বইয়ের জীবনও অনেকটা মানুষেরই মতো। আবির্ভাবের প্রাথমিক হইচই কাটিয়ে যত
পুরোনো হতে থাকে ততই বাড়তে থাকে প্রাসঙ্গিকতা, বাড়তে থাকে তার কদর। ‘একাল’-এর পরিচিত আবহের সীমার বাইরে ‘সেকাল’-এর ঋদ্ধ যাপনকথার দলিল হয়ে উঠে পুরোনো বই। অর্থাৎ কিনা পুরোনো চাল যেমন ভাতে
বাড়ে তেমনি পুরোনো বইয়ের ক্ষেত্রে বেড়ে যায় তার গুণগত মূল্য।
এমনই একটি কাব্যগ্রন্থ হাতে এসেছে সম্প্রতি। গ্রন্থনাম ‘নৌকো করে মামার বাড়ি যাব’। কবি হৃষিকেশ নাথ। গ্রন্থনাম এবং তার আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ পাঠক হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে ‘প্রথম দেখাতেই প্রেম’। ভেতরেও রয়েছে বৈচিত্র্যের সমাবেশ। এই নৌকো করে মামার বাড়ি যাওয়ার এক অন্তর্গত কল্পিত ছবি সতত প্রবহমান হয়ে আছে উত্তরপূর্বের পাঠকপ্রজন্মের মনন চিন্তনে। সেই পূর্ববর্তী প্রজন্মের ছেড়ে আসা দেশের গল্পগাথা।
ভেতরে খুঁজতে গিয়েও বহু কবিতায় পাওয়া গেছে সেই অনুষঙ্গ। তবে সার্বিক বিচারে গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে একাধারে বহুধাবিভক্ত অনুভূতি, সমাজ সচেতনতা, দেশকাল সম্পর্কিত অব্যবস্থা, অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও শ্লেষ আদি। ১১২ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের ১০২ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে মোট ৫৬টি কবিতা - যার মধ্যে ২৫টি নির্বাচিত কবিতা নেয়া হয়েছে কবির পূর্ববর্তী সংকলন ‘আমার জন্মদিন ২১শে ফেব্রুয়ারি’ থেকে। সেই হিসেবে পুরো কবিতাপর্বকে দুভাগে বিন্যস্ত করা যায়। প্রথম পর্বের ৩১টি কবিতায় লক্ষ করা যায় ছড়ানো বৈচিত্র্য। এখানে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে রয়েছে দু’লাইন থেকে শুরু করে পাঁচ পৃষ্ঠা জোড়া দীর্ঘ কবিতাও।
অধিকাংশ কবিতাই গদ্য আঙ্গিকে লিখা হয়েছে। বিপরীতে কাব্যিকতার স্বাদযুক্ত কিছু কবিতাও রয়েছে। গদ্য কবিতায় নিখাদ গদ্য আঙ্গিকের কিছু পঙক্তি, কিছু কবিতায় বেমানান শব্দ এবং কিছু তৎসম শব্দের প্রবেশ ঘটলেও অনুভবের প্রকাশে উতরে গেছে বলা যায় সেসব। কাব্যময়তায় ভরপুর কিছু কবিতা আবার পাঠক হৃদয়ে জাগিয়ে তুলতে সমর্থ হয়েছে কবিতার পাঠস্পৃহা। তেমনই কিছু পঙক্তি উল্লেখনীয় -
কোনখানে রাখি বলো অগ্নি হৃদয়
সমস্ত হৃদয় জুড়ে চৈত্র মাস
জীবন পথ হেঁটে হেঁটে তেপান্তরের মাঠ
কোথায় রাখি বলো দহন জিজ্ঞাসা
থরে থরে ছেয়ে আছে অম্লান পাথর
পূর্ণিমার চাঁদে আজ ধরেছে গ্রহণ।
কবিতায় জ্বলছ তুমি পুড়ছে হৃদয়
চিতাভস্মে জল ঢালা অগ্নি প্রক্ষালন। (কবিতা - অগ্নি হৃদয়)
কিংবা -
তোমার এতটুকু স্পর্শের জন্য
হেঁটেছি হাজারো মাইল
আমার একটি চুম্বনে কেঁপেছে
তোমার অচঞ্চল পৃথিবী
এখন হাঁটু গেড়ে বলি
তোমার ওইসব কম্পন দাও
আমি নাড়া দিই দেশটাকে পৃথিবীটাকে
হাত পেতে বলি - উষ্ণতা দাও
পুড়িয়ে শুদ্ধ করি আগাছা ধরিত্রী
ভালো নেই খোকন মাসি, রহিমের মা
ভালো নেই পিতৃপরিচয়হীন টুম্পা
কাজের মেয়ে সোমা।
ভালো নেই আমি......
