Skip to main content

প্রত্যয়ের বার্তা নিয়ে প্রকাশিত লোকসংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘লোকজ’


‘লোকজ’ - জাতীয় লোকসংস্কৃতি পরিষদের লোকসংস্কৃতি বিষয়ক ষাণ্মাসিক পত্রিকা। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকাটির আত্মপ্রকাশ সংখ্যা (প্রথম বর্ষ, অক্টোবর ২০২৩)। সম্পাদক তিনজন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে অমিত চট্টোপাধ্যায়, ত্রিপুরা থেকে মন্টু দাস ও আসাম থেকে অহীন্দ্র দাস। বলাই বাহুল্য এই তিনজনই লোকসাহিত্য, লোকসংস্কৃতি বিষয়ে স্বমহিমায় ভাস্বর। সুতরাং বিষয় বৈচিত্র্যে পত্রিকা যে ব্যতিক্রমী হওয়ার দাবি রাখে তা নিশ্চিত।
প্রথমেই শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির অপূর্ব মেলবন্ধনে অঙ্কিত চমৎকার প্রচ্ছদ দৃষ্টি আকর্ষণ করে নেয় পাঠকের। অহীন্দ্র দাসের প্রচ্ছদ নিঃসন্দেহে পত্রিকার মান বৃদ্ধি করেছে বহুগুণ। প্রাথমিক পর্বে ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলেও সম্পাদকবৃন্দ দীর্ঘ পথ চলার প্রত্যয় ও ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন সম্পাদকীয়তে। পরবর্তী পৃষ্ঠা থেকেই শুরু হয়েছে একের পর এক বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ নিবন্ধ। লোকসংস্কৃতি বিষয়ে কাব্য রচনা সহজ না হলেও এ সংখ্যায় সন্নিবিষ্ট হয়েছে সাত সাতটি কবিতা।
চোখ রাখা যাক একে একে প্রবন্ধসমূহের দিকে। ত্রিপুরার কথাশিল্পী জহর দেবনাথ। লিখেছেন  নিবন্ধ ‘লোকসংস্কৃতির আঙ্গিকে ঊনকোটি ও লংতরাই পাহাড়’। ত্রিপুরার পাহাড়ের অন্দরে লুকিয়ে থাকা লোক সংস্কৃতির অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত কথার এক সুলিখিত এবং সমৃদ্ধ ভূমিকাসম্বলিত নিবন্ধ। লোকসংস্কৃতির বিস্তৃত সংজ্ঞা প্রাঞ্জল ভাবে বর্ণিত করেছেন লেখক। ‘লোক সংস্কার ও সংস্কৃতির বিহঙ্গম পরিচয়’ শীর্ষক নিবন্ধে বঙ্গে এবং বাঙালি সমাজে প্রচলিত কিছু ধাঁধা, হেঁয়ালি, প্রবাদ ইত্যাদির উপর লিখিত নিবন্ধ লিখেছেন ড. গীতা সাহা। পরিসর সংক্ষিপ্ত না হলেও বিষয়ের ব্যাপ্তির কথা মাথায় রেখে নিবন্ধটি সংক্ষিপ্ত বলেই উল্লেখ করতে হবে। শুক্লা মিশ্রের ‘মাঘব্রত’ শীর্ষক অনুচ্ছেদের পরই আসছে এ সংখ্যার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ - ড. চিত্তরঞ্জন মাইতির ‘প্রচারের আড়ালে থাকা শিল্পসাধক নিখিল চন্দ্র দাস’। এক পটশিল্পীর জীবন ও কর্ম নিয়ে বিস্তৃত এক প্রতিবেদন। এতটাই নিখুঁত যে ভাষায়, বর্ণনায় যেন জীবন্ত করে তুলেছেন শিল্পীকে। এই নিবন্ধে মুদ্রণ বিভ্রাটের ফলে লেখক পরিচিতি প্রথমে বা শেষে না এসে নিবন্ধের মাঝখানে এসে যাওয়ায় ব্যাহত হয়েছে সরল পঠন। এর পর লোকসংস্কৃতি, লোকশিল্প ও লোকসাহিত্যের প্রাথমিক পরিচিতি বিষয়ক তাত্ত্বিক নিবন্ধ রয়েছে অন্যতম সম্পাদক অমিত চট্টোপাধ্যায়ের। ড. সুভাষ রায় লিখেছেন ‘পুরুলিয়ার টুসু গানে মেয়েদের কথা’। অনেক অজানা কথা থাকলেও সম্ভবত অধিক বিস্তৃতির সুযোগ ছিল। আরোও একজন সম্পাদক অহীন্দ্র দাসের নিবন্ধের শিরোনাম ‘লোকসংস্কৃতিতে কল্কি নারায়ণ ঠাকুরের সেবা’। বিষয়টি অনেকের কাছেই নতুন ঠেকবে যদিও প্রাবন্ধিক এ বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ অধ্যয়নসঞ্জাত অনুভব ব্যক্ত করেছেন গরজ দিয়ে। পুরুষ পরিচালিত এক ব্যতিক্রমী ব্রত অনুষ্ঠানের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন। ব্রত কথায় ভাষার মিশ্রণ এবং এক অসমাপ্ত ভাব প্রত্যক্ষ করা গেছে পাঠশেষে। হয়তো পরিসরের অভাবে লেখক নিজেকে সংযত রেখেছেন বৃহত্তর স্বার্থে।
