প্রথম কবিতার প্রথন স্তবক দিয়েই মঙ্গলাচরণ
হোক আলোচনার -
লিফটের দরজা খুলতেই পা রাখলেন ঈশ্বর
কাঁধে তাঁর স্বর্গের বায়ুদল মেঘদল স্বর্গসুখ
পুব-পশ্চিম কোন কোণে ঠাহর পাচ্ছেন না
উলুধ্বনি তেতলায় সারি সারি মাটির প্রদীপ…
(কবিতা - ঈশ্বর ও কবিতা)
প্রাণজি বসাক-এর ২৩তম কাব্যগ্রন্থ এবং সার্বিক ২৭তম গ্রন্থের সর্বশেষ ‘রূপবৃত্তে ছায়াবৃত্তে’ গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়েছে মোট ৯০টি কবিতা। সকাল নাকি পুরো দিনটাকে দেখায়। সেই হিসেবে গ্রন্থের প্রথম কবিতার প্রথম স্তবকই বলে দেয় কবিতার পথবৃত্তান্ত। পুরো গ্রন্থ জুড়ে এভাবেই একের পর এক ব্যঞ্জনায়, শব্দের কারুকার্যে, অন্তর্নিহিত ভাবনার রূপ ও ছায়ায় সম্পৃক্ত হয়ে ছেয়ে আছে কবিতাগুলো। আলোচনার বিশদে না গিয়ে ইচ্ছে হয় পাঠকের সঙ্গে কবিতার সরাসরি পরিচয় করিয়ে দেওয়া ভালো। ইচ্ছে হয় একের পর এক বসিয়ে দেওয়া হোক কবিতার মায়াময় পঙ্ক্তিগুলো।
না, গ্রন্থনামে কোনও কবিতা নেই এখানে। তবে শুধু ‘রূপবৃত্তে’ শিরোনামে আছে একটি কবিতা। এই কবিতায় বাস্তবের প্রেক্ষিতে রূপক হয়ে উঠেছে রূপ কিংবা অন্যভাবে বললে রূপের ভাবনায় রূপক হয়ে উঠেছে বাস্তব। এই বাস্তব বোধের উপর, জীবনপথের বাস্তব অনুষঙ্গের উপরই রচিত হয়েছে অধিকাংশ কবিতা। যে কবিতায় রূপ ও বৃত্তের বিস্তর অনুষঙ্গ বর্ণিত হয়েছে। তাই এই কবিতার কেন্দ্রীয় ভাবনার উপর লিখিত এবং সন্নিবিষ্ট কবিতাসমূহের সার্বিক কাব্যভাবনাতেই চয়িত হয়েছে গ্রন্থনাম, এমন ধারণা করা যেতেই পারে। এবং এই ভাবনাকেই পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক করে দিয়ে নির্বাচিত করা হয়েছে, কিংবা বলা যায় সৃষ্ট হয়েছে চঞ্চল গুই-এর অসাধারণ একটি প্রচ্ছদ। কাব্যভাবনার সঙ্গে যথার্থ মানানসই করে রূপ ও ছায়ার অজস্র বৃত্তকে রঙের মায়ায় তুলে এনেছেন শিল্পী। কবির একটি কবিতার প্রথম লাইনের সার্থকতা এই প্রচ্ছদ - ‘রেখার মতো রেখা টানলে জমে ওঠে ছবি’।
ভূমিকা কিংবা আত্মকথাহীন এই গ্রন্থের কবিতাকে কবি সরাসরি তুলে দিয়েছেন পাঠকের দরবারে। সুতরাং কবিতার অবয়ব কিংবা অন্তর এবং গ্রন্থের মর্যাদা অনুধাবন করতে আরোও কিছু পঙ্ক্তি নিয়ে ভাবতে হবে বইকী। সেই জীবনবোধের অনুষঙ্গে এসেছে নানা কথা। কবিতায় কবিতায় এসেছে জাগতিক সম্পর্কের বাঁধন, এসেছে প্রেম ভালোবাসা, ধূসর দিনযাপন, দেশভাগ, সামাজিক বোধের অবক্ষয় -
এভাবে হয় না - অবান্তর কথাবার্তায় অবুঝ সময়
এক ভাষা থেকে অন্য এক ভাষায় প্রজন্মের কথা
মেজাজ হারিয়ে ব্যথাতুর হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষ
বেগতিক হাওয়া কামড়ে ধরে প্রহর...
এভাবেই বেড়ে ওঠে আজকের সমান্তরাল ইতিহাস
কেউ বোঝে না মাঝখানের সময়টাকে
কোন খাপে রাখা সমীচীন উৎসব ......
