে পারি বলে নাম থাকা আমার অহমিকাকে সে নাড়া দিয়ে গেল অথচ তার বিপরীতে বিজয়ের এই চাতুর্যে আমি অভিভূতও হয়ে পড়লাম কিন্তু তাকে জয়ী হতে দিতে পারি না তাই নিজেকে সংযত করে বললাম - তোমার কথা ভাবার কী আছে ? আমি ভাবছি পরিবেশ কী করে বদলে যায়, ঠিক না ??
- ‘যেভাবে এই মুহূর্তে তুমি সুর বদলে ফেললে মধুছন্দা
বিজয়ের প্রতি হঠাৎ একরাশ ক্রোধ উঠে এল বিজয় নিজেকে কী বলে ভাবছে ?? কিন্তু সে যা বলছে তা কি মিথ্যা ?? তাহলেও সহজে ধরা দিলে আমার দুর্বলতা প্রকাশ পাবে, যা আমি কোনভাবেই হতে দিতে পারি না আমার সামনে
- ‘বাবার সাথে চলে যাওয়ার পর মাঝে মাঝে তোমার খবর নিতাম দিল্লিতে পড়তে চলে গেলে সেদিন আমার হৃদয় হাহাকার করে উঠেছিল যেদিন খবর পেলাম তোমার বিয়ে হয়ে গেছে শিক্ষা অর্ধসমাপ্ত রেখে চলে এলাম কিন্তু কেন এলাম ?? পরে প্রশ্ন করেছিলাম অনেক ঝড় বয়ে গেল তোমাকে বলতে ইচ্ছে করে জানতে ইচ্ছে করে কেমন আছো তুমি কি সুখী ??’
- ‘অ্যাই, পুরোনো কথাগুলোকে রোমন্থন করতে হবে না আয় আয় ভাত খাওয়ার হলো
দিলীপ স্বভাবজাত আচরণ তার দূর থেকেই সে চিৎকার করতে করতে কাছে চলে এল আমার হাতটিকে খামচে ধরে বসা থেকে উঠিয়ে দিল দিলীপের এমন শিশুসুলভ আবদারের জন্যই কিজানি সুখানুভূতির এক স্রোত উজিয়ে এসে আমার গলায় ধাক্কা দিতে থাকল মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমি দিলীপকে অনুসরণ করলাম বিজয় আমাকে অনুসরণ করল
বিজয়ের শেষের কথাটি আমার মোমের মতো জমাট বাঁধতে থাকা অনুভূতিতে অগ্নিশিখার মতো কাজ করল এত বছরের মাথায় আমার মজবুত মনটিতে আবার এক ঝাঁক কীসের তুফান ?
হাসি ঠাট্টার মধ্যে ভোজ ভাত খাওয়া শেষ হলো আমরা যে একজোট হলাম, এই জোটকে কীভাবে স্থায়ী করতে পারা যাবে ?? এই নিয়ে একটি আলোচনার জন্য সবাই বসলাম প্রকাণ্ড তেঁতুলগাছটির নীচে
প্রত্যেকেই নিজ নিজ অভিমত ব্যক্ত করেছে এমনিতে দেখাদেখি হওয়ার যেহেতু কারো সময় নেই সেজন্য আমাদের দ্বারা সদ্যগঠিত সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সৌজন্যে ছমাস বছরে কিছু একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে গ্রামের ছেলে-মেয়েরাও সাংস্কৃতিক কার্যসূচিতে অংশ নিতে পারবে দূরে থাকা আমরাও এই অছিলায় সমবেত হবো মনের আনন্দ বিনিময় করব গ্রামটিকে যে ভুলে যাইনি, এই প্রমাণও গ্রামবাসীকে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও আত্মা পরিতৃপ্ত হবে
আমার মনে পড়ছে এক কালের প্রাণোচ্ছল মমীটির কথা মমীর নাকি স্বামীবিয়োগ হলো তিনটি ছেলে মেয়ে নিয়ে চলছে মমীর জীবন সংগ্রাম কাছেই আছি তথাপি ওর একটি খবর নেওয়ার সময় বের করতে পারিনি কী যে হয়ে যাচ্ছি দুই তিনদিন থাকব বলেও থাকতে পারি না অনেক কাজ পড়ে আছে
