‘শব্দমুখর ঘাটলা’
আক্ষরিক অর্থেই এক শব্দমুখর কাব্যগ্রন্থ। শব্দের কারিকুরি, শব্দের সশব্দ অনুরণন
ছড়িয়ে আছে গ্রন্থ জুড়ে প্রখর মহিমায়, জীবন্ত উল্লাসে। কবি খোকন সাহা (অগ্রজ)-এর কাব্যগ্রন্থ ‘শব্দমুখর ঘাটলা’ এক মিশ্র ভাবের কাব্য সংকলন। পাকা বাঁধাইয়ের দুই মলাটের ভিতর মোট ১২৮ পৃষ্ঠার মধ্যে সংকলিত
হয়েছে ১০৬ টি কবিতা। বিস্তৃত
অবয়ব সব কবিতার। হ্রস্ব থেকে দীর্ঘ সব কবিতায়
ধরা রয়েছে জীবনবোধ আর অনুভব, অনুভূতির বিচিত্র প্রকাশ। কোনও এক বিষয়ের মধ্যে ফেলা যাবে না
কিছুতেই। বিস্তৃত ভাবনার কাব্যিক প্রকাশ
এক একটি কবিতায়। স্বতন্ত্র বোধে গ্রথিত শাব্দিক
নান্দনিকতা।
ভূমিকাতেই শুরু এই নান্দনিকতা। কবিতায় ধরা আছে ‘কবিকথা’। কবিতার শরীর বেয়ে কবির প্রবহমানতার কথা। শব্দের কুহকজালে এই অনাদি অনন্ত প্রবহমানতা এতটাই প্রকট যে ইচ্ছে হয় সবগুলি কবিতা তুলে দিই পাঠকের দরবারে। সেই পরিসর নেই বলেই কিছু শব্দমুগ্ধ পঙক্তি ধরে রাখা যাক বিমুগ্ধতায় -
রক্তগাছের কোটর চিরে
শেষবারের মতো সূর্য যখন দুরন্ত চিতায়...,
আমি তার ধাবিত সকাল, পাষাণী বিকেলের মুখ ঘষে
এঁকে দিই গিরগিটি আকাশ।
পঞ্চশরে অনড় মেঘের জলস্রোত ভেঙে দিই,
ছুড়ে মারি পায়ে তার নূপুরের গুহাধ্বনি।
বলি তারে - কামরঙা রাতের কিরাতদুপুরে
যত দগ্ধ জলোচ্ছ্বাস, নৌকাডুবির সপ্তশিরার
সুপ্ত ঘ্রাণ
লুকিয়ে আছে - তোমার নির্বিকল্প শরীরের উনুনে।
তুমি তারে খুঁজে আনো,
দুঃখ চেপে, হাসি বেচে
পায়ে তোল অস্তিত্বের অহংকার। ......
(কবিতা - সময়ের দিকে)।
এবং আরোও বহুসংখ্যক এমন কবিতা। আহা, এমন সব পঙক্তি যেন কাঁপন ধরায় মননে। এনে দেয় এক নির্বিকল্প ঘোর লাগা। এবং অধিকাংশ কবিতায় এমনই সব শব্দের ঝংকার নিশ্চিত আবেশ সৃষ্টি করে পাঠকের হৃদমাঝারে। কবিতা হয়ে ওঠে বাঙময়, জীবন্ত চলমানতার প্রতিচ্ছবি। এই সুযোগে তুলে আনা যাক আরোও কিছু কবিতা থেকে শব্দ যুগলের বা দ্বৈত শব্দের এমন অনুপ্রাসাশ্রিত অনাবিল মুগ্ধতা -
নির্ঝরের নীলাঞ্জন, বর্ষাযুগল, অমৃতগান, ত্রিবেণীতন্তু, যশোদা নদী, সূর্যনাবিক, ঋণপাহাড়, জটিল জড়োয়া, গল্পদোলন, পরানঝাঁপি, তানপুরা-তনু, ভিক্ষাচাতাল, রক্তরৌদ্র, ধাওয়ানবিশ, ক্রুদ্ধপরি, ঝিল্লিঝনক, মিছিল মঞ্জিল, যাত্রাচঞ্চু, গালিচাফুল, অশ্রুদিঘল, ত্রিগুণ তরণি, ঘুম ঘাস, শব্দসিঁড়ি, বাগানবিলাপ, হাওয়াশরীর, স্বপ্নমঙ্গল, হাসিটিপ, বৃষ্টিনূপুর, মেঘপাতাল, প্রচ্ছদ পা, বর্ষতরঙ্গ, মনপিঁড়ি ...... এবং আরোও বহু। এক একটি কবিতার গোটা স্তবক জুড়ে যেন ঝরনার ফেনিল জলোচ্ছ্বাসের মতো ঝরে পড়ে শব্দবন্ধের বাহার -
নিঃসঙ্গের ইতিহাস বড় বেশি বেমানান
এ ত্রিভুজ সংসারে। এখানে গুল্মের ফাঁকে ফাঁকে
তৃণতিল অভিমানের মতো শীতকাঁটা প্রেম,
বোলতামাসির মজাক ব্যালান্স,
আর নিরুদ্দেশের যাত্রাচঞ্চু
বার বার পাক খায় - ত্রিবন্দি জঠরের
চশমাচিকন নকশিকাঁথায়। ......
