Skip to main content

ছোটোদের জমজমাট গল্প সংকলন ‘নানা রঙের কৈশোর’


কবি, সাহিত্যিক ঋতা চন্দের ছোটোদের নিয়ে এবং ছোটোদের উপযোগী সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ - ‘নানা রঙের কৈশোরউপযুক্ত পরিবেশ কিংবা প্ল্যাটফর্ম যদি পেত তাহলে নিঃসন্দেহে বই-বাজার এবং বই-ভুবনে সাড়া ফেলতএই উত্তর পূর্বের বাংলা বই-ভুবনে এমনটা আশা না করাই শ্রেয়এবং ঠিক এখানটাতেই হয়ত ভুবনায়নের ধারণাটি তার যৌক্তিকতা পেয়ে যায় - তা সে যতই কারোও আপত্তি থাকুক না কেনদুই বাংলার বহু বই-পত্র পড়ে যে ধারণাটি গড়ে ওঠে মনে তা থেকে এই কথাটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে সেসব বই এই আলোচ্য গ্রন্থের ধারেকাছেও আসতে পারে নাপ্রচ্ছদ থেকে শুরু করে দুই মলাটের মধ্যেকার প্রথম থেকে শেষ লাইনটি অবধি পাঠকের কাছেক্ষুধার্তের অন্নবই আর কিছুই নয়
লেখক গ্রন্থটিকে নির্দেশিত করেছেনছোটোদের গল্প সমগ্রহিসেবেএবং এটাই যথাযথমোট ৯২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাকের এই গ্রন্থটির ৮৩ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে ১৩ টি গল্পএ অঞ্চলে কিশোর কিশোরী অর্থাৎ ছোটোদের মধ্যে বাংলা গ্রন্থপাঠের প্রবণতা কতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে তা সকলেরই জানা এ অবস্থায় ছোটোদের নিয়ে লিখা যতটুকু সাহসী ততটুকুই গরজের। সামাজিক মাধ্যম সমূহে অনেকেরই হা-হুতাশ এবং নীরব অথবা মৃদু প্রতিবাদ প্রায়শই লক্ষ করা যায় যদিও বাংলায় পঠনপাঠনের পথ আজ ক্রমশ বিলীয়মান। এই আবহে ঋতা চন্দের এই নান্দনিক প্রয়াস শুধু গরজ নয় অভিভাবক ও সামগ্রিক ভাবে পুরো সমাজের কাছেই এক প্রত্যাহ্বান তথা সরব প্রতিবাদ হিসেবে অভিহিত করা যায়।
প্রথম গল্প ‘প্রকৃত বন্ধু’। নিখাদ বন্ধুত্ব যে ছোটো থাকতেই গড়ে ওঠে সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বন্ধুর জন্য কোনো ত্যাগই ত্যাগ নয়। এমন আবহে নিটোল বয়ানে এক মন ভালো করা গল্প। শেষটায় চোখের জল আটকে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় গল্প ‘রিয়াদের ম্যাঁও বাহিনী’। বেড়ালের সাতকাহন বলা যায়বর্ণনাত্মক কিছু বিশ্লেষণ এখানে কাহিনির আদলে পরিবেশিত হয়েছে বলা যেতে পারেছোটদের উপযোগী এক বেড়াল-বেত্তান্তবাণ্টির আশাতৃতীয় গল্পমাতৃহারা এক বালকের শোকাহত দিনযাপন এবং ধীরে ধীরে আত্ম-উপলব্ধির চোখে জল আনা এক অনবদ্য গল্পচতুর্থ গল্পদীপের দিনরাত ও একদিনঅসাধারণ এক উত্তরণের গল্পগল্পের শেষে আনন্দাশ্রুতে ভাসবেই পাঠকের চোখ - এমন গ্যারান্টি দেওয়াই যায়এর পরের গল্পমহিরুহছোটো থেকে বড়ো হওয়ার এক বাস্তবভিত্তিক কাহিনিচেনা হলেও এক উদাহরণযোগ্য প্লটপরবর্তী গল্পগরিবের ভগবানছোটোদের নিয়ে গল্প নয় হয়ত তবে ছোটোদের উপযোগী অবশ্যইনিটোল, গোছানো এক গল্প