- গ্রাম ও শহরের মধ্যে একটি অবচ্ছিন্ন আবেগের সাঁকো আমাদেরই নির্মাণ করতে হবে সবাই নগরমুখী হলে গ্রামে থাকবে কে ? সবাই চাকুরীমুখী হলে খেতখামার দেখবে কে ? পথের পাশে আজ চটকদার রেস্তোঁরা, ধাবা, দোকান গড়ে উঠেছে মাঠজমি কমে আসছে এভাবে চললে আমাদের কৃষিজমি নাই হয়ে যাবে কথাগুলো ভাবার সময় হলো অন্যরা করুক বা না করুক আমাদের এই সম্মিলিত জোটের দ্বারাই আমাদের কিছু কাজ হাতে নেওয়ার সময় সমাগত আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীকে সহায়তা করা, বৃদ্ধজনকে আশ্রয় দেওয়া, অর্থাভাবে রোগযন্ত্রণাকে মেনে নেওয়াজনের প্রতিও আমাদের করণীয় আছে
আরো কীসব বললাম বসে পড়লাম সবাই হাততালি দিল প্রবীণ খুড়াকে চোখের জল মুছতে দেখলাম আমি আবার এক যন্ত্রণায় ভুগতে লেগেছি যেটুকু কথা বললাম, এই যে গ্রামে থেকে যাওয়া দিলীপ, ভবেনদের দুই চোখে আশার স্বপন ছিটালাম, এখান থেকে গিয়ে আমি এই অনুষ্ঠানটির উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, সংরক্ষণ ও সংবর্ধনের জন্যই লেগে যেতে পারব কি ? অথচ মনে এমন একটি কাজ করার প্রবল ইচ্ছা বিজয়, প্রকাশ, বিজুরা সহযোগ করবে তো ? এসব কাজে অর্থেরও অনেক প্রয়োজন আছে রাজনৈতিক নেত্রীর মতো এভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে, মনে শঙ্কাবোধেও ভুগলাম কথাগুলো বলার সময় দিলীপ, ভবেন, প্রবীণ খুড়ারা যেভাবে তন্ময় হয়ে শুনছিলেন তার বিপরীতে বিজু বারে বারে ফোনে কথা বলার জন্য উঠে যাচ্ছিল প্রকাশ উদ্বিগ্নতায় হাতঘড়ির দিকে দেখছিল
বেচারা দিলীপ খেতের, ঘরের সব কাজ বাদ দিয়ে আমাদের সঙ্গে একত্রে এক বেলা খাওয়ার আশায় সে একাই করেছে এই আয়োজন অথচ প্রকাশ এবং বিজয়দের তুলনায় ওকে আর্থিক ভাবে সবলও বলতে পারি না তার আকালও নেই, আগারও নেই কিন্তু আছে একটি ভালোবাসা ও মহানতার আগার যা আমাদের কাছে আকাল নিজেকে দোষী দোষী মনে হলো দিলীপ যে আন্তরিকতা দেখিয়েছে, তার পরিণামে হয়তো সে মহানগরীতে গেলে, আমাদের কথা বলারও সময়ের অভাব হবে
বিজু উঠলো তার যেতে হবে ছেলেটির অসুখ পত্নী ফোন করেছে কথাটি বলেই সে চিন্তাক্লিষ্ট মুখাবয়ব নিয়ে উঠে গেল প্রকাশও বেশি সময় থাকতে পারলো না কাল প্রধানমন্ত্রী আসবেন জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক আধিকারিক সে দায়িত্ব ভারী সেও চলে গেল হুড়মুড় করে আমারও কাল একটি সভা আছে তাড়াতাড়ি যেতে হয় বলব বলব বলেও কথাটি বলতে পারিনি অথচ পরিবেশের সঙ্গে ধীরে ধীরে খাপ খাওয়াতেও অপারগ হয়ে পড়ছি
সেই কবেকার নিরঙ্কুশ, চিন্তাবিহীন, দায়িত্ববিহীন দিনগুলো সামনে এসে দাঁড়ালো সঙ্গ পেলে যে খাওয়ার কথাই ভুলে যেতাম ঘরের কথাও মনে আসত না ডুবন্ত বেলার আকাশটিকে দেখে অনামী বিষণ্ণতায় ভুগেছিলাম - ‘এত তাড়াতাড়ি কেন সন্ধ্যা হয় ? সঙ্গীদের থেকে যে বিচ্ছিন্ন হতে হয় ?’
