Skip to main content

অমোঘ শব্দ আর অনাবিল অনুভূতির সমাহার ‘কিছু শব্দ কিছু অনুভূতি’


কিছু শব্দ কিছু অনুভূতি বলতে গেলে পুরো গ্রন্থ জুড়ে শব্দের হাত ধরেই অনুভূতিরা খেলা করে বেড়িয়েছে আপন ছন্দে অনুভূতি - এক থেকে অনেক আপনজনের বিয়োগ ব্যথায় একজন কবির কলম থেকে বোধ করি বেরিয়ে আসে তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতাসমূহ বিয়োগাত্মক দিশাতেই কবিতার স্ফুরণ ও বুনন বোধ করি সর্বোৎকৃষ্ট পক্ষান্তরে এভাবেও তাই বলা যায় - কবিতা হলো প্রকৃতই দুঃখের সাথি, একাকী বেলার মরমি সাহচর্য
মধ্য অসমের লংকা শহরের বাসিন্দা কবি মনোজকান্তি ধর-এর সম্প্রতি প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থকিছু শব্দ কিছু অনুভূতিও তারই এক জ্বলন্ত নিদর্শন কবির এই দুঃসহ জীবনের পারিপার্শ্বিকতা এবং সার্বিক কাব্যপরিচিতি নিখাদ বয়ানে ফুটে উঠেছে একই শহরের খ্যাতনামা কবি, সাহিত্যিক রতীশ দাস-এর ‘অভিপ্রায় এবং অনুরোধ’ শীর্ষক ভূমিকায় - যেখানে তিনি লিখছেন ‘বই কবিতার; হাতড়ে কিছু বলতে গেলে কতটাই বা বলা যায় আর; বিশেষত পাঠক ভেদে কবিতার মাত্রাতেই ঘটে কত যে সংযোজন-বিয়োজন, তবে কবিতা সম্পর্কে ব্যক্তি বিশেষের আপন হার্দিক অনুভব যথেষ্ট মানে রাখে, তাই বলার চেয়ে কবিতার অধরা মাধুরী হৃদয়ে বয়ে চলাটা কম কথা নয়।......
অনুজপ্রতিম মনোজকান্তি ধরের প্রথম বই - কিছু শব্দ কিছু অনুভূতিমনোজকান্তি ধর আসলে গল্প লেখার মানুষ কিন্তু সহধর্মিণী সম্পার অকাল বিয়োগ-ব্যথা তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে ঘোর শোকসম্পৃক্ত কিছু বিষাদ-লেখা। পঙক্তিনিচয় বিষাদ-গাথার আদলে গাঁথা - কুয়াশাচ্ছন্ন বেদনাবিধুর শিশিরধোয়া ফুলের মালা; সহধর্মিণী স্মরণে স্বভাবতই এদের এমনই হওয়ার কথা, তবে সব কবিতা একই পর্যায়ভুক্ত নয়, হৃদয়গ্রাহী আবেগ-অনুভূতির বিভিন্নতা রয়েছে বহু কবিতায় ......।’
‘আমার কথা’ শিরোনামে গ্রন্থের শ্রীগণেশে কবিও লিখছেন - ‘কিছু শব্দরাজি মনের অগোচরে খেলা করে। এই অবিরত খেলায় সৃষ্টি হয় নানা অনুভূতির। খেলা চলে মনের ভিতরে ও বাহিরে। এই চিরন্তন খেলার বাহ্যিক প্রকাশ ঘটে কবিতার আদলে কিছু পঙক্তির সৃষ্টি করে। আবার কিছু হারিয়ে যায় ফেনিল বুদবুদের মতো......।’
এবং এই ভূমিকারই সূত্র ধরে প্রথম কবিতায় একাধারে প্রকাশিত হয় বিয়োগ-ব্যথা, শব্দের কারিকুরি আর অনুভূতির চলমানতা -
ছিলে তুমি সন্ধ্যা প্রদীপ,
সাঁঝের তারা আজ। ...
ভয় ছিল পুড়ে যাবার
তবুও পুড়ল শরীর যন্ত্রণার চিতাকাঠে;
এখন,
উড়ছে ছাই রেণু রেণু
অমোঘ বাতাসে। ...
(কবিতা - কিছু শব্দ কিছু অনুভূতি)
এভাবেই ৭০ পৃষ্ঠার এই কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ৬০ টি কবিতার প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে কবি মনের অমোঘ বাতাসে ছাই রেণু উড়ে উড়ে লিপিবদ্ধ হয়েছে একের পর এক কবিতা -
স্বপ্ন-মোড়ক খুলে বসি চৈতালি রাতে,
খেলা করি,
স্বপ্ন-খেলা -
তোমারই সাথে।
নীল আকাশ পেরিয়ে, ওপারে
ঠিক তোমারই ঠিকানায় - যাই ভেসে,
ভেসে যাই অপরূপ দ্যুতিভরা দুপুর দ্যুলোকে,
দিব্য প্রাচীন একা আমি কতযুগ ধরে।
 
