Skip to main content

শ্মশানের স্তব্ধতা

- যা, আরেকবার খুঁচিয়ে দিয়ে আয় দেহটা
দেখিস না কেমন বেঁকে গেছে পা-টা ?
 
সেদিন চোখের ভিতর 'তিনকা' পড়ে সে কী জ্বালা
গরম জলের একটি বিন্দু তুলেছে
ঢাউস এক জলটম্বুর ফোসকা
দিন সাতেকের দহন যন্ত্ৰণা।
 
- আরে আরে পড়ে যাবে 'বডি', শীগগির যা
ভালো করে গুঁজে দে কাঠখড়ি
 
সেবার খাটের কোণে পা লেগে যে
পড়েছিল দেহ মাস্টার বেডরুমে
ভেঙেছিল কড়ে আঙুল (তবু রক্ষা ভাঙেনি মেঝে)
ফুলে কলাগাছ হয়ে রইল দিন দুই কুড়ি।
এই নরদেহ পলকে ভোকাট্টা আকাশের ঘুড়ি
নচেৎ পথের ধারঘেঁষা সব অচল পাথর, নুড়ি।
 
- কই রে গোপাল ?
যা তো দেখ চেয়ে - ফাটছে কপাল।
আপাত নীরব যাত্রাপথে শব্দের কোলাহল।
কপাল খুঁজে খুঁজে ফেরে মাতাল গোপাল
হাঁক দেয় কেউ - 'পেগ টেনেছিস মাল ?
 
আগেও একবার ফেটেছিল এ কপাল
ছেড়েছিল দেশ - হানাহানি উত্তাল
ছেড়েছিল সব সম্ভ্রম, শেষ পারানির সম্বল
সব হারিয়ে নিঃস্ব অকিঞ্চন
ছিল শুধু এই দেহ, এই নাম
তকমা জুটেছে শিরোপরি - ভাগ্যের পরিণাম
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উদ্‌বাস্তু শিরোনাম।
আজ শেষবার ফাটছে কপাল
শেষ যাত্রায় এই দেহ, এই নাম - ছাড়ছে ইহকাল।
 
মাঝে মাঝেই উঠছে রোল
হরি বল, হরি বল
চলছে নতুন ‘বডি’র মিছিল
চলছে নতুন হট্টগোল আর খিস্তি, গালাগাল -
গোপাল তখন রক্তরাঙা, মালে মালে মালামাল
চলন টালমাটাল,
খুঁজেই চলে বডি থেকে খসা, খানদানি এক ভাল।
 
দূরে বসে কেউ ঝরায় অশ্রুধারা
খুঁজে ফেরে নীরবতা
তপ্ত বহ্নি, স্তব্ধ দুপুরে নিঝুম ছন্নছাড়া।
পিতৃহীন এ সংসার, কোন পথে হব পার ?
সব তকমা, সব জীবনছবি নিমেষেই হবে ছারখার। 
পরম মমতার ধন, যতনের ধন এ দেহ,
এই কষ্টার্জিত নরদেহ
আজ লাশ হয়ে গেল, হয়ে গেল বডিশেষমেশ
কোথায় রইল পড়ে এই ঘর বাড়ি, এই দেশ ? 
 
কত কথা, কত সংগ্রামের ইতিকথা
কত হাল না ছাড়া প্রত্যয়ের কথা।
সুখের মানবজমিন, রইল পতিত
ভাষার বিদ্বেষ, ধর্ম নিল কেড়ে - কোন অজুহাতে ?
কে দিয়েছিল কার বাড়া ভাতে ছাই ?
সেদিন ছিল ললাট লিখন, আজ কৃষ্ণবিনে গতি নাই।
 
তখন নাকি বাবা দশেরও কম, চার ক্লাসে
কত পথ শেষে ক্লান্ত দুপায়ে
এসেছেন ছেড়ে সাধের খেলাভূমি।
পায়ের ব্যথা কমে গেছে কয়েক দিনে
মনের ব্যথা বয়েছেন আজীবন
শেষের দিনে, সেইটুকু সাথে নিয়ে
নীরবে ছেড়েছেন প্রিয় ঘর প্রাঙ্গন।
 
নীরব যাত্রা পথে এ কেমন অস্থিরতা ?
হইচই যত এই কি নিস্তব্ধতা ?
ভোগের বিলাসে মত্ত মানুষ সব
এখানে চিতায় জ্বলছে যারা
তাদের আবার জীবন কীসের, সবটাই শুধু শব।
 
একদিন তো শব হবে সব
লেখা আছে কপালে অমোঘ সত্য সার
ছাই হবে দেহ কিংবা মেলাবে মাটিতে
মিছে আসা ধরণীতে।
মিছে শুধু আসা যাওয়া
মিছে এ তরণী বাওয়া
তাই কি এ কোলাহল, জেনেছে মাতাল দল ?
দেহটাকে নিয়ে তাই কি এমন খেলা ?
প্রাণহীন এই দেহ, তাই কি এতটা হেলা ?
 