যে উদ্যম নিয়ে সমবেত হয়েছিলাম সময় সংকেতে দায়িত্ববোধ সবকিছুকে যেন স্পন্দনহীন করে তুলেছে সময়কে প্রত্যাহ্বান জানিয়ে জোর করে কিছু একটা অন্বেষণ করে এক অবুঝ অস্থিরতায় ছটফট করতে থাকলাম
প্রবীণ খুড়া কিছু একটা বলার জন্য দাঁড়িয়েছেন দিলীপ, খুড়ার দুই কাঁধে ধরে বসিয়ে দিয়েছে
- শেষে বলবেন খুড়া, আপনি শেষে বলবেন
দিলীপের সমাদরসিক্ত দাবি
কালকের সভায় আমি কী বলব ভাষণে … ? একজন প্রখ্যাত গীতিকার, সমাজসেবকের স্মরণসভা বলতে হবে, তিনি মানুষের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে দেওয়ার কথা বলতে হবে জনগণের জন্য তিনি নিজের ঘর সংসারও ত্যাগ করার
- আমি জানি, তোরা সবাই ব্যস্ত এক এক জন প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক আধিকারিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর, ব্যবসায়ী, লেখক সময়ের মূল্য অনেক তোরা চলে গেলি শহরে আমরা পড়ে রইলাম গ্রামে আমাদের মতো কাদায় লুটোপুটি করে থাকাদের দিকে তোরা ফিরেই তাকাবি না বলে ভেবে কখনও দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছিলাম আজ আমি নিজেকে ধন্য মানছি রে এত বড় মানুষ হয়েও আমাদের মতো কৃষকদের পাশে এসে এভাবে একসাথে ……
হু হু করে কেঁদে উঠল দিলীপ সে আরো কিছু বলতে চাইছে, পারছে না উথলে ওঠা শোক চেপে ধরতে চেয়ে সে কিছুটা সরে গিয়ে নাকের জল টেনে এল গামছা দিয়ে দুই চোখ মুছলো
- ভুল হলে ক্ষমা করবি এভাবে দশজনের সামনে কথা বলিনি কখনো না বললেও বড় অশান্তিতে থাকব এভাবেই, ঠিক এভাবেই আমাদের মধ্যে আসবি ছেলে-মেয়েদের গৌরবের সাথে বলছি - দেখ দেখ দেখেছিস ? ওরা আমার বন্ধু শহরে থাকে বড় মানুষ হয়েও গ্রামের সাথে কীভাবে আপন ভাব রেখেছে দেখ তোরাও এমনই হবে ছেলে মেয়েরা আজকাল গ্রামকে ভালো না বাসা হয়েছে এমন হলে গ্রামে বিদেশি এসে থিতু হবে
আমি সব খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করব তোদের কিছু আনতে হবে না শুধু একবার কথাবার্তা বলতে আসবি
দিলীপ আবার ফুঁপিয়ে উঠলো আমি দিলীপের দুই কাঁধে ধরে বসিয়ে দিলাম শ্চর্য ! সে হঠাৎ আমার কাঁধে তার মাথাটি রেখে আবার সশব্দে কেঁদে ফেললো এবার বিজয় দিলীপকে আমার কাঁধ থেকে স্নেহের পরশে সরিয়ে নিল সুযোগ বুঝে বিজয় আমার হাতটি খামচে ধরল বলব - বলব না বলে ভাবা কথাটি তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল
আজও তোমার উত্তরের অপেক্ষায় আমার ডিভোর্স হয়েছে বহু কাহিনি কখনো বলব আমি তোমাকে আজও
মুখ ফুটে আমি বিজয়কে কিছু বলতে পারিনি পঁচিশ বছর আগে যে আবেগটি ছিল না আজ পঁচিশ বছর পর হঠাৎ বিজয়ের প্রতি আমার
