Skip to main content

ত্রিভাষিক নির্বাচিত গদ্য সংকলন ‘যৌবন বেদনা রসে’


উজান আসামের কবি, সাহিত্যিক শান্তনু সরকার। লেখালেখির সঙ্গে জড়িত দীর্ঘ দীর্ঘ দিন ধরে। একাধারে কবিতায় এবং সরল গদ্যে সিদ্ধহস্ত। তবে এই অবসরে তাঁর কবিতা নয়, আলোচনা এগোবে গদ্যকার শান্তনুর ৩৪৪ পৃষ্ঠার বিশাল গ্রন্থ ‘যৌবন বেদনা রসে’ নিয়ে। গ্রন্থের সব লেখাই যৌবনে লিখা কিনা জানা নেই তবে গ্রন্থনাম যে দারুণ অর্থবহ এতে কোনও সন্দেহ থাকার কথা নয়। তিনটি শব্দ - যৌবন, বেদনা ও রস। রস বহু প্রকার। একটি জীবন তার দীর্ঘ সময়ের পথ চলার ফাঁকে পেরিয়ে আসে নানা রসের পর্যায়। সেখানে বেদনা যেমন আছে তেমনি সুখও আছে। তবে সাহিত্যে বেদনার প্রভাবই বেশি। যেমন যৌবনই হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পর্যায়। সব মিলিয়ে তাই সার্থক গ্রন্থনাম।
গ্রন্থনামের মতোই এই বইয়ের অন্দরমহল আদ্যোপান্ত ব্যতিক্রমী এবং অতীব যত্ন সহকারে সজ্জিত। শুরু করা যাক গোড়া থেকেই। লেখকের লিখা তিনটি ভাষার গদ্যই এখানে স্থান পেয়েছে। বাংলা, অসমিয়া ও ইংরেজি। তাই গ্রন্থটিকে ত্রিভাষিক নির্বাচিত গদ্য সংকলন হিসেবেই আখ্যায়িত করা যুক্তিযুক্ত হবে। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে - ‘সেই কৈশোর কাল থেকে, যখন লেখালেখির গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেতে লাগলাম লাটিমের মতো, তখন পাশে পেয়েছিলাম কিছু সুহৃদ বন্ধু-বান্ধবী আর শ্রদ্ধেয় হিতৈষী অভিভাবকদের।’ - তাঁদের। আত্মপাঠ শিরোনামে ভূমিকায় লেখক লিখছেন - বলা ভালো প্রশ্ন রেখেছেন - ‘কতটা লেখা লিখলে পরে তাকে লেখক রূপে চিহ্নিত করা যায় ? আমি কি আদৌ লেখক হতে পেরেছি ? না, লেখক হবার ভান করেছি আজ ইস্তক শুধু ? প্রশ্নগুলো দোলা দেয় মনে।’ এই জটিল এবং অধিকাংশ লেখকের অন্তরে সতত ঘুরপাক খেতে থাকা প্রশ্নের উত্তর বোধ করি একমাত্র পাঠক-ঈশ্বরই দিতে পারবেন।  
গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়েছে মোট ১১৮টি গদ্য রচনা। এর মধ্যে রয়েছে ১ থেকে ৯ পৃষ্ঠার সব গদ্য, ৮টি ইংরেজি, ২৬টি অসমিয়া এবং বাকিগুলো বাংলা। এও এক বৈচিত্র্য বইকী। বলা যায় কী নেই এখানে ? আছে লেখককে নিয়ে বিশিষ্টজনদের মূল্যায়ন সম্পর্কিত নিবন্ধ, বিশিষ্টজনদের এবং পরিচিতজনদের নিয়ে লিখা লেখকের নিবন্ধ, বিশিষ্টজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার - যাঁর মধ্যে রয়েছেন ভূপেন হাজরিকা, নির্মলপ্রভা বরদলৈ প্রমুখ, লেখকের সাক্ষাৎকার, অণুগল্প, গল্প, অসমিয়া গল্প, অনুবাদ গল্প, ভ্রমণ কাহিনি, স্মৃতিচারণ, রম্য রচনা, স্বাস্থ্যচর্চা, একাধিক ছোটপত্রিকার সম্পাদকীয়, শ্রদ্ধার্ঘ্য, স্থানীয় অঞ্চলগুলির উপর গবেষণামূলক নিবন্ধ, কবিতার উপর একাধিক প্রবন্ধ, জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি সুভাষচন্দ্রের মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিদের থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ে এ অঞ্চলের বহু গুণী ব্যক্তিদের উপর অনেকগুলি রচনা।