(কবিতা - ত্রিভুজের ভিতরে নিঃসঙ্গের চাঁদবেণু)।
কবিতা যত এগিয়েছে কবিতার অবয়ব বর্ধিত হয়েছে। পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে গেছে একাধিক কবিতা। তবে ভাবের গাম্ভীর্যে শব্দের ঝংকারও স্তিমিত হয়ে এসেছে খানিকটা। কিছু কবিতায় এসেছে রাবীন্দ্রিক শব্দাবলি ও ভাবধারার অনুসরণ। ব্যবহৃত হয়েছে বেশ কিছু তৎসম শব্দও - হয়তো কাব্যগুণের খাতিরেই। শব্দের ফুলঝুরির মাঝে কিছু শব্দের আবার অর্থও হৃদয়ঙ্গম করা গেল না। যেমন - ব্যথুন, বিদ্যান, বন্দকী আদি। নদী নিয়ে কবিতা প্রত্যেক ভাবকবির এক সম্পদ। কিন্তু ‘তবুও গোমতী’ কবিতাটি যেন প্রত্যাশা মেটাতে পারল না। শেষের কিছু কবিতায় বাস্তবকে চিহ্নিত করতে গিয়ে কাব্যিকতার সঙ্গে কিছু বোঝাপড়া করতে বলে মনে হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই হ্রাস পেয়েছে কাব্যসুষমা।
আগরতলার অক্ষর পাবলিকেশানস্ থেকে প্রকাশিত গ্রন্থের ছাপাই, অক্ষর বিন্যাস আদি যথাযথ হলেও কয়েকটি কবিতার ফন্ট পরিবর্তন হয়ে গেছে। রয়ে গেছে বেশ কিছু বানান ভুলও। শৈল্পিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে পুস্পল দেব যদিও নামলিপিতে ‘ব্দ’ যুক্তাক্ষরটিকে শনাক্ত করতে হোঁচট খেতে হয় বইকী। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে কবির ‘পূজ্যপাদ স্বর্গীয় পিতা-মাতার চরণকমলে’।
সব মিলিয়ে কাব্যময়তায় ভরপুর ব্যতিক্রমী সব কবিতার এক অনবদ্য সম্ভার ‘শব্দমুখর ঘাটলা’ যেখানে কবিতার সজ্জিত ঘাটে অনাবিল, অন্তর্নিহিত ছন্দে খেলে বেড়ায় শব্দেরা আর ঘাট পেরিয়ে, মাঠ - প্রান্তর পেরিয়ে শব্দের মোহনীয়তা পৌঁছে যায় নিমগ্ন পাঠকের উৎকীর্ণ কর্ণকুহরে।
ভূমিকাতেই শুরু এই নান্দনিকতা। কবিতায় ধরা আছে ‘কবিকথা’। কবিতার শরীর বেয়ে কবির প্রবহমানতার কথা। শব্দের কুহকজালে এই অনাদি অনন্ত প্রবহমানতা এতটাই প্রকট যে ইচ্ছে হয় সবগুলি কবিতা তুলে দিই পাঠকের দরবারে। সেই পরিসর নেই বলেই কিছু শব্দমুগ্ধ পঙক্তি ধরে রাখা যাক বিমুগ্ধতায় -
রক্তগাছের কোটর চিরে
শেষবারের মতো সূর্য যখন দুরন্ত চিতায়...,
আমি তার ধাবিত সকাল, পাষাণী বিকেলের মুখ ঘষে
এঁকে দিই গিরগিটি আকাশ।
পঞ্চশরে অনড় মেঘের জলস্রোত ভেঙে দিই,
ছুড়ে মারি পায়ে তার নূপুরের গুহাধ্বনি।
বলি তারে - কামরঙা রাতের কিরাতদুপুরে
যত দগ্ধ জলোচ্ছ্বাস, নৌকাডুবির সপ্তশিরার
সুপ্ত ঘ্রাণ
লুকিয়ে আছে - তোমার নির্বিকল্প শরীরের উনুনে।
তুমি তারে খুঁজে আনো,
দুঃখ চেপে, হাসি বেচে
পায়ে তোল অস্তিত্বের অহংকার। ......