সিন্ধু রায়ের ‘করমা উয়সব’ একটি প্রাণবন্ত রচনা। লেখকের রচিত গানটি নিবন্ধের মান বর্ধন করেছে নিশ্চিত। এর পর রয়েছে আরোও একটি শ্রেষ্ঠ রচনা। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই গ্রাম্য পরিবেশে পরিবেশিত মহিলাদের একটি সমবেত গান উপভোগ করেছেন। গানটি এরকম ছিল - ‘সাঁঝের বেলায় যমুনার জল আনতে যাবে কে...’। সামনে পটচিত্র রেখে পরিবেশিত এই গানের সেই পটশিল্প বিষয়টিকে নিয়েই এই রচনা - অরূপ কুমার ভুঁইঞার ‘পটশিল্প, পটুয়া সমাজ - মেদিনীপুর’। তুলে এনেছেন বিষয় সম্পর্কিত অন্দরমহলের কথা। বিস্তৃত হলেও মনে হয় আরোও কিছু রয়ে গেল বাকি। সুচিত্রা সেন লিখেছেন ‘লোককথায় চাঁদ চরিত্র’। মনসা আখ্যান খ্যাত  চাঁদ সওদাগরের উপর বিস্তৃত প্রতিবেদন।
আরোও একজন সম্পাদক মন্টু দাস লিখেছেন আরোও একটি শ্রেষ্ঠ রচনা - বাঘাই সেবা ও প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়’। বিস্তৃত এক অঞ্চল জুড়ে পালিত বাঘাই সেবার সাতকাহন। ভূমিকা থেকে উপসংহার অবধি লোকসংস্কৃতি বিষয়ক এক স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন। এর পর লোকসংস্কৃতিকে মননে রেখে সাতটি কবিতা লিখেছেন শিবানী গুপ্ত, নারায়ণ মোদক, সুচরিতা সিংহ, শিখা দাশগুপ্ত, শুক্লা চন্দ, চান্দ্রেয়ী দেব ও ড. গীতা সাহা। সুদীপ ভট্টাচার্য ব্যতিক্রমী বিষয় হিসেবে ‘বিকেলের সোনারোদে’ শিরোনামে লিখেছেন লোকজ খেলাধূলা ও ক্রীড়াসংস্কৃতি নিয়ে এক গোছালো অথচ সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন। ‘রথযাত্রা’ শীর্ষক গীতা মুখার্জির অনুচ্ছেদের পর রয়েছে প্রতিমা শুক্লবৈদ্যের প্রতিবেদন ‘সিলেটি ডিটান - একটি স্বল্প রূপরেখা’। স্বল্প অর্থে অনেকটাই সংক্ষিপ্ত। বারোটি হারিয়ে যাওয়া লৌকিক ব্রত ও পূজা বিষয়ক এক মূল্যবান নিবন্ধ লিখেছেন গোপাল চন্দ্র দাস। অনুসন্ধানমূলক এক সাধু উদ্যোগ নিঃসন্দেহে। ‘কবিগান ও প্রয়াত উমেশচন্দ্র নাথ’ কে নিয়ে লেখা নিবারণ নাথের নিবন্ধ প্রাসঙ্গিক এবং সুলিখিত হলেও অধিক বিস্তৃতির দাবি রাখে।
শেষ পৃষ্ঠায় রয়েছে সংস্থার লোকসংস্কৃতি বিষয়ক ইতিপূর্বে প্রকাশিত গ্রন্থ আলোচনার পুনর্মুদ্রণ। সব মিলিয়ে আত্মপ্রকাশ সংখ্যা হিসেবে একশো ভাগ সফল এই উদ্যোগ এ কথা বলা যায় প্রত্যয় নিয়েই। তবে একই পৃষ্ঠায় নতুন নিবন্ধের অবতারণা দৃষ্টিকটু হয়েছে। স্পষ্ট ছাপা ও অক্ষর বিন্যাস যদিও বানান ও ছাপার ভুল রয়ে গেছে বেশ কিছু। পরবর্তীতে এ নিয়ে অধিক সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে অবশ্যই। অলংকরণ ও কাগজের মান নান্দনিক ও যথোপযুক্ত। লোকজ শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির অন্দরমহলে থাকা অজানা আশ্চর্যের রূপ উদঘাটনের আশায় অতি অবশ্যই পরবর্তী সংখ্যা সমূহের অপেক্ষায় থাকবেন পাঠকবৃন্দ এমন প্রত্যয় জাগাতে পূর্ণমাত্রায় সফল আলোচ্য সংখ্যাটি।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৯৬১৮৯৫৫৩০

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...