শুধু গ্রন্থনাম নয়, গ্রন্থের প্রতিটি কবিতাকেও বলা যায় সেলেস্টিয়াল। কবি রাজীব ঘোষ-এর সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থ। ৬৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থের ৫৬ পৃষ্ঠা জুড়ে আছে ৫৬ টি ভিন্ন স্বাদের কবিতা। শব্দকুহকের কবিতা, বিপ্রতীপ উপস্থাপনের কবিতা, উপমা ও উপমেয়র সমান্তরাল প্রয়োগের কবিতা, ইল্যুশনের কবিতা। এবং প্রতিটি কবিতাই তাই। মনে হয় যেন গ্রন্থনাম অনুসারে কবির গভীর রাতের কপোলকল্পনা, স্বর্গীয় আচ্ছন্নতায় মোড়া এক একটি কবিতা। এবং… শুধু কবিতা নয়, প্রতিটি পঙক্তি, প্রতিটি শব্দযুগলেই যেন পূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে শব্দব্রহ্মের ভাঁড়ার। প্রথম ব্লার্বের আরোও একটু বিশ্লেষণী পাঠ সেরে নেওয়া যেতে পারে এই পরিসরে - ‘... রাজীবের শব্দ ব্যবহার বৈচিত্র্য আপনাকে আকৃষ্ট করবেই, বিভিন্ন ভাষার শব্দগুলোকে নিয়ে স্বাধীনভাবে খেলা - এটা কবির আর্ট। ... শব্দের স্বাধীনতা গড়ে তোলেন কবির খেলার মাঠ কিংবা আঁকার ক্যানভাসে। কখনও অতি মসৃণ শব্দের সঙ্গে অতি কর্কশ শব্দের পরিণয় ঘটিয়ে ফেলেন, আবার কখনও একেবারে পরিশীলিত শব্দের সাথে ভীশণ আপত্তিকর শব্দ নিয়েও খেলেন। ... রাজীবের কবিতা বোঝার সুযোগ না দিয়েই অন্য দিকে বাঁক নিয়ে নেয় আর অনায়াসেই পাঠককে খাদের কিনারে দাঁড় করিয়ে দেয়।’ কিছু পঙক্তির উল্লেখেই ঘটনা পরিস্ফুট হবে যথার্থ স্বরূপে -
… ছন্নছাড়া ঢেউ হাততালি দিতে দিতে আত্মহত্যা শেখায়
প্রবুদ্ধ আকাশ বইয়ের স্তূপ ঘেঁটে খুঁজে পায় না
গোঙানি জমাটবাঁধা নীল চৈত্রের স্কুলটি
কাচের ব্রিজটি মেঘের বিবৃতি পড়ে পা ফাঁক করে দাঁড়ায়। …… (প্রথম কবিতা - রানওয়ে ছেড়ে মেঘেদের সহোদর)।
কিছু কি বোঝা গেল ? আসলে কবিতা পড়ে বোঝার চেষ্টা করাটাই যেন এক অকাজের কাজ। কবিতার রসাস্বাদনে যে তৃপ্তি সেখানে বোঝা না বোঝার যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়ার কোনও মানেই থাকতে পারে না। ঠিক সেই ঘরানারই কবি রাজীব, ঠিক সেই ঘরানার কবিতাই যাঁর নিত্য প্রসব। বিস্ময়াবিষ্ট শব্দ প্রয়োগের অসংখ্য উদাহরণ আলোচ্য এই গ্রন্থ। আলাদা করে কোনো কবিতাকেই চিহ্নায়িত করার সুযোগ নেই। আদ্যোপান্ত একই ধাঁচ, কবিতায় শব্দের ভোজবাজি। তুলে ধরা যাক আরোও কিছু ...