(কবিতা - টিকে থাকা)
এই মাঝখানের সময়টা অর্থাৎ মধ্যবয়সের ভাবনারই প্রতিফলন একের পর এক কবিতায়। কখনও ফিরে দেখা তো কখনও বর্তমানকে কাটাছেঁড়া করে ভবিষ্যতের চিন্তা। মূলত এই অনুষঙ্গকে কেন্দ্র করেই রূপ ও ছায়ার বৃত্তে কবি মজে আছেন গ্রন্থ জুড়ে। চিন্তার অবসানে কবিতা লিখা, কবিতা পড়াকেই নিরাময় হিসেবে বেছে নিয়েছেন কবি -
‘......প্রতিদিনের আঘাতে মানুষ ভুলেছে ভালোবাসা
শিশিরের টুপটাপ পতনের শব্দেও ঘুম ভাঙে
স্বপ্নরা ক্রমে উবে যায় রোদের প্রহরে
প্রার্থনা ঘরে উপচে পড়ে দীর্ঘশ্বাস
বাঁচি - বেঁচে থাকার জন্য দু’একটি কবিতা পড়ি
যেন কানে ঢোকে বিশুদ্ধ মন্ত্র উচ্চারণ
ভালো লাগার ক্রমান্বয়ে নতুন এক স্বপ্ন আসে বুঝি।
(কবিতা - যার কাছেই যাই)
গ্রন্থে আছে একাধিক (১২টি) গদ্য কবিতা। যতিচিহ্নহীন বাকি কবিতাগুলোর মধ্যেও আছে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিক। ‘ভাবচিত্র ও তিরিশে জুন’ কবিতার আঙ্গিক ব্যতিক্রমী। ‘হালফিল’ কবিতাটির বাইরে ছন্দের পথে হাঁটেননি কবি যদিও নিমগ্ন পাঠে পঙ্ক্তিগুলোর মধ্যে থাকা এক অন্তর্নিহিত ছন্দকে অস্বীকার করা যায় না একেবারেই। কবির পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের কবিতার সঙ্গে কিছুটা পরিবর্তনও পরিলক্ষিত হয়েছে আলোচ্য গ্রন্থে। একদিকে যেমন শব্দস্থাপনার ক্ষেত্রে এসেছে অধিকতর সারল্য আবার পাশাপাশি কাব্যভাবনায়ও লক্ষ করা গেছে এক ভিন্নতর অনুষঙ্গ। প্রচ্ছদের সাদা রং সেদিক থেকেও প্রাসঙ্গিক বটে।
৯৯ পৃষ্ঠার গ্রন্থের ছাপাই ও বাঁধাই তথা অক্ষর, শব্দ বিন্যাস যথাযথ। শূন্য ব্লার্ব ও দু’একটি বানানের বাইরে পত্রলেখা থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থ ত্রুটিমুক্ত। শেষ প্রচ্ছদে অবশ্য কবির পরিচিতি সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে - ‘মিতালিকে...’। সব মিলিয়ে রূপবৃত্তে, ছায়াবৃত্তে এক গভীর জীবনবোধের কাব্যসংকলন।
লিফটের দরজা খুলতেই পা রাখলেন ঈশ্বর
কাঁধে তাঁর স্বর্গের বায়ুদল মেঘদল স্বর্গসুখ
পুব-পশ্চিম কোন কোণে ঠাহর পাচ্ছেন না
(কবিতা - ঈশ্বর ও কবিতা)
প্রাণজি বসাক-এর ২৩তম কাব্যগ্রন্থ এবং সার্বিক ২৭তম গ্রন্থের সর্বশেষ ‘রূপবৃত্তে ছায়াবৃত্তে’ গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়েছে মোট ৯০টি কবিতা। সকাল নাকি পুরো দিনটাকে দেখায়। সেই হিসেবে গ্রন্থের প্রথম কবিতার প্রথম স্তবকই বলে দেয় কবিতার পথবৃত্তান্ত। পুরো গ্রন্থ জুড়ে এভাবেই একের পর এক ব্যঞ্জনায়, শব্দের কারুকার্যে, অন্তর্নিহিত ভাবনার রূপ ও ছায়ায় সম্পৃক্ত হয়ে ছেয়ে আছে কবিতাগুলো। আলোচনার বিশদে না গিয়ে ইচ্ছে হয় পাঠকের সঙ্গে কবিতার সরাসরি পরিচয় করিয়ে দেওয়া ভালো। ইচ্ছে হয় একের পর এক বসিয়ে দেওয়া হোক কবিতার মায়াময় পঙ্ক্তিগুলো।
না, গ্রন্থনামে কোনও কবিতা নেই এখানে। তবে শুধু ‘রূপবৃত্তে’ শিরোনামে আছে একটি কবিতা। এই কবিতায় বাস্তবের প্রেক্ষিতে রূপক হয়ে উঠেছে রূপ কিংবা অন্যভাবে বললে রূপের ভাবনায় রূপক হয়ে উঠেছে বাস্তব। এই বাস্তব বোধের উপর, জীবনপথের বাস্তব অনুষঙ্গের উপরই রচিত হয়েছে অধিকাংশ কবিতা। যে কবিতায় রূপ ও বৃত্তের বিস্তর অনুষঙ্গ বর্ণিত হয়েছে। তাই এই কবিতার কেন্দ্রীয় ভাবনার উপর লিখিত এবং সন্নিবিষ্ট কবিতাসমূহের সার্বিক কাব্যভাবনাতেই চয়িত হয়েছে গ্রন্থনাম, এমন ধারণা করা যেতেই পারে। এবং এই ভাবনাকেই পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক করে দিয়ে নির্বাচিত করা হয়েছে, কিংবা বলা যায় সৃষ্ট হয়েছে চঞ্চল গুই-এর অসাধারণ একটি প্রচ্ছদ। কাব্যভাবনার সঙ্গে যথার্থ মানানসই করে রূপ ও ছায়ার অজস্র বৃত্তকে রঙের মায়ায় তুলে এনেছেন শিল্পী। কবির একটি কবিতার প্রথম লাইনের সার্থকতা এই প্রচ্ছদ - ‘রেখার মতো রেখা টানলে জমে ওঠে ছবি’।