তুমি কেমন আছো তিলোত্তমা ? (কবিতা - আমার অসুস্থ ভাবনার কাব্য নাটিকা)
কিছু কবিতা এমনি করেই জন্ম দেয় একরাশ জিজ্ঞাসা, জন্ম দেয় পঠনসুখের আবিলতা। উল্লেখ্য কবিয়াত - স্বপ্ন, জয়ধ্বনি, বকুল, এক বাসের যাত্রী, একদম ঠিক হয়নি, সংলাপ, কিশোর ও আমি, বয়স এবং তার রকমফের, ঘুম ভাঙার গান, বসন পরো মা, আমি তখনও জন্মাইনি, রমধনু, স্বাধীন রাজার শেষ সংলাপ, ব্যবস্থা দাও উপায় বলো ইত্যাদি। ভাষা মায়ের সচেতন সন্তান কবির ভাষা বিষয়ক কবিতা ‘চেতনার রং লাল’ শীর্ষক কবিতার প্রথম স্তবক উদ্ধৃত করার লোভ সামলানো গেল না -
ভাষা মরে ; ভাষা জন্ম নেয়
মৃত্যু বড়ই অসহনীয় ! পূর্বপুরুষ
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শুধু...
২১ ফেব্রুয়ারি এক খণ্ড সূর্য
১৯ মে হাতে দিল চন্দ্র
জপা অজপা প্রাণবায়ু
দীক্ষা নিলাম... দীক্ষা নিলাম শুধুই মন্ত্র
উচ্চারণ নেই, উচ্চারণ করো।
পাঁচ পৃষ্ঠা জোড়া গ্রন্থের দীত্তঘতম কবিতা ‘আর ভালো লাগছে না’। কবি যেন তাঁর অন্তরে জমায়িত যাপিত কালের যাবতীয় অনুভবকে উজাড় করে দিয়েছেন। পাশাপাশি যাবতীয় অব্যবস্থার বিরুদ্ধে উগরে দিয়েছেন যাবতীয় ক্ষোভ।
দ্বিতীয় পর্বে কবি তাঁর প্রিয় ভাষা, প্রিয় দেশ, প্রিয় মানুষ, প্রিয়তমাকে নিবেদন করেছেন জন্মদিনের শুভেচ্ছার আঙ্গিকে ভালো লাগা, ভালো থাকার মন্ত্রগান। গভীর অর্থবহ ব্যঞ্জনায় তুলে এনেছেন যাপিত জীবনের সুখ দুঃখ বিরহ ব্যথা। অতীতকে যেন ছড়িয়ে দিয়েছেন মুঠো মুঠো কবিতার আঙ্গিকে। এই পর্বের শেষ কবিতায় নিজেকে রহস্যের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে পাঠককে জানিয়ে দিয়েছেন তাঁর ভালো লাগার উদ্দেশ - ‘তোমার জন্মদিন - ১৫ই আগস্ট/ তোমার জন্মদিন - ২৬শে জানুয়ারি/ তোমার জন্মদিন - ২১শে ফেব্রুয়ারি/ তোমার জন্মদিন - ২৫শে বৈশাখ’।
কয়েকটি ছাপার ভুলের বাইরে বানান ভুলের আধিক্য সংকলনটির গরিমা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ করেছে নিশ্চিত। এমনকি একটি কবিতায় ১০ বার ‘লাশ’ শব্দটির জায়গায় ‘লাস’ ছাপা হয়েছে। এই সমস্যা এ অঞ্চলের বই প্রকাশের ক্ষেত্রে চলে আসছে কালাবধি। এখানেও তাই হয়েছে। প্রাপ্তিস্থান এবং সহযোগিতায় অক্ষর পাবলিকেশনের নাম উচ্চারিত হলেও প্রকাশকের উল্লেখ নেই কোথাও।
একাধারে রূপা নন্দীঘোষের চমৎকার প্রচ্ছদ, পাকা বাঁধাই এবং কাগজের মান তথা যথাযথ বর্ণ সংস্থাপন সহ সার্বিক ছাপাইয়ের কাজও মানসম্পন্ন হয়েছে বলা যায়। সব মিলিয়ে গভীর গরজের এই কাব্য সংকলন উত্তর পূর্বের কাব্যবিশ্বে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে দ্যোতনায়, বয়ানে ও উপস্থাপনায় - এ অনস্বীকার্য।