সরযূ নদীর চোখের জল থেকে
গড়িয়ে পড়ে মাছেদের স্নানের কৌশল
শ্রাবন্তী আকাশ বুক চেপে দেখে
দহের দিকে হেঁটে চলেছে দারিদ্র্যের মাঝি
দুঃসহ-নির্জনতা খানখান করে
যাযাবরী তরুণ সূর্যের ফাজলামি মুদ্রা
বিজলির সাথে নেচে ওঠে বিজলির ঠোঁট
রাগিনী শব্দরা রক্তপাতে ভেসে যায়। ... (কবিতা - বিধবা পোশাকে সাঁতার)।
কবির এই জাদুকরি কবিতাযাপন অনুভব করা যায় তাঁর অধিকাংশ কবিতায়। তাঁর নির্মোহ চলনবলন, শব্দের সাহসী প্রক্ষেপন, তাঁর দৃপ্ত, সুপ্ত ইচ্ছেরা কবিতার গায়ে এঁকে দেয় ইচ্ছেপূরণের বার্তা। আভিজাত্য আর দুঃসাহস সমান্তরাল ঠিকরে বেরোয় কবিতার শরীর থেকে -
একটা জাদুকরির জন্য যুদ্ধ করতে পারি সারারাত
লাল ওয়াইন নাভিতে ঢেলে পান করতে পারি
হরিণ ছোটাতে পারি ঈশ্বরকে দাস বানিয়ে
সমস্ত বজ্রপাত নিয়ে নদীতে উড়িয়ে দিই বন্যা। ......
যেখানে কাঁচা কোকিলের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীর দুপুর
জলন্ত আঙুল দিয়ে আমার পিঠে এঁকে দেয় পদচিহ্ন
আধমরা ভ্যাজাইনা থেকে ভেসে আসে ঘণ্টাধ্বনি
একটি মৃত্যুর জন্য কেঁদে ওঠে আর একটি মৃত্যুর নির্বাচন। (কবিতা - জাদুকরির জন্য)।
শব্দ আর ভাবনার কারিকুরিতে নিমগ্ন কবির ভাবনা বয়ে চলে সেলেস্টিয়াল পথে। এমনকি কবিতার শিরোনামেও এই ধারা অব্যাহত। উদ্দাম, ছুটে চলা কবিমন কখনও শান্ত সমাহিত শব্দব্রহ্মে হয়ে যায় বিলীন। শেষ কবিতার শেষ কয়েকটি লাইন এমনই এক আবহ তৈরি করে পাঠককে এনে দাঁড় করায় এক অনিশ্চিত নিশ্চয়তায়, এক সেলেস্টিয়াল সফর শেষে এনে দেয় এক নিঝুম যতিচিহ্নময় দীর্ঘশ্বাসে -
নগরীতে যাঁরা কেঁদে বেড়ায় রূপোলি বৃষ্টি জড়ো করে
তারাও জানে না কার প্রয়োজন আগে, আগুন না বারুদ।
কুসুমগুলি স্রোতের মতো গড়িয়ে যায় নোংরা ড্রেনে
দাও ব্রহ্মা, প্রাণ সৃষ্টির আগে এক উজ্জ্বল শিশির বিন্দু। (কবিতা - ব্রহ্মা জানে)।
স্পষ্ট ছাপা ও বাঁধাইসম্পন্ন হার্ড বোর্ডের গ্রন্থটির প্রকাশনায় বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ, কলকাতা। শোভনীয় প্রচ্ছদের সৌজন্যে অতনু গাঙ্গুলী। গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন ‘সুহৃদ কবি শ্রীজাত এবং কবি সুমন গুনকে’। হাতে গোনা দু’একটি বানান ভুলের বাইরে সর্বাংশে এক নান্দনিকতার পরশস্মৃদ্ধ কাব্যগ্রন্থ - ‘সেলেস্টিয়াল রাত’।
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৭৬১৯৩৩৬৬৯
… ছন্নছাড়া ঢেউ হাততালি দিতে দিতে আত্মহত্যা শেখায়
প্রবুদ্ধ আকাশ বইয়ের স্তূপ ঘেঁটে খুঁজে পায় না
গোঙানি জমাটবাঁধা নীল চৈত্রের স্কুলটি
কাচের ব্রিজটি মেঘের বিবৃতি পড়ে পা ফাঁক করে দাঁড়ায়। …… (প্রথম কবিতা - রানওয়ে ছেড়ে মেঘেদের সহোদর)।
কিছু কি বোঝা গেল ? আসলে কবিতা পড়ে বোঝার চেষ্টা করাটাই যেন এক অকাজের কাজ। কবিতার রসাস্বাদনে যে তৃপ্তি সেখানে বোঝা না বোঝার যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়ার কোনও মানেই থাকতে পারে না। ঠিক সেই ঘরানারই কবি রাজীব, ঠিক সেই ঘরানার কবিতাই যাঁর নিত্য প্রসব। বিস্ময়াবিষ্ট শব্দ প্রয়োগের অসংখ্য উদাহরণ আলোচ্য এই গ্রন্থ। আলাদা করে কোনো কবিতাকেই চিহ্নায়িত করার সুযোগ নেই। আদ্যোপান্ত একই ধাঁচ, কবিতায় শব্দের ভোজবাজি। তুলে ধরা যাক আরোও কিছু ...