নাবাল বেয়ে নেমে আসে নির্বিণ্ণ আঁধার;
তারাগুলি মিটিমিটি, খেলাভাঙা হাট,
উবে যায় স্বপ্ন-মোড়ক কোথা কোনখানে,
আমি একা ভেসে রই অতল গহ্বরে। ......
(কবিতা - স্বপ্ন-বিভীষিকা)
এভাবেই প্রিয়তমার বিয়োগ-ব্যথা কবিতার অঙ্গে অঙ্গে মূর্ত হয়ে পৌঁছে যায় পাঠকের অন্তরমহলে। যাথার্থ্যে, যথাযোগ্য মর্যাদায়। এই পর্বে কবির কবিতা পুরোমাত্রায় গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে শব্দে, শৃঙ্খলায়, অনুভবে, বয়ানে, একমাত্রিক অনুভূতির শৈল্পিক বহুমাত্রিকতায়।
পরবর্তী পর্বে কবি নিজেকে ভুলতেই হয়তোবা ফিরে গেছেন আপন বিশ্বে আপন অনুভবের ডালি সাজিয়ে কবিতায় কবিতায়। তাই হয়তো কবি লিখছেন -
এবার সরে দাঁড়াবার সময়।
সব কিছু থেকে সরে, দূরে, অনেক দূরে।
পরিচিতিহীন এক নির্ভেজাল জীবনের খোঁজে......,
এটাই এখন আমার একান্ত কামনা। ...
(কবিতা - সময়)
আশায়, ভালোবাসায় কবি বাস্তবকে ছুঁয়ে দেখেছেন বহু কবিতায়। অনেক কবিতায় মেলে ধরেছেন তাঁর একান্ত আপন ফেলে আসা দিনের অনুভবের স্মৃতিচারণায় -
আমি একদিন ছোটো ছিলাম, অ-নে-ক ছোটো।
চোখের সামনে খেলার মাঠ, অধিকার বড় ছেলেদের,
আমার সেখানে প্রবেশ নিষেধ।
তারপর
একে একে হারিয়েছি সোনালি রোদের ঝাঁঝ,
আর আমি,
আমিও হারিয়ে যাই সময় প্রবাহে।...
(কবিতা - আমি একদিন)
কবিতার হাত ধরে কবি মেলে ধরেছেন নিজেকে শেকড়ের স্মৃতিসম্বলিত অতীত থেকে বর্তমানের যাত্রাপথে, জলছবি, নদীকথা, ছায়ামেঘ, শীতঘুম... সঙ্গে নিয়ে। সমাপনে বোধ করি শেষ শ্রদ্ধাত আবার ফিরে আসে প্রথমের নৈরাশ্য - ‘আবার যখন দেখা হবে’ -
এক সাথে পা ফেলে হেঁটেছি অনেক পথ, ...
তারপর এক দুরন্ত ঝড়।
তীব্র আর্তনাদে
থেমে গেছে স্বপ্নের গতি।
এখন হারিয়েছি দিশা;
এতদিন কাছে থেকে যে দেখিয়েছে পথ
সেও হারিয়ে গেছে অচেনা পথের বাঁকে। ......
আমিনুর রহমানের মানানসই প্রচ্ছদযুক্ত গ্রন্থটি স্বভাবতই কবি উৎসর্গ করেছেন তাঁর সহধর্মিণী প্রয়াত সম্পা ধরের স্মৃতির উদ্দেশে। পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি কাগজ, ছাপাই ও শব্দ বিন্যাসের সৌজন্যে আনন্দ প্রিন্টিং, নগাঁও। আধুনিক বানান অনুসরণ করা হয়েছে সার্বিক ভাবে। তবু কিছু প্রচলিত শব্দেরও বানান ভুল রয়ে গেছে। একই শিরোনামের দু’টি করে কবিতা রয়েছে - কিছু শব্দ কিছু অনুভূতি এবং ‘জীবন’। ভিন্ন শিরোনাম হতেই পারত। প্রায় প্রতিটি কবিতার প্রতিটি পঙক্তিশেষে যতিচিহ্নের ব্যবহার বাহুল্য মনে হয়েছে। সব মিলিয়ে কিছু অমোঘ, অনাবিল শব্দের সমাহারে এক ঘোর লাগা কাব্য সংকলন হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি পাঠকের দরবারে সমাদৃত হবে নিশ্চিতই।

- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

কিছু শব্দ কিছু অনুভূতি
মনোজকান্তি ধর
মূল্য - ১৮০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৮২২৪৬৪৬২৩

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...