Skip to main content

বিষয় ভাবনায়, আয়োজনে অনবদ্য উৎসব সংখ্যা ‘উপত্যকা’


একটি লেটার সাইজের পত্রিকার যখন ৭৮ পৃষ্ঠা জুড়ে থাকে লেখালেখির সম্ভার তখন ভারে যে সেই পত্রিকা অনেকখানিই পুষ্ট সেকথা অনস্বীকার্য। ত্রিপুরার ধলাই সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিশেষ উৎসব সংখ্যায়ও (চতুর্থ বর্ষ, চতুর্থ সংখ্যা - ২০২৩) তাই ব্যত্যয় ঘটেনি স্বভাবতই। এই সংস্থার দ্বারা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা সাধারণত বিষয়ভিত্তিক হয়ে থাকে। এ সংখ্যার বিষয় হচ্ছে নেশা ও নেশামুক্তি। জ্বলন্ত এবং প্রাসঙ্গিক বিষয় নিঃসন্দেহে।
উৎসবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চমৎকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন কৃতী প্রচ্ছদশিল্পী পুস্পল দেব। ভিতরের পাতায় রচনার সম্ভারের দিকে চোখ রাখা যাক এবার। বিষয়ভিত্তিক লেখা সংগ্রহ করা যে এক কঠিন কাজ তা আলোচ্য পত্রিকার সম্পাদকের ক্ষেত্রে উপলব্ধি করা যাবে না মোটেও। সব মিলিয়ে রয়েছে ছয়টি অণুগল্প, ৫৫ জন কবির একটি করে কবিতা, ৭ টি নিবন্ধ, ৮ টি গল্প, ৬ টি প্রবন্ধ এবং একটি ভ্রমণকাহিনি। প্রতিটি রচনাই যে বিষয়-ভিত্তিক তেমনটা অবশ্য নয়।  
প্রথমেই দুই পৃষ্ঠা জোড়া সম্পাদকীয়। নেশাগ্রস্ততার অন্ধকার দিক নিয়ে মূল্যবান সম্পাদকীয় সংখ্যাটিকে মর্যাদা প্রদান করতে সমর্থ হয়েছে সার্বিকভাবে। অণুগল্প বিভাগে প্রথম লেখা দেবোপম রায়-এর। ‘অস্ত্র’ অণুগল্পটি সুলিখিত এবং নিশ্চিত ভালো লাগার। শুভ নাথ ও বিশ্বজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অণুগল্প দুটিও সুখপাঠ্যএছাড়া রয়েছে মিঠুন রায় ও চৈতন্য দাসের অণুগল্প।
কবিতা বিভাগে রয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে কবিতার জগতে দাপিয়ে চলা কবিদের সঙ্গে কিছু নতুন কবিদেরও কবিতা। নানা স্বাদের কবিতা লিখেছেন মনিকা বড়ুয়া, মনোজ পাইন, জয়ন্তী দেবনাথ, সুশান্ত নন্দী, জাহানারা মজুমদার, সুজয় নিয়োগী, সুস্মিতা দেবনাথ, ইসমাইল জসীম, ভীষ্মদেব মণ্ডল, মোনালিসা রেহমান, হরিদাস দেবনাথ, মানসী মিশ্র হালদার, সন্দীপ সাহু, সুমিতা বর্ধন, কৃষ্ণকুসুম পাল, অমৃকা মজুমদার, সৌহার্দ্য সিরাজ, অপাংশু দাবনাথ, কল্যাণী দেবচৌধুরী, নিবারণ নাথ, নীতা কবি মুখার্জি, ইরেশ দেবনাথ, ড. অপর্ণা গাঙ্গুলি, রতন আচার্য, শিপ্রা রায়, শ্যামল রুদ্রপাল, জবা পাল রুদ্র, অভীককুমার দে, জগন্নাথ বণিক, শিপ্রা ঘোষ, সঞ্জীব দে, শুভজিৎ বোস, দিপ্সি দে, রণজিৎ রায়, সৌরভ পাত্র, রত্না দেব, অমলকান্তি চন্দ, মহঃ শামীম আফরোজ, সঞ্জীব ভট্টাচার্য, কিশোর কুমার অথিকারী, টিঙ্কুরঞ্জন দাস, অমূল্য ভৌমিক, মৌমিতা দাস, তুহিন কুমার চন্দ, রনি অধিকারী, দিলীপ মালাকার, দীপক রঞ্জন কর, বীরেন্দ্রনাথ মহাপাত্র, দিপালী দেবনাথ, স্বর্ণসিন্ধু শীল, সজল বন্দ্যোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন দেবনাথ, ভার্গব অধিকারী, সম্রাট ধর ও শঙ্করনারায়ণ ভট্টাচার্য।
