Skip to main content

বিষয় নির্ভর গল্পের সমাহার 'ড. গীতা সাহার গল্প সমগ্র'


খানিকটা দেরিতেই হাতে এল ‘ড. গীতা সাহার গল্পসমগ্র’ গ্রন্থটি লেখক কর্ম এবং বসবাসসূত্রে মূলত বরাকভূমের হলেও তাঁর উচ্চশিক্ষাজীবন কেটেছে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় আলোচ্য গ্রন্থের শেষ মলাটে আছে পরিচিতি যা দস্তুর মতো চমকে দেওয়ার মতো খানিকটা উদ্ধৃতি এখানে নিতান্তই প্রাসঙ্গিক - ‘গৌহাটী বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রী গীতা সাহা স্নাতকোত্তর সংস্কৃত বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করে স্বর্ণপদক লাভ করেন স্নাতক শ্রেণিতেও সংস্কৃত বিষয়ে অনার্স সহ ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শ্রেষ্ঠ স্নাতকের সম্মান নিয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন অতঃপর গৌহাটী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন পরে মাতৃভাষা বাংলাতেও এমএ ডিগ্রী লাভ করেন …… কর্মজীবন শুরু হয় করিমগঞ্জ রবীন্দ্রসদন মহিলা মহাবিদ্যালয়ে সংস্কৃত বিষয়ের অধ্যাপিকা রূপে পরবর্তী সময়ে চাকুরি জীবনের এক দীর্ঘ সময় উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করে অবসর গ্রহণ করেন
তাঁর এ যাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থ দশ যার মধ্যে রয়েছে সংস্কৃত, বাংলা ও অসমিয়া ভাষায় রচিত গ্রন্থ এর বেশির ভাগই কবিতা, ছড়া ও প্রবন্ধ এহেন উচ্চশিক্ষিত এই বহুভাষিক লেখকের প্রথম গল্প সংকলন - ‘. গীতা সাহার গল্পসমগ্র প্রাক্কথনে লেখক তাঁর গল্প নিয়ে লিখছেন - ‘সাহিত্যে বিভিন্ন অঙ্গনে বিচরণ করছি অনেকদিন থেকেইঅল্প সংখ্যায় কিছু গল্পও লিখেছিএবারে গল্পগুলোকে একত্র করে প্রকাশিত হচ্ছে ড. গীতা সাহার গল্পসমগ্র গল্পগুলিতে নিজের অভিজ্ঞতা, সত্য ঘটনা, বাস্তব উপলব্ধি ইত্যাদি স্থান পেয়েছে
উপরিউক্ত ভূমিকার সূত্র ধরেই এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে মোট উনিশটি ছোটোগল্প। গল্পগুলি অধ্যয়নে ভূমিকায় বর্ণিত ব্যাখ্যাই পরিস্ফুট হয়েছে পুরোপুরি। বলা হয় সত্য ঘটনা নাকি কখনও সাহিত্য হয়ে ওঠে না। এই আপ্তবাক্য এখানে বহুলাংশে মিথ্যে প্রতিভাত হয়েছে যদিও গল্পের বুনোট তথা সাহিত্যরসে কিছুটা হলেও প্রকাশ পেয়েছে যাথার্থ্য। সত্য ঘটনার সঙ্গে কিছু কল্পনা জুড়ে দিলেই এই ঘাটতিটুকু কাটানো যেত অনায়াসে। তবে লেখক সেই পথে হাঁটতে চাননি। ফলত প্রতিটি গল্প হয়ে উঠেছে মূলত বিষয় নির্ভর, কাহিনিনির্ভর। তবে এও সত্যি প্রতিটি গল্পই হয়ে উঠেছে সত্যিকারের গল্প যা পাঠকের দরবারে সমাদৃত হবে নিঃসন্দেহে। ঘটনাবলির বিস্তার ও গল্পের চলন পাঠককে ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে একশোভাগ। তাছাড়া গল্পের দৈর্ঘ্য অধিক না হওয়ায় একের পর এক গল্প পাঠে সহজেই অভ্যস্ত ও স্বচ্ছন্দ হয়ে পড়বেন পাঠক - এমন প্রত্যয়ও রাখা যেতেই পারে।