এমনই একটি কাব্যগ্রন্থ হাতে এসেছে সম্প্রতি। গ্রন্থনাম ‘নৌকো করে মামার বাড়ি যাব’। কবি হৃষিকেশ নাথ। গ্রন্থনাম এবং তার আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ পাঠক হৃদয়ে জাগিয়ে তোলে ‘প্রথম দেখাতেই প্রেম’। ভেতরেও রয়েছে বৈচিত্র্যের সমাবেশ। এই নৌকো করে মামার বাড়ি যাওয়ার এক অন্তর্গত কল্পিত ছবি সতত প্রবহমান হয়ে আছে উত্তরপূর্বের পাঠকপ্রজন্মের মনন চিন্তনে। সেই পূর্ববর্তী প্রজন্মের ছেড়ে আসা দেশের গল্পগাথা।
ভেতরে খুঁজতে গিয়েও বহু কবিতায় পাওয়া গেছে সেই অনুষঙ্গ। তবে সার্বিক বিচারে গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে একাধারে বহুধাবিভক্ত অনুভূতি, সমাজ সচেতনতা, দেশকাল সম্পর্কিত অব্যবস্থা, অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও শ্লেষ আদি। ১১২ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের ১০২ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে মোট ৫৬টি কবিতা - যার মধ্যে ২৫টি নির্বাচিত কবিতা নেয়া হয়েছে কবির পূর্ববর্তী সংকলন ‘আমার জন্মদিন ২১শে ফেব্রুয়ারি’ থেকে। সেই হিসেবে পুরো কবিতাপর্বকে দুভাগে বিন্যস্ত করা যায়। প্রথম পর্বের ৩১টি কবিতায় লক্ষ করা যায় ছড়ানো বৈচিত্র্য। এখানে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে রয়েছে দু’লাইন থেকে শুরু করে পাঁচ পৃষ্ঠা জোড়া দীর্ঘ কবিতাও।
অধিকাংশ কবিতাই গদ্য আঙ্গিকে লিখা হয়েছে। বিপরীতে কাব্যিকতার স্বাদযুক্ত কিছু কবিতাও রয়েছে। গদ্য কবিতায় নিখাদ গদ্য আঙ্গিকের কিছু পঙক্তি, কিছু কবিতায় বেমানান শব্দ এবং কিছু তৎসম শব্দের প্রবেশ ঘটলেও অনুভবের প্রকাশে উতরে গেছে বলা যায় সেসব। কাব্যময়তায় ভরপুর কিছু কবিতা আবার পাঠক হৃদয়ে জাগিয়ে তুলতে সমর্থ হয়েছে কবিতার পাঠস্পৃহা। তেমনই কিছু পঙক্তি উল্লেখনীয় -
কোনখানে রাখি বলো অগ্নি হৃদয়
সমস্ত হৃদয় জুড়ে চৈত্র মাস
জীবন পথ হেঁটে হেঁটে তেপান্তরের মাঠ
কোথায় রাখি বলো দহন জিজ্ঞাসা
থরে থরে ছেয়ে আছে অম্লান পাথর
পূর্ণিমার চাঁদে আজ ধরেছে গ্রহণ।
কবিতায় জ্বলছ তুমি পুড়ছে হৃদয়
চিতাভস্মে জল ঢালা অগ্নি প্রক্ষালন। (কবিতা - অগ্নি হৃদয়)
কিংবা -
তোমার এতটুকু স্পর্শের জন্য
হেঁটেছি হাজারো মাইল
আমার একটি চুম্বনে কেঁপেছে
তোমার অচঞ্চল পৃথিবী
এখন হাঁটু গেড়ে বলি
তোমার ওইসব কম্পন দাও
আমি নাড়া দিই দেশটাকে পৃথিবীটাকে
হাত পেতে বলি - উষ্ণতা দাও
পুড়িয়ে শুদ্ধ করি আগাছা ধরিত্রী
ভালো নেই খোকন মাসি, রহিমের মা
ভালো নেই পিতৃপরিচয়হীন টুম্পা
কাজের মেয়ে সোমা।
ভালো নেই আমি......
