Skip to main content

ভালোবাসা ও ভ্রমণের নিরবচ্ছিন্ন পঠন ‘অলকানন্দার তীরে’


কাহিনি, তার ব্যাপ্তি, তার চলন, চমক, মোড়, বুনোট ও উপস্থাপনাই একটি উপন্যাসের প্রধানতম প্রতিপাদ্য উত্তরপূর্বের ঔপন্যাসিকদের মধ্যে দেশভাগ ও তজ্জনিত সৃষ্ট কাহিনিই সর্বাপেক্ষা পছন্দের এই বিষ্যটির উপরই লেখা হয়েছে সবচাইতে বেশি গল্প, উপন্যাস, গদ্য তবে এর যে ব্যত্যয় নেই তাও নয় দেশভাগ পূর্ববর্তী কাহিনি যেখানে নিতান্তই বিরল আজকের দিনে সেখানে তৎপরবর্তী ঘটনাসমূহকে প্রতিপাদ্য করে লেখা হয়েছে বহু কাহিনি যেখানে স্থান পায়নি দেশভাগ সেরকমই এক সম্পূর্ণ দেশজ কাহিনিভিত্তিক উপন্যাসঅলকানন্দার তীরে পরিতোষ তালুকদার এ অঞ্চলের খ্যাতনামা গদ্যকার তাঁর একাধিক গল্প সংকলন ও উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে ইতিমধ্যেই সম্প্রতি হাতে এল তাঁর সর্বশেষ উপন্যাসটি
এই উপন্যাসের ধর্ম নির্ধারণ করা খানিকটা জটিল কাজ নিঃসন্দেহে তবে উপন্যাসের সবচাইতে পাঠকপ্রিয় দুই বিষয়কে এক করে দিয়ে যেভাবে এগিয়েছে কাহিনি তাতে পাঠকসমাজে উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে সর্বাংশে গ্রহণযোগ্য। সমান্তরালভাবে তাই উপন্যাসটিকে আখ্যায়িত করা যায় প্রেমধর্মী এবং ভ্রমণধর্মী উপন্যাস হিসেবে। নির্ণায়ক সিদ্ধান্তের ভার তাই তোলা রইল পাঠকের জন্যই। উত্তরপূর্বেরই এক শহরের দুই অপরিচিত নায়ক ও নায়িকা বেরিয়েছেন চারধাম যাত্রায়। ট্রেনে ওঠার আগে ওয়েটিং রুমে তাদের পরিচয়। সেই থেকে শুরু করে গোটা ভ্রমণপর্বের ধাপে ধাপে অনেকটাই কাছাকাছি চলে এসেছেন একে অপরের। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা অন্য এক ভ্রমণার্থী দলের সঙ্গে মিশে ভ্রমণপর্ব যত এগিয়েছে প্রেমের অনুষঙ্গও হয়ে উঠেছে চিত্তাকর্ষক। লেখক যতটা সম্ভব দুই অনুষঙ্গকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে বুনন করেছেন কাহিনির। গোটা উপন্যাস জুড়েই সতর্কিত ব্যালান্সের প্রয়াসে একদিকে যেমন পাঠকমনে সঞ্চারিত হয়েছে সাময়িক উদবেগের অন্য দিকে লেখককেও মনোযোগ দিতে হয়েছে সচেতনতার বিষয়টিতেএখানেও মুনশিয়ানার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন উপন্যাসকার।   
কাহিনির চলন অর্থাৎ বুনোটই হচ্ছে উপন্যাসের আসল দিক। এখানে স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে কিছু পারিপার্শ্বিকতার অনুষঙ্গ। আলোচ্য উপন্যাসেও তাই হয়েছে। কথায় কথায় এসেছে দেশ ও সমাজের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ইতিহাস, ধর্মীয় আখ্যান, স্থানমাহাত্ম্য, প্রকৃতির বর্ণনা, চরিত্রসমূহের ব্যক্তিগত বিষয় ভাবনা, প্রেম ভালোবাসার বিচিত্র আঙ্গিক ইত্যাদি। তবে কিছুটা একতরফা ভাবেই এসেছে সাম্প্রতিক রাজনীতির বিষয় যা হয়তো ইচ্ছাকৃত ভাবেই জুড়ে দিয়েছেন লেখক তাঁর নিজস্ব ধ্যানধারণার প্রচারের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। সর্বসাধারণ পাঠক হয়তো এসব বিষয়ে একমত নাও হতে পারেন।