- “সারা জীবন নাটক করলাম সত্য জীবন কী ? আজও ভেবেই দেখলাম না ভ্রাম্যমাণের মঞ্চে অভিনয় করে বহু জায়গা ভ্রমণ করলাম তথাকথিত গ্ল্যামারিস্ট হইনি আক্ষেপ নেই নাটক ভালোবাসি গ্রাম ভালোবাসি গ্রামের মানুষ ভালোবাসি গ্রামটি আমাকে স্নেহ দিয়েছে আজও আমার অভিনয় উপভোগ করে আমার মৃত্যুতে এক একটি ফুল আমার মৃতদেহে দেওয়ার জন্য এঅঞ্চলের মানুষই যথেষ্ট আজকের এই ব্যস্ত পৃথিবীতে কার এত সময় থাকে ? আমাদেরই নয়, গ্ল্যামারিস্ট আর্টিস্টদেরও যে স্মরণ করে থাকে দুদিনের জন্যই তো বছর বছর কোন ভাগ্যবানের স্মৃতি দিবস পাতে - যেন শহর থেকে তোমরা আসবে আমার স্মরণসভায় বলবে - ইস, সেই খুড়াজন ছিলেন অমুক কথা বলেছিলেন, তমুক কথা বলে রঙ্গ করেছিলেন আজ আর তিনি নেই
জ্যেষ্ঠ হিসাবে একটাই অনুরোধ - হে আমার শহর-নগরবাসী অনুজরা তোমরা মিলে এই গ্রামটিকে উজ্জ্বল করে রেখো ভুলবে না এই মাতাল খুড়াটিকে আমি তো এখন সেই অস্তমিত বেলাটির মতো এই যাই, এই ডুবছি আমিমি
কান্নায় ভেঙে পড়েছেন প্রবীণ খুড়া শিশুর সাথে শিশু হতে পারা, যুবকের সাথে যুবকের মতো হয়ে পড়া, সঙ্গীসাথিদেরও সাথে সদাহাস্যময় হয়ে থাকা খুড়ার এমন ক্রন্দনরত অবস্থা আমাদের সবাইকে মূক করে ফেললো পরিবেশ গহিন হয়ে পড়ল
পশ্চিমাকাশে সূর্যের আর কিছু অংশ ডুবতে বাকি গো-রাস্তায় এক ঝাঁক গরু নিয়ে রাখালেরা যাচ্ছে বহুদিন পর এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলাম
সবারই ভিন্নদিশায় যাওয়ারও সময় হলো প্রবীণ খুড়া চোখের জল মুছে নিলেন আমাকে কাছে ডাকলেন কিছুটা দূরে নিয়ে গিয়ে এদিক ওদিক তাকালেন কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন -
- ‘কেমন পেলে ? তোমাদের এই প্রীতি অটুট রাখতে আমি একটু আবার জীবনের রঙ্গমঞ্চে ট্র্যাজেডিরডায়লগগাইলাম
ফিক করে হেসে প্রবীণ খুড়া আমার দিকে তাকালেন আমি চেয়ে রইলাম স্তম্ভিত নেত্রে প্রবীণ খুড়ার দিকে প্রবীণ খুড়ার দুই চোখের কোণে তখনও দুই ফোঁটা অশ্রু জ্বলজ্বল করছিল আমার মাথায় হাত রেখে বললেন - ‘এগিয়ে যাও
আমি দোদুল্যমান খুড়ার কোনটি সত্য রূপ ? কিন্তু যে রূপেই না থাকুন খুড়ার অমলিন মনের প্রতিফলনই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়ভালো থাকুন প্রবীণ খুড়া সতত চিরতরুণ হয়ে থাকুনমুখ ফুটে কথাটি বললাম না মনে মনে বিড়বিড় করতে থাকলাম
ঘরে আসতে উদগ্রীব হয়ে থাকা আমার দুপায়ের পদক্ষেপ ধীর হয়ে এল প্রবীণ খুড়ার সেই কান্নায় ভেঙে পড়া মুহূর্তটি দিলীপের অন্তরের আকুতি আর আমি ? আমি কি অভিনয়ই করেছি নাকি ?
সময় সময় আমাদের অনেক দিয়েছে আর বহু দুর্লভ অনুভূতি কেড়ে নিয়ে গেছে আমার সাথে সাথে বিজয় আসতে থাকলো বিজয় কিছু বলছে শুনছি কিন্তু মনে থাকছে না আঁধার নেমেছে, একটি ছোট রাস্তা মেঠো - বন্ধুর সেই পথেই আমাদের গাড়ি এগিয়ে গেল বিজয়ের আবেগবিহ্বল কথাটি গ্রামের ক্রমশঃ আঁধারজড়িত ছবিটি অনুভূতির বাইরে, হাজার প্রচেষ্টাতেও সেই কৈশোরের রঙ্গতামাশাকে পুনঃ ঘুরিয়ে আনতে না পারার ব্যর্থতা দিলীপদের অকপট আন্তরিকতা ? আমি যা হতে চাই, যা করতে চাই ঠিক সেভাবে করতে না পারা দুঃখবোধ ওহ্কোনটির প্রতিক্রিয়া ? কোথায় হারিয়ে গেল হৃদয়ের খেই ???

মূল অসমিয়া গল্প - সময় - রুমী লস্কর বরা

বাংলা অনুবাদ - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...