দূরে বসে কেউ আত্মভোলা যাপন
কতই না বলা কথা রয়েই গেল গোপন
আর তো যাবে না বলা
শেষ যাত্রার বেলা, রয়ে গেল বাকি কথা।
মনের মধ্যে খেলছে শুধু ইহকাল পরকাল
এ মন বড় নরম মাটির তাল
কেউ বলে, যা শিখেছ - সব মিথ্যে ইতিহাস
কেউ বলে, তাই ? বৃথা এত পরিহাস
এ মাটি আবাদ করেছে কেউ
গড়েছে আপন করে, ভেঙে করে চৌচির
আজ সবকিছু হয়েছে স্থির
কথার ভেতর লুকিয়ে থাকে কত কথা
ছন্নছাড়া কিছু, কিছু পরিপাটি নিটোল
কারো সবেতেই তালগোল
সব থেকে যায় লুক্কায়িত, ঋদ্ধ ভেতরমহল
মনের মধ্যে নিত্য হিসেবনিকেশ
বাইরে শুধুই বাহবা, বাহবা, বেশ
মন ভুলেনি কথার সাগর, মিথ্যে বড়াই
হোক না মিছে তবু তোমার, আমার
সেই ইতিহাস চাই
আজ, মাথার ভেতর শুধুই নিরেট ছাই
আর আছে শুধু জল,
শেষের বেলায় - এ দুটোই সম্বল
 
এমনই কত কথা, কত জীবনযাপন গাথা
এক লহমায় হল শেষ
অথচ জীবন দীর্ঘ দহন পথে
পেরিয়ে এসেছে কত বিষাদসিন্ধু
আরঅগুনতি শোক বুকে ধরেও
টুকরো টুকরো হর্ষবেলার গান
 
এ যাপন পেরিয়ে সহস্র আলোর পথে
চলে গেল যে মহাপ্রাণ, জীবনসেনানী মহান
বুকে ধরে এক জীবনের
যত যাপনকথার বৃত্তান্ত, কথা অনন্ত
বিস্মৃতির ভাঁড়ারে ফেলে দিয়ে যত দুঃখ অপমান
সংস্কৃত পথে বেড়ে ওঠা সংগ্রাম
চোখের সামনে দেখে শেখা, ঠেকে শেখা
শিখতে শিখতেই এ জীবন হল সারা
কোথা দিয়ে গেল বর্ষা কিংবা
কুসুমে কুসুমে জাগ্রত বসন্তবেলা
আসেনি পলাশ কিংবা গোলাপ বসন্ত
পলকা শিমূল আর পীত অতসী মাখা
ধুলোময় সব ধূসর বসন্ত শাখা
সারাটা জীবন হৃদয়ে ধরে রেখে
শুধুই দাবদাহ, গ্রীষ্মবেলার শুধুই ভস্মকথা।
 
কুড়িয়ে নেওয়া টুকরো সুখেই
আত্মহারা সেই বেলা,
কিছু খুনশুটি খেলা।
যতটা সুখ, বহুগুণ দায়
প্রজন্মসুখের নির্মাণ-সুখ দায়
স্বেদবিন্দুধারা ঝরেছে অঝোর ধারায়।
শুধু ছোটাছুটি এধার ওধার
খুঁজে মরা শুধু পায়ের তলায় শক্ত মাটির আধার।
কত নদীপথে বয়ে গেছে কত জল
গর্ভজল থেকে চিতাজল
সেই নদী জানে সব কথা
গহ্বরে যার ধরা আছে সব অনন্ত পারাপার কথা।
প্রতিটি জলের বিন্দুতে আছে ধরা
সব শোকগাথা, কানায় কানায় ভরা।
 
সব কথা আজ হয়ে গেল ইতিহাস
ধুয়ে মুছে দেবে স্বচ্ছ জলের ধারা
বড় অসহায় এ ক্ষণ, এ অবুঝ মন
অন্তর জুড়ে অনন্ত শূন্যতা শুধু,
এই কি জীবন ?
একসাথে এত এত প্রাণ ....
এ কোন যুদ্ধ ? একসাথে হল স্তব্ধ
কত হাসি কত গান কত কথামালা
হিসেব নিকেশ কোলাহল
লিখা হল না সফরনামা
মাঝপথেই থমকে গেল পথ চলা
আচমকা শুরু হল এক
অজানা অনন্ত সফর
 
মৌন সফর - অদৃশ্য পথ ধরে
প্রিয়জন পরিজন ছেড়ে
চেনা অচেনার সব পরিসর ভেঙে
এ কোন বিধির নিয়ম ?
 
একরাশ মায়া এসে আচ্ছন্ন করে হৃদয়
শ্মশান জুড়ে ঘনায় কালো ছায়া
কেউ হাঁক দিয়ে ডাকে -
ধুয়ে ফেল, ধুয়ে ফেল সব
সাজিয়ে রাখ নতুন চিতা - ওই এল বলে
অনন্ত পথের নব্য নতুন যাত্রী।
আবারও রব ওঠে - হরি বল, হরি বল
দাঁড়ায় গোপাল, গলায় ঢালে
শোকবিস্মৃতির আজব গজব তরল
 
সব লেখা গেছে মুছে, তবু
অদাহ্য কপালের একটি টুকরো হাতে
ফিরে আসে এক প্রজন্ম
কপালের অলিখিত সব কথা
অন্তর্জলি স্রোতে ভাসাতে গঙ্গাজলে,
প্রায়শ্চিত্তের গোপন অশ্রুজলে।
হোক সমাপন যত অদাহ্য গোপন ব্যথা
ব্যর্থ জীবনের অগুনতি সফলতা
চারা থেকে মহিরুহ পথের, হে মহান নির্মাতা
ইতিহাসের গোপন খাতায় জুড়ে যাক আজ
তোমার জন্য একটি নতুন পাতা,
নব আঙ্গিকে লেখা হোক আজ অনন্য শোকগাথা,
মায়াপৃথিবীর শ্মশান ছায়ায় প্রোথিত হোক
ছন্নছাড়া এক স্তব্ধতার কবিতা।

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...