মূলত হরিদ্বার থেকে বদ্রিনাথ ও ফিরে আসার অনুষঙ্গেই জমে উঠেছে উপন্যাস। পাশাপাশি প্রস্ফুটিত হয়ে গিয়েছে নায়ক-নায়িকার প্রেম ভালোবাসার পর্ব। অন্তর্নিহিত যৌনতা কখনও ছাড়ায়নি সীমারেখা। তাই পঠনযোগ্য হয়ে উঠেছে আপামর পাঠকের কাছে। কিছু গোপনীয় বিষয়ের সামনে চলে আসার মতো উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সূচনা হয়েও সহসাই নির্বাপিত হয়েছে বার বার। এসব ক্ষেত্রে খানিকটা বিস্তৃতির সুযোগ হয়তো ছিল। প্রকৃতার্থে ভ্রমণপর্বের বৈচিত্র্যময় বর্ণনায় মজে থাকার ফাঁকে ফাঁকে শালীনতাবোধের মাত্রা না ছাড়িয়ে এমন প্রেমপর্ব উন্মুখ পাঠকের কাছে হয়ে উঠেছে নান্দনিক ও গ্রহণযোগ্য হয়ে। ব্যক্তিগত শালীনতার পরিমিতি যেমন রয়েছে অক্ষত তেমনি কাহিনি জমে ওঠার পর থেকে অহেতুক প্রসঙ্গের অবতারণা থেকেও লেখক নিজেকে রেখেছেন নিবৃত। হিমালয়ের কোলে ছোট ছোট জনপদে বিপদসংকুল যাত্রার বর্ণনায় শিহরিত হতে বাধ্য পাঠকমন। প্রতিটি ধর্মীয় স্থানের মাহাত্ম্য, সেখানে করণীয় কাজকর্মের খতিয়ানও এসেছে কাহিনিরই খাতিরে, কোথাও বাহুল্য বলে মনে হয়নিফলত এই উপন্যাস একাধারে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে এক ভ্রমণগাইড হিসেবেও।
কাহিনির পরিসমাপ্তি প্রতিটি উপন্যাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানে কতটা সফল হয়েছেন আলোচ্য উপন্যাসের লেখক তা নিয়ে হয়তো দ্বিধাবিভক্ত হতে পারেন পাঠক। কিছুটা পুরোনো ধাঁচের এক সমাপন লক্ষ করা যায় এখানে। কিছু তথ্যজনিত বৈসাদৃশ্যের অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মাত্র দু’আড়াই মাসের ব্যবধানে একটি মানুষ কী করে আকর্ষণীয় থেকে বৃদ্ধের পর্যায়ে চলে যেতে পারেন তা হয়তো বোধগম্য নাও হতে পারে। সমাপ্তিপর্বটিকে ভিন্নধারায়ও গঠন করা যেত - হয়তো। তবে এই সমাপনও যথেষ্ট ঘটনাবহুল এবং উত্তেজনাকর।  
কাহিনিনির্ভর বড্ড খোলামেলা চলনে এগিয়েছে উপন্যাস। সাহিত্যরস সিঞ্চনে উপন্যাসকারের বিরুদ্ধে কৃপণতার অভিযোগ ওঠার ব্যাপারটিকেও নস্যাৎ করা যায় না। অবশ্য পরিতোষ বরাবরই কথননির্ভর গদ্যে সিদ্ধহস্ত। সাহিত্যের চাইতে কাহিনি, বক্তব্যনির্ভর গদ্যেই তিনি অধিক পারদর্শী।
উপন্যাসের প্রাথমিক পর্বে কিছু বানান ভুল, কি ও কী-এর বিচ্যুতি এবং কিছু শব্দগুচ্ছের পুনর্মুদ্রণে বিভ্রাট ঘটলেও পরবর্তীতে এসব কেটে গিয়ে এক সরল পঠনের সুযোগ এনে দিয়েছে পাঠকের সামনে। ঘটনার ঘনঘটায় আকর্ষিত হয়ে উঠেছেন পাঠক। ঘোরাঘুরির ফাঁকে নানা স্থানের অনবদ্য বর্ণনা, ঐতিহাসিক অনুষঙ্গ এবং পাশাপাশি দুই হৃদয়ের দোলাচল আর শঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে চক্রবৃদ্ধি হারে। কোথাও ব্যাহত হয়নি নিরবচ্ছিন্ন পঠন। এখানেই লেখকের স্বকীয়তা, কৃতকার্যতা।
১৫৯ পৃষ্ঠার পেপারব্যাকে উপস্থাপিত গ্রন্থের ছাপা ও অক্ষরবিন্যাস যথাযথ। পিন্টুর প্রচ্ছদ অর্থবহ ও শোভনীয়। বিকাশ প্রকাশন, গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত গ্রন্থটির শেষ প্রচ্ছদে রয়েছে লেখক পরিচিতি। সব মিলিয়ে এক নিরবচ্ছিন্ন পঠনের উপন্যাস ‘অলকানন্দার তীরে’। তবে উপন্যাসটি আইএসবিএন-যুক্ত নয় কেন বোঝা গেল না।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - ২৫০ টাকা

যোগাযোগ - ৯৯৫৪০১১৭৭৬

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...