(কবিতা - সময়ের দিকে)।
এবং আরোও বহুসংখ্যক এমন কবিতা। আহা, এমন সব পঙক্তি যেন কাঁপন ধরায় মননে। এনে দেয় এক নির্বিকল্প ঘোর লাগা। এবং অধিকাংশ কবিতায় এমনই সব শব্দের ঝংকার নিশ্চিত আবেশ সৃষ্টি করে পাঠকের হৃদমাঝারে। কবিতা হয়ে ওঠে বাঙময়, জীবন্ত চলমানতার প্রতিচ্ছবি। এই সুযোগে তুলে আনা যাক আরোও কিছু কবিতা থেকে শব্দ যুগলের বা দ্বৈত শব্দের এমন অনুপ্রাসাশ্রিত অনাবিল মুগ্ধতা -
নির্ঝরের নীলাঞ্জন, বর্ষাযুগল, অমৃতগান, ত্রিবেণীতন্তু, যশোদা নদী, সূর্যনাবিক, ঋণপাহাড়, জটিল জড়োয়া, গল্পদোলন, পরানঝাঁপি, তানপুরা-তনু, ভিক্ষাচাতাল, রক্তরৌদ্র, ধাওয়ানবিশ, ক্রুদ্ধপরি, ঝিল্লিঝনক, মিছিল মঞ্জিল, যাত্রাচঞ্চু, গালিচাফুল, অশ্রুদিঘল, ত্রিগুণ তরণি, ঘুম ঘাস, শব্দসিঁড়ি, বাগানবিলাপ, হাওয়াশরীর, স্বপ্নমঙ্গল, হাসিটিপ, বৃষ্টিনূপুর, মেঘপাতাল, প্রচ্ছদ পা, বর্ষতরঙ্গ, মনপিঁড়ি ...... এবং আরোও বহু। এক একটি কবিতার গোটা স্তবক জুড়ে যেন ঝরনার ফেনিল জলোচ্ছ্বাসের মতো ঝরে পড়ে শব্দবন্ধের বাহার -
নিঃসঙ্গের ইতিহাস বড় বেশি বেমানান
এ ত্রিভুজ সংসারে। এখানে গুল্মের ফাঁকে ফাঁকে
তৃণতিল অভিমানের মতো শীতকাঁটা প্রেম,
বোলতামাসির মজাক ব্যালান্স,
আর নিরুদ্দেশের যাত্রাচঞ্চু
বার বার পাক খায় - ত্রিবন্দি জঠরের
চশমাচিকন নকশিকাঁথায়। ......
(কবিতা - ত্রিভুজের ভিতরে নিঃসঙ্গের চাঁদবেণু)।
কবিতা যত এগিয়েছে কবিতার অবয়ব বর্ধিত হয়েছে। পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে গেছে একাধিক কবিতা। তবে ভাবের গাম্ভীর্যে শব্দের ঝংকারও স্তিমিত হয়ে এসেছে খানিকটা। কিছু কবিতায় এসেছে রাবীন্দ্রিক শব্দাবলি ও ভাবধারার অনুসরণ। ব্যবহৃত হয়েছে বেশ কিছু তৎসম শব্দও - হয়তো কাব্যগুণের খাতিরেই। শব্দের ফুলঝুরির মাঝে কিছু শব্দের আবার অর্থও হৃদয়ঙ্গম করা গেল না। যেমন - ব্যথুন, বিদ্যান, বন্দকী আদি। নদী নিয়ে কবিতা প্রত্যেক ভাবকবির এক সম্পদ। কিন্তু ‘তবুও গোমতী’ কবিতাটি যেন প্রত্যাশা মেটাতে পারল না। শেষের কিছু কবিতায় বাস্তবকে চিহ্নিত করতে গিয়ে কাব্যিকতার সঙ্গে কিছু বোঝাপড়া করতে বলে মনে হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই হ্রাস পেয়েছে কাব্যসুষমা।
আগরতলার অক্ষর পাবলিকেশানস্ থেকে প্রকাশিত গ্রন্থের ছাপাই, অক্ষর বিন্যাস আদি যথাযথ হলেও কয়েকটি কবিতার ফন্ট পরিবর্তন হয়ে গেছে। রয়ে গেছে বেশ কিছু বানান ভুলও। শৈল্পিক প্রচ্ছদের সৌজন্যে পুস্পল দেব যদিও নামলিপিতে ‘ব্দ’ যুক্তাক্ষরটিকে শনাক্ত করতে হোঁচট খেতে হয় বইকী। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে কবির ‘পূজ্যপাদ স্বর্গীয় পিতা-মাতার চরণকমলে’।
সব মিলিয়ে কাব্যময়তায় ভরপুর ব্যতিক্রমী সব কবিতার এক অনবদ্য সম্ভার ‘শব্দমুখর ঘাটলা’ যেখানে কবিতার সজ্জিত ঘাটে অনাবিল, অন্তর্নিহিত ছন্দে খেলে বেড়ায় শব্দেরা আর ঘাট পেরিয়ে, মাঠ - প্রান্তর পেরিয়ে শব্দের মোহনীয়তা পৌঁছে যায় নিমগ্ন পাঠকের উৎকীর্ণ কর্ণকুহরে।
- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
‘শব্দমুখর ঘাটলা’
খোকন সাহা (অগ্রজ)
মূল্য - ৩০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৬১২১১০৯
খোকন সাহা (অগ্রজ)
মূল্য - ৩০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৬১২১১০৯

Comments
Post a Comment