খাঁচার পাখিগল্পে পাখি-মানুষের বন্দিদশার এক নির্মম চিত্র পরিস্ফুট হয়েছেকিশোরতাতান’-এর মানসিক চিন্তাধারার মাধ্যমে রচিত এক ব্যতিক্রমী এবং চমৎকার গল্পঅষ্টম গল্পছোট্টুর ছোট্ট সফরগয়া ও বুদ্ধগয়ার প্রেক্ষাপটে শিক্ষণীয় বিষয়ের উপর ছোটদের উপযোগী একটি গল্প যেখানে স্থানিক বর্ণনায় ঋদ্ধ হয়েছে কাহিনিনবম গল্পপাঁচুএকটি হাস্যরসাত্মক গল্পছোটোদের স্কুলজীবনের দুস্টুমিভরা দিনযাপনের সুলিখিত বাস্তব প্রেক্ষাপটের গল্পপরের গল্পভোলি ম্যাডামভুলো মনের ভুলভুলাইয়ায় নিমজ্জিত স্কুল ম্যাডামের কাণ্ডকারখানার উপর রচিত হাসির গল্পকিশোর কিশোরীর মনে নিশ্চিতভাবেই এনে দেবে একরাশ তৃপ্তিসুখএক বরেতেই কেল্লা ফতেঅলৌকিকত্বের ছোঁয়ায় রচিত এক মায়াময় গল্পব্যতিক্রমী চিন্তাধারা নিঃসন্দেহেএরপরের গল্পগার্গীর জন্মদিনেএক গা ছমছম করা ভূতের গল্পঅসাধারণ বুনোটশেষ গল্পসেই কালো পাথরটাঅতিলৈকিকঘটনাপ্রবাহের উপর লিখা এক দারুণ জমজমাট বড়গল্পশব্দ ও ভাষার অপরূপ প্রয়োগে বড়গল্প হলেও এক পঠনে শেষ না করে উপায় নেই
ঋতা চন্দের লেখায় শব্দ ও ভাষার এই যুগলবন্দি নতুন নয়লেখাকে কীভাবে পরিপাটি বুননে বোনা যায় সেই কথাটি তাঁর প্রতিটি রচনায় প্রত্যক্ষ করা যায়আলোচ্য গ্রন্থটিও তার ব্যতিক্রম নয়কিছু গল্প সরাসরি শিশু কিশোরদের সম্বোধন করেই লিখাগ্রন্থ জুড়ে অনুসৃত হয়েছে আধুনিক বানানের প্রয়োগতবে কিছু কিছু শব্দে ত্রুটি রয়ে গেছেতিনটি গল্পের শিরোনামেও তা লক্ষ্য করা যায়আছে কিছু ছাপার ভুলওতবে বানান বা ছাপা উভয় ক্ষেত্রেই ভুলের সংখ্যা নিতান্তই নগণ্য যা পরিহার করা এ অঞ্চলের সাহিত্যে এক অনতিক্রম্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছেএখানেও ভূমিকায় উল্লেখ করা মতো সেই ভুবনায়নের ধারণা এসে সামনে দাঁড়ায় অনিবার্যভাবেই
ভূমিকাহীন এই গ্রন্থটি লেখক উৎসর্গ করেছেন তাঁরশ্বশুরমশাই যতীন্দ্রমোহন শীল এবং শাশুড়ি মা নীহারকণা শীল-এর স্মৃতির উদ্দেশেগুয়াহাটির ভিকি পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত গ্রন্থের প্রচ্ছদ এঁকেছেন চিত্রশিল্পী লেখক নিজেই
সব মিলিয়ে এক অনাবিল স্বাদের গল্প সংকলননানা রঙের কৈশোরশুধু ছোটরা নয় নিশ্চিতভাবেই একবার পড়া শুরু করলে বড়রাও থামবেন না শেষ অবধি না পড়েপ্রতিটি গল্পই ভীষণ রকমের গতিশীলকোথাও থেমে থাকার জো নেইশিশু মনস্তত্ত্বকে ভালো করে অনুধাবন না করতে পারলে এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণসমন্বিত গল্প লিখা কোনওভাবেই সম্ভব নয়এ অঞ্চলে শিশু সাহিত্যের উপর কিংবা বলা ভালো ছোটোদের উপযোগী সাহিত্য রচনার উদাহরণ নিতান্তই কমপ্রায় নেই বললেই চলেএ অবস্থায় ঋতা চন্দের এই সৃষ্টি পাঠক মহলে সাড়া জাগাবে নিশ্চিতএবং নির্দ্বিধায় বলা যায় যে নিরাশ হবেন না পাঠকপ্রতিটি গল্পের লিখনশৈলী এমনই যে গল্পের চলনই ধরে রাখে পাঠককেএখানেই লেখকের মুনশিয়ানা

- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

নানা রঙের কৈশোর
ঋতা চন্দ
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫৫৭৮৯৭১

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...