Skip to main content

গরজের সম্ভার চতুর্দশ সংখ্যা স্মরণিকা 'শরণ্ময়ী'


একটি বারোয়ারি পূজা সমিতির দ্বারা আয়োজিত দুর্গা পূজার মতো একটি উৎসবের আয়োজন মনে হয় তখনই সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে যখন এই উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয় একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্মরণিকা। অর্থাৎ শারদীয় সংখ্যা। এবং সেই সূত্রে প্রতি বছরের মতো ২০২৩ বর্ষেও এমনই এক শারদীয় সংখ্যা ‘শরণ্ময়ী’ উপহার দিল গুয়াহাটির ‘ভাস্করনগর সর্বজনীন দূর্গা পূজা কমিটি’। এ নিয়ে সার্বিক চতুর্দশ সংখ্যা প্রকাশিত হল এই পত্রিকার।

পত্রিকা প্রকাশের আয়োজনে ত্রুটি নেই কোথাও। চমকপ্রদ প্রচ্ছদ সহ বিশাল ৯৬ পৃষ্ঠায় সন্নিবিষ্ট হয়েছে বাংলা, অসমিয়া ও ইংরেজি ভাষায় লিখিত একগুচ্ছ রচনা। এ বছরের পুজোর থীমের সঙ্গে মানানসই প্রচ্ছদের সৌজন্যে কে রয়েছেন তার উল্লেখ না থাকলেও সার্বিক অলংকরণে রয়েছেন অংশুমান বসু। একাধিক ছবি সহ রচনাসমূহের অলংকরণ নান্দনিক এবং হিসেবি হলেও একমাত্র দীর্ঘ কবিতাটিকে একটিমাত্র পৃষ্ঠায় সন্নিবিষ্ট করতে গিয়ে অক্ষরের মাপ (ফন্ট সাইজ) এতটাই ছোট করে ফেলা হয়েছে যে সাধারণ পাঠকের পক্ষে পড়তে অসুবিধে হতেই পারে। এটি অনায়াসে দু’পৃষ্ঠায় সাজানো যেত।

শ্রদ্ধাঞ্জলি, নিয়মিত শুভেচ্ছা বার্তা এবং পূজা কমিটির সভাপতি ও সম্পাদকের প্রতিবেদনের পর সম্পাদকীয় প্রতিবেদনে সম্পাদক (পত্রিকার ভাষায় অবশ্য সম্পাদিকা) লিখছেন - ‘শরণ্ময়ী ভাস্করনগর সর্বজনীন দুর্গা পূজার এক ঐতিহ্যময় প্রয়াস। শুধুমাত্র শখের সাহিত্য চর্চা নয়, সৃজনশীল সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে ‘শরণ্ময়ী’...।’ এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে যদিও এই পরিসর তার উপযুক্ত নয়। এবারের সংখ্যা সেজে উঠেছে একগুচ্ছ গদ্য পদ্যের সমাহারে। লিখেছেন নবীন ও প্রবীণ কবি সাহিত্যিকবৃন্দ। সূচিপত্রে বিভাগ বিন্যাস অসম্পূর্ণ। পৃষ্ঠানুযায়ী বিন্যস্ত। বাংলা বিভাগে কবিতা লিখেছেন উমা ভৌমিক, তুষারকান্তি সাহা, মীনাক্ষি চক্রবর্তী সোম, ভোলা সরকার, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী ও গৌতম দে। প্রথমে উল্লেখিত তিনজনের কবিতা দাগ কাটে পাঠক মনে। ‘মনের পাতা’য় একটি বাংলা কবিতা ও অসমিয়াতে একটি করে কবিতা ও ‘অনুভব’ লিখেছেন শুভম দাস। রচনাকার সম্ভবত অপ্রাপ্তবয়স্ক। সাধুবাদ জানাতেই হয় এই প্রয়াসের। এছাড়া অসমিয়া বিভাগে কবিতা আছে রাধিকা যশোধরার। ইংরেজি বিভাগে কবিতা লিখেছেন শ্রেয়া পাল, বৈশাখী পাল, সীমা পুরকায়স্থ রায়, দীপাংক্ষি সহরিয়া।  