নিবন্ধ ও প্রবন্ধের তুল্যমূল্য ফারাকের মধ্যেই দু’ভাগে বিন্যস্ত হয়েছে রচনাসমূহ। নিবন্ধ বিভাগে রয়েছে সাতটি রচনা। বিশেষোল্লেখে রাখা যেতে পারে বিজন বোস ও নিশীথরঞ্জন পাল-এর নিবন্ধ দু’টি। স্বপ্না চৌধুরী ভট্টাচার্য, নিরঞ্জন দাস, জবা চৌধুরী ও মঞ্জু চ্যাটার্জির নিবন্ধও প্রাসঙ্গিক। সত্যবচনে গোবিন্দ ধরের নিবন্ধ ব্যতিক্রমী। প্রবন্ধ বিভাগে বি সি দেববর্মা, মন্টু দাস ও সোহেল ফখরুদ দীন-এর লেখা বিষয়বহির্ভূত হলেও সমৃদ্ধ, তথ্যভিত্তিক রচনা। এছাড়াও বিষয়ভিত্তিক তথা বিষয়বহির্ভূত প্রবন্ধ রয়েছে ড. ব্রজগোপাল মজুমদার, সৈয়দ খায়রুল আলম ও ড. দেবব্রত দেবরায়-এর।
গল্প বিভাগে বেশ বৈচিত্র্য লক্ষ করা গেছে। হারাধন বৈরাগী, রীতা রায় ও লিপিকা আচার্য চৌধুরীর গল্প সুলিখিত, সুখপাঠ্য। এছাড়াও রয়েছে চৈতালী সান্যাল, শংকর হালদার শৈলবালা ও রীতা ঘোষের গল্প। ওমর খালেদ রুমির গল্প অনুবাদধর্মী ধাঁচে কেন লেখা বোঝা গেল না কারণ সেখানে তেমন কোনও উল্লেখ নেইরীতা ঘোষের গল্পটি সুন্দর এগোচ্ছিল কিন্তু শেষটায় গল্পের সমাপনের জায়গায় ছাপা বিভ্রাটে ঢুকে গেছে স্বপ্না চৌধুরী ভট্টাচার্যের নিবন্ধের শেষাংশ। সুতরাং গল্প রয়ে গেছে অসম্পূর্ণ। ড. সেবিকা ধরের গল্প ব্যতিক্রমী কিন্তু লিখনশৈলীতে অনুবাদের ধাঁচ প্রত্যক্ষ করা যায় যদিও তেমন কোনো উল্লেখ না থাকায় ধরেই নেওয়া যায় মৌলিক বলে।
সংখ্যার শেষ রচনা হিসেবে মধুরেণ সমাপয়েৎ ঘটেছে স্বাতী দত্তের ভ্রমণকাহিনি ‘রূপের রানি সিকিম’ দিয়ে। চার পৃষ্ঠা জোড়া বিস্তৃত, সুলিখিত একটি সম্পূর্ণ পঠনযোগ্য বৃত্তান্ত।
এত বিশাল আয়োজন, এত মহৎ বিষয় নিয়ে এমন একটি সংখ্যা প্রকাশ করা সহজ কথা নয়। তবু তা করে দেখিয়েছেন সম্পাদক জহর দেবনাথ। সম্পাদনামণ্ডলীতে রয়েছেন মানিক দেবনাথ, রীতা ঘোষ, ড. স্বপন শর্মা ও কৃপেশ ঘোষ। সম্পাদকীয়র বাইরে সুলেখক জহর দেবনাথের লেখার অনুপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।
ছাপা স্পষ্ট, অক্ষরবিন্যাস যথাযথ। পত্রিকার সাইজ খানিকটা ছোট হলে পাঠক-বান্ধব হয়। বানান ভুলের আধিক্য সংখ্যাটির মর্যাদা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ণ করেছে। লেখার শিরোনাম, লেখক নাম সহ ভেতরের পাতায় রয়ে গেছে অসংখ্য বানান ভুল। ভবিষ্যতে এদিকটায় বিশেষ নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কারণ এতে যেমন প্রতিষ্ঠিত লেখকদের লেখার গরিমা বিঘ্নিত হয় তেমনি উঠতি বা নবীন লেখকদের কাছে একটা ভুল বার্তা পৌঁছে যায়। এই আয়াসটুকু হাতে নিলে ভবিষ্যতে পত্রিকা জগতে ‘উপত্যকা’ যে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে তার সবটুকু পরিচয় নিবদ্ধ রয়েছে এই সংখ্যায়। উদ্যোগ কতটা মহৎ, গরজ কতটা আন্তরিক তার উৎকৃষ্ট নিদর্শন আলোচ্য সংখ্যা  ‘উপত্যকা’।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

 

মূল্য - ৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৪১৪৯৪৩৮০২

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...