আত্মপাঠেই লেখক লিখছেন - ‘লেখক হতে না পারলেও লেখা নিয়ে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে, লেখা নিয়ে খেলতে খেলতে এবং তার লেখাজোখা করতে করতেই জীবনের এই দীর্ঘ বছরগুলো কেটে গেল শুধু একান্ত তারই সান্নিধ্যে। সেই সান্নিধ্য আমাকে যে প্রকারান্তরে নির্মাণ করে গেছে, অর্থহীন জীবনকে অন্বেষণ পূর্বক অর্থপূর্ণ করে তুলতে সাহায্য করেছে গোপনে গোপনে, সে-কথা, বলা বাহুল্য মাত্র।’ এখানে লেখক ‘তার’ বলতে কাকে বোঝাতে চেয়েছেন তা গোপনেই থেকে যায়। কে তিনি ? তিনিই কি সেই সর্বনিয়ন্তা, যার সূত্র ধরে গ্রন্থের প্রথম ৭টি রচনা সন্নিবিষ্ট হয়েছে ? প্রথম নিবন্ধ ‘কীভাবে আমি রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভাব-আন্দোলনের সংস্পর্শে এলাম’-এ  লেখক লিখছেন - ‘শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ - স্বামী বিবেকানন্দের ভাব-আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে জীবনকে এক অনাস্বাদিত গৌরবে উজ্জীবিত ও উজ্জ্বল করার যে মার্গ দর্শন লাভ করেছি, তার পেছনে শৈশবের দিনগুলিতে খেলাচ্ছলে শ্রী শ্রী ঠাকুরের কাছে ওই ভাবে যাওয়ার নিশ্চয়ই কোন না কোনও গূঢ় অভিপ্রায় আছে...।’
গ্রন্থের মধ্যে সন্নিবিষ্ট বহু মূল্যবান ছবি, লেখা ও উক্তি গ্রন্থটিকে এনে দিয়েছে এক অনন্য উৎকর্ষ। ইংরেজিতে লেখককে নিয়ে তাঁর স্ত্রী ও কন্যার সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন এক ব্যতিক্রমী সংযোজন। এই পেপারব্যাক সংস্করণের ছাপা, অক্ষর বিন্যাস আদি যথেষ্ট পরিপাটি। সেঞ্চুরি লিটারেচার, শিলচর-এর তরফে প্রকাশক অমিতাভ দাস। প্রচ্ছদ পরিকল্পনায় লেখক নিজে ও জ্যোতি গগৈ। মুদ্রণ - রাজর্ষি গগৈ, দ্য অসম কম্পিউটারস, তিনসুকিয়া। সামান্য কিছু বানান এবং ৩১৬তম পৃষ্ঠার রচনাটির শিরোনাম - গ্রন্থে এবং সূচিপত্রে ভিন্ন হওয়ার বাইরে পুরোপুরি এক চমকপ্রদ, নিটোল প্রকাশ এই গ্রন্থ যা লেখককে সর্বাংশে পরিচয় করিয়ে দেয় পাঠকের কাছে।

- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

 

মূল্য - ৩০০ টাকা (দাতব্য)
যোগাযোগ - ৮৬৩৮২৪৮১৬২

Comments

  1. Thanks a lot dear Bidyut da, it is indeed a great moment for all of us. No words to convey our gratitude. Stay blessed dada.

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেকটাই দেরি হয়েছে। আরোও আগেই আসা উচিত ছিল। যাই হোক ভালো থাকবেন সবাই।

      Delete
  2. শান্তনু সরকার মহোদয়ের কোন লেখা না পড়েও, এই সমৃদ্ধ-সম্যক গ্রন্থ আলোচনায় তাঁর রচনাসম্ভাররের যথেষ্ট জানার সুযোগ পেলাম। আন্তরিক অভিনন্দন জানাই প্রাজ্ঞ আলোচককে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. অকুণ্ঠ ধন্যবাদ এবং নমস্কার

      Delete

Post a Comment

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...