বিষয়বস্তুর দিকে নজর রাখলে দেখা যায় বেশ কিছু গল্পে এসেছে শিশু-কিশোর মনস্তত্ত্ব, প্রাণীপ্রেম, নারী জীবনের নানান অনুষঙ্গ, জীবনবোধের পরাকাষ্ঠা, যাপনপথের মন্দ ভালোর দোলাচল তথা জীবন্ত ছবি, দুঃখ ব্যথার বাস্তব বাখান ও নিঠুর বাস্তবের প্রতিচ্ছবি। গল্পগুলো পাঠে সহজেই অনুমান করা যায় লেখক এখানে যে বাস্তবের বাইরে এগোননি একচুলও। আপামর মানুষের চোখে দেখা বাস্তবই বারবার এসেছে একের পর এক গল্পে। তবু তারা গল্প হয়ে উঠেছে ঘটনার বৈচিত্র্যে, প্রেক্ষাপট ও পারিপার্শ্বিকতার ভিন্নতায়। স্বভাবতই অধিকাংশ গল্পের সমাপন হয়তো পাঠকের কাঙ্ক্ষিত পথে হয়নি। হয়েছে বাস্তবের সূত্র ধরে।
অধিকাংশ গল্পেই জীবনের প্রধান অনুষঙ্গ ‘মৃত্যু’ এসেছে মূল উপজীব্য হিসেবে। গল্পের মূল বিষয় কোনো না কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু, অকাল মৃত্যু। মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতেই গড়ে উঠেছে গল্প কিংবা ঘুরে গেছে গল্পের মোড়। এছাড়াও এসেছে নানা ঘটনাবলি যা সরল জীবনযাপনে অনুভূত হয় মানব জীবনের ধাপে ধাপে।
গল্পগুলির নামকরণে লেখক কিছু ব্যতিক্রমী। এর প্রমাণ পাওয়া যায় বেশ কিছু গল্পে। কিছু গল্প বিশেষভাবে রেখাপাত করে পাঠকহৃদয়ে। যেমন - ফিরে পাওয়া, প্রতিভার অকালমৃত্যু, বিদ্যা দদাতি বিনয়ম, জননী জন্মভূমিশ্চ, যে ফুল না ফুটিতে ঝরেছে ধরণীতে, সমুদ্র সৈকতে, স্বপ্নভঙ্গ, একজন আত্মনির্ভরশীল মহিলার কথা, চিঠি ইত্যাদি। আগেই বলা হয়েছে কিছু গল্প সত্যিকারের গল্প হয়ে না উঠলেও ঘটনার ঘনঘটায় ও বিষয়বৈচিত্র্যে হয়ে উঠেছে গল্পবৎ - যা পড়া শুরু করলে এক পঠনেই পৌঁছোতে হয় সমাপ্তিতে।
আলোচনার শুরুতেই যে ভূমিকাটুকু দেওয়া হয়েছে সেই সূত্রে লেখকের সংস্কৃত বিষয়ে পারদর্শিতার ফলস্বরূপ গল্পে প্রবেশ ঘটেছে অসংখ্য তৎসম শব্দ যা আধুনিক গল্পের ব্যাকরণ ক্ষুণ্ণ করেছে বহুলাংশে। অন্যদিকে বানানের শুদ্ধতা গল্পগুলিকে প্রদান করেছে আলাদা মর্যাদা। ছাপার ভুল প্রায় নেই বললেও চলে। কাগজের মান, ছাপার মান, বর্ণ, অক্ষর, শব্দ ও বাক্যবিন্যাস যথাযথ। স্কলার পাবলিকেশন, করিমগঞ্জ থেকে লেখক কর্তৃক প্রকাশিত ১০২ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘আদরের ভাইঝি মাহীকে’। ছিমছাম প্রচ্ছদ নান্দনিকতার পরিচায়ক।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - ১০০ টাকা

যোগাযোগ - অনুল্লেখিত। 

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...