সরযূ নদীর চোখের জল থেকে
গড়িয়ে পড়ে মাছেদের স্নানের কৌশল
শ্রাবন্তী আকাশ বুক চেপে দেখে
দহের দিকে হেঁটে চলেছে দারিদ্র্যের মাঝি
দুঃসহ-নির্জনতা খানখান করে
যাযাবরী তরুণ সূর্যের ফাজলামি মুদ্রা
বিজলির সাথে নেচে ওঠে বিজলির ঠোঁট
রাগিনী শব্দরা রক্তপাতে ভেসে যায়। ... (কবিতা - বিধবা পোশাকে সাঁতার)।
কবির এই জাদুকরি কবিতাযাপন অনুভব করা যায় তাঁর অধিকাংশ কবিতায়। তাঁর নির্মোহ চলনবলন, শব্দের সাহসী প্রক্ষেপন, তাঁর দৃপ্ত, সুপ্ত ইচ্ছেরা কবিতার গায়ে এঁকে দেয় ইচ্ছেপূরণের বার্তা। আভিজাত্য আর দুঃসাহস সমান্তরাল ঠিকরে বেরোয় কবিতার শরীর থেকে -
একটা জাদুকরির জন্য যুদ্ধ করতে পারি সারারাত
লাল ওয়াইন নাভিতে ঢেলে পান করতে পারি
হরিণ ছোটাতে পারি ঈশ্বরকে দাস বানিয়ে
সমস্ত বজ্রপাত নিয়ে নদীতে উড়িয়ে দিই বন্যা। ......
যেখানে কাঁচা কোকিলের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীর দুপুর
জলন্ত আঙুল দিয়ে আমার পিঠে এঁকে দেয় পদচিহ্ন
আধমরা ভ্যাজাইনা থেকে ভেসে আসে ঘণ্টাধ্বনি
একটি মৃত্যুর জন্য কেঁদে ওঠে আর একটি মৃত্যুর নির্বাচন। (কবিতা - জাদুকরির জন্য)।
শব্দ আর ভাবনার কারিকুরিতে নিমগ্ন কবির ভাবনা বয়ে চলে সেলেস্টিয়াল পথে। এমনকি কবিতার শিরোনামেও এই ধারা অব্যাহত। উদ্দাম, ছুটে চলা কবিমন কখনও শান্ত সমাহিত শব্দব্রহ্মে হয়ে যায় বিলীন। শেষ কবিতার শেষ কয়েকটি লাইন এমনই এক আবহ তৈরি করে পাঠককে এনে দাঁড় করায় এক অনিশ্চিত নিশ্চয়তায়, এক সেলেস্টিয়াল সফর শেষে এনে দেয় এক নিঝুম যতিচিহ্নময় দীর্ঘশ্বাসে -
নগরীতে যাঁরা কেঁদে বেড়ায় রূপোলি বৃষ্টি জড়ো করে
তারাও জানে না কার প্রয়োজন আগে, আগুন না বারুদ।
কুসুমগুলি স্রোতের মতো গড়িয়ে যায় নোংরা ড্রেনে
দাও ব্রহ্মা, প্রাণ সৃষ্টির আগে এক উজ্জ্বল শিশির বিন্দু। (কবিতা - ব্রহ্মা জানে)।
স্পষ্ট ছাপা ও বাঁধাইসম্পন্ন হার্ড বোর্ডের গ্রন্থটির প্রকাশনায় বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ, কলকাতা। শোভনীয় প্রচ্ছদের সৌজন্যে অতনু গাঙ্গুলী। গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন ‘সুহৃদ কবি শ্রীজাত এবং কবি সুমন গুনকে’। হাতে গোনা দু’একটি বানান ভুলের বাইরে সর্বাংশে এক নান্দনিকতার পরশস্মৃদ্ধ কাব্যগ্রন্থ - ‘সেলেস্টিয়াল রাত’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৭৬১৯৩৩৬৬৯

Comments
Post a Comment