প্রবন্ধ লিখেছেন বাংলা বিভাগে ড. নন্দিতা ভট্টাচার্য গোস্বামী, জহরলাল সাহা (এক পৃষ্ঠার তথ্যভিত্তিক এই অণু নিবন্ধের সঙ্গে রয়েছে একটি আবেগিক কবিতাও), খগেনচন্দ্র দাস, প্রভাতকুমার ঘোষ, অরবিন্দ ভট্টাচার্য, সন্দীপ মজুমদার, কমলাংশু দত্ত পুরকায়স্থ, মণিদীপা সরকার, অলকা সেন (ভ্রমণ কাহিনি), মদনগোপাল গোস্বামী ও সঞ্জীব রায় (অণুনিবন্ধ)। প্রতিটি নিবন্ধই সুলিখিত, তত্ত্ব ও তথ্যভিত্তিক। অসমিয়া বিভাগে নিবন্ধ লিখেছেন ডা. রবীন মজুমদার ও মৃণালকান্তি মেধি। ইংরেজি প্রবন্ধ রচনায় কলম ধরেছেন অনীশা রায়, অভিরাজ বোস, দেবস্মিতা বিশাস, বনশ্রী সরকার, ড. শশাঙ্ক চ্যাটার্জি ও দেবজিত মজুমদার। সব মিলিয়ে এই বিভাগট যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়েছে বলা যায়।  

ছোটগল্প আছে শুধু বাংলা বিভাগেই। লিখেছেন রমাপদ ভট্টাচার্য, মধুমিতা সেনগুপ্ত, বিভাস রায় ও বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী। মধুমিতার গল্প এ সংখ্যার শ্রেষ্ঠ সম্পদ নিঃসন্দেহে। বিভাস রায়ের বড় গল্প ঘটনাবহুল হলেও উপস্থাপনায় অধিক উৎকর্ষের চাহিদা রয়ে গেল। বিশ্বজিতের গল্পের শিরোনাম প্রবন্ধ-সুলভ ঠেকেছে।

একটি সাময়িক পত্রিকার দায় অনেক। শুধু আমন্ত্রিত কবি সাহিত্যিকদের রচনা সন্নিবিষ্ট করা নয়। উপযুক্ত পরিমাণে উঠতি কবি লেখকদেরও তুলে ধরতে হয়। আর যদি অঞ্চলভিত্তিক পত্রিকা হয় - যেমন শারদীয় উৎসবের অঙ্গস্বরূপ স্মরণিকা ইত্যাদি - সেখানে আঞ্চলিক লিখিয়েদেরও স্থান করে দিতে হয়। শরণ্ময়ী সেই ধর্মটুকু বজায় রেখেছে যথাযথ। ফলত রচনাসমূহের মান এখানে মুখ্য নয়। কিছু কিছু রচনায় সেই অভাব বোধ হয়েছে স্বভাবতই। তবে বানানের শুদ্ধতা কিন্তু আখেরে সম্পাদকের উপরই বর্তায়। এ কাজে সম্পাদক মাম্পি গুপ্ত নিজে সচেতন হলেও এই সংখ্যায় এদিকটায় যে কেন গুরুত্ব আরোপ করা হল না তা অবোধ্য। পরবর্তী সংখ্যাগুলোতে এদিকে অধিক সচেতন হওয়া একান্ত আবশ্যক। বানান সম্পর্কে পত্রিকা নাম ‘শরণ্ময়ী’ নিয়েও হয়তো চিন্তা চর্চার প্রয়োজন রয়েছে।

বানান ও অক্ষরবিন্যাসের এই স্বল্পতাটুকুর বাইরে ধারে ও ভারে এক উল্লেখযোগ্য পত্রিকা ‘শরণ্ময়ী’। ছাপা, বাঁধাই, কাগজের মান যথেষ্ট ভালো। নবীন ও প্রবীণ, নবিশ ও নামি দামি কবি লেখকদের উপযুক্ত অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব একটি স্মরণিকার সার্বিক সাফল্যই সূচিত করে। ‘শরণ্ময়ী’ চতুর্দশ সংখ্যাও তাই নিজেকে এক নান্দনিক ধারাবাহিকতার পরিচায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে।

                                       বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
মূল্য - অনুল্লেখিত
যোগাযোগ - ৯৮৬৪৩০৫২০৪                 

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...