তুমি কেমন আছো তিলোত্তমা ? (কবিতা - আমার অসুস্থ ভাবনার কাব্য নাটিকা)
কিছু কবিতা এমনি করেই জন্ম দেয় একরাশ জিজ্ঞাসা, জন্ম দেয় পঠনসুখের আবিলতা। উল্লেখ্য কবিয়াত - স্বপ্ন, জয়ধ্বনি, বকুল, এক বাসের যাত্রী, একদম ঠিক হয়নি, সংলাপ, কিশোর ও আমি, বয়স এবং তার রকমফের, ঘুম ভাঙার গান, বসন পরো মা, আমি তখনও জন্মাইনি, রমধনু, স্বাধীন রাজার শেষ সংলাপ, ব্যবস্থা দাও উপায় বলো ইত্যাদি। ভাষা মায়ের সচেতন সন্তান কবির ভাষা বিষয়ক কবিতা ‘চেতনার রং লাল’ শীর্ষক কবিতার প্রথম স্তবক উদ্ধৃত করার লোভ সামলানো গেল না -
ভাষা মরে ; ভাষা জন্ম নেয়
মৃত্যু বড়ই অসহনীয় ! পূর্বপুরুষ
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শুধু...
২১ ফেব্রুয়ারি এক খণ্ড সূর্য
১৯ মে হাতে দিল চন্দ্র
জপা অজপা প্রাণবায়ু
দীক্ষা নিলাম... দীক্ষা নিলাম শুধুই মন্ত্র
উচ্চারণ নেই, উচ্চারণ করো।
পাঁচ পৃষ্ঠা জোড়া গ্রন্থের দীত্তঘতম কবিতা ‘আর ভালো লাগছে না’। কবি যেন তাঁর অন্তরে জমায়িত যাপিত কালের যাবতীয় অনুভবকে উজাড় করে দিয়েছেন। পাশাপাশি যাবতীয় অব্যবস্থার বিরুদ্ধে উগরে দিয়েছেন যাবতীয় ক্ষোভ।
দ্বিতীয় পর্বে কবি তাঁর প্রিয় ভাষা, প্রিয় দেশ, প্রিয় মানুষ, প্রিয়তমাকে নিবেদন করেছেন জন্মদিনের শুভেচ্ছার আঙ্গিকে ভালো লাগা, ভালো থাকার মন্ত্রগান। গভীর অর্থবহ ব্যঞ্জনায় তুলে এনেছেন যাপিত জীবনের সুখ দুঃখ বিরহ ব্যথা। অতীতকে যেন ছড়িয়ে দিয়েছেন মুঠো মুঠো কবিতার আঙ্গিকে। এই পর্বের শেষ কবিতায় নিজেকে রহস্যের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে পাঠককে জানিয়ে দিয়েছেন তাঁর ভালো লাগার উদ্দেশ - ‘তোমার জন্মদিন - ১৫ই আগস্ট/ তোমার জন্মদিন - ২৬শে জানুয়ারি/ তোমার জন্মদিন - ২১শে ফেব্রুয়ারি/ তোমার জন্মদিন - ২৫শে বৈশাখ’।
কয়েকটি ছাপার ভুলের বাইরে বানান ভুলের আধিক্য সংকলনটির গরিমা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ করেছে নিশ্চিত। এমনকি একটি কবিতায় ১০ বার ‘লাশ’ শব্দটির জায়গায় ‘লাস’ ছাপা হয়েছে। এই সমস্যা এ অঞ্চলের বই প্রকাশের ক্ষেত্রে চলে আসছে কালাবধি। এখানেও তাই হয়েছে। প্রাপ্তিস্থান এবং সহযোগিতায় অক্ষর পাবলিকেশনের নাম উচ্চারিত হলেও প্রকাশকের উল্লেখ নেই কোথাও।
একাধারে রূপা নন্দীঘোষের চমৎকার প্রচ্ছদ, পাকা বাঁধাই এবং কাগজের মান তথা যথাযথ বর্ণ সংস্থাপন সহ সার্বিক ছাপাইয়ের কাজও মানসম্পন্ন হয়েছে বলা যায়। সব মিলিয়ে গভীর গরজের এই কাব্য সংকলন উত্তর পূর্বের কাব্যবিশ্বে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে দ্যোতনায়, বয়ানে ও উপস্থাপনায় - এ অনস্বীকার্য।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - অনুল্লেখিত
যোগাযোগ - অনুল্লেখিত

Comments
Post a Comment