ভূমিকা কিংবা আত্মকথাহীন এই গ্রন্থের কবিতাকে কবি সরাসরি তুলে দিয়েছেন পাঠকের দরবারে। সুতরাং কবিতার অবয়ব কিংবা অন্তর এবং গ্রন্থের মর্যাদা অনুধাবন করতে আরোও কিছু পঙ্ক্তি নিয়ে ভাবতে হবে বইকী। সেই জীবনবোধের অনুষঙ্গে এসেছে নানা কথা। কবিতায় কবিতায় এসেছে জাগতিক সম্পর্কের বাঁধন, এসেছে প্রেম ভালোবাসা, ধূসর দিনযাপন, দেশভাগ, সামাজিক বোধের অবক্ষয় -
এভাবে হয় না - অবান্তর কথাবার্তায় অবুঝ সময়
এক ভাষা থেকে অন্য এক ভাষায় প্রজন্মের কথা
মেজাজ হারিয়ে ব্যথাতুর হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষ
বেগতিক হাওয়া কামড়ে ধরে প্রহর...
এভাবেই বেড়ে ওঠে আজকের সমান্তরাল ইতিহাস
কেউ বোঝে না মাঝখানের সময়টাকে
কোন খাপে রাখা সমীচীন উৎসব ......
(কবিতা - টিকে থাকা)
এই মাঝখানের সময়টা অর্থাৎ মধ্যবয়সের ভাবনারই প্রতিফলন একের পর এক কবিতায়। কখনও ফিরে দেখা তো কখনও বর্তমানকে কাটাছেঁড়া করে ভবিষ্যতের চিন্তা। মূলত এই অনুষঙ্গকে কেন্দ্র করেই রূপ ও ছায়ার বৃত্তে কবি মজে আছেন গ্রন্থ জুড়ে। চিন্তার অবসানে কবিতা লিখা, কবিতা পড়াকেই নিরাময় হিসেবে বেছে নিয়েছেন কবি -
‘......প্রতিদিনের আঘাতে মানুষ ভুলেছে ভালোবাসা
শিশিরের টুপটাপ পতনের শব্দেও ঘুম ভাঙে
স্বপ্নরা ক্রমে উবে যায় রোদের প্রহরে
প্রার্থনা ঘরে উপচে পড়ে দীর্ঘশ্বাস
বাঁচি - বেঁচে থাকার জন্য দু’একটি কবিতা পড়ি
যেন কানে ঢোকে বিশুদ্ধ মন্ত্র উচ্চারণ
ভালো লাগার ক্রমান্বয়ে নতুন এক স্বপ্ন আসে বুঝি।
(কবিতা - যার কাছেই যাই)
গ্রন্থে আছে একাধিক (১২টি) গদ্য কবিতা। যতিচিহ্নহীন বাকি কবিতাগুলোর মধ্যেও আছে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিক। ‘ভাবচিত্র ও তিরিশে জুন’ কবিতার আঙ্গিক ব্যতিক্রমী। ‘হালফিল’ কবিতাটির বাইরে ছন্দের পথে হাঁটেননি কবি যদিও নিমগ্ন পাঠে পঙ্ক্তিগুলোর মধ্যে থাকা এক অন্তর্নিহিত ছন্দকে অস্বীকার করা যায় না একেবারেই। কবির পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের কবিতার সঙ্গে কিছুটা পরিবর্তনও পরিলক্ষিত হয়েছে আলোচ্য গ্রন্থে। একদিকে যেমন শব্দস্থাপনার ক্ষেত্রে এসেছে অধিকতর সারল্য আবার পাশাপাশি কাব্যভাবনায়ও লক্ষ করা গেছে এক ভিন্নতর অনুষঙ্গ। প্রচ্ছদের সাদা রং সেদিক থেকেও প্রাসঙ্গিক বটে।
৯৯ পৃষ্ঠার গ্রন্থের ছাপাই ও বাঁধাই তথা অক্ষর, শব্দ বিন্যাস যথাযথ। শূন্য ব্লার্ব ও দু’একটি বানানের বাইরে পত্রলেখা থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থ ত্রুটিমুক্ত। শেষ প্রচ্ছদে অবশ্য কবির পরিচিতি সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে - ‘মিতালিকে...’। সব মিলিয়ে রূপবৃত্তে, ছায়াবৃত্তে এক গভীর জীবনবোধের কাব্যসংকলন।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
মূল্য - ১৩০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৩১০৭৩৬৪৮৪
যোগাযোগ - ৯৩১০৭৩৬৪৮৪

